Citizen Rights, Politics

জুলাই সনদ (সারাংশ)

জুলাই সনদ:  রাষ্ট্রীয় সংলাপ ২০২৫-এর জন্য প্রস্তাবিত রূপরেখা

প্রস্তাবনাঃ

২০২৪ সালের জুলাই-আগস্ট মাসে সংঘটিত কোটা-সংস্কার আন্দোলনের আলোকে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা সংস্কারের একটি ঐতিহাসিক সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে। এই পরিপ্রেক্ষিতে আমরা নিম্নস্বাক্ষরকারী বিভিন্ন রাজনৈতিক দল, প্রতিষ্ঠান ও শক্তিসমূহের সাথে আলোচনাক্রমে গঠিত রাষ্ট্রীয় সংলাপ কমিটির মাধ্যমে নিম্নলিখিত বিষয়সমূহে জাতীয় ঐকমত্যে উপনীত হচ্ছি।

১. পটভূমি

১৯৭১ সালে সমৃদ্ধ, গণমুখী ও প্রগতিশীল নীতিকে আত্মস্থ করে গঠিত মহান মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে যে একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র কাঠামো প্রতিষ্ঠার আকাঙ্ক্ষা বাংলাদেশের জনগণের মধ্যে সৃষ্টি হয়েছিল, দীর্ঘ ৫৩ বছরেও তা অর্জন করা যায়নি। কারণ গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া ও প্রতিষ্ঠানসমূহ বারবার স্বৈরাচারী শাসনের কবলে পড়েছে। দুর্ভাগ্যবশত, গত পাঁচ দশকে রাষ্ট্রের গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানসমূহকে একদিকে সংসদভিত্তিক ব্যবস্থা থেকে বিচ্যুত করা হয়েছে। অন্যদিকে, সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানসমূহ বিদ্যমান থাকলেও সেগুলো অত্যন্ত দুর্বলভাবে কাজ করছে। অকার্যকর ও অনিয়ন্ত্রিত প্রতিষ্ঠানসমূহকে আরও দুর্বল করার মাধ্যমে রাষ্ট্রীয় কার্যক্রম পরিচালনা করা হচ্ছে।

২০০৯ সালে একটি দলীয় সরকার রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব নিয়ে জোরপূর্বক গণতান্ত্রিক মূল্যবোধকে উপেক্ষা করে অগণতান্ত্রিক পথ অবলম্বন করে। তারা রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ ও সমালোচকদের উপর গুম, খুন, লাঞ্ছনা, গৃহবন্দী, হয়রানি, গুণ্ডামি ও মামলার মাধ্যমে একটি নজিরবিহীন ও সহিংস রাজনৈতিক পরিবেশ সৃষ্টি করে। স্বাধীন জাতীয় সংসদকে ভোটারদের কাছে জবাবদিহিতার পরিবর্তে ব্যক্তিগত ও গোষ্ঠীস্বার্থে ব্যবহার করা হয়। গত এক দশক ধরে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ সরকার সংবিধানের মৌলিক কাঠামো ক্ষুণ্ণ করে, সংলাপ প্রক্রিয়া বাধাগ্রস্ত করে, বিভিন্ন বেআইনি আইন প্রণয়ন, নির্বাচনী ব্যবস্থাকে অকার্যকর করা, প্রশাসনিক কাঠামোকে দলীয়করণ এবং বিচার বিভাগের মাধ্যমে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানসমূহের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নেয়।

এই পটভূমিতে, ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্ট মাসে শিক্ষার্থীদের নেতৃত্বে সৃষ্ট শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভে সাধারণ কোটা-সংস্কার আন্দোলনের অংশগ্রহণের ফলে একটি অভূতপূর্ব গণজাগরণ সৃষ্টি হয়। এতে পুলিশের বেপরোয়া দমন-পীড়নের ফলে নিহত ও নারীসহ সর্বস্তরের একাধিক মানুষ নিহত এবং লক্ষাধিক মানুষ আহত হন। তাদের আত্মত্যাগ ও সংগ্রামের কথা স্মরণ করে এবং জনগণের সংহত শক্তি ও আকাঙ্ক্ষার প্রতি শ্রদ্ধা রেখে রাষ্ট্র-কাঠামো সংস্কারের একটি নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হয়েছে। এই প্রেক্ষাপটে রাষ্ট্রীয় সংলাপ, বিশেষ করে সংসদীয় ব্যবস্থার সংস্কার, নির্বাচনী ব্যবস্থার পুনর্গঠন, গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানের স্বাধীনতা, স্বাধীন ও নিরপেক্ষ নির্বাচন কমিশন গঠন এবং স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক সরকারি প্রতিষ্ঠান গঠনের ঐতিহাসিক সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে, যার সদ্ব্যবহার আমাদের সকলের নৈতিক দায়িত্ব।

২. সংলাপ কমিটি গঠন

বর্তমান সংবিধানের ৭০নং অনুচ্ছেদ সংশোধনের মাধ্যমে রাষ্ট্রপতি কর্তৃক নির্দেশিত কার্যনির্বাহী আদেশের ভিত্তিতে ২০২৪ সালের ৮ আগস্ট প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার পদত্যাগের পর অন্তর্বর্তীকালীন সরকার দায়িত্ব নিয়ে রাষ্ট্রীয় সংলাপের বিভিন্ন দাবি গ্রহণ করে। তারই ধারাবাহিকতায় ৭ সেপ্টেম্বর, ২০২৪ তারিখে সরকার এক প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে ছয়টি সংলাপ কমিটি গঠন করে। কমিটিগুলো হলো: সংসদীয় ব্যবস্থা সংলাপ কমিটি, নির্বাচনী ব্যবস্থা সংলাপ কমিটি, প্রশাসনিক কাঠামো সংলাপ কমিটি, আইন প্রয়োগকারী সংস্থা সংলাপ কমিটি, পুলিশ সংলাপ কমিটি ও বিচার বিভাগীয় সংলাপ কমিটি। কমিটিগুলো ৩১ জানুয়ারি, ২০২৫ তারিখের মধ্যে সুপারিশসহ সরকারের কাছে তাদের প্রতিবেদন জমা দেয়।

৩. জাতীয় ঐকমত্য কমিটি গঠন

জাতীয় ঐকমত্যের ভিত্তিতে সামগ্রিক সংস্কার প্রক্রিয়াকে এগিয়ে নেওয়ার জন্য অন্তর্বর্তীকালীন সরকার ১২ ফেব্রুয়ারি, ২০২৫ তারিখে প্রধান বিচারপতির সভাপতিত্বে, সংসদীয় ব্যবস্থা সংলাপ কমিটির সভাপতিকে সহ-সভাপতি এবং নির্বাচনী ব্যবস্থা সংলাপ কমিটি, আইন প্রয়োগকারী সংস্থা সংলাপ কমিটি, পুলিশ সংলাপ কমিটি, বিচার বিভাগীয় সংলাপ কমিটির সভাপতি ও প্রশাসনিক কাঠামো সংলাপ কমিটির একজন সদস্যকে নিয়ে জাতীয় ঐকমত্য কমিটি গঠন করে। পরবর্তীতে উক্ত কমিটি কিছুটা পুনর্গঠন করা হয়। কমিটির দায়িত্ব ছিল- আগামী নির্বাচনের দিকে তাকিয়ে সংসদীয় ব্যবস্থা, নির্বাচনী ব্যবস্থা, প্রশাসনিক কাঠামো, আইন প্রয়োগকারী সংস্থা, পুলিশ ও বিচার বিভাগ বিষয়ে সংলাপের মাধ্যমে গঠিত কমিটিসমূহের সুপারিশ পর্যালোচনা ও গ্রহণের জন্য জাতীয় ঐকমত্য প্রতিষ্ঠার জন্য রাজনৈতিক দল ও শক্তিসমূহের সাথে আলোচনা করা এবং এই বিষয়ে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ সুপারিশ করা। কমিটির মেয়াদ ছিল কার্যক্রম শুরুর তারিখ থেকে ছয় মাস। কমিটি তার দায়িত্ব পালন ও সুপারিশের অংশ হিসেবে জাতীয় ঐকমত্যের মৌলিক বিষয়সম্বলিত ‘রাষ্ট্রীয় সংলাপ জাতীয় চুক্তি ২০২৫’ প্রণয়নের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে।

৪. কমিটির কার্যক্রম

জাতীয় ঐকমত্য কমিটি ১৫ ফেব্রুয়ারি থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে তার কাজ শুরু করে। ২৮ ফেব্রুয়ারি, ২০২৫ তারিখের মধ্যে ছয়টি কমিটির প্রতিবেদনের সারসংক্ষেপ সকল রাজনৈতিক দলের কাছে হস্তান্তর করা হয়। এরপর ৫ মার্চ, ২০২৫ তারিখে পুলিশ সংলাপ কমিটি বাদে অন্য পাঁচটি কমিটির প্রতিবেদনের গুরুত্বপূর্ণ ১৬৬টি সুপারিশ সংক্ষিপ্ত আকারে ৩৮টি রাজনৈতিক দল ও প্রতিষ্ঠানের কাছে পর্যালোচনার জন্য প্রেরণ করা হয়। এর মধ্যে সংসদীয় ব্যবস্থা সংলাপ বিষয়ক ৭০টি, নির্বাচন সংলাপ বিষয়ক ২৭টি, প্রশাসনিক কাঠামো সংশ্লিষ্ট ২৩টি, আইন প্রয়োগকারী সংস্থা সংশ্লিষ্ট ২৬টি ও বিচার বিভাগীয় কমিটি বিষয়ক ২৭টি সুপারিশ ছিল। পুলিশ সংলাপ কমিটির সুপারিশগুলো সরাসরি বাস্তবায়নযোগ্য হওয়ায় সেগুলো সংক্ষিপ্ত আকারে অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি। অন্যদিকে, সংসদীয় ব্যবস্থা সংলাপ কমিটি ছাড়া অন্য পাঁচটি কমিটির দ্রুত বাস্তবায়নযোগ্য সুপারিশগুলোর তালিকা সরকারের কাছে প্রেরণ করা হয়।

মোট ৩৫টি রাজনৈতিক দল ও প্রতিষ্ঠান তাদের মতামত কমিটির কাছে জমা দেয়, অনেকটি বিস্তারিত ব্যাখ্যা-পর্যালোচনাও প্রদান করে। মতামত গ্রহণের প্রক্রিয়ায় প্রথম ধাপে ২০ মার্চ থেকে ১৯ এপ্রিল, ২০২৫ পর্যন্ত ৩২টি দল ও প্রতিষ্ঠানের সাথে জাতীয় ঐকমত্য কমিটির মোট ৪৪টি সভা অনুষ্ঠিত হয়। আলোচনা সম্প্রসারিত করার জন্য কিছু দলের সাথে একাধিকবার সভা করা হয়।

রাজনৈতিক দলসমূহের সাথে প্রথম ধাপের আলোচনা শেষ করে কমিটি অগ্রাধিকার ও গুরুত্বপূর্ণ পর্যালোচনায় মোট ২০টি বিষয় নিয়ে রাজনৈতিক দলসমূহের সাথে দ্বিতীয় দফা আলোচনায় অবতীর্ণ হয়। এই প্রক্রিয়ার সমন্বয় সাধন করে নিম্নলিখিত ‘রাষ্ট্রীয় সংলাপ জাতীয় চুক্তি ২০২৫’ প্রস্তাব করা হয়।

জাতীয় ঐকমত্য কমিটির দায়িত্বে বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ও প্রতিষ্ঠানের সাথে সরাসরি আলোচনা-পর্যালোচনার ভিত্তিতে, আমরা অংশগ্রহণকারী রাজনৈতিক দল ও প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে বর্তমান রাষ্ট্র ব্যবস্থা যথা সংসদীয় ব্যবস্থা, প্রশাসনিক ব্যবস্থা, নির্বাচনী ব্যবস্থা, আইন প্রয়োগকারী সংস্থা, পুলিশব্যবস্থা ও বিচার বিভাগ বিষয়ে নিম্নলিখিত কাঠামোগত, আইনি ও প্রাতিষ্ঠানিক পরিবর্তনের ব্যাপারে জাতীয় ঐকমত্যে উপনীত হয়েছি এবং এই সকল বিষয়কে একটি জাতীয় চুক্তিতে সমন্বিত করতে সম্মত হয়েছি। ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্ট মাসে সংঘটিত গণজাগরণের চেতনা ও আহতদের প্রতি গভীর সমবেদনা এবং উক্ত গণজাগরণে সরাসরি ও পরোক্ষভাবে অংশগ্রহণকারীদের সংগ্রামের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে আমরা এই চুক্তিকে ‘রাষ্ট্রীয় সংলাপ জাতীয় চুক্তি ২০২৫’ হিসেবে ঘোষণা করছি।

৫. জাতীয় ঐকমত্যে উপনীত বিষয়সমূহ
(পরবর্তীতে যুক্ত হবে)


রাষ্ট্রীয় সংলাপ জাতীয় চুক্তি ২০২৫ বাস্তবায়নের অঙ্গীকার

আমরা নিম্নস্বাক্ষরকারীগণ এই বিষয়ে অঙ্গীকারবদ্ধ যে,
১) সকল মানুষের জীবন ও সম্পদ এবং বিশেষ করে তরুণ প্রজন্মের সম্ভাবনা ও স্বপ্নপূরণ এবং ন্যায়বিচার প্রাপ্তির অধিকার নিশ্চিত করার লক্ষ্যে দীর্ঘমেয়াদি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে গঠিত ও জাতীয় ঐকমত্যের ভিত্তিতে প্রণীত ‘রাষ্ট্রীয় সংলাপ জাতীয় চুক্তি ২০২৫’-এর পূর্ণ বাস্তবায়ন নিশ্চিত করব;
২) ‘রাষ্ট্রীয় সংলাপ জাতীয় চুক্তি ২০২৫’-এ উল্লিখিত দেশের রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থা যথা সংসদীয় ব্যবস্থা, প্রশাসনিক ব্যবস্থা, নির্বাচনী ব্যবস্থা, আইন প্রয়োগকারী সংস্থা, পুলিশব্যবস্থা ও বিচার বিভাগ বিষয়ে যেসব সুপারিশ/প্রস্তাব এই চুক্তিতে অন্তর্ভুক্ত রয়েছে সেগুলো বাস্তবায়নের জন্য সংবিধানের প্রয়োজনীয় সংশোধনী, সংযোজন, সংস্কার, পুনর্লিখন ও সংযোজন এবং বর্তমান আইনের প্রয়োজনীয় সংস্কার, পরিবর্তন, সংযোজন, পুনর্লিখন, সংযোজন বা নতুন আইন প্রণয়ন, প্রয়োজনীয় বিধি প্রণয়ন বা বর্তমান বিধি ও প্রবিধানের পরিবর্তন বা সংস্কারের পদক্ষেপ নেওয়ার অঙ্গীকার করছি;
৩) ‘রাষ্ট্রীয় সংলাপ জাতীয় চুক্তি ২০২৫’ প্রণয়নের পর পরবর্তী জাতীয় নির্বাচনের মাধ্যমে সরকার গঠনের পর দুই বছরের মধ্যে এই চুক্তিতে উল্লিখিত সংস্কারসমূহ বাস্তবায়ন এবং সেসব সংলাপ বাস্তবায়নের অঙ্গীকার করছি;
৪) এই চুক্তি প্রণয়নের পর এতে যেসব মৌলিক সুপারিশ/প্রস্তাব অন্তর্ভুক্ত রয়েছে সেগুলো পরবর্তী দুই (২) বছর মেয়াদী সরকারের মধ্যে বাস্তবায়ন নিশ্চিত করার পদক্ষেপ নেওয়ার অঙ্গীকার করছি;
৫) ‘রাষ্ট্রীয় সংলাপ জাতীয় চুক্তি ২০২৫’ বাস্তবায়নের প্রতিটি স্তরে আইনগত ও প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতার পূর্ণ নিশ্চয়তা বিধান করব;
৬) ‘রাষ্ট্রীয় সংলাপ জাতীয় চুক্তি ২০২৫’ বাস্তবায়ন এবং এর আইনগত ও প্রাতিষ্ঠানিক বাস্তবায়নে আমরা অঙ্গীকারাবদ্ধ; এবং
৭) ২০২৪ সালের শান্তিপূর্ণ ও গণতান্ত্রিক আন্দোলন ও গণজাগরণের ঐতিহাসিক শিক্ষাকে রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থায় যথাযথ মর্যাদা দিতে অঙ্গীকারবদ্ধ থাকব।


বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের প্রতিনিধি/নেতার স্বাক্ষর

ক্রমিক নং দল/প্রতিষ্ঠানের নাম স্বাক্ষর
১.
২.
৩.
৪.
৫.
৬.

জাতীয় ঐকমত্য কমিটির সদস্যগণের স্বাক্ষর

জাতীয় ঐকমত্য কমিটির সভাপতি ও অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান উপদেষ্টার স্বাক্ষর