ইসলাম ধর্মের মধ্যে শাখা-বিভাজনের ইতিহাস দীর্ঘ এবং জটিল। প্রাথমিক যুগ থেকেই মুসলিম সমাজে কিছু মতবিরোধ সৃষ্টি হয়েছিল, যা পরে বড় আকার ধারণ করে বিভিন্ন শাখায় ভাগ হয়। এই বিভাজনের মূল কারণ ছিল ধর্মীয় বিশ্বাসের ভিন্নতা, নেতৃত্বের প্রশ্ন এবং কখনো কখনো রাজনৈতিক স্বার্থের সংঘর্ষ। বিশেষ করে মহানবী মুহাম্মদ (সা.)’র মৃত্যুর পর কাদের নেতৃত্ব গ্রহণ করবেন এ নিয়ে মূল দ্বন্দ্ব সৃষ্টি হয়েছিল। একপক্ষে ছিল তাদের যারা মুহাম্মদ (সা.)-এর সগৌরবী পরিবার তথা আহলুল বাইত থেকে নেতার ওপর বিশ্বাস করতেন, অন্যদিকে এমন অনেকেই ছিলেন যারা সামরিক ও রাজনৈতিক নেতাদের নেতৃত্বে আস্থা রাখতেন।
সময়ের সাথে সাথে আরও উপশাখার সৃষ্টি হয়েছে। সুন্নি ইসলামে হানাফি, শাফেয়ি, মালিকি ও হাম্বলি মাযহাব গড়ে উঠেছে। শিয়া ইসলামে ইমামি শিয়া, ইসমাইলি ও যায়দি শাখা রয়েছে। সুফিবাদও একটি গুরুত্বপূর্ণ আধ্যাত্মিক ধারা হিসেবে বিকশিত হয়েছে। দুই বড় শাখা হলো সুন্নি ও শিয়া । সময়ের সাথে এই দুই শাখার মধ্যে বিশ্বাস ও আচরণের পার্থক্য আরও গভীর হয়। এই পার্থক্যের মূলে ছিল কেবলমাত্র নেতৃত্বের প্রশ্ন নয়, বরং ধর্মীয় অনুশাসন, ইবাদতের প্রকারভেদ, শরীয়াহর ব্যাখ্যা এবং ঐতিহ্যের ভিন্নতা। কখনো কখনো স্থানীয় রাজনৈতিক ও সামাজিক পরিস্থিতি এই দ্বন্দ্বকে আরও প্রকট করে তোলে।
ইতিহাস জুড়ে এই ভিন্নমতের কারণে বহুবার মুসলিম সমাজের অভ্যন্তরে সংঘর্ষ দেখা গেছে যা কখনো কখনো সামরিক সংঘর্ষে রূপ নিয়েছে। বিশেষ করে শিয়া-সুন্নি বিরোধ বিভিন্ন সময়ে তীব্র আকার ধারণ করেছে।
ইতিহাসে বিভিন্ন সময়ে এই মতবিরোধ সশস্ত্র সংঘাতে রূপ নিয়েছে। কারবালার যুদ্ধ (৬৮০ খ্রিস্টাব্দ) ছিল প্রথম বড় ঘটনা, যেখানে হোসেইন (রা.) নিহত হন। মধ্যযুগে অটোমান-সাফাভিদ যুদ্ধগুলো (১৫০১-১৭৩৯) সুন্নি-শিয়া বিরোধের রাজনৈতিক রূপ নেয়।
আধুনিক যুগে ইরান-ইরাক যুদ্ধ (১৯৮০-১৯৮৮) এ লক্ষাধিক মানুষের প্রাণহানি হয়েছে। বর্তমানে সিরিয়া, ইয়েমেন ও অন্যান্য অঞ্চলে সাম্প্রদায়িক উত্তেজনা দেখা যায়।
ঐতিহাসিকদের হিসাব অনুযায়ী, বিভিন্ন ইসলামিক সাম্প্রদায়িক সংঘাতে লাখো মানুষের প্রাণহানি হয়েছে। শুধু ইরান-ইরাক যুদ্ধেই প্রায় দশ লাখ মানুষ মারা যান। সিরিয়ার সংঘাতে পাঁচ লাখেরও বেশি মানুষের মৃত্যু হয়েছে।
তবে বলা প্রয়োজন যে, এই সংঘাতগুলো শুধুমাত্র ধর্মীয় কারণে নয়, বরং ভূ-রাজনৈতিক স্বার্থ, সম্পদের নিয়ন্ত্রণ এবং আঞ্চলিক প্রভাব বিস্তারের লড়াইও জড়িত। আধুনিক বিশ্বে সৌদি আরব ও ইরানের মধ্যকার প্রতিদ্বন্দ্বিতা এই সাম্প্রদায়িক বিভাজনকে আরও জটিল করে তুলেছে।
তবে এটা মনে রাখা জরুরি যে, বেশিরভাগ মুসলমান শান্তিপূর্ণভাবে তাদের ধর্ম পালন করেন। বিভিন্ন শাখার মধ্যে মতপার্থক্য থাকলেও সাধারণভাবে তারা একই মূল বিশ্বাসে অটুট থাকেন। আজকের দিনে অনেক মুসলিম পণ্ডিত ও নেতা একতা ও সম্প্রীতির জন্য কাজ করে যাচ্ছেন।

