জুলাই অভ্যুত্থানের স্লোগান : জনতার কণ্ঠে প্রতিবাদ ও প্রতিরোধ
বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে স্লোগান কেবল শব্দের সমাহার নয়—এগুলো জনতার মনের আগুন, প্রতিবাদের ছন্দ এবং আন্দোলনের প্রাণশক্তি। ২০২৪ সালের জুলাই অভ্যুত্থানের সময়কার স্লোগানগুলোও তাই। এ স্লোগানগুলো কেবল রাজনৈতিক শ্লোগান নয়, এগুলো রক্তগরম সময়ের দলিল। কখনো শাসকবিরোধী ক্ষোভ, কখনো ন্যায়বিচারের দাবি, কখনো আবার ব্যঙ্গ-বিদ্রুপের মাধ্যমে প্রকাশ পেয়েছে জনতার অভ্যন্তরীণ অনুভূতি। এছাড়া জ্বালাময়ী সব গান তরুনদের দিয়েছে অনুপ্রেরণার স্ফুলিঙ্গ।
ক্ষমতা কার?
সবচেয়ে শক্তিশালী স্লোগানগুলোর একটি ছিল— “ক্ষমতা তা জনতা, জনতা জনতা”। এই স্লোগানে জনগণের সার্বভৌমত্বের ঘোষণা রয়েছে। শাসকের আসন, দণ্ড-মুণ্ডের কর্তা—সবকিছুর মালিক জনগণ, এই সত্যটিকে স্মরণ করিয়ে দিয়েছে এ স্লোগান। এর সঙ্গে তাল মিলিয়ে উচ্চারিত হয়েছে— “আপোষ না সংগ্রাম, সংগ্রাম সংগ্রাম”। আপোষহীন সংগ্রামী চেতনার প্রতীক হয়ে উঠেছে এটি, যা ১৯৭১-এর মুক্তিযুদ্ধের আদর্শের সাথেও সাযুজ্যপূর্ণ।
পুলিশ ও স্বৈরাচারবিরোধী স্লোগান
তৎকালীন শাসকযন্ত্রের অন্যতম ভরসা ছিল পুলিশ। তাই শ্লোগান উঠেছিল— “কে এসেছে কে এসেছে? পুলিশ এসেছে পুলিশ এসেছে”। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে তীব্র ব্যঙ্গ— “কী করছে কী করছে? স্বৈরাচারের পা চাটছে”। জনগণের ক্ষোভের লক্ষ্যবস্তু হয়ে উঠেছিল প্রশাসনের নির্লজ্জ ভূমিকা।
শহীদের রক্তের দাবি
শহীদদের স্মরণ ও ন্যায়বিচারের দাবি উঠে এসেছে কয়েকটি স্লোগানে—
-
“আমার ভাই কবরে, খুনি কেন বাহিরে”
-
“আমার ভাই ফেরত দে, নইলে গতি ছেড়ে দে”
-
“আমার ভাইয়ের রক্ত বৃথা যেতে দেব না”
এসব স্লোগান শোককে পরিণত করেছে শক্তিতে। ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার দৃঢ় অঙ্গীকার স্পষ্ট হয়ে উঠেছে এখানে।
শেখ হাসিনা ও সরকারের বিরুদ্ধে স্লোগান
এই আন্দোলনের অন্যতম কেন্দ্রবিন্দু ছিল প্রধানমন্ত্রীর পদত্যাগের দাবি। তাই উঠে এসেছে—
-
“এক দফা এক দাবী, হাসিনা তুই এখন যাবি”
-
“দফা এক দাবী এক, শেখ হাসিনার পদত্যাগ”
ব্যঙ্গ-বিদ্রুপে ভরপুর অনেক স্লোগানও দেখা গেছে। যেমন—
-
“কাউয়া আর কালা বিলাই, কবে যাবে পালাই পালাই”
-
“লীগ এখন পঁচা দই, ছাগল চোরের বাড়ি কই?”
-
“কুমিরর মার পুত্রশোক, কাঠাল রানীর সাইকো রোগ”
- ‘‘এই মুহুর্এতে বাংলা ছাড়-বাংলা কি তোর বাপ দাদার’’
- সব স্লোগানে হাস্যরস ও ব্যঙ্গ মিশ্রিত হয়ে আন্দোলনকারীদের ক্ষোভকে আরও ধারালো করেছে।
আত্মত্যাগ ও রাজপথের প্রতিশ্রুতি
জুলাই অভ্যুত্থানের অন্যতম স্লোগান ছিল আত্মত্যাগের ঘোষণা—
-
“দিয়েছিতো রক্ত, আরো দেব রক্ত”
-
“রক্ত গরম, মাথা ঠান্ডা”
-
“বুকের ভিতর অনেক ঝড়, বুক পেতেছি গুলি কর”
একইসাথে দৃঢ় প্রতিজ্ঞা শোনা গেছে—
-
“দালালী না রাজপথ, রাজপথ রাজপথ”
-
“বিকল্প কে আছে? তুমি আমি আমরা আছি”
এগুলো আন্দোলনকে সংগঠিত করেছে, নেতৃত্বশূন্য পরিস্থিতিতে জনতার ঐক্যকে দৃঢ় করেছে।
ভারত ও আন্তর্জাতিক ইস্যুতে স্লোগান
একটি অংশে প্রতিবেশী দেশের ভূমিকাকেও সমালোচনা করা হয়েছে। যেমন—
-
“ভারত যাদের মামার বাড়ি, বাংলা ছাড়ো তাড়াতাড়ি”
-
“ভারত যাদের বড়দা, বাংলা ছেড়ে ভারত যা”
-
“মোদির পোষা হাসিনা, তোমায় ভাল ভাসিনা”
- ‘‘চশমা ওয়ালী বুবজান-বাংলা ছাড়ি ভারত যান’’
এসব স্লোগানে জাতীয়তাবাদী আবেগ জেগে উঠেছে এবং বহির্বিশ্বের হস্তক্ষেপের বিরুদ্ধে জনমত প্রকাশ পেয়েছে।
আন্তর্জাতিক ও আঞ্চলিক স্লোগান
কিছু স্লোগানে আন্তর্জাতিক ধাঁচের ছাপও ছিল। যেমন—
-
“জাস্টিস! জাস্টিস! উই ওয়ান্ট জাস্টিস!”
-
“অ্যাকশন, অ্যাকশন, ডাইরেক্ট অ্যাকশন”
এছাড়া চট্টগ্রামের আঞ্চলিক ভাষায়ও স্লোগান উঠেছে—
-
“আঁর ন হাঁইয়্যে, বৌতদিন হাঁইয়্য” (অর্থাৎ: আর খেয়ো না, অনেকদিন খেয়েছো)।
এই স্লোগান আঞ্চলিক বৈচিত্র্যকে জাতীয় আন্দোলনের সাথে একত্র করেছে।
আওয়ামী লীগ ও মতাদর্শবিরোধী স্লোগান
আওয়ামী লীগ ও এর নীতির প্রতি তীব্র ঘৃণা প্রকাশিত হয়েছে স্লোগানগুলোতে—
-
“আওয়ামী লীগ না মানুষ, আর কত থাকবি বেহুশ”
-
“বাকশালের মতবাদ, চলবেনা চলবেনা”
-
“মুজিবাদের ধান্ধা, আর না আর না”
এসব স্লোগানে জনগণের রাজনৈতিক চেতনা ও মতাদর্শগত বিরোধিতা প্রকাশ পেয়েছে।
প্রতিরোধের ডাক
জুলাই অভ্যুত্থান শুধু প্রতিবাদেই সীমাবদ্ধ ছিল না; এটি প্রতিরোধের ডাকও ছিল।
-
“আর নয় প্রতিবাদ, এবার হবে প্রতিরোধ”
-
“সাইকো লীগের দালালেরা, হুশিয়ার সাবধান”
-
“জ্বালো রে জ্বালো, আগুন জ্বালো”
- ‘‘সব সাথীরে খবর দে- ফ্যাসিবাদের কবর দে’’
- সব ছাত্রকে খবর দে- স্বৈরাচারের কবর দে’’
এসব স্লোগান আন্দোলনের গতি ও তীব্রতা বাড়িয়েছে।
সাহিত্য স্লোগান
আসছে ফাগুন- আমরা হবো দ্বিগুন (জহির রায়হানের আরেক ফাল্গুন থেকে)|
চল চল চল- উধ্ব গগনে বাঝে মাদল
কত বিপ্লবী বন্ধুর রক্তে রাঙা-বন্দীশালার ওই শিকল ভাঙ্গা
তাঁরা কি ফিরিবে আজ সুপ্রভাতে – যত তরুণ অরুণ গেছে অস্তাচলে (মোহিনী চৌধুরীর গান)
কারা ওই লৌহ কপাট- ভেঙ্গে ফেল করলে লোপাট (নজরুলে গান)
মুক্তিযুদ্ধকালীন স্লোগান
তোমার আমার ঠিকানা- পদ্ধ মেঘনা যমূনা
পিন্ডি না ঢাকা- ঢাকা ঢাকা এর মডিফাই স্লোগান, দিল্লী না ঢাকা-ঢাকা ঢাকা,
২০২৪ সালের জুলাই অভ্যুত্থানের স্লোগানগুলো বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে নতুন মাত্রা যোগ করেছে। এগুলো ছিল সরল অথচ গভীর, আবেগময় অথচ কৌশলগত। কখনো ন্যায়বিচারের দাবি, কখনো শাসকবিরোধী ব্যঙ্গ, কখনো প্রতিবেশী দেশের সমালোচনা—সবকিছু মিলিয়ে স্লোগানগুলো হয়ে উঠেছিল একেকটি আগুনের মশাল। ইতিহাসে যেমন ১৯৫২-এর “রাষ্ট্রভাষা বাংলা চাই”, ১৯৬৯-এর “তোমার আমার ঠিকানা, পদ্মা-মেঘনা-যমুনা” বা ১৯৭১-এর “জয়বাংলা” স্লোগান যুগের চেতনা প্রকাশ করেছে, তেমনি জুলাই অভ্যুত্থানের স্লোগানগুলোও ভবিষ্যতে গণআন্দোলনের এক অনন্য দলিল হিসেবে স্মরণীয় হয়ে থাকবে।

