কপিরাইট আইন ২০২৩: সময়ের দাবির সঙ্গে অসামঞ্জস্য, কাঠামোগত ঘাটতি ও বাস্তব প্রয়োগের সংকট
কপিরাইট আইন এমন একটি ক্ষেত্র, যেখানে দ্রুত নবায়ন ও নিয়মিত হালনাগাদ অপরিহার্য। কারণ কপিরাইট ভঙ্গকারীরা সব সময় আইনের ফাঁকফোকর খুঁজে বেড়ায় এবং প্রযুক্তিগত পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে কপিরাইট সংশ্লিষ্ট বাস্তবতাও দ্রুত রূপ নেয়। তাইওয়ান, জাপান, দক্ষিণ কোরিয়ার মতো দেশগুলোতে কপিরাইট আইন ঘন ঘন পর্যালোচনা ও সংশোধন করা হয়। সেই তুলনায় বাংলাদেশে একটি কপিরাইট আইন প্রণয়ন করতে পাঁচ বছরের বেশি সময় লেগে যাওয়া নিঃসন্দেহে দুঃখজনক। সবচেয়ে বেদনাদায়ক বিষয় হলো—যে নতুন কপিরাইট আইন ২০২৩ আমাদের হাতে এসেছে, তা চতুর্থ শিল্পবিপ্লব, ডিজিটাল অর্থনীতি ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার নতুন বাস্তবতায় দাঁড়িয়ে পুরোপুরি সময়োপযোগী হয়ে উঠতে পারেনি।
তবুও এ কথা স্বীকার করতে হয় যে, কপিরাইট আইন ২০২৩–এ কিছু গুরুত্বপূর্ণ ইতিবাচক দিক রয়েছে। ২০০০ সালের কপিরাইট আইন নিয়ে কপিরাইট অফিসকে দীর্ঘদিন অসহায় অবস্থার মধ্যে পড়তে হয়েছে। ভুক্তভোগী স্রষ্টা ও সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর বাস্তব সমস্যার কথা বিবেচনায় রেখেই নতুন আইনে ব্যাপক পরিসরে সংস্কার আনা হয়েছে। কপিরাইট বিষয়টিকে সাধারণ মানুষের জন্য সহজবোধ্য করতে বহু নতুন সংজ্ঞা যুক্ত করা হয়েছে। পুরোনো অনেক ধারা ভেঙে বিস্তৃত করা হয়েছে, উপধারা সংযোজন করা হয়েছে এবং বর্তমান বাস্তবতায় অপ্রাসঙ্গিক কিছু বিষয় বাদ দেওয়া হয়েছে। নৈতিক অধিকার, অর্থনৈতিক অধিকার, রিলেটেড রাইটস, পাবলিক ডোমেইন—এসব ধারণা আগের তুলনায় সুস্পষ্টভাবে অন্তর্ভুক্ত হয়েছে।
রিলেটেড রাইটস বিষয়ে নতুন আইনে একটি গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি দেখা যায়। আগের আইনে সংগীত, নাটক ও পরিবেশনা শিল্পীদের অধিকার যথাযথভাবে সংজ্ঞায়িত না থাকায় দীর্ঘদিন ধরে বিভ্রান্তি ও দ্বন্দ্ব চলছিল। নতুন আইনে এসব বিষয় তুলনামূলকভাবে স্বচ্ছ ও বিস্তৃতভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে। একই সঙ্গে লোকজ্ঞান ও লোকসংস্কৃতির অধিকার সুরক্ষার বিষয়টি যুক্ত হওয়াও একটি ইতিবাচক সংযোজন।
কপিরাইট অফিসকে ক্ষমতায়ন করা হয়েছে এবং কপিরাইট সংরক্ষণে কার্যকর মাধ্যম হিসেবে টাস্কফোর্স ও মোবাইল কোর্টকে আইনি কাঠামোর আওতায় আনা হয়েছে। সচেতনতা বৃদ্ধির বিষয়েও আইনে কিছু বিধান রাখা হয়েছে, যা ২০০০ সালের আইনের একটি বড় দুর্বলতা ছিল। ডিজিটাল মিডিয়া ও অনলাইন প্ল্যাটফর্মে গান, নাটক ও অন্যান্য সৃজনশীল কাজ থেকে অর্জিত আয়ে স্রষ্টার অধিকার সংরক্ষণের বিষয়টিও নতুন আইনে স্বীকৃতি পেয়েছে।
তবে এসব ইতিবাচক দিকের পাশাপাশি কপিরাইট আইন ২০২৩–এ কিছু মৌলিক ও কাঠামোগত ঘাটতি রয়ে গেছে, যা ভবিষ্যতে আইনের কার্যকারিতা সীমিত করে দিতে পারে।
প্রথমত, এই আইন প্রতিকারকেন্দ্রিক হলেও প্রতিরোধমূলক নয়। কপিরাইট লঙ্ঘনের পর শাস্তি, জরিমানা ও মামলা করার সুযোগ থাকলেও লঙ্ঘন ঘটার আগেই তা প্রতিরোধ করার জন্য কার্যকর কোনো কাঠামো নেই। আধুনিক কপিরাইট ব্যবস্থায় যেখানে আগাম প্রতিরোধ, প্ল্যাটফর্ম দায়বদ্ধতা ও নিয়মভিত্তিক নিয়ন্ত্রণ গুরুত্বপূর্ণ, সেখানে এই আইন মূলত “ক্ষতির পর প্রতিকার” দর্শনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ।
দ্বিতীয়ত, আইনটি অতিমাত্রায় আদালতনির্ভর। আদালতে না গিয়ে কপিরাইট বিরোধ দ্রুত ও স্বল্প খরচে নিষ্পত্তির জন্য একটি স্বতন্ত্র কপিরাইট কাউন্সিল বা বিকল্প বিরোধ নিষ্পত্তি কাঠামো থাকা প্রয়োজন ছিল। কিন্তু তা রাখা হয়নি। ফলে রয়্যালটি, লাইসেন্স, ডিজিটাল ব্যবহারের মতো বিষয়গুলো আদালতের দীর্ঘসূত্রতায় আটকে যাবে। বাস্তবে অনেক স্রষ্টাই এই ঝামেলার ভয়ে ন্যায্য অধিকার দাবি না করেই চুপ করে থাকেন। এতে সুবিধাভোগী হয় মধ্যস্বত্বভোগীরা, আর সৃজনশীল মানুষ বঞ্চিতই থেকে যায়।
তৃতীয়ত, বুদ্ধিভিত্তিক সম্পদ সুরক্ষায় কোনো সমন্বিত জাতীয় নির্দেশনা নেই। কপিরাইট, পেটেন্ট, ট্রেডমার্ক ও ডিজাইনের মধ্যে নীতিগত সমন্বয়ের অভাব স্পষ্ট। বুদ্ধিভিত্তিক সম্পদ সংশ্লিষ্ট সব পক্ষ—স্রষ্টা, প্রযোজক, প্ল্যাটফর্ম, প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান ও রাষ্ট্র—এই সমন্বয়ে একটি কাউন্সিল বা একাধিক কাউন্সিলের সমন্বয়ে একটি ফেডারেশন গঠনের মৌলিক প্রয়োজনীয়তা উপেক্ষিত হয়েছে। ফলে আইন বিস্তৃত হলেও বহু পুরোনো কাঠামোগত সমস্যার সমাধান হয়নি, ভবিষ্যতেও হবে না।
চতুর্থত, বহু-স্বত্বাধিকারী কনটেন্টের বাস্তবতা আইন যথাযথভাবে মোকাবিলা করেনি। একটি গানে গীতিকার, সুরকার, শিল্পী ও প্রযোজক—সবার অধিকার থাকতে পারে। কিন্তু কেউ সেই গান ব্যবহার করতে চাইলে কার কাছ থেকে অনুমতি নেবে এবং কাকে কতটা রয়্যালটি দেবে—এই প্রশ্নের কার্যকর সমাধান নেই। অতীতে মোবাইল কনটেন্ট ও ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে এই সুযোগে ব্যাপক অনিয়ম হয়েছে। কনটেন্ট প্রোভাইডাররা অনেক সময় প্রোডাকশন হাউজ থেকে শিল্প নেয়, অথচ প্রকৃত কপিরাইট শিল্পী বা গীতিকারের নামে থাকে। একটি শক্তিশালী কাউন্সিল থাকলে আদালতে না গিয়েই এসব বিরোধ নিষ্পত্তি করা যেত।
পঞ্চমত, কপিরাইট ব্যবস্থাপনায় আর্থিক কাঠামোর অভাব প্রকট। একটি কাউন্সিল বা ফেডারেশনের অধীনে স্বতন্ত্র আর্থিক বিভাগ থাকলে স্রষ্টারা তাদের শিল্পকর্ম সেখানে জমা রাখতে পারতেন। ব্যবহারকারীরা সেই কর্তৃপক্ষের কাছ থেকেই স্বত্বাধিকারীর শর্ত অনুযায়ী লাইসেন্স নিতেন। কাউন্সিল একটি মিডিয়া ও মধ্যস্থতাকারী হিসেবে কাজ করে নির্দিষ্ট কমিশনের বিনিময়ে রয়্যালটি সংগ্রহ ও বণ্টন করত। এতে কপিরাইট সংক্রান্ত অর্ধেক সমস্যাই স্বয়ংক্রিয়ভাবে সমাধান হয়ে যেত। কিন্তু নতুন আইনে এমন কোনো ব্যবস্থা রাখা হয়নি।
ষষ্ঠত, ই-কমার্স ও বিপুল ডিজিটাল কনটেন্টের বাস্তবতা আইন যথাযথভাবে স্বীকার করেনি। ই-কমার্সে একজনের ছবি বা কনটেন্ট আরেকজন ব্যবহার করছে—এটি নিত্যদিনের ঘটনা। একটি বড় ওয়েবসাইটে কোটি কোটি পণ্য বিবরণ ও প্রতিদিন হাজার হাজার নতুন আপলোডের ক্ষেত্রে পৃথক কপিরাইট রেজিস্ট্রেশন বাস্তবসম্মত নয়। আন্তর্জাতিকভাবে এসব ক্ষেত্রে প্ল্যাটফর্মভিত্তিক গাইডলাইন ও নোটিসভিত্তিক ব্যবস্থাপনা অনুসরণ করা হয়, যা এই আইনে অনুপস্থিত।
সপ্তমত, সবচেয়ে বেশি কপি হওয়া কনটেন্ট—সংবাদ ও লেখা—এই বিষয়ে কোনো স্পষ্ট জাতীয় নীতি নেই। এক সংবাদমাধ্যমের লেখা অন্য মাধ্যম হুবহু প্রকাশ করছে, অথচ আদালতে গিয়ে এসব সমস্যা সমাধান করা বাস্তবসম্মত নয়। এসব ক্ষেত্রে প্রেস বা মিডিয়া কাউন্সিলের মাধ্যমে নিষ্পত্তির নির্দেশনা এবং ফেয়ার ইউজ সংক্রান্ত স্পষ্ট গাইডলাইন থাকা জরুরি ছিল, যা আইনে নেই।
সবচেয়ে বড় সীমাবদ্ধতা হলো—কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বিষয়ে আইন প্রায় নীরব। এআই দিয়ে তৈরি লেখা, গান, ছবি ও ভিডিও—এসবের স্বত্ব, প্রশিক্ষণ ডেটার কপিরাইট, অ্যালগরিদমিক ব্যবহারের দায়—এই প্রশ্নগুলো ভবিষ্যতের নয়, বর্তমানের। অথচ কপিরাইট আইন ২০২৩ এসব বিষয়ে কোনো দিকনির্দেশনা দেয় না।
সব মিলিয়ে বলা যায়, কপিরাইট আইন ২০২৩ একটি প্রয়োজনীয় ও আংশিক অগ্রগতি হলেও এটি এখনো প্রতিরোধহীন, কাউন্সিলবিহীন এবং খাতভিত্তিক বাস্তবতা থেকে বিচ্ছিন্ন। আইনটি সত্যিকার অর্থে কার্যকর করতে হলে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও নতুন প্রযুক্তি বিষয়ে স্পষ্ট নীতি, বুদ্ধিভিত্তিক সম্পদের জন্য সমন্বিত কাউন্সিল বা ফেডারেশন, আদালতের বাইরে দ্রুত বিরোধ নিষ্পত্তি ব্যবস্থা, খাতভিত্তিক গাইডলাইন এবং একটি শক্তিশালী আর্থিক ও নৈতিক কাঠামো গড়ে তোলা জরুরি।
নইলে আইনের পরিধি যতই বাড়ুক, সৃজনশীল মানুষের দীর্ঘদিনের বঞ্চনা দূর হবে না—আর সেটিই হবে এই আইনের সবচেয়ে বড় ব্যর্থতা।

