July

জুলাই আন্দোলনের প্রভাবক ও সার্বজনীনতা

জুলাই আন্দোলনের প্রভাবক ও সার্বজনীনতা

আজকের লেখাটা একটা গল্প দিয়ে শুরু করি। একদেশে এক রাজা তিনি কখনো কারো সমালোচনা সহ্য করতে পারে না। তারপর তিনি সভাসদ নিয়ে বসে এর একটা বিহিত করতে চাইলেন। তারপর তার বিজ্ঞানীরা তাকে একটা ঔষধ আবিষ্কার করে সেটা যাকে লাগানো হয় সে বোবা হয়ে যায়। এই বোবা মলম আবিষ্কারের রাজা খুশিতে সেটা প্রয়োগ করা শুরু করলেন। দেখলেন এর কার্যকারিতা ১০০ ভাগ নয়। তবে ৬০-৭০ ভাগ বা তারও বেশী হবে।

রাজা চিন্তা করলেন। মন্দ না। বাকী লোকেরাতো আমার। এরমধ্যে যদি ২/৪টা বেয়াড়া থাকে। তাদের জন্য নিজের দরবারের নিচে সুড়ঙ্গ ঘর তৈরী আটক রাখলেন। আর যাদেরকে আটক রাখলে মিছিল মিটিং হতে পারে তাদের জন্য থাকল। মৃত্যুদন্ড। তাদেরকে খুন করে পাথর বেধে নদীতে ডুবিয়ে দেয়া হয়।

এভাবে চলছিল। বলতে গেলে দেশের বেশীরভাগ মানুষ বোবা হয়ে গেল। এর মধ্যে পাশের রাজ্য রাজার রাজ্যকে অনেকটা গ্রাস করে নিল। আর কিছু মানুষ অত্যাচারের ভয়ে বোবা অভিনয় করে বেঁচে রইল।

দিন যায়, মাস যায়। সুখ আর সুখ। কিন্তু একদিন রাজ দরবারে কাজের সুযোগ নিয়ে বেঁধে গেল এক ফ্যাসাদ। এখনো পুরনো বোবা হয়নি। এমন কিছু শুরু করলো আন্দোলন। প্রথমে বোঝালো, হুমকি দিলো, আটকে রাখল। কিন্তু দেখা যায়। তাদের সংখ্যা কম নয়। তারপর চিন্তা করল কিছু লাশ ফেলানো যাক। কারণ এরা ভাবছে তাদেরকে মারবোনা। লাশ পড়লে ভয় পাবে।

কিন্তু হলো বিপরীত, কোতোয়ালরা কয়েকজন মানুষকে মারলো। তারপর তাদের নাম নিয়ে স্লোগান শুরু হলো দেশজুড়ে। আর আন্দোলনকারীদের সংখ্যা বাড়তে থাকলো। মনে হচ্ছে ঔষধের কার্যকারিতাই নষ্ট হয়ে গেছে। তারপর রাজা উজির নাজির নিয়ে বসে চিন্তা করলেন। যে কয়জন মারে গেলে তারা এখন জাতীয় বীর এবং আন্দোলনের প্রতীক হয়ে উঠতেছে। যা মারাত্বক ক্ষতিকর হতে পারে। অল্প লোক মারলে তারা জাতীয় বীর হয়ে যায়। এর আগে বাংলাদেশে ডা. মিলন, আসাদ. নূরহোসেন তাই হয়েছিল।

তাই তারা চিন্তা করলো হাজার দুয়েক লাশ পড়লে আর কেউ হিরো হবে না। অতীতে দেখা গেলে যেসব ঘটনাকে ইস্যু করা হতো। সেগুলো কয়েকশ ঘটানো হতো। তাতে সে ইস্যুটি তার গুরুত্ব হারাতো। এবারো তারা একই কৌশল চিন্তা করলো। পরে মৃতের ১ হাজারের উপরে যেতেই পরিস্থিতি বদলে গেলো।

দেখাগেলো বোবারাও রাস্তায় নেমে এলো। কারণ কি? বিশ্লেষণ করে দেখা গেল যারা মারা গেছে তাদের তিনভাগের ২ ভাগ হয়তো বোবা নয়তো বোবাদের পরিবারের। ফলে যারা বোবা নয় তাদের সাথে বোবারাও আন্দোলনে যোগ দিল। মানে বোবাদর একটা অংশ। তারা বোমা, বুলেট, হেলিকপ্টার থেকে করা গুলি, স্নাইপারের গুলি কিছুই পরোয়া না করে বুক চিতিয়ে দাড়িয়ে গেলো সামনে। পড়লো আরো কয়েকশ লাশ।

তারপর-

চলুন আমরা মুল আলোচনায় ফিরে যাই

ইতিহাসের প্রতিটি গণআন্দোলন বা মুক্তি সংগ্রাম হঠাৎ করে ঘটে না, এর পেছনে থাকে সামাজিক, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক বাস্তবতার জটিল জাল। ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ এবং ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থান—দুটোই বাংলাদেশের ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ মোড় পরিবর্তনের ঘটনা। যদিও প্রেক্ষাপট ভিন্ন, তবে দুটো ঘটনার মধ্যে কিছু মিল রয়েছে। উভয় ক্ষেত্রেই তরুণ প্রজন্ম, সাধারণ মানুষের অংশগ্রহণ, নির্যাতন-অত্যাচার, এবং নিরাপত্তাহীনতার বোধ মূল নিয়ামক হয়ে উঠেছিল। এই লেখায় আমরা ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানের ৬টি প্রধান নিয়ামক, একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধের সাথে মিল, এবং কেন উভয় আন্দোলন সার্বজনীন হয়ে উঠেছিল তা বিশ্লেষণ করব।

২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানের ৬টি নিয়ামক কারণ

১. প্রচলিত ক্ষমতা পরিবর্তনের পথ বন্ধ হয়ে যাওয়া
বাংলাদেশে রাজনৈতিক ক্ষমতার হস্তান্তর সাধারণত নির্বাচনী প্রক্রিয়ার মাধ্যমে হয়ে আসছিল। কিন্তু যখন সেই প্রক্রিয়া অবরুদ্ধ হয়ে গেল, তখন নতুন পরিবর্তনের পথ উন্মোচিত হওয়া সময়ের ব্যাপার ছিল।

২. তরুণ জনগোষ্ঠীর বঞ্চনা ও ক্ষোভ
দেশে ৬৫% তরুণ জনগোষ্ঠী, যাদের প্রায় ৯০% ভোটাধিকার প্রয়োগের সুযোগ পায়নি, তারা রাষ্ট্রীয় প্রক্রিয়া থেকে বাদ পড়ে ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠে। তাদের অংশগ্রহণ আন্দোলনের গতি বাড়ায়।

৩. নিরাপদ সড়ক আন্দোলনের প্রভাব
২০১৮ সালের নিরাপদ সড়ক আন্দোলনে স্কুল শিক্ষার্থীদের সংগঠিত ও সফল ভূমিকা ভবিষ্যতের বড় আন্দোলনের ভিত্তি গড়ে দিয়েছিল। সেই প্রজন্মই পরবর্তীতে অনার্স-মাস্টার্সে পড়ুয়া হয়ে ২০২৪-এ নেতৃত্ব দেয়।

৪. দুর্নীতি, মতপ্রকাশের স্বাধীনতার সংকট ও দমননীতি
গুম, খুন, দমনপীড়ন ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতা সীমিত হওয়ায় নতুন প্রজন্ম একটি অরাজনৈতিক, তারুণ্যনির্ভর আন্দোলনের দিকে ঠেলে দেওয়া হয়।

৫. জনগণের দাবি বনাম দলীয় দাবি
বাংলাদেশে সাধারণ মানুষ দলীয় দাবির আন্দোলনে সচরাচর অংশ নেয়নি। কিন্তু জনগণের মৌলিক দাবি সামনে আসলেই তারা রাস্তায় নেমেছে। ২০২৪-এও জনগণ একক জনস্বার্থভিত্তিক আন্দোলনে যুক্ত হয় এবং সেটিই আন্দোলনকে শক্তিশালী করে।

৬. নিরাপত্তাহীনতা ও সর্বজনীন টার্গেট হওয়া
যেমন একাত্তরে হিন্দু সম্প্রদায় বা তরুণরা নিরপেক্ষ থেকেও পাকিস্তানি সেনাদের টার্গেটে পড়েছিল, তেমনি ২০২৪-এও বিরোধী দল ও সাধারণ মানুষ নির্যাতনের শিকার হয়েছিল। চুপ থাকলেও কেউ নিরাপদ ছিল না, ফলে বাঁচার জন্যই জনগণ আন্দোলনে ঝাঁপিয়ে পড়ে।

একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধের সাথে মিল

২০২৪-এর গণঅভ্যুত্থান ও একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধ উভয় ক্ষেত্রেই দেখা যায়—

  • তরুণ প্রজন্মের নেতৃত্ব ও অংশগ্রহণ

  • নিরপেক্ষ থেকেও নিরাপদ না থাকার বাস্তবতা

  • দমনপীড়নের বিরুদ্ধে সাধারণ জনগণের স্বতঃস্ফূর্ত জাগরণ

  • আন্দোলনের অরাজনৈতিক বা সার্বজনীন চরিত্র

একারণে দুই ঘটনাই ইতিহাসে প্রজন্মনির্ভর, গণমুখী ও সর্বজনীন প্রতিরোধ হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে।

কেন উভয় আন্দোলন সার্বজনীন ছিল

১. সাধারণ মানুষের অংশগ্রহণ
উভয় আন্দোলনে রাজনীতি ছাড়িয়ে সাধারণ মানুষ মাঠে নেমেছে। মুক্তিযুদ্ধে কৃষক-শ্রমিক-তরুণ অংশ নিয়েছিল; ২০২৪-এও একইভাবে সব শ্রেণি-পেশার মানুষ যুক্ত হয়েছে।

২. বাঁচার সংগ্রাম থেকে আন্দোলনে যুক্ত হওয়া
১৯৭১-এ যেমন বাঙালি জাতি বুঝেছিল স্বাধীনতা ছাড়া মুক্তি নেই, ২০২৪-এ মানুষ বুঝেছে চুপ থাকলেও তারা নিরাপদ নয়। ফলে আত্মরক্ষার প্রবৃত্তি আন্দোলনকে সার্বজনীন করে তুলেছে।

৩. তরুণ প্রজন্মের চালিকা শক্তি
উভয় আন্দোলনে তরুণরা মূল নেতৃত্ব দিয়েছে। তাদের প্রাণশক্তি, ক্ষোভ ও আদর্শিক তাগিদ আন্দোলনকে জাতীয় রূপ দিয়েছে।

বাড়তি বিশ্লেষণ

মুক্তিযুদ্ধ কিংবা গণঅভ্যুত্থান কোনো নির্দিষ্ট দলীয় বা সংগঠনের পরিকল্পনায় নয়, বরং পরিস্থিতি, দমনপীড়ন ও জনগণের সার্বজনীন চাহিদা থেকে জন্ম নেয়। তাই এগুলোকে “মেটিকুলাস ডিজাইন” দিয়ে ব্যাখ্যা করা যায় না। বরং এগুলো ইতিহাসের অবশ্যম্ভাবী বিস্ফোরণ।

Comments

No comments yet. Why don’t you start the discussion?

Leave a Reply