jonota

ক্ষমতার পতন বনাম নীরবতা তত্ত্ব

ক্ষমতার পতন বনাম নীরবতা তত্ত্ব: ২০২৪-এর গণঅভ্যুত্থান ও ফ্যাসিবাদের মনস্তাত্ত্বিক পরাজয়

 নীরবতার এক অলিখিত ব্যাকরণ। একটি রাজনৈতিক ব্যবস্থার শক্তি কিংবা দুর্বলতা পরিমাপের জন্য আমরা সাধারণত রাজপথের স্লোগান, গণমাধ্যমের কোলাহল কিংবা নির্বাচনের ভোট গণনার ওপর চোখ রাখি। কিন্তু ক্ষমতার উত্থান-পতন এবং ইতিহাসের বড় বড় বিপ্লবের গতিপ্রকৃতি বিশ্লেষণ করলে একটি অমোঘ সত্য সামনে আসে—কোনো সরকারের পক্ষে বা বিপক্ষে কতজন মানুষ প্রকাশ্যে কথা বলছে, তার চেয়েও হাজার গুণ বেশি গুরুত্বপূর্ণ হলো কতজন মানুষ ‘নীরব’ হয়ে গেছে।

রাজনীতিতে এই নীরবতা কোনো নিষ্ক্রিয়তা নয়, এটি আসলে এক নীরব বারুদ। ২০২৪ সালে বাংলাদেশে সংঘটিত জুলাই-আগস্টের গণঅভ্যুত্থান, যার মাধ্যমে দীর্ঘ ১৬ বছরের একটি নিশ্ছিদ্র ফ্যাসিবাদী স্বৈরশাসনের অবসান ঘটেছে, তা রাষ্ট্রবিজ্ঞানের প্রচলিত অনেক তত্ত্বকে চূর্ণ করে দিয়েছে। এই ঐতিহাসিক ঘটনাকে গভীরভাবে ব্যবচ্ছেদ করলে ক্ষমতার পতন ও জনমনস্তত্ত্বের যে সমীকরণটি পাওয়া যায়, তাকে আমরা বলতে পারি “নীরবতা তত্ত্ব” (The Theory of Silence)

 জনসমর্থনের গাণিতিক বিভ্রম: ফেক ও ফাও-এর ফাঁদ

স্বৈরাচারী শাসকেরা কেন তাদের পতনের শেষ দিন পর্যন্ত বুঝতে পারে না যে তারা কতটা একা? এর উত্তর লুকিয়ে আছে জনসমর্থনের এক অদ্ভুত গাণিতিক বিভ্রমে।

ধরা যাক, একটি দল যখন তুলনামূলক স্বাভাবিক সময়ে ক্ষমতায় থাকে, তখন তাদের প্রকৃত বা আদর্শিক জনসমর্থন থাকে ৪০ থেকে ৬০ শতাংশ। যখনই তারা রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার মসনদে বসে, তখন কোনো খাটুনি ছাড়াই তারা আরও অতিরিক্ত ২০ শতাংশ মানুষের এক ধরণের ‘ফাও’ সমর্থন পেয়ে যায়। এই ২০ শতাংশ মানুষ হলো মূলত সুবিধাবাদী, ব্যবসায়ী এবং ক্ষমতার উচ্ছিষ্টভোগী—যারা সবসময় ক্ষমতাসীনদের পক্ষে সায় দেয়। ফ্যাসিস্ট শাসকেরা এই বাড়তি ২০ শতাংশের কোলাহলকে নিজেদের আসল ‘শক্তি’ মনে করে এক মারাত্মক ভুল করে বসে। তারা বোঝে না, এই সমর্থন আসলে কোনো শক্তি নয়, বরং এটি তাদের সবচেয়ে বড় দুর্বলতা।

যখন কোনো সরকার পথ হারাতে থাকে, একের পর এক নীতিগত ভুল এবং অপরাধ করতে শুরু করে, তখন রাতারাতি কোনো সশস্ত্র বিপ্লব না হলেও অলক্ষ্যে একটি ঘটনা ঘটে—তার সমর্থনের ভিত ক্ষয়ে যেতে থাকে। কিন্তু চাটুকার পরিবেষ্টিত স্বৈরশাসক এই নীরব ক্ষয় টের পায় না। সে তার নিজের মূল ৪০ শতাংশ সমর্থনের মধ্য থেকে যে ১০ শতাংশ উগ্র কর্মী প্রতিনিয়ত টেলিভিশনে ও রাজপথে লাফালাফি করছে, তাদের দেখেই ধরে নেয় দেশবাসী তার সাথেই আছে। ফলে বাস্তবতার ২০ শতাংশ সমর্থনকে শাসকের চোখে মনে হয় ৮০ শতাংশের এক বিশাল সমুদ্র।

কিন্তু সংকটের দিন যখন ঘনিয়ে আসে, তখন এই ফাঁপা সমীকরণটি তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়ে:

[ কাল্পনিক হিসেব ] 
স্বৈরশাসকের ধারণা: পক্ষে ৬০-৮০% | বিপক্ষে ১৫-২০% (যারা প্রকাশ্যে সরব)
কিন্তু ক্রমাগত সামাজিক অনাচার, দূর্নীতি আর অপশাসন যখন এক সময় পরিস্থিতি বদলে যায়।
 তখন চিত্রটা অন্যরকম হয়। 

[ বাস্তবতার নির্মম রূপ ]
প্রকৃত জনসমর্থন: ২০% (যার মধ্যে ১০% ইতিমধ্যেই নীরব)
বাকি সরব ১০% এর পরিণতি (সংকটের চূড়ান্ত দিনে):
  * ৫% সাথে সাথে নীরব হয়ে যায়
  * ৪% রাতারাতি গা-ঢাকা দেয়
  * ১% কর্মী কোনো কাজেই আসে না

যেদিন মানুষ চূড়ান্ত ক্ষোভে ঘর থেকে বের হয়, সেদিন দেখা যায় রাজপথে সরকারের পক্ষে আছে মাত্র ৫ শতাংশ আর বিপক্ষে ১৫ শতাংশ—সরাসরি ৩ গুণ পার্থক্য। যখন স্বৈরশাসক এই জনস্রোতকে রাষ্ট্রীয় অস্ত্র ও পুলিশ বাহিনী দিয়ে দমন করতে চায় এবং লাশ ফেলে ভয় দেখাতে যায়, তখন তা হিতে বিপরীত হয়। ভয়ের দেয়াল ভেঙে রাজপথে পক্ষের লোক নেমে আসে ৩ শতাংশে, আর বিপক্ষের সংখ্যা দাঁড়ায় ২৫ শতাংশে। এই যে বিপুল সংখ্যার ব্যবধান, তা তৈরি করে দেয় ঘরের কোণে বসে থাকা সেই ‘নীরব’ মানুষেরা।

জুলাই ২০২৪: নীরবতার শক্তিতে ১ দফার দ্রুততম পতন

বাংলাদেশের ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের গণঅভ্যুত্থানে এই ‘নীরবতা তত্ত্ব’-এর সবচেয়ে নিখুঁত প্রয়োগ দেখা গেছে। বিগত প্রতিটি নির্বাচনে যে দলটি গড়ে ৩০ থেকে ৩৭ শতাংশ ভোট পেত, ১৬ বছরের অপশাসন এবং জুলাইয়ের নির্মম গণহত্যার পর তাদের সেই মনস্তাত্ত্বিক সমর্থন নেমে এসেছিল ১০ শতাংশ বা তারও নিচে। যে সংখ্যালঘু অংশটি তখনও দলের প্রতি দুর্বল ছিল, তারাও নৈতিক ও মানসিক শক্তি হারিয়ে পুরোপুরি নীরব হয়ে গিয়েছিল।

ফলাফল কী হয়েছিল? মাত্র ১০ শতাংশ বা তারও কম সাধারণ মানুষ ও তরুণ রাজপথে নেমে ১৬ বছরের এক পরাক্রমশালী সরকারের পতন ঘটিয়ে দিয়েছে। ১ দফা দাবির আন্দোলনের বয়স ছিল মাত্র ২ দিন। ১ দফা ঘোষণার পর মাত্র ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে একটি সরকারের এমন শোচনীয় পতন দুটি চরম সত্যকে পরিষ্কার করে দেয়:

নীরবতার শক্তি: কোনো শক্তির যতই প্রকাণ্ড অহংকার থাকুক না কেন, জনগণের একাংশের ‘নীরবতা’ ও নৈতিক সমর্থন প্রত্যাহারই তার পতনের জন্য যথেষ্ট।

অস্ত্রের অসহায়ত্ব: মনস্তাত্ত্বিক সমর্থন বা মরাল লেজিটিমেসি (Moral Legitimacy) যদি না থাকে, তবে পৃথিবীর কোনো আধুনিক অস্ত্র বা সামরিক শক্তি স্বৈরাচারকে রক্ষা করতে পারে না।

মনস্তাত্ত্বিক লড়াই ও সেনাবাহিনীর ঐতিহাসিক দায়

এই মনস্তাত্ত্বিক রূপান্তরের সূচনা কিন্তু ২০২৪ সালে হঠাৎ করে হয়নি। এর একটি দীর্ঘ ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট রয়েছে। ২০০৯ সালে পিলখানা হত্যাকাণ্ডের নির্মম ট্র্যাজেডির সময়ই এই পতনের বীজ রোপিত হয়েছিল। একটি স্বাধীন দেশের সার্বভৌমত্বের প্রতীক সেনাবাহিনীর শীর্ষ কর্মকর্তাদের যেভাবে মিডিয়া ট্রায়াল এবং সুদূরপ্রসারী চক্রান্তের মাধ্যমে হত্যা করা হয়েছিল, তখনই স্পষ্ট হয়ে গিয়েছিল যে, এই অপকর্মের জন্য একদিন এই সরকারকে চরম মূল্য চোকাতে হবে। দেশপ্রেমিক সেনাবাহিনী তাদের ভাইদের হত্যার এই ক্ষত কোনোদিন ভোলেনি। তাই মনস্তাত্ত্বিক সমীকরণে এটি নিশ্চিত ছিল যে, যেদিন দেশের জনগণ ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে একটি শক্তিশালী এবং অদম্য প্রতিরোধ গড়ে তুলতে পারবে, সেদিন সেনাবাহিনী জনগণের বুলেটের মুখোমুখি দাঁড়াবে না, বরং জনগণের পাশেই অবস্থান নেবে।

বিগত ১৫ বছরের চরম অপশাসন, গুম, খুন এবং লুণ্ঠন সাধারণ মানুষকে এমন এক বিন্দুতে এনে দাঁড় করিয়েছিল যেখানে তারা কেবল একটি স্ফুলিঙ্গের অপেক্ষা করছিল। জনগণ মনে মনে প্রস্তুত ছিল যে, কোনো দেশপ্রেমিক বা নিরপেক্ষ শক্তি ডাক দিলেই তারা মাঠে নামবে। শাসকগোষ্ঠী বাইরে যতই নিজেদের অপরাজেয় দাবি করুক না কেন, মানুষের অবচেতন মন (Subconscious Mind) এই পতনের আভাস ঠিকই টের পেয়েছিল। যদি না পেত, তবে রাজপথের স্লোগানে সাধারণ মানুষ বলত না—“পালিয়ে যাওয়ার পথ খুঁজে পাবি না।” আবার অন্যদিকে, অবচেতনের সেই একই ভয়ের কারণে স্বৈরশাসক ও তার মন্ত্রীরা বারবার কাঁপাকাঁপা গলায় বলত—“আমরা পালাব না।” যখন একটি রাজনৈতিক ব্যবস্থায় ‘পালানো’র কথাটি প্রকাশ্যে চলে আসে, তখনই বুঝতে হবে যে মনস্তাত্ত্বিক লড়াইয়ে শাসক ইতিমধ্যেই হেরে গেছে।

 ষড়যন্ত্র তত্ত্ব বনাম জনগণের আত্মত্যাগ

আজ ক্ষমতা হারিয়ে পলাতকেরা নিজেদের ব্যর্থতা ঢাকতে নানারকম ‘ষড়যন্ত্র তত্ত্ব’ (Conspiracy Theory) ফেরি করছে। তারা প্রচার করার চেষ্টা করছে যে সাধারণ মানুষকে বোকা বানানো হয়েছে, তাদের ব্যবহার করা হয়েছে। কিন্তু এটি তাদের আরেকটি মনস্তাত্ত্বিক ভুল।

বাস্তবতা হলো, সাধারণ মানুষ বোকা ছিল না। তারা অতীতে রাজনৈতিক দলগুলোর আন্দোলনের নামে বারবার বিক্রি হয়ে যাওয়া এবং মাঠ ছেড়ে পালিয়ে যাওয়ার সংস্কৃতি দেখেছে। তাই তারা কেবল এমন একটি নেতৃত্বের অপেক্ষায় ছিল, যারা মাঠে বুক পেতে দেবে কিন্তু বিক্রি হবে না, মাঠ ছেড়ে পালাবে না। যখন বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের তরুণেরা রিমান্ডে গিয়েও আপস করেনি, গুলির মুখে দাঁড়িয়ে বুক পেতে দিয়েছে, তখন সাধারণ মানুষ বুঝতে পেরেছে—এই প্রজন্ম বিক্রি হওয়ার নয়। তখনি সাধারণ মানুষ ঘর থেকে বের হওয়ার সাহস পেয়েছে।

তাছাড়া, গত ১৬ বছরে দেশে যেসব গুম, খুন এবং ব্যাংক লুটের ঘটনা ঘটেছে, পৃথিবীর অন্য যেকোনো গণতান্ত্রিক দেশে সরকার পতনের জন্য এর একটি ঘটনাই যথেষ্ট ছিল। বাংলাদেশের মানুষ অসীম ধৈর্যে তা সহ্য করেছে। কিন্তু ফ্যাসিবাদ যখন তার দলীয় বাহিনী ও পুলিশ লেলিয়ে দিয়ে ঘরে ঘরে লাশ ফেলতে শুরু করল, শতাধিক কোমলমতি শিশুকে ছাদে, ঘরের ভেতরে বা মায়ের কোলে গুলি করে হত্যা করল, তখন মানুষের মনের শেষ হিসাবটি পাল্টে গেল। মানুষ বুঝতে পারল—ঘরে বসে থাকলেও আজ কেউ নিরাপদ নয়। আর মরতে যখন হবেই, তখন কাপুরুষের মতো ঘরে না মরে, রাজপথে লড়াই করে মরাই শ্রেয়। এই চূড়ান্ত মনস্তাত্ত্বিক ওরিয়েন্টেশনই লাখো মানুষকে কারফিউ ভেঙে রাস্তায় নামিয়ে এনেছিল।

পুনরুত্থানের চেষ্টা ও নতুন প্রজন্মের ওরিয়েন্টেশন

বর্তমানে পলাতক ফ্যাসিবাদী শক্তি কোটি কোটি টাকা ঢেলে, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে মিথ্যা প্রোপাগান্ডা ছড়িয়ে এবং নানারকম কৃত্রিম সংকট তৈরি করে আবার ফিরে আসার জন্য মরিয়া চেষ্টা চালাচ্ছে। তারা ভারতের মতো প্রতিবেশী দেশের সহানুভূতি পাওয়ার জন্য নানা চাল চালছে। কিন্তু তাদের এই কোটি টাকার প্রোপাগান্ডা সফল হবে নাকি চিরতরে ধূলিসাৎ হয়ে যাবে—তা সম্পূর্ণ নির্ভর করছে বর্তমান আন্দোলনকারী এবং এই নতুন প্রজন্মের আদর্শিক ওরিয়েন্টেশন এবং রাজনৈতিক বোঝাপড়ার ওপর।

তরুণ প্রজন্মকে বুঝতে হবে, স্বৈরশাসক পালিয়েছে কিন্তু ফ্যাসিবাদের ভূত এবং তাদের তৈরি করা প্রশাসনিক কাঠামো রয়ে গেছে। এখন যদি তরুণেরা বিজয়ের ঘোরে অন্ধ হয়ে নিজেদের মধ্যে বিভেদ তৈরি করে, মব-জাস্টিস বা আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার মতো বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করে, তবে তা পলাতক ফ্যাসিস্টদের ষড়যন্ত্রকেই সফল করবে।

‘নীরবতা তত্ত্ব’ থেকে শিক্ষা নিয়ে আমাদের বুঝতে হবে—সাধারণ মানুষ আজ শান্ত, স্থিতিশীল এবং ইনসাফভিত্তিক একটি সমাজের অপেক্ষায় গভীর নীরবতায় পর্যবেক্ষণ করছে। এই নতুন প্রজন্মকে এখন ‘ভাঙ্গনের রাজনীতি’ থেকে ‘গঠনের রাজনীতি’-তে ওরিয়েন্টেড হতে হবে। মেধা, সহনশীলতা এবং আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে যদি আমরা একটি মানবিক রাষ্ট্র গড়ে তুলতে পারি, তবে পলাতকদের সমস্ত ষড়যন্ত্র তত্ত্ব ইতিহাসের ডাস্টবিনে নিক্ষিপ্ত হবে। আর যদি আমরা ব্যর্থ হই, তবে নীরব থাকা সেই বিশাল জনসমষ্টি আবার ক্ষুব্ধ হয়ে উঠবে। ২০২৪-এর শহীদদের রক্তের ঋণ শোধ করার একটাই পথ—প্রতিশোধ নয়, বরং মেধা ও ইনসাফের জোরে রাষ্ট্রকে পুনর্গঠন করা।

তত্ত্ব ও লেখা : জাহাঙ্গীর আলম শোভন