“গানস, জার্মস, এন্ড স্টিল”
image : collected

“গানস, জার্মস, এন্ড স্টিল”

গ্রন্থ পর্যালোচনা
বইয়ের নাম: Guns, Germs, and Steel
লেখক: জ্যারেড ডায়মন্ড
প্রকাশকাল: ১৯৯৭
ভাষা: ইংরেজি
প্রকাশক: W. W. Norton & Company
বাংলা অনুবাদ: বিভিন্ন অনুবাদ প্রকাশিত হয়েছে

১৯৯৭ সালে প্রকাশিত হওয়ার পর থেকে Guns, Germs, and Steel বইটি একাডেমিক ও সাধারণ পাঠকমহলে তুমুল আলোড়ন তোলে। বইটির কেন্দ্রীয় প্রশ্ন খুব সহজ—কেন কিছু জাতি অন্য জাতির উপর আধিপত্য বিস্তার করল? কেন ইউরোপিয়ানরা আফ্রিকা বা আমেরিকায় গিয়ে বসতি গড়ল, উল্টোটা কেন হলো না? এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গিয়ে লেখক ইতিহাস, ভূগোল, জীববিদ্যা, কৃষি, ভাষাবিজ্ঞান থেকে শুরু করে মহামারী পর্যন্ত নানা বিষয় টেনে এনেছেন।

জ্যারেড ডায়মন্ড পেশায় একজন অর্নিথোলজিস্ট (পাখিবিদ), কিন্তু তার লেখার পরিসর অনেক বিস্তৃত। এই বই লেখার পেছনে তার অভিজ্ঞতা ছিল নিউ গিনির জঙ্গলে ঘোরাঘুরি আর সেখানকার মানুষের জীবনযাপন নিয়ে গবেষণার ফল। একবার নিউ গিনির এক স্থানীয় নেতা তাকে জিজ্ঞেস করেন: “আপনারা সাদা মানুষেরা এত জিনিসপত্র, ক্ষমতা ও প্রযুক্তি কীভাবে পেলেন, আর আমরা পেলাম না?” এই প্রশ্নই লেখকের চিন্তার বীজ রোপণ করে।

বইটির মূল যুক্তি হলো, ইউরোপ-এশিয়ার মানুষ প্রযুক্তিগত এবং রাজনৈতিক দিক দিয়ে এগিয়ে গিয়েছিল ভূপ্রাকৃতিক সুবিধার কারণে। যেমন: ইউরেশিয়া মহাদেশে পশু ও উদ্ভিদের বেশি প্রজাতি সহজে গৃহপালিত বা চাষযোগ্য ছিল। বড়, সমতল এবং পূর্ব-পশ্চিমে বিস্তৃত ভূমি চাষাবাদ ছড়িয়ে দিতে সাহায্য করেছে। অন্যদিকে আফ্রিকা বা আমেরিকা মহাদেশে এই সুবিধাগুলো ছিল না। ফলে সেসব অঞ্চলের সমাজগুলো একই গতিতে এগোতে পারেনি।

বইটির একটি শক্তিশালী দিক হলো, লেখক বর্ণবাদী দৃষ্টিভঙ্গির বিপরীতে যুক্তি দাঁড় করিয়েছেন। তিনি দেখিয়েছেন, কোনো জাতি জ্ঞানে-গুণে শ্রেষ্ঠ বলে আধিপত্য বিস্তার করেনি, বরং তাদের ভৌগোলিক ও পরিবেশগত সুবিধাই সেই পথ তৈরি করেছে।

তবে বইটির কিছু দুর্বল দিকও আছে। অনেক পাঠক মনে করেন, ডায়মন্ড অতিরিক্তভাবে ভূগোলকেই একমাত্র ব্যাখ্যা হিসেবে তুলে ধরেছেন। তিনি সংস্কৃতি, রাজনীতি, ব্যক্তিগত নীতিনির্ধারণ, অর্থনৈতিক কাঠামো ইত্যাদি বিষয়ের ভূমিকা তুলনামূলকভাবে কম গুরুত্ব দিয়েছেন।

নিউ ইয়র্ক টাইমস বইটিকে “a brilliantly written, passionately argued book” হিসেবে অভিহিত করেছে। আবার The Economist মন্তব্য করেছে, “This is one of those rare books that takes a familiar question and makes you rethink everything you thought you knew.” ২০০৫ সালে National Geographic এই বই অবলম্বনে একটি প্রামাণ্যচিত্র নির্মাণ করে, যার ফলে সাধারণ পাঠকদের মধ্যেও বইটি নতুনভাবে আলোচিত হয়।

একজন পাঠক হিসেবে আমার কাছে বইটি অনেকাংশে চোখ খুলে দেওয়ার মতো মনে হয়েছে। ছোটবেলা থেকে যেসব ঐতিহাসিক তথ্য প্রশ্নহীনভাবে শিখেছি, সেগুলোর পেছনের প্রেক্ষাপট এখানে নতুন দৃষ্টিভঙ্গিতে দেখতে পেয়েছি। বিশেষ করে, উন্নয়ন-অনুন্নয়নের ব্যাখ্যায় ভূগোল যে এত বড় ভূমিকা রাখে, সেটা আগে কখনো ভাবিনি।

এই বইয়ের শিক্ষা বাস্তব জীবনে কাজে লাগানো যায় ইতিহাস চর্চা, নীতি নির্ধারণ, এমনকি ব্যক্তিগত সিদ্ধান্ত গ্রহণেও। আমরা যখন কোনো জাতি বা জনগোষ্ঠীকে পিছিয়ে থাকা ভাবি, তখন আমাদের দরকার হয় প্রেক্ষাপট বোঝা—এই বই সেই দরজা খুলে দেয়।

সবশেষে বলা যায়, Guns, Germs, and Steel একটি জটিল কিন্তু জরুরি প্রশ্নের অনুসন্ধান। যদিও সবাই একমত হবেন না তার সব বিশ্লেষণের সঙ্গে, তবু বইটি আমাদের চিন্তার জগতে নাড়া দেয়—এবং সেটাই সবচেয়ে বড় কথা।

Comments

No comments yet. Why don’t you start the discussion?

Leave a Reply