ইংকা সভ্যতা দক্ষিণ আমেরিকার এক প্রাচীন ও সমৃদ্ধ সভ্যতা যা কলম্বাসের আমেরিকা আবিষ্কারেরও বহু বছর আগে থেকেই বিস্তৃত ছিল। বর্তমানের বলিভিয়া, পেরু, ইকুয়েডর, আর্জেন্টিনা এবং চিলির বিভিন্ন অঞ্চলে এই সভ্যতা বিকাশ লাভ করেছিল। ইংকারা তাদের সাংস্কৃতিক, সামাজিক এবং রাজনৈতিক সংগঠন দ্বারা একটি সুশৃঙ্খল সমাজ গড়ে তুলেছিল।
ইংকারা রাজধানী কুজকো (Cuzco)-কে বিশ্বের কেন্দ্রস্থল মনে করতো। এই শহর ছিল তাদের রাজনীতি, বাণিজ্য ও ধর্মীয় জীবনের কেন্দ্র। দূরদূরান্ত থেকে বিভিন্ন ধরনের শস্য, সোনা, রূপা, কাপড় ও কোকো পাতা কুজকোর বাজারে পৌঁছাতো। কুজকো ছিল ইংকা সাম্রাজ্যের একেবারে কেন্দ্রবিন্দু।
ইংকারা একটি সুসংগঠিত সমাজ গড়ে তুলেছিল। তাদের শাসনব্যবস্থা পারিবারিক ভিত্তিতে পরিচালিত হতো। প্রতি দশটি পরিবার একটি দল গঠন করতো, যার নেতৃত্বে থাকতো একজন দলপতি। ৫০টি পরিবার মিলিত হয়ে একটি গোত্র গঠন করতো। এইভাবে স্তরক্রমে ক্ষমতার শৃঙ্খল চলতো, যার সর্বোচ্চ শীর্ষে অবস্থান করতো রাজা।
প্রত্যেক ইংকা নাগরিক কর্মঠ ছিল। শিশু ও বৃদ্ধ ব্যতীত সবাই কাজ করতো। পরিবারগুলি চাষাবাদ করতো, নিজেদের কাপড় বুনতো, জুতো বানাতো, ঘরের আসবাবপত্র তৈরি করতো এবং নিজেরা গড়ে তুলতো সোনার-রূপার অলঙ্কার।
ইংকা সমাজে কঠোর শৃঙ্খলা বিদ্যমান ছিল। কে কী খাবে, কী পরবে এবং কোন কাজ করবে তা সমাজপতি নির্ধারণ করতো। অসুস্থ, বৃদ্ধ এবং গরিবদের দেখাশোনার দায়িত্বও সমাজপতির। ইংকা সমাজে কেউ গরিব থাকতো না এবং প্রত্যেকের ঘরে ছিল প্রচুর সোনার-রূপার অলঙ্কার।
ধর্মীয় অনুষ্ঠানের মধ্যে চিবচা হ্রদে প্রতি বছর একটি বিশেষ অনুষ্ঠান অনুষ্ঠিত হতো। এক জন সমাজপতিকে সোনার গুঁড়ো দিয়ে সাজিয়ে সূর্যদেবতার বিসর্জন দেওয়া হতো। এটি ছিল ইংকা ধর্মীয় সংস্কৃতির একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
বছরের পর বছর সমৃদ্ধির পর, ইংকা সাম্রাজ্যে রাজপরিবারে দলে দলে বিবাদ শুরু হয়। দুর্বল হওয়া এই সময়ে স্পেনীয় সেনাপতি ফ্রান্সিসকো পিজারো ইংকার শেষ সম্রাট আতাহুয়ালপা-কে হত্যা করে সাম্রাজ্য দখল করে নেয়। ইংকা সভ্যতার ঐশ্বর্য লুট করা হয় এবং এটি ইতিহাসের পাতায় একটি প্রাচীন সভ্যতা হিসেবে ধ্বংস হয়ে যায়।
স্পেনীয়দের অত্যাচারে কুজকো রাজধানী পরিত্যক্ত হয়ে যায়, এবং ইংকারা অন্য অঞ্চলে পালিয়ে যায়। আজও কুজকো শহর ইংকা সভ্যতার একটি গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক নিদর্শন হিসেবে পরিচিত।
সৌজন্যে: টিম শোভনীয়
ছবি: protikhon
