নিরপেক্ষতার ছদ্মবেশে দালালি: বাংলাদেশ মডেল
মত প্রকাশের স্বাধীনতা কেন জরুরি?
একটি রাষ্ট্র বা সমাজে শত্রুমিত্র চেনার সবচেয়ে বড় হাতিয়ার হলো মত প্রকাশের স্বাধীনতা। আপনি যখন কাজ করতে নামবেন, তখন আপনার পাশে কে আছে আর কে গোপনে ছুরি শানাচ্ছে, তা বোঝার জন্য মানুষের মুখের ভাষা কেড়ে নেওয়া যাবে না। বাকস্বাধীনতা থাকলে আপনি বুঝতে পারবেন সমাজে আপনার চিন্তার পক্ষে কতজন আছে, আর বিপক্ষে কতজন। এই স্বাধীনতা কেড়ে নিলে সমাজ চাটুকারে ভরে যায়; তখন ঘরের শত্রুও মিত্রের ছদ্মবেশে রাজপ্রাসাদে ঢুকে পড়ে।
জুলাই-পরবর্তী বাস্তবতার নির্মোহ ব্যবচ্ছেদ
৫ই আগস্টের গণ-অভ্যুত্থানের পর আমরা একটি ইতিবাচক সংসদ, একজন মানবিক প্রধানমন্ত্রী কিংবা একটি সহনশীল অন্তর্বর্তীকালীন সরকার পেলেও। সাধারণ মানুষের আসল প্রত্যাশা পূরণ হয়নি। এই ধোকাটা ৭১ সালেও মানুষের সাথে হয়েছে তাই বলে স্বাধীনতা মিথ্যা হয়ে যায়নি।
৭১ সালে ৩ লাখ জনসংখ্যাকে ৩০ লাখ করা হয়েছে। তাই বলে প্রকৃত শহীদদের অবদান খাটো হয়ে যায়নি।
৭১ এর সালে মৃত ঘোষিত শহীদেরা ফিরে এসেছে তাই বলে যুদ্ধ মিথ্যা হয়ে যায়নি।
৭১ এ স্বাধীনতার পেছনে ভারতের ষড়যন্ত্র তত্ত্ব থাকতে পারে। তাই বলে ভারতের সহযোগিতা অস্বীকার করা যায় না।
৭১ এর পরে একটি পতাকা ও নতুন পরিচয় ছাড়াও মানুষের ভাগ্যের বদল হয়নি। তাই বলে স্বাধীনতা মূল্যহীন হয়নি।
একটি মহাসমুদ্রের মতো বিশাল পরিবর্তনের প্রত্যাশার বিপরীতে এই টিমটিমে অর্জন আসলে কিছুই নয়। বর্তমান অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের ব্যর্থতার তালিকাটা মোটেও ছোট নয়, এবং এই ব্যর্থতা নিয়ে আমাদের অবশ্যই কথা বলতে হবে। সমালোচনা ও পরামর্শ—দুই-ই জারি রাখতে হবে। তাই বলে আপনি খুনি লুটেরার এজেন্ডা বাস্তবায়ন করবেন, তা হতে পারে না। কিন্তু যখন সমস্যাটা তৈরি হয় অন্য জায়গায়।
নিরপেক্ষতার ভণ্ডামি ও ফ্যাসিবাদের জমিন তৈরি
আপনি যখন এমন ভাব ধরেন যে—জুলাইয়ের শহীদ আবু সাঈদ বা অন্য কাউকে আপনি অসম্মান করছেন না, কিন্তু আপনার মূল লক্ষ্য হয়ে দাঁড়ায় বিপ্লবোত্তর টুকটাক মব-ভায়োলেন্স, ভাঙচুর কিংবা তথাকথিত ‘মৌলবাদ’কে বড় করে দেখিয়ে মূল ফ্যাসিবাদের অপরাধকে আড়াল করা; তখনই বোঝা যায় আপনার অবচেতনে আসলে ফ্যাসিবাদের প্রতি এক ধরনের প্রেম লুকিয়ে আছে।
আমি মববাজকে টুকটাক বলছি এজন্য যে, যেখানে একটি দলের নেতারা বলেছে তারা ক্ষমতা থেকে গেলে তাদের লাখো কর্মী নিহত হবে সেখানে তা শতকও ছোঁয়নি।
যাই হোক- সচেতন মানুষের গঠনমূলক সমালোচনা আর ফ্যাসিবাদের পুনর্বাসনের এজেন্ডার ভাষা কখনো এক হতে পারে না। আপনি যখন শিল্পের দোহাই দিয়ে সুকৌশলে খুনিদের পক্ষে সাফাই গান, আর অন্যদের রাজনীতিকে ‘অপরাধ’ বলে দাগিয়ে দেন, তখন আপনার নিজের সব অপরাধ মাফ হয়ে যায়। আর জনগণ যখন আপনার এই দ্বিচারিতা আর চালাকি ধরে ফেলে, তখন আপনি বুক ফুলিয়ে ‘মত প্রকাশের স্বাধীনতা’র কার্ড খেলেন।
ইতিহাসের পাঠ: যেভাবে পুনর্বাসিত হয়েছিল বাকশাল এই ‘নিরপেক্ষতার নাটক’ বাংলাদেশে নতুন কোনো খেলা নয়। একটু অতীতে তাকালেই এর নিখুঁত নকশা দেখা যায়। ১৯৭২-৭৫ সালের দুঃসহ অপশাসন, দুর্ভিক্ষ এবং একদলীয় বাকশাল কায়েমের মাধ্যমে যে ফ্যাসিবাদের সূচনা হয়েছিল, পরবর্তীতে এরশাদের সামরিক স্বৈরশাসনকে দেখিয়ে সেটিকে এক অভিনব কায়দায় ‘নরমাল’ বা স্বাভাবিক করে দেওয়া হলো।
তথাকথিত সুশীল বুদ্ধিজীবী, করপোরেট মিডিয়া, তল্পিবাহক শিল্পীসমাজ এবং সেকুলার মুখোশধারী মুসলিমবিদ্বেষী গোষ্ঠী তখন এক অদ্ভুত সমীকরণ দাঁড় করাল। তারা বাকশালের নির্মমতা আর এরশাদের স্বৈরাচারকে একই পাল্লায় মেপে বলতে শুরু করল—”সব দলেই তো খুন-খারাবি আছে, সব দলেই তো দুর্নীতি আছে। তাহলে সবাই সমান।”
এই ‘সবাই সমান’ তত্ত্বের আড়ালে তারা আসল অপরাধীদের দায়মুক্তি দিল। তারা কৌশলে মানুষকে বোঝাল—যেহেতু সবাই সমান অপরাধী, তাই দিনশেষে আমাদের ‘মুক্তযুদ্ধের পক্ষ’ এবং ‘ধর্মনিরপেক্ষতার’ সাইনবোর্ডধারীদেরই সমর্থন করতে হবে। নিরপেক্ষতার এই সস্তা ও ভণ্ড সূত্রে ফেলে বাকশালের মতো চরম ফ্যাসিবাদকে বাঙালির মননে অত্যন্ত সুচারুভাবে পুনর্বাসন করা হয়েছিল।
মানে স্বৈরশাসন কেউ একা করেনি এখানে অন্যরাও আছে। মানে এই বিষয়ে সবাই সমান। আর সবাই যখন সমান তখন যে, আমাদের বন্ধু তার পাশেই থাকব। এই এক বয়ান দিয়ে তারা সব ভূলিয়ে দিয়েছে। বাকশাল আমলের খুনের সংখ্যা আর অন্য আমলের খুনের সংখ্যা কি সমান ছিলো। যে কেউ একটি হিসেব কষলেই ব্যবধানটা বের হয়ে আসবে।
অপরাধের তুলনামূলক স্কোরিং এবং সামাজিক বিপর্যয়
ধরে নিলাম সব দলের বিরুদ্ধেই কম-বেশি অপরাধের অভিযোগ সত্য। অন্যায় তো অন্যায়ই, তা ছোট হোক বা বড়। কিন্তু যেকোনো সভ্য দেশের বিচারিক বা রাজনৈতিক বিশ্লেষণে অপরাধের তুলনা হয় শতাংশ বা মাত্রার ওপর ভিত্তি করে। আপনি যখন অপরাধের মাত্রা সুনির্দিষ্ট করে সমালোচনা করবেন, তখন দলগুলোর মধ্যে নিজেদের স্কোর উন্নত করার বা অপরাধ কমানোর একটা প্রতিযোগিতা তৈরি হবে। এটি সমাজে ইতিবাচক প্রভাব ফেলে।
কিন্তু এই ‘বাংলাদেশী স্টাইলে’ যখন ৯০% খুন, ৮০% দুর্নীতি আর ৭০% মব-ভায়োলেন্সের হোতাদের মাত্র ১০% অপরাধ করা দলের সাথে সমান বানিয়ে দেওয়া হয়, তখন অপরাধের অভয়ারণ্য তৈরি হয়। পেশাদার খুনি আর চোরেরা তখন আরও বড় অপরাধ করতে উৎসাহিত হয়; আর যাদের অপরাধের স্কোর কম, তারাও অপরাধের প্রতিযোগিতায় মেতে ওঠে। সমাজ তখন অন্যায়ের এক অনন্ত চক্রে আটকে যায়। আজকের বাংলাদেশের এই সামাজিক ও রাজনৈতিক অবক্ষয় আসলে এই ভণ্ড ‘নিরপেক্ষতা’র খেলারই অনিবার্য ফসল।
ভবিষ্যতের দায় ও আমাদের নিয়তি
আজ স্পষ্ট করে বলে রাখা ভালো—দেশের এই চরম পরিণতি, অপরাজনীতি আর অবক্ষয়ের জন্য আমরাও সমানভাবে দায়ী। আমরা যারা ‘নিরপেক্ষ’ সাজার ভং ধরে খুনি, লুম্পেন আর শোষকদের এক পাল্লায় বসিয়ে খুনিদের পুনর্বাসনের প্রজেক্ট বাস্তবায়ন করছি, তাদের ইতিহাস ক্ষমা করবে না।
আমরা যদি প্রথম পাপীকে ছুড়ে ফেলতে পারতাম তাহলে পরের পাপী শিক্ষা পেত। পরের পাপীকে পূণবাসন না করতাম তাহলে নতুন পাপী তৈরী হতো না।
ভবিষ্যতে কোনো এক প্রজন্ম যখন আমাদের এই সময়টা নিয়ে গবেষণা করবে, তখন আমাদের মতো সুবিধাবাদী ও মেরুদণ্ডহীন সুশীলদের জন্য তাদের মনে কোনো সম্মান থাকবে না। থাকবে কেবল চরম ঘৃণা, নয়তো তীব্র করুণা।
একটি আত্মঘাতী, কপট ও স্ববিরোধী জাতি হিসেবে আগামীদিনের ইতিহাসগ্রন্থে আমাদের নাম লেখা থাকবে—আর সেটাই হবে আমাদের উপযুক্ত কর্মফল।

