আমার রাতজাগা পাখি
পর্ব: ৪
জাহাঙ্গীর আলম শোভন
বুকের ভেতর মনে হলো আকাশের সমান বড়ো একটা হাতুড়ি দিয়ে কেউ আঘাত করছে। বুঝলাম আমি শুধু মেয়েকে নয় মেয়ের মাকেও ভালোবাসি। কিন্তু ঘটনা এতদূর গড়ালো এখন মেয়ে ছাড়া আমার আর কারো বিষয় ভাববার অবসর নেই। ভাবছি যাক ভালোই হবে। এই ঘটনায় যদি মেয়ে বাবার কাছে ফিরে আসে।
আমরা তিনটা মানুষ ৭ বছরের মেয়েটার পাশে রাত জেগে আছি। আমি আর মা কিছু খেয়েছি। তিনি খাননি। তার খাবার ঢাকনা দেয়া আছে। হয়তো তিনি গরিবের খাবার নাও খেতে পারেন। বহুদিন পর দেখলাম। কিছুটা শুকিয়েছে বটে কিন্তু বেশ আধুনিক হয়েছে মনে হলো। তার গায়ের সুগন্ধি পেলাম রাতভর। হয়তো দামী। প্রবাসী ধনবান ব্যক্তির সাথে বিয়ে ঠিক হয়েছে এটাইতো স্বাভাবিক। মা পাশে একরুমে ঘুমের কথা বলে চলে গেলেন। আমরা দুজন সাবেক দম্পতি বর্তমান মৃত্যুপথযাত্রী সন্তানের পাশে বসে। শেষরাতের দিকে মেয়ের জ্ঞান ফিরে এলো। বাবাকে জড়িয়ে ধরলো। মাকেও।
- বাবা তুমি আমাকে দেখতে আসোনি কেন?
- এইতো মা এখন এলাম।
- বাবা আমি তোমার কাছে থাকবো। মাম্মি নাকি বিদেশ চলে যাবে। আমি বিদেশ যাবো না।
- ঠিক আছে মামনি তুমি বিদেশ যাবেনা।
মেয়ের পাশে বসেই মেয়ের বালিশের কাছে মাথা নিয়ে রাখলাম। রুমে অন্য কারো উপস্থিতি আছে এটা আমি বুঝতেই চাইলাম না। পরে তিনি এসে মেয়েকে আদর করছেন। তার চোখ দিয়ে পানি পড়ছে। মায়ের ভালোবাসাকে ছোট করে দেখার মতো মানুষ আমি নই। তাই মা মেয়ের মাঝে বাঁধা হয়নি। মায়ের কান্নায় মেয়ের কোনো প্রতিক্রিয়া দেখিনি। একথা আর বলার অপেক্ষা রাখেনা যে, এই টুকু মেয়ে পুরো বিষয়টিকে মোটেই ভালোভাবে নিতে পারেনি।
রাতে একবার মা এসে ঘুরে গেছেন। মা বুঝতে চেষ্টা করছেন আমাদের মাঝে কোনো বোঝাপড়া হলো কিনা। আমার মা সে আমলে ক্লাস নাইন পর্যন্ত পড়েছেন। খুব বেশী শিক্ষিত না হলেও এসব ব্যাপারে বেশ বিচক্ষণ। তিনি আগ বাড়িয়ে কখনো আমাদের স্বামী স্ত্রীর মাঝে কোনো কথা বলেন নি। এখনো নয়।
সকাল হওয়ার আগে তিনি মুখ খুললেন।
- আসলে আমি বুঝতে পারছিনা। আমি ঠিক করছি কিনা? আমার জীবনে অনেক স্বপ্ন ছিলো। আমার সব স্বপ্ন ভেঙ্গে গেছে। তাই আমি নতুন করে শুরু করতে চেয়েছি। আমার মেয়েকেও আমি নতুন জীবনের সাথে নতুন করে জড়িয়ে নিতে চেয়েছি। কিন্তু আমি ভুলেই গেছিলাম যে, মেয়ের বাবাও একজন আছে। আমি জানি না। আমার কি হবে? আমার মেয়ের কি হবে? হয়তো আমার জন্য দোয়া করবেনা জানি। কিন্তু পারলে ক্ষমা করে দিও।
- আমি চুপই ছিলাম। কিছু বলার মতো অবস্থা ছিলো না। শুধু বললাম। আমি তোমাকে ভালোবেসেছিলাম হয়তো এখনো বাসি। যদি ভালোবাসা পাও তাহলে যেতে পার যেখানে খুশি। কিন্তু যদি নেহায়েত টাকার জন্য কোনো সিদ্ধান্ত নিয়ে থাকো। তাহলে মনে হয় ভুল করবে। ভালোবাসার ক্ষেত্রে মানুষের পরিতৃপ্তি থাকে। টাকার ক্ষেত্রে থাকে না।
- তুমি আবারো খোচা দিয়ে কথা বললে।
- না খোচা দিয়ে বলিনি। হয়তো তোমার সাথে আর দেখা হবেনা। এই কথাটা বলার ছিলো। তাই সরাসরি বলে দিলাম।
- আমি আজ আর তর্ক করতে চাইনা। (এই প্রথম তাকে সংযত হতে দেখলাম কিছুটা ভালো লাগলো) কিন্তু আমি মেয়েটাকে আমার সাথে রাখতে চেয়েছিলাম। আমার ধারণা ছিলো মেয়েকে আমি আদর যত্নে বড়ো করে তুলব।
- তোমার ইচ্ছেতে আমি কখনো বাধ সাধিনি। কিন্তু মেয়েকে পিতৃস্নেহ থেকে বঞ্চিত করার আইডিয়াটা যে দিয়ে থাকুক এটা আমার প্রতি এবং আমার মেয়ের প্রতি চরম অন্যায় করা হয়েছে।
- আসলে আমি সে কথাটাই ভাবছি। মেয়ে তোমার জন্য অনেক কান্নাকাটি করতো। আমি ভুল করছি কিনা? কেনজানি এখন মনে হচ্ছে মেয়ে তোমার কাছে থাকলে ভালো হতো। কিন্তু তুমি যদি বিয়ে শাদী কর। তখন অন্য মহিলা কি আমার মেয়েকে….।
এই বলে তিনি কান্না জুড়ে দিলেন।
আমাকে তখন কথা বলতে হলো।
– বিয়ে করবো কিনা জানি না। বিয়ের কথাটা আমার কখনো মনেই আসেনি। আমার এমন কোনো উচ্চাভিলাস নেই। যেটা পূরন করার জন্য আমাকে বিয়েটাই করতে হবে। বরং আমার মেয়ের জন্য আমি আরো বড় কোনো ত্যাগ স্বীকার করতে পারবো।
- আমি পারলাম না। আমি হেরে গেলাম। তুমি ঠিকই জিতে গেলে।
- পৃথিবীতে সবকিছু হারজিত দিয়ে বিচার হয়না দোলা। আর তুমিও চাইলে জিততে পারো। আমিওতো একবারও বলিনি আমি তোমাকে চাইনা। তুমি কেবল আমার আর্থসামাজিক অবস্থার সাথে নিজেকে খাপ খাওয়াতো পারোনি।
- আমি এখন কি করবো? সবকিছু এতদূর গড়িয়ে গেছে।
- যে যত দূর থেকে ফিরে আসে সে তত বড় জয়ের স্বাদ পায়। সে তত বেশী জিততে পারে। এটা তোমার বড়দাগে জেতার সুযোগ। তুমি ভেবে দেখ। আরো ২ দিন সময় নাও। মেয়েটা যেহেতু হাসপাতালে।
কথায় কথায় দিনের আলো ফুটেছে। দেয়ালে হেলান দিয়ে বসেছিলাম। মনে হয় কিছুটা তন্দ্রা পেয়ে বসলো আমাকে। চোখ বন্ধ অবস্থায় ভরাট পুরুষকণ্ঠের অস্তিত্ব টের পেলাম। সাদা সুতি শার্ট, জিন্সের প্যান্ট পরা, সুঠামদেহ একটু কালোমত, লম্বাও কিছুটা বেশী মনে হলো। আমার মেয়েকে আদর করছে। মেয়ে যদিও ঘুমিয়ে। আমি জানি সে আদরে ভালোবাসা নেই। সে আদরে যদি বাবার আদর থাকতো তাহলে এই অসুস্থ্যতা নিয়ে আমার মেয়েকে ঘরে বসে মায়ের বিয়ের সাজ দেখার জন্য অপেক্ষা করতে হতো না।
চোখ মেললাম। তিনি সরাসরি আমার চোখে চোখ রাখলেন। হাত বাড়িয়ে নাম বললেন খালিদ। মেয়ের এখন কি অবস্থা জানতে চাইলেন। আমি কেমন আছিও সেটাও জানতে চাইলেন।
একজন ভদ্রলোক আমার মেয়ের খবর জানতে চাইলে যেভাবে বলা উচিত সেভাবেই বললাম।
মিনিট দশেক পর তিনি খুব শক্ত বিনয়ের সাথে বললেন।
(চলবে…………)

