ই-কমার্স খাতের নতুন সংজ্ঞা ও সংশ্লিষ্ঠদের দাবী
জাহাঙ্গীর আলম শোভন
বাজেটে জনসাধারণ চোখ থেকে কোন পণ্যটির দাম বাড়বে আর কোন পণ্যটির দাম কমবে? ব্যসায়ীদের চোখ একটা বাক্সের ভেতরে উঁকি দেয়। তারা জানতে চান কোথায় কোন ট্যাক্স ট্যারিফ উঠে গেল তার জন্য কোন পণ্য সেবার ব্যবসা সহজ বা কঠিন হবে? কিংবা কোন পণ্য সেবার ভ্যাট ট্যাক্স কমলো বাড়লো বলে সেটির লাভ লোকসানের হিসেব সহজ-কঠিন হলো? আর নতুন খাতের উদ্যোক্তারা চায় সরকার তাদের জন্য কি সুবিধা নিয়ে আসছে?
অতীতে এবং বর্তমানেও সরকার বিভিন্ন খাতকে প্রণোদনা, ট্যাক্স রিবেট কিংবা বিকল্প ও প্রতিযোগীপণ্যের অবাধ বাণিজ্য কিছুটা গরল (সরল নয়) করে দিয়ে কোনো বিশেষ খাতকে সুবিধায়িত করে থাকে। এর ফল হলো একটি নির্দিষ্ঠ সময়ের মধ্যে সে খাত বিকশিত হলে একদিকে যেমন কর্মসংস্থান হয়, অন্যদিকে অর্থনীতিতে খাতের অবদান থাকে। তবে সব সময় সব খাত সুবিধা পেয়ে সমানভাবে বিকশিত হয় এমন নয়। একটি খাত বিকাশের জন্য রাজস্ব নীতি ছাড়াও আরো অন্যান্য পিলার থাকে। সেগুলো সমান্তরালে উন্নীত না করলে আশানুরুপ ফল নাও হতে পারে।
এবারের ২০২২-২৩ সালের বাজেটে ই-কমার্স নিয়ে ভুরি ভুরি কথা আছে। সত্যিকার অর্থে এই খাতকে বিশেষ খাত বানিয়ে সরকার একটি সেল গঠন করেছে, সেই সেল থেকে একটি নির্দেশিকা প্রকাশ করে এই খাতের প্রতারণাকে ঠেকানো হয়েছে এবং একটি টেকনিক্যাল কমিটি গঠন করার মাধ্যমে একটি সমস্যার কিছু সমাধান করেছে। বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের কাছে গ্রাহকদের দাবীকৃত অর্থের যে অংশ তৃতীয় বা গেটওয়েতে আটকে ছিল। তা ফেরত দিতে পেরেছে। ৩শত ৯৭ কোটি টাকার মধ্যে ৩শত ৭৪ কোটি টাকা ফেরত দেয়া সম্ভব হয়েছে। পুরো ঘটনার কাছে এই অর্থ হয়তো বড়ো কোনো অংশ নয়। কিন্তু আদালত বা আইনশৃংখলা বাহিনীর প্রক্রিয়ার বাইরে একটি কারিগরি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে প্রতারিত গ্রাহকের টাকা ফেরত দেয়ার ঘটনা বাংলাদেশে হর হামেশা ঘটে না।
এবারের বাজেটে ই-কমার্স খাত থেকে ট্যাক্স ও ভ্যাট সংক্রান্ত ৮টি প্রস্তাব প্রদান করা হয়েছে। সর্বশেষ গত ২০২১-২২ অর্থবছরে ই-লার্নিং বা অনলাইন এডুকেশন এর উপর ভ্যাট প্রত্যাহারের পর আর কোনো শুভ সংবাদ এখানে পায়নি উদ্যোক্তারা। বলে রাখা ভাল যে, আমাদের যোগাযোগ ও ডিজিটাল অবকাঠামোর তুলনায় আমাদের ই-কমার্স কাংখিত প্রবৃদ্ধির ধারায় নেই। এখনো সামগ্রীক খুচরা ব্যবসায়ের ১%ও অনলাইনে হয়না। প্রতিদিন এই সেবা নেন ৬ লাখের কিছু বেশী মানুষ যেখানে ঢাকাতেই কোটির বেশী মানুষ বসবাস করে। বাইরে থেকে যতটা ঢাকঢোল আছে ভেতরে তা নয়। তবে কর্মসংস্থান এর ক্ষেত্রে এর অবদান সমানুপাতিক নয় বরং বেশী বলা যায়। সরাসরি প্রায় সাড়ে তিন লাখ কর্মী কাজ করে। কিন্তু অন্তত ২ লাখ তরুন, গৃহিনী ও আবাসিক উদ্যোক্তা আছেন। যারা পূর্ণ এবং খন্ডকালিন সময় নিয়ে নিজস্ব একটা উদ্যোগ পরিচালনা করেন। এবং মোট বাজারের প্রায় ২৫-৩০% এদের নিয়ন্ত্রণে।
বিগত বছরগুলোতে দাবী আদায় না হওয়াতে এ বছরও একই দাবীগুলো সরকারের সংশ্লিষ্ঠ দপ্তরের নিকট উপস্থাপন করা হয়েছে। যেমন, ট্রেড লাইসেন্স অনুমোদন, ফুলফিলমেন্ট সেন্টারের উপর থেকে মূসক রেয়াত, উৎসে কর থেকে অব্যাহতি ইত্যাদি।
এসআরও নং-১৮৬-আইন/২০১৯/৪৩-মূসক। তারিখ- ১৩ জুন, ২০১৯ অনুসারে – “অনলাইনে পণ্য বিক্রয়” অর্থ ইলেকট্রনিক নেটওয়ার্ক ব্যবহারের মাধ্যমে সেই সকল পণ্য ও সেবার ক্রয়-বিক্রয়কে বুঝাবে যা ইতিপূর্বে কোনো উৎপাদনকারী বা সেবা প্রদানকারীর নিকট হতে মূসক পরিশোধপূর্বক গৃহীত হইয়াছে এবং যাহাদের নিজস্ব কোনো বিক্রয়কেন্দ্র নাই।’’ এই সংজ্ঞা ঘোষণার পর মার্কেটপ্লেস ও অনলাইন শপ এর ক্ষেত্রে কিছু পদ্ধতিগত ভিন্নতা থাকার কারণে করনীতি তৈরীতে কিছুটা ঝামেলা হচ্ছে বটে।
যদিও বিগত ৪ জুলাই ২০২১ সালে প্রকাশিত ডিজিটাল কমার্স পরিচালনায় নির্দেশিকায় মার্কেটপ্লেস এর সংজ্ঞা দেয়া হয়েছে- ‘‘মার্কেটপ্লেস অর্থ ইন্টারনেটে এক ধরনের ডিজিটাল কমার্স সাইট বা পোর্টাল যাতে এক বা একাধিক তৃতীয়পক্ষ কতৃক পণ্য সেবা সর্ম্পর্কিত তথ্যাদি সন্নিবেশ করা থাকে এবং লেনদেন প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়।’’ কিন্তু এটা কোনো আইন বা রাজস্ব সংক্রান্ত নথি না হওয়ার কারণে কর সম্পর্কিত কাজে এটা ব্যবহার করা যায়নি।
২০২৩-২৪ বাজেট প্রস্তাবনায় বলা হয়েছে, অনলাইনে খুচরা বিক্রয় অর্থ: ইলেকট্রনিক্স নেটওয়ার্ক ব্যবহারের মাধ্যমে সেইসব পণ্য সেবার ক্রয় বিক্রয় যা ইতোপূর্বে কোনো উৎপাদনকারী বা পণ্য সরবরাহকারী বা ব্যবসায়ির নিকট হতে মূসক পরিশোধপূর্বক ক্রয় করা হয়েছে এবং অনলাইনে খুচরা বিক্রেতা কতৃক উক্ত ক্রয়কৃত পণ্য মূসক প্রদানপূর্বক সরবরাহ করা হবে। যেক্ষেত্রে উক্ত অনলাইন খুচরা বিক্রেতার নিজস্ব কোনো (ভৌত) বিক্রয়কেন্দ্র নেই।
এখানে সংজ্ঞাতে মূসক এর বিধান যুক্ত করা হয়েছে এবং ক্রয় করার পূর্বে একবার মূসক এর কথা বলা হয়েছে এবং বিক্রয় করার সময় আরেকবার মূসক এর কথা বলা হয়েছে। ২০১৮ সাল থেকে মূসক আদায়ের ক্ষেত্রে কোনো অনলাইন বিক্রেতাকে অনলাইনে পণ্যসেবা বিক্রয়ের ক্ষেত্রে হয়তো তার সরবরাহকারী বা উৎপাদক বা আমদানীকারক মূসক প্রদান করেছেন এমন নথি প্রদান করবেন। এমন নীতি বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। যদি কোনো কারণে তা না করেন তাহলে তিনি সে মূসক প্রদান করবেন। এই নিয়মটি রহিত করতে কয়েকদফা চিঠি ও বৈঠক হয়েছে ই-কমার্স খাতের বাণিজ্য সংগঠন ই-ক্যাব ও রাজস্ব বোর্ড এর সাথে। কিন্তু কোনো অগ্রগতি হয়নি। এখন সংজ্ঞা পাওয়াটাকে একটা প্রাপ্তি বা প্রাথমিক অগ্রগতি হিসেবে দেখা হচ্ছে। ভবিষ্যতে অন্যান্য নীতি নির্ধারণে এই সংজ্ঞা সহায়ক ভূমিকা পালন করবে।
ব্যাপারটা একটু ব্যাখ্যা করা যাক, যদি কোনো পণ্যের হয় ১০০০ টাকা। এবং অনলাইন শপ থেকে এটা ১১০০ টাকায় বিক্রি করা হয় এবং ৬০ টাকা ডেলিভারী চার্জ নিয়ে মোট ১১৬০ টাকা গ্রাহকের কাছ থেকে গ্রহণ করা হয়। তাহলে তিনি শুধু বাড়তি (১০০+৬০=১৬০) টাকার উপর ৫% শতাংশ হারে মূসক প্রদান করবেন। মানে তার প্রদেয় মূসক হবে ৮ টাকা। কিন্তু কোনো কারণে তিনি যদি পূর্বের মূসক চালান দেখাতে না পারেন সেক্ষেত্রে তার উপর পুরো মূল্য মানে ১১৬০ টাকার ৫% হারে মূসক প্রযোজ্য হবে। যার পরিমাণ দাঁড়াবে ৫৮ টাকা। ই-কমার্সে সবক্ষেত্রে ৫% লাভ করাও সম্ভব হয়না। তাছাড়া ১০০০ টাকার একটি পণ্যে বিভিন্ন রকম খরচ দিয়ে এই টাকা লাভ হয়না। এমনকি প্রকৃত প্রস্তাবে সব সময় ৬০ টাকা দামে পণ্য ডেলিভারীও সম্ভব হয়না।
এই সংজ্ঞা অনুসারে একটি অংশের উপর ২ বার মূসক ধরার আশংকা তৈরী হয়েছে। কর বাস্তবায়ন নীতি প্রকাশ না হওয়া পর্যন্ত বিষয়টি নিয়ে ধোয়াশা থেকে যাচ্ছে। এছাড়া এই খাতের উদ্যোক্তাদের চাওয়া অনুযায়ী তারা বাড়তি মূল্যাযোগের ৫% শতাংশ মূসক দিতে সম্মত আছেন। কিন্তু সরবরাহকারীর মূসক বিক্রেতার উপর নির্ধারণ করা সমীচিন নয়। সরকারের কর আদায়ের সুবিধার্থে সরবরাহকারীর অনলাইন শপ রাজস্ব বোর্ডকে সরবরাহ করতে পারে। এছাড়া আইটি এবং আইটিইএস (আইটি এনাবল সার্ভিসেস) এর ক্ষেত্রে সরকার প্রদত্ত সুবিধাগুলো ই-কমার্স খাতেও দেয়া প্রয়োজন। সাথে সাথে প্রচলিত দোকান ও অনলাইন শপ এর সাথে যেসব
বিশেষ করে ঠিক করেই যখন মার্কেটপ্লেস এর সংজ্ঞায় এই মূসক সংক্রান্ত কোনো ইঙ্গিত নেই। অনুচ্ছেদ (২) এর বলা হয়েছে ‘‘ মার্কেটপ্লেস অর্থ, ডিজিটাল মার্কেট প্লাটফর্ম যাতে এক বা একাধিক বিক্রেতা কতৃক তাদের পণ্য সেবা সংক্রান্ত তথ্যাদি সন্নিবেশ করা হয়ে থাকে এবং উক্ত প্লাটফর্মের মাধ্যমে সরবরাহ প্রদান হয়ে থাকে অর্থাৎ এক্ষেত্রে মার্কেটপ্লেস পরিচালনাকারী ব্যক্তি (ও প্রতিষ্ঠান) কতৃক কোনো পণ্য ক্রয় বা বিক্রয় করা হবে না এবং তাদের কোনো বিক্রয়কেন্দ্র থাকবেনা। ’’’ (যদিও এটা হওয়া উচিৎ ‘‘অনলাইন মার্কেটপ্লেস’’ বা ‘‘ডিজিটাল মার্কেটপ্লেস’’ কারণ মার্কেটপ্লেস বলতে ফিজিক্যাল মার্কেটপ্লেসও হতে পারে) দেখুন এখানে মূসক সংক্রান্ত বক্তব্য নেই। এর অর্থ যদি এটা হয় যে, মার্কেটপ্লেসকে মুসক দিতে হবে না কিন্তু একক বিক্রেতাকে মূসক দিতে হবে। তাহলে তা বৈষম্যমূলক ও প্রতিযোগিতা পরিপন্থি হবে। ক্ষুদ্র উদ্যোক্তারা চাপে পড়বে বৈকি?
সাধারণত মার্কেটপ্লেস হয় বৃহৎ প্রতিষ্ঠানের আর একক বিক্রেতা প্রতিষ্ঠানগুলো ক্ষুদ্র ও মাঝারী মানের। তাহলে বৃহৎ এবং ক্ষুদ্রদের মধ্যে যদি কোনো বৈষম্য তৈরী হয় তা ইতিবাচক হবে না। বরং নেতিবাচক হবে। সবচেয়ে ভয়ংকর হবে। এই সংজ্ঞার সূত্র ধরে যদি কর আদায়কারী কর্মকর্তা ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের কাছ থেকে ২ বার মূসক চায় তখন ব্যাপারটা খুব ভালো দেখাবেনা। এখানে একই সুবিধা উভয়পক্ষের জন্য থাকা উচিৎ বা উভয়ক্ষেত্রে মূসক অব্যহতি থাকা উচিৎ।
প্রসঙ্গত উল্লেখ্য যে, বিগত ২০২৮ সাল থেকে রাজস্ব বোর্ড ই-কমার্স খাতে মূসক আদায়ের ক্ষেত্রে একটি নিয়ম প্রয়োগ করে আসছে তাতে সকলের ক্ষেত্রে একই মূসক প্রযোজ্য ছিল। আর তা হলো, কোনো অনলাইন বিক্রেতাকে অনলাইনে পণ্যসেবা বিক্রয়ের ক্ষেত্রে হয়তো তার সরবরাহকারী বা উৎপাদক বা আমদানীকারক মূসক প্রদান করেছেন এমন নথি প্রদান করবেন। তাহলে তিনি শুধু বাড়তি মূল্যের উপর মূসক পরিশোধ করবেন। মানে তার পণ্যের ক্রয়মূল্য যদি হয় ১০০ টাকা। এবং তিনি এটা ১২০ টাকায় বিক্রি করেন এবং ৩০ টাকা ডেলিভারী চার্জ নিয়ে ১৫০ টাকা গ্রাহকের কাছ থেকে নেন। তাহলে তিনি শুধু বাড়তি (২০+৩০=৫০) টাকার উপর ৫% শতাংশ হারে মূসক প্রদান করবেন। কিন্তু কোনো কারণে তিনি যদি পূর্বের মূসক চালান দেখাতে না পারেন সেক্ষেত্রে তার উপর পুরো মূল্য মানে ১৫০ টাকার ৫% হারে মূসক প্রযোজ্য হবে।
কিন্তু এটাতেও উদ্যোক্তারা আপত্তি জানিয়ে আসছিলেন, তাদের কথা ছিল। তারা অবশ্যই বাড়তি মূল্যের উপর মূসক দিতে রাজি আছেন। কিন্তু আগের বিক্রেতা যদি মূসক না দেন তার দায়ভার তারা নিতে চান না। কেননা অনলাইনে পণ্য বিক্রিতে সব সময় ৫% লাভও হয়না। তাই তারা এই নিয়মটি রহিত করার প্রস্তাব করে আসছেন। সরকারকে সহযোগিতা স্বার্থে তারা বিক্রেতার সব তথ্য এনবিআরকে দিতে সম্মত আছেন।
এখন পূর্বের দাবী দাওয়ার কোনো অগ্রগতি না হয়েও শুধুমাত্র একটি সংজ্ঞা এবং তাতে দ্বৈত মূসকের আশংকা তৈরী করা এই খাতের জন্য ইতিবাচক নয়। তাই এই বিষয়টি পূর্নবিবেচনার দাবী রাখে।
(উপরোক্ত মতামত ও বিশ্লেষণ লেখকের নিজস্ব। এর সাথে অন্য কোনো ব্যক্তি বা সংস্থার কোনো যোগ নেই)
লেখক
নির্বাহী পরিচালক: ই-কমার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ
সাধারন সম্পাদক: বাংলাদেশ ট্রাভেল রাইটার্স অ্যাসোসিয়েশন
