আইসিটি খাতের কয়েকটি প্রকল্প পর্যালোচনা
বিগত সময়ের আইসিটি খাতের সরকারী প্রকল্পের মধ্যে যেগুলো চলমান রয়েছে সরকারী প্রায় সব প্রকল্পের অবস্থা ‘‘ছেড়ে দে মা কাইন্দা বাঁচি’’। এসব প্রকল্প এখনি কোনো টা বন্ধ করতে হবে কোনোটাকে ঢেলে সাজাতে হবে। আবার কোনোটাকে সংশোধন করতে হবে। এখানে নমূনা হিসেবে দুটো প্রকল্পের বিষয়ে তুলে ধরা হলো। দুটোই গুরুতবপূর্ণ কারণ এই দুটো প্রকল্পের ভৌত অবকাঠামো রয়েছে। তিনটি প্রকল্প আমার জানামতে যে সমস্যা রয়েছে তার আলোকে পর্যালোচনা করা হলো- শেখ রাসেল ডিজিটাল ল্যাব, হাইটেক পার্ক ও ইনকিউবিশন সেন্টার, আইডিয়া প্রকল্প। (লেখা: জাহাঙ্গীর আলম শোভন)
১) শেখ রাসেল ডিজিটাল ল্যাব
এই প্রকল্পটি এমনভাবে ডিজাইন করা হয়েছে যাতে এখান থেকে দলীয় লোকদের অর্থ প্রদান করা যেতে পারে। এখানে প্রতিটিতে প্রচুর ব্যয় করা হয়েছে। যা প্রকৃত ব্যয়ের চার ভাগের এক ভাগ। এছাড়া এর নীতি পলিসির কারণে প্রতিটি ল্যাব এখন গোচারণ ভূমিতে পরিণত হয়েছে। কারণ এগুলো রক্ষণাবেক্ষণের কোনো নীতি ও দায়িত্ব রাখা হয়নি। এমনি নানা অনিয়ম অন্যান্য ল্যাবের ক্ষেত্রেও।
সমাধান
ক) এগুলো বাস্তবায়ন ও পরিচালনার নীতি ঢেলে সাজাতে হবে।
খ) স্কুলগুলোতে আইসিটি ক্লাব প্রতিষ্ঠা করে ক্লাব এর দায়িত্বে এর পরিচালনাভার ন্যাস্ত করতে হবে।
গ) ক্লাব এর পরিচালক হিসেবে নিয়োজিত শিক্ষককে বেতনের সাথে প্রতি মাসে ভাতা যুক্ত করে দিতে হবে।
ঘ) স্কুলের ভর্তি ফি এর স্যাথে ল্যাব ফি যুক্তি করে ছাত্র প্রতি ২০/৫০ টাকা আয় ধরে তা ল্যাব ব্যবস্থাপনায় ব্যয় করতে হবে এবং সকল ছাত্রকে অন্তত সপ্তাহে ১ দিন ল্যাব ব্যবহারের সুযোগ দিতে হবে।
ঙ) আইসিটি ক্লাবের সদস্যগণ প্রতিমাসে ৫০/১০০ টাকা চাঁদা প্রদান করবে এবং তারা প্রতিদিন ল্যাব ব্যবহার করতে পারবে।
চ) ল্যাবকে বিদ্যালয়ের একটি আয়ের উৎস হিসেবে ব্যবহারের সুযোগ দিতে হবে। বাইরের দক্ষ লোকদের দিয়ে এলাকার বেকারদের জন্য বিভিন্ন প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা যেতে পারে। সে প্রশিক্ষণের অনুমোদন, সিলেবাস ও অ্যাসেসমেন্ট আইসিটি বিভাগের অধীনে ‘‘কম্পিউটার কাউন্সিল’’ দ্বারা হতে পারে।
ছ) এমনকি বাইরের প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউটকে ল্যাব স্কুল সময়ের আগে পরে ভাড়া দেয়া যেতে পারে।
জ) আয়ের একটি অংশকে উন্নয়ন তহবিলে রেখে মেরামত, নতুন ডিভাইস ক্রয় এসব ব্যয় নির্বাহ করা যেতে পারে।
ঝ) ক্লাব সদস্যরা ক্লাস শুরুর আগে ৩০ মিনিট এবং সাধারণ ছাত্ররা ক্লাস শেষ হওয়ার পর ৩০ মিনিট এবং বাইরের লোকদের জন্য এই সময়ের আগে পরে সময় বরাদ্ধ রাখা যেতে পারে।
ঞ) একটিমাত্র ডিজিটাল ল্যাব শেখ রাসেল এর নামে রেখে বাকী ডিজিটাল ল্যাবগুলো সারাদেশে বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনে নিহত ছাত্র জনতা এবং বিভিন্ন সড়ক দূর্ঘটনায় নিহত সংশ্লিষ্ঠ প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীদের নামে নামকরণ করতে হবে।
২) হাইটেক পার্ক ও ইনকিউবিশন সেন্টার-সমূহ
প্রথমত, হাইটেকপার্ক সমূহের অবস্থান ঠিক করা হয়েছে রাজনৈতিক বিবেচনায়। মানুষের যাতায়াত সুবিধা দেখা হয়নি। ফলে বেশীর ভাগ হাইটেক পার্ক ও ইনকিউশিন সেন্টার বেকার পড়ে আছে।
দ্বিতীয়ত, হাইটেক পার্ক ও ইনকিউবিশন সেন্টার-সমূহ শুধুমাত্র অবকাঠামো সুবিধা দেয়া হয়েছে অন্যান্য অনেক সুবিধাই সেখানে নেই।
তৃতীয়ত, হাইটেক পার্ক ও ইনকিউবিশন সেন্টার-সমূহ স্থাপনের ক্ষেত্রে সংশ্লিস্ঠ জেলায় পর্যাপ্ত অনলাইন পেশাজীবি ও অনলাইন উদ্যোক্তা রয়েছে কিনা তা আমলে নেয়া হয়নি।
চতুর্থত: হাইটেক পার্ক ও ইনকিউবিশন সেন্টার-সমূহ সহযোগী সেবার সরবরাহ আছে কিনা তা বিবেচনা করা হয়নি।
পঞ্চমত, হাইটেক পার্ক ও ইনকিউবিশন সেন্টার-সমূহ এলাকার ভেতরে জীবন ধারনের জন্য অন্যান্য প্রয়োজণীয় বিষয়ের ব্যাপারে উদাসীনতা দেখানো হয়েছে। ফলে এগুলো অব্যবহ্রত অবস্থায় রয়েছে।
সমাধান
১) প্রতিটি হাইটেক পার্ক ও ইনকিউবিশন সেন্টারে আইসিটি কলেজ প্রতিষ্ঠা করে সে এলাকার তরুনদের প্রথমে আইসিটি শিক্ষায় শিক্ষিত করতে হবে।
২) আইসিটি কলেজে কারিগরি শিক্ষা বোর্ডের ফরম্যাট পরিহার করে ভিন্ন ফরম্যাটে কাঠামো সাজাতে হবে। যেমন একাডেমিক এর চেয়ে বাস্তবজ্ঞানে নজর দিতে হবে। থিওরীর চেয়ে প্রাকটিক্যাল বেশী করাতে হবে। ক্লাসের চেয়ে ল্যাবে বেশী সময় দিতে হবে। পরীক্ষার চেয়ে এসাইনমেন্ট বেশী রাখতে হবে। নিয়মিত বেতনভূক্ত ১/২ জন শিক্ষক রেখে বাকী বাইরে থেকে ক্লাস ও বিষয়ভিত্তিক বিশেষজ্ঞ নিয়োগ করতে হবে।
৩) শিক্ষাবর্ষ শেষে ২ মাসের ব্যবহারিক ২ মাসের মেন্টরশিপ ও ২ মাসের ইন্টারর্ণশিপ যুক্ত করতে হবে।
৪) এসব কলেজে ভর্তির জন্য শিক্ষা-গ্যাপ, কোন বিভাগ থেকে পাস করেছে বয়স ও পেশা এসব দেখা যাবে না।
৫) এখানে ৩ মাস থেকে শুরু করে ৪ বছরের সব ধরনের কোর্স থাকতে হবে। NSDA এর সাথে এলাইন করে সেখানকার কোর্সগুলোর অনুমোদন দিতে হবে।
৬) ছাত্রদের জন্য আবাসিক সুবিধা রাখতে হবে। কলেজ, ল্যাব এবং আবাসিক এসব বিষয় সরকারী মালিকানা কিংবা ব্যক্তি মালিকানায় হবে না। এটার জন্য বিভিন্ন সামাজিক সংগঠন, এসোসিয়েশনকে ও এনজিওকে দায়িত্ব দিতে হবে।
৭) প্রয়োজনে আইসিটি উন্নয়ন বিষয়ক সামজিক সংগঠন আইসিটি বিভাগ থেকে অনুমোদন এর ব্যবস্থা করতে হবে। বা সমাজকল্যাণ ও যুব মন্ত্রণালয়ে অলাভজনক সংগঠন ক্যাটাগরিতে আইসিটি শাখা যুক্ত করতে হবে।
৮) এখানকার কর্মকর্তা কর্মচারীদের জন্য আবাসিক ব্যবস্থা ও তাদের সন্তানদের জন্য স্কুল যুক্ত করতে হবে।
৯) আইসিটি কলেজগুলোতে এসএসইস ও এইচএসসির পর ভর্তির সুযোগ অবারিত করতে হবে।
১০) কলেজগুলোতে ৩ মাস থেকে ৪ বছরের বিভিন্ন কোর্স এর সুযোগ রাখতে হবে
১১) ব্যক্তি মালিকানাধীন ট্রেনিং সেন্টারগুলোতে হাইটেক পার্ক ও ইনকিউবিশন সেন্টার-সমূহে কার্যক্রম পরিচালনার সুযোগ দিতে হবে।
১২) ৩ দিন থেকে ৩ মাস অস্থায়ী শিক্ষার্থীদের জন্য আলাদা লজ, হোস্টেল বা থাকার ব্যবস্থা রাখতে হবে।
১৩) মোট স্থায়ী শিক্ষার্থীর ১৫% এবং অস্থায়ী শিক্ষার্থীদের ২৫% এর জন্য আবাসন সুবিধা দিতে হবে।
১৪) সকল জেলায় হাইটেক পার্ক ও ইনকিউবিশন সেন্টার প্রতিষ্ঠা না করে একেক জেলাকে একেকটি কাজে দক্ষ করতে হবে।
৩) আইডিয়া প্রকল্প
এই প্রকল্পের অধীনে যেসব অর্থ ব্যয় করা হয়েছে সঠিক উপকারভোগীদের দেয়া হয়নি এবং নীতি ও পলিসির কারণে তা সঠিকভাবে ব্যয় হয়নি। পুরো প্রক্রিয়া ও পদ্ধতির কারণে রাষ্ট্রের যেমন আর্থিক ক্ষতি হয়েছে তেমনি কারো উপকারও হয়নি।
সমাধান
১) আইডিয়া প্রকেল্প অর্থ কত শতাংশ কোন খাতে দেয়া হবে তার নীতিমালা থাকতে হবে।
২) উদ্যোক্তা বাছাইয়ের নীতিমালা থাকতে হবে। শর্তসাপেক্ষে চুক্তি স্বাক্ষর করে অর্থবন্টন করতে হবে।
৩) বাছাই কমিটিতে প্রাইভেট সেক্টর প্রতিনিধি বা পূর্বের তহবিল পেয়েছে এমন লোকদের যুক্ত করতে হবে। প্রতি ৩ মাস পর পর বা প্রতি রাউন্ডে পরিবর্তন করতে হবে।
৪) উদ্যোক্তা বাছাইয়ের ক্ষেত্রে ট্রেড লাইসেন্স, ব্যাংক একাউন্ট, খরচের পরিকল্পনা ও মৌখিক সাক্ষাৎকার (জুমে হলেও) থাকতে হবে।
৫) তহবিল দেয়ার পর মেন্টরিং এবং মনিটরিং এর ব্যবস্থা রাখতে হবে।

