এই শতকের কয়েকটি অভ্যুত্থান ও গণ অভ্যুত্থান
বিশ্ব দুই সহস্রাব্দের বাঁক পেরিয়ে এসে যখন প্রযুক্তি ও উন্নয়নের নতুন দিগন্তে পা রাখছে, তখনো বহু দেশে ক্ষমতার দখলদারি চলছে সেই পুরোনো পথে — অস্ত্রের নল দিয়ে রাষ্ট্র পরিচালনা। কাগজে-কলমে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হলেও, মাটি আর মানুষের বুকে বারবার ফিরে এসেছে অভ্যুত্থানের পদধ্বনি।
্আবার বহুদেশে গণতন্ত্রের নাম দিয়ে শাসক শ্রেণী সাধারণ মানুষকে দ্বিতীয় তৃতীয় শ্রেণীর নাগরিক বানিয়ে বছরের পর বছর ক্ষমতা দখল করে হত্যা গুম খুন ও লুটের রাজ্য কায়েম করেছে। জনগনের যখন দেয়ালে পিঠ ঠেকে গিয়েছে তখন তারা রাস্তায় নামতে বাধ্য হয়েছে।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর থেকে অভ্যুত্থান হাজারের বেশি হয়েছে। তবে সাম্প্রতিক কালে, অর্থাৎ ২০০০ থেকে ২০২৪ পর্যন্ত সময়েও, পৃথিবী পুরোপুরি মুক্ত হয়নি সামরিক হস্তক্ষেপ আর রাষ্ট্রীয় ষড়যন্ত্র থেকে। বরং পরিসংখ্যান বলছে, এই সময়েও গড়ে প্রতি বছর ৪–৫টি সফল অভ্যুত্থান ঘটেছে।
আর ২০২১–২০২৪ এ সেই সংখ্যা বেড়ে গেছে, বছরে ৭–৫টি সফল অভ্যুত্থান হয়েছে।
সামরিক অভ্যুত্থান বনাম গণ অভ্যুত্থান
-
সামরিক অভ্যুত্থান (Military coup):
রাষ্ট্রযন্ত্রের (সেনাবাহিনী) মাধ্যমে নির্বাচিত বা নিয়মতান্ত্রিক সরকারকে হটিয়ে ক্ষমতা দখল। -
গণ অভ্যুত্থান (Popular uprising, mass uprising):
জনগণের স্বতঃস্ফূর্ত বা সংঘবদ্ধ আন্দোলন, যা সরকার পতনের দিকে ঠেলে দেয় — কখনো সহিংস, কখনো অহিংস।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর গণ অভ্যুত্থানও অনেক দেশে সরকার ফেলে দিয়েছে।
সার্বিয়া (২০০০)
মিলোসেভিচের জালিয়াতিপূর্ণ নির্বাচনের পর সার্বিয়ায় কয়েক সপ্তাহ ব্যাপী গণ বিক্ষোভ।
লাখ লাখ মানুষ বেলগ্রেডে জড়ো হয়, এবং শেষ পর্যন্ত মিলোসেভিচ পদত্যাগ করেন।
এটি একটি বিশুদ্ধ গণ অভ্যুত্থান ছিল।
জর্জিয়া (২০০৩) — “রোজ রেভোলিউশন”
পার্লামেন্ট নির্বাচনের কারচুপি ও দুর্নীতির বিরুদ্ধে হাজার হাজার মানুষ রাস্তায় নামে।
প্রেসিডেন্ট এডুয়ার্ড শেভারনাদজে পদত্যাগে বাধ্য হন।
ইউক্রেন (২০০৪) — “অরেঞ্জ রেভোলিউশন”
ভোট জালিয়াতির বিরুদ্ধে ইউক্রেনে কয়েক সপ্তাহব্যাপী গণআন্দোলন।
শেষ পর্যন্ত সুপ্রিম কোর্ট নির্বাচন বাতিল করে পুনঃভোটের নির্দেশ দেয়।
কিরগিজস্তান (২০০৫, ২০১۰)
দুইবার গণ আন্দোলন রাষ্ট্রপতিকে ক্ষমতা ছাড়তে বাধ্য করে।
উভয় ঘটনাই ছিল জনগণের মিছিল, ব্যারিকেড, শ্লোগান আর অগণিত সমাবেশের ফল।
তিউনিসিয়া (২০১০-২০১১) — “আরব বসন্ত” শুরু
একজন ক্ষুদ্র ফল বিক্রেতা মোহাম্মেদ বুয়াজিজির আত্মাহুতির মাধ্যমে যে গণবিক্ষোভ শুরু, তা সরকারের পতন ঘটায়।
দীর্ঘকালের প্রেসিডেন্ট জিনে এল আবেদিন বেন আলী দেশ ছেড়ে পালান।
মিশর (২০১১)
তাহরির স্কয়ারে লাখ লাখ মানুষ কয়েক সপ্তাহ ধরে অবস্থান নেয়।
অবশেষে হোসনি মুবারক ত্রিশ বছরের শাসনের ইতি টানেন।
সুদান (২০১۹)
দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধির বিরুদ্ধে শুরু হওয়া আন্দোলন দ্রুতই সরকারবিরোধী গণ অভ্যুত্থানে রূপ নেয়।
৩০ বছরের স্বৈরাচারী শাসক ওমর আল বাশির ক্ষমতা হারান। ২০১৯ সালে সুদানের দীর্ঘকালীন শাসক ওমর আল বাশির অভ্যুত্থানে অপসারিত হন। তবে সুদানে গৃহযুদ্ধ ও সেনা-বেসামরিক সংঘাত এখনও চলছে।
২০২১ সালেও আবার সেনা অভ্যুত্থান ঘটে, বেসামরিক সরকার সাময়িকভাবে স্থগিত হয়।
শ্রীলংকা (২০২২)
অর্থনৈতিক ধস, দ্রব্যমূল্যের উল্লম্ফন ও দীর্ঘ লোডশেডিং-এর কারণে জনগণের ব্যাপক বিক্ষোভ রাষ্ট্রপতি গোটাবায়া রাজাপাকসেকে পদত্যাগে বাধ্য করে। ২০২২ সালে সরাসরি অভ্যুত্থান না হলেও, অর্থনৈতিক বিপর্যয়ের কারণে গণঅভ্যুত্থানসদৃশ পরিস্থিতি তৈরি হয়। রাষ্ট্রপতি গোটাবায়া রাজাপাকসে দেশ ছেড়ে পালাতে বাধ্য হন।
পরে পার্লামেন্টের ভোটে নতুন প্রেসিডেন্ট নির্বাচন হয়।
গণ অভ্যুত্থান ও পরিণতি
এইসব গণ অভ্যুত্থানের একটা বৈশিষ্ট্য:
-
সাধারণত এটি শহর কেন্দ্রিক, ছাত্র, পেশাজীবী, মধ্যবিত্তের বড় অংশ সম্পৃক্ত হয়।
-
মিডিয়া ও সোশ্যাল মিডিয়া মুখ্য ভূমিকা পালন করে।
-
অহিংস থেকেও সরকারের ভিত্তি নাড়িয়ে দিতে পারে, কিন্তু শেষ পর্যন্ত সেনাবাহিনী বা নিরাপত্তা বাহিনীর ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ হয় — তারা জনগণের সাথে যাবে নাকি সরকারের সাথে, সেটিই নির্ধারণ করে।
অভ্যুত্থান
থাইল্যান্ড
থাইল্যান্ড সম্ভবত এশিয়ার সবচেয়ে বড় “অভ্যুত্থান-প্রিয়” দেশ।
২০০৬ সালে প্রধানমন্ত্রী থাকসিন সিনাওয়াত্রার সরকার সামরিক হস্তক্ষেপে অপসারিত হয়।
এরপরও থেমে থাকেনি — ২০১৪ সালে আবার সেনাবাহিনী ক্ষমতা দখল করে।
থাইল্যান্ডে সামরিক অভ্যুত্থান প্রায় “প্রথার” মতো, যা রাজনৈতিক সংঘাত সামলানোর এক সহজ উপায়ে পরিণত হয়েছে।
পাকিস্তান
২০০০ সালে জেনারেল পারভেজ মুশাররফ সরাসরি ক্ষমতা দখল করেন।
এরপর পাকিস্তানে আবার গণতান্ত্রিক কাঠামো ফেরে, কিন্তু সামরিক বাহিনী বরাবরই দেশের রাজনীতির পেছনের চালিকা শক্তি হয়ে থাকে।
বুরকিনা ফাসো
২০২২ সালে এক বছরে দু’বার সেনা অভ্যুত্থান হয়।
প্রথমে জানুয়ারিতে রাষ্ট্রপতি রচ কাবোরে উৎখাত হন। তারপর অক্টোবরেও সামরিক অভ্যুত্থান হয়।
জিহাদিদের বিরুদ্ধে ব্যর্থতা, দারিদ্র্য, দুর্নীতি ও নিরাপত্তাহীনতা ছিল মূল কারণ।
মালি
২০২০ সালে প্রেসিডেন্ট ইব্রাহিম বৌবাকার কিতা সেনাবাহিনীর হাতে ক্ষমতা হারান।
এরপর আন্তর্জাতিক চাপের মুখে অন্তর্বর্তী বেসামরিক সরকার গঠিত হলেও, ২০২১ সালে আবার সেনা নেতৃত্বে ক্ষমতা ঢুকে পড়ে।
গিনি
২০২১ সালে গিনিতে প্রেসিডেন্ট আলফা কুন্ডে সেনাবাহিনীর হাতে অপসারিত হন।
প্রধান অভিযোগ ছিল— ক্ষমতায় আঁকড়ে থাকা ও সংবিধান পরিবর্তন করে তৃতীয় মেয়াদে যাওয়া।
নাইজার
২০২৩ সালের জুলাইতে নাইজারে সেনাবাহিনী ক্ষমতা দখল করে নির্বাচিত প্রেসিডেন্ট মোহাম্মদ বাজুমকে বন্দি করে। পশ্চিম আফ্রিকার অনেক দেশের মতো এখানে ও নিরাপত্তা সংকট, জিহাদি হামলা ও দুর্নীতি সেনা হস্তক্ষেপের কারণ।
কেন আবার অভ্যুত্থান বাড়ছে?
-
অর্থনৈতিক বৈষম্য ও শূন্যতা:
অনেক দেশে দ্রব্যমূল্য, বেকারত্ব, সরকারি ব্যর্থতা মানুষকে হতাশ করে। -
জঙ্গিবাদ ও নিরাপত্তা সংকট:
মালি, নাইজার, বুরকিনা ফাসোতে সেনাবাহিনী নিজেই মনে করে তারাই দেশকে রক্ষা করতে পারে। -
রাজনীতির অতিরিক্ত ব্যক্তিকেন্দ্রিকতা ও ক্ষমতায় দীর্ঘকাল থাকার চেষ্টা:
তৃতীয় মেয়াদ, চিরকালের জন্য প্রেসিডেন্ট থাকা, সংবিধান পাল্টানো — এগুলোই সেনা অভ্যুত্থান ডেকে আনে। -
সামরিক বাহিনীর একপ্রকার আত্মপ্রত্যয়:
গণতন্ত্র দুর্বল হলে সেনারা ভাবে, রাষ্ট্রের ভাগ্য তাদের হাতেই ভালো থাকবে।
অভ্যুত্থানের পর দেশ কীভাবে চলে?
প্রায় সবক্ষেত্রেই দেখা যায়:
-
প্রথমে সেনা কাউন্সিল বা অন্তর্বর্তী সামরিক সরকার গঠন হয় বা অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি নির্বাচন করা হয়।
-
আন্তর্জাতিক চাপ এলে বা অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞার ভয়ে সামরিক নেতারা কোনও বেসামরিক অন্তর্বর্তী প্রেসিডেন্ট বসিয়ে রাখেন।
-
তারপর এক-দুই বছর পর নির্বাচন আয়োজনের ঘোষণা আসে।
কিন্তু অনেক সময়ই এই নির্বাচনে সেনাবাহিনী নিজেরা থেকে যায়, প্রার্থী দাঁড় করায়, অথবা এমন পরিবেশ তৈরি করে যাতে তাদের কাঙ্ক্ষিত ফলাফল হয়।
সারসংক্ষেপ:
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর সামরিক অভ্যুত্থান যতটা, গণ অভ্যুত্থানও ঠিক ততটাই বৈপ্লবিক প্রভাব ফেলেছে।
২০০০–২০২৪-এর মধ্যে গণ আন্দোলনগুলো প্রমাণ করেছে যে জনগণ চাইলেই রাষ্ট্রের রাশ টানতে পারে — যদিও বহুক্ষেত্রে পরে আবার ক্ষমতা ঘুরে আসে সামরিক, ক্ষমতালোভী বা দুর্নীতিগ্রস্ত রাজনীতিবিদের হাতে।
