ভবিষ্যতের ই-কমার্স ও চতুর্থ শিল্প বিপ্লব
জাহাঙ্গীর আলম শোভন
বাংলাদেশের ই-কমার্সে এখনো ২ শতাংশ মানুষ কেনাকাটা করে না। মোট খুচরা বাজারের ৫% শতাংশ এখনো ই-কমার্সে হয়না। তা সত্বেও আমরা বলছি একটি ইতিবাচক উন্নতি ও পরিবর্তনের দিকে ই-কমার্স খাত ধাবিত রয়েছে। এরমধ্যে কয়েকটি বিষয় এই গতিকে কিছুটা বেগতি করেছে বটে।
করোনার সময় ই-কমার্স খাত গতি পেলেও প্রথম ধাক্কায় কিন্তু নিত্যপণ্য ভিত্তিক ছাড়া বাকী সবাই কিছুটা ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছে। উল্লেখযোগ্য পরিমাণে ক্ষতিগ্রস্থের হার প্রায় ৫৩%। যা ই-ক্যাবের এক জরিপ থেকে উঠে আসে। তবুও নিত্যপণ্যে ৩০০% শতাংশ এবং তৈরী খাবারে ২৬৭% প্রবৃদ্ধির কারণে আপাত হারে করোনাকালীন সময়ে গড়ে দ্বিগুন প্রবৃদ্ধি হয়েছে। তারপরও এই উ্ন্নতিকে ইতিবাচক হিসেবে ধরা হয় কেননা। করোনার আগে অনেকে বিশ্বাস করেনি যে, যে দেশের মানুষ দোকানে গিয়ে ধরে-দেখে পণ্য ও দরদাম করে পণ্য কিনতে অভ্যস্ত তারা কি অনলাইনে কেনাকাটা করবে।
চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের ছোঁয়ায় আগামীর ই-কমার্স হবে আমাদের অনেকের প্রত্যাশিত প্রযুক্তি বিপ্লবের রুপান্তর আবার অনেকের জন্য আশার চেয় বেশী কিছু। বিশেষ করে বিগ ডেটার ব্যবহার পুরো খাতের চিত্র বদলে দেবে যা ইতোমধ্যে ডিজিটাল মার্কেটিং তথা ডেটা ড্রিভেন ডিজিটাল মার্কেটিং এর মাধ্যমে সূচনা হয়েছে। statista.com এর মতে শুধু বাংলাদেশেই ডিজিটাল মার্কেটিং এর পরিমাণ সামনের বছরগুলোতে ৩৮২ মিলিয়ন মার্কিন ডলার এবং প্রবৃদ্ধির হার প্রায় ১০%।
আধুনিক নিরবিচ্ছিন্ন ও পারষ্পরিক সংযুক্ত নেটওয়ার্কে যেখানে সবকিছুই আইওটির সাথে যুক্ত। সেখানে আমাদের প্রতিদিনের প্রতিটি ডেটাই ক্লাউডে জমা হবে যা বিশ্লেষণ করে ই-কমার্স প্রতিষ্ঠানগুলো পণ্য সেবা উন্নয়ন ও পরিবেশন করবে। আজ আমরা যেভাবে গুগলে সার্চ করে পণ্য খুঁজি তার প্রয়োজনই পড়বেনা। ইতোমধ্যে বিভিন্ন অ্যাপ এই পদ্ধতি রপ্ত করে নিয়েছে। হয়তো আমাদের সব প্রয়োজন দিয়েই সাজানো হবে আগামীর প্রযুক্তি। বর্তমানে লাইভ ও চ্যাটবটগুলোর বুদ্ধি দেখে আমরা চমকিত হই প্রতিনিয়ত।
বর্তমানে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার জয়জয়কার চলছে। কনটেন্ট থেকে ডিজাইন, ইমেজ থেকে ভিডিও, অ্যানিমেশন থকে কোডিং কি নেই যা এআই করছেনা? খুব নিকটে আপনার হয়তো সব কাজ করে দেবে আরেকটি এআই বেডজ অ্যাপ। আপনার শপ অ্যাসিটেন্টে কিংবা পার্সোনাল অ্যাসিসটেন্ট হয়তো আপনার হয়ে আপনার শপিং করে দেবে বা অন্য কোনো কাজ করবে।
রোবটিক্স ইতোমধ্যে অন্যান্য খাতের মতো ই-কমার্স খাতেও কাজ শুরু করেছে। অনেক দেশেই ড্রোন দিয়ে শুরু হয়েছে পণ্য ডেলিভারী। সম্প্রতি জিটেক্স গ্লোবালে একটি ছোট রোবটের দেখা পেয়েছি যে নিজস্ব বৃদ্ধিমত্তার আলোকে সঠিক ক্রেতার কাছে পণ্য সেবা পৌঁছে দিবে। মেশিন লারনিং, বিগডেটা, ড্রোন ডেলিভারী এসব এখন বাস্তবতা।
ই-কমার্সের পেমেন্ট ও আর্থিক নিরাপত্তার জন্য ব্লকচেইন হবে অন্যতম হাতিয়ার। ব্লকচেইন প্রযুক্তি প্রতিটি লেনদেনকে ইউনিক করে যেকোনো ইউনিক তথ্যকে একটি ব্লকে রুপদান করতে পারে। যা হতে পারে তথ্য উপাত্তের বিশুদ্ধতা নির্ণয়ের হাতিয়ার। যেভাবে তথ্য উপাত্তের অবাধ প্রবাহের কারণে এই বাহুল্য ও বহুমাত্রিকতা তৈরী হয়েছে সবক্ষেত্রে সঠিক তথ্য পাওয়া দুষ্কর হতে পারে। ভুল পুরোনা ও নকল তথ্যে ঘটতে পারে কোনো বিদঘুটি তাই ব্লকচেইন প্রযুক্তির ব্যবহার দ্রুতই বাড়বে। বিশেষ করে নিজস্ব ব্রান্ডের ও নিশ বা কুলুঙ্গির ক্ষেত্রে ব্লকচেইন এক ধরনের নিরাপত্তা নিয়ে আসবে। তাই নানাবিধ প্রতারণার জাল বিছানো থাকলেও সঠিক ও নিরাপদ ই-কমার্স সেবা প্রাপ্তি সহজ হয়ে যেতে পারে।
অগমেন্টেড রিয়েলিটি এবং বিকল্প পেমেন্ট উপায় হিসেবে ক্রিপ্টোকারেন্সির প্রবেশাধিকার ব্যাপক হতে চলেছে ই-কমার্সে। ভার্চুয়াল মুদ্রার ব্যাপ্তি ও বাস্তবতায় এতটাই গতিশীল যে আমাদেরকে রীতিমত হিমশিম খেতে হবে। কারণ ইতোমধ্যে অনেক সুযোগ সন্ধানিরা ডিজিটাল কারেন্সির নামে প্রতারণা শুরু করে দিয়েছে। ভিডিও থেকে পণ্য অর্ডার করা যাবে আর ভয়েস কমান্ড দিয়ে সম্পন্ন হবে বেচাকেনা। এগুলো হয়তো অনেকের কাছে মামুলি হতে পারে।
সুদৃঢ় নিরাপত্তা প্রযুক্তির দ্বারা সেবাখাতে যে কারিগরি পরিবর্তন আসবে যা আমরা সহসাই দেখতে পাবো। প্রতিটি মানুষের কন্ঠ আলাদা তা হওতো আপনার সিস্টেম চিহ্নিত করে কমান্ড গ্রহণ করবে। কারণ সহজিকরণের সাথে নিরাপত্তার ঝুঁকিও জড়িত থাকে। তবে সুবিধার বিপরীতের চ্যালেঞ্জ থাকে। আমাদের দেশের মতো শ্রম ও শ্রমিক নির্ভর শিল্প ব্যবস্থার জন্য স্বয়ংক্রিয় প্রযিুক্তিগুলো কর্মসংস্থান দখল করার ঝুঁকিও তৈরী করতে পারে। সেক্ষেত্রে দক্ষ জনবল ও পূর্ব প্রস্তুতি হতে পারে একটি সমাধান।
(নভেম্বর-২০২৪)

