Probashi

প্রবাসী কল্যাণে ১৫ প্রকল্প প্রস্তাব

প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের জন্য ১৫টি রূপান্তরমূলক প্রকল্প প্রস্তাব

দক্ষ মানবসম্পদ, নিরাপদ অভিবাসন ও প্রবাসী বিনিয়োগভিত্তিক নতুন বাংলাদেশের রূপরেখা

জাহাঙ্গীর আলম শোভন

বাংলাদেশের অর্থনীতিতে প্রবাসীদের অবদান শুধু রেমিট্যান্সে সীমাবদ্ধ নয়; তারা দেশের অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ, পারিবারিক উন্নয়ন, সামাজিক পরিবর্তন এবং আন্তর্জাতিক সংযোগের অন্যতম প্রধান শক্তি। দীর্ঘদিন ধরে বাংলাদেশের লাখো মানুষ বিদেশে শ্রম, মেধা ও দক্ষতা দিয়ে দেশের অর্থনীতিকে সচল রেখেছেন। অথচ বাস্তবতা হলো— এখনো অভিবাসন ব্যবস্থার বড় অংশ অনিয়ন্ত্রিত, দক্ষতাহীন এবং দালালনির্ভর। অন্যদিকে প্রবাসীদের বিনিয়োগ, শিক্ষা, প্রযুক্তি ও অভিজ্ঞতাকে রাষ্ট্রীয় উন্নয়নে পুরোপুরি কাজে লাগানো সম্ভব হয়নি।

বিশ্ব দ্রুত বদলাচ্ছে। ভবিষ্যতের শ্রমবাজার হবে দক্ষতা, প্রযুক্তি, ভাষাজ্ঞান ও আন্তর্জাতিক মানদণ্ডভিত্তিক। ফলে শুধু শ্রমিক পাঠানো নয়, বরং “গ্লোবাল বাংলাদেশি মানবসম্পদ শক্তি” গড়ে তোলাই হওয়া উচিত আগামী দিনের কৌশল। একই সঙ্গে প্রবাসীদের নিরাপত্তা, সামাজিক মর্যাদা, বিনিয়োগ সুবিধা এবং ফেরত আসা অভিবাসীদের পুনর্বাসন নিশ্চিত করতে হবে।

এই প্রেক্ষাপটে প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের জন্য নিচে ১৫টি বাস্তবভিত্তিক, সময়োপযোগী ও জাতীয়ভাবে গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্প প্রস্তাব তুলে ধরা হলো। এগুলো বাস্তবায়িত হলে বাংলাদেশ শুধু রেমিট্যান্সনির্ভর দেশ নয়, বরং দক্ষ মানবসম্পদ, আন্তর্জাতিক বিনিয়োগ ও প্রবাসী সম্পৃক্ত উন্নয়নের একটি নতুন মডেল রাষ্ট্রে পরিণত হতে পারে।

১. জাতীয় স্কিল পাসপোর্ট প্রকল্প

প্রত্যেক বিদেশগামী কর্মীর জন্য একটি ডিজিটাল “Skill Passport” তৈরি করা যেতে পারে। এতে তার প্রশিক্ষণ, ভাষাজ্ঞান, অভিজ্ঞতা, সার্টিফিকেশন ও পেশাগত দক্ষতার তথ্য থাকবে। এটি আন্তর্জাতিক মানদণ্ডে যাচাইযোগ্য হওয়ায় বিদেশি নিয়োগদাতারা সহজে বাংলাদেশি কর্মী নিয়োগ করতে পারবেন। এতে জাল সনদ কমবে এবং দক্ষ কর্মীর মর্যাদা বাড়বে।

২. স্মার্ট মাইগ্রেশন ওয়ান-স্টপ সার্ভিস প্ল্যাটফর্ম

বিদেশগামী কর্মীদের জন্য একটি কেন্দ্রীয় অ্যাপ ও ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম তৈরি করা জরুরি, যেখানে চাকরির তথ্য, ভিসা যাচাই, প্রশিক্ষণ, অভিযোগ, দূতাবাস সেবা, বিমানের তথ্য ও রেমিট্যান্স গাইডলাইন একসাথে পাওয়া যাবে। এতে দালালনির্ভরতা কমবে এবং নিরাপদ অভিবাসন নিশ্চিত হবে।

৩. প্রবাসী উদ্যোক্তা ও বিনিয়োগ সহায়তা কর্মসূচি

বিশ্বের বিভিন্ন দেশে থাকা বাংলাদেশি উদ্যোক্তা ও ব্যবসায়ীদের দেশে বিনিয়োগে উৎসাহ দিতে “One Stop Investment Support Cell” চালু করা যেতে পারে। বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল, কর সুবিধা, শিল্পপার্ক ও স্টার্টআপ বিনিয়োগ তহবিল গঠন করলে প্রবাসী বিনিয়োগ উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়বে।

৪. আন্তর্জাতিক ভাষা ও সংস্কৃতি প্রশিক্ষণ প্রকল্প

বিদেশগামী কর্মীদের জন্য আরবি, ইংরেজি, জাপানি, কোরিয়ান, জার্মানসহ বিভিন্ন ভাষা শিক্ষা এবং সংশ্লিষ্ট দেশের সংস্কৃতি ও আইন বিষয়ে প্রশিক্ষণ বাধ্যতামূলক করা উচিত। ভাষাজ্ঞান বাড়লে কর্মীদের বেতন ও গ্রহণযোগ্যতা উভয়ই বৃদ্ধি পাবে।

৫. নারী নিরাপদ অভিবাসন ও কর্মসংস্থান প্রকল্প

নারী কর্মীদের জন্য বিশেষ নিরাপত্তা কাঠামো গড়ে তুলতে হবে। নিরাপদ হোস্টেল, প্রি-ডিপার্চার কাউন্সেলিং, জরুরি হেল্পলাইন, বিদেশে সেফ হাউস ও আইনি সহায়তা চালু করা গেলে নির্যাতন ও ঝুঁকি কমবে।

৬. ফেরত প্রবাসী পুনর্বাসন ও স্টার্টআপ তহবিল

বিদেশ থেকে ফেরত আসা কর্মীদের জন্য স্বল্পসুদে ঋণ, উদ্যোক্তা প্রশিক্ষণ ও জেলা পর্যায়ে পুনর্বাসন কেন্দ্র গড়ে তোলা যেতে পারে। এতে তারা দেশে ব্যবসা শুরু করতে পারবেন এবং বেকারত্ব কমবে।

৭. গ্লোবাল বাংলাদেশি ট্যালেন্ট ডাটাবেজ

বিশ্বজুড়ে অবস্থানরত দক্ষ বাংলাদেশি ডাক্তার, প্রকৌশলী, গবেষক, আইটি বিশেষজ্ঞ ও উদ্যোক্তাদের একটি জাতীয় ডাটাবেজ তৈরি করা যেতে পারে। এর মাধ্যমে “Brain Drain” কে “Brain Gain”-এ রূপান্তর করা সম্ভব হবে।

৮. জেলা ভিত্তিক বিদেশগামী কর্মী প্রস্তুতি কেন্দ্র

প্রতিটি জেলায় “Migration Preparation Center” স্থাপন করে ভাষা শিক্ষা, স্বাস্থ্য পরীক্ষা, আইনি সচেতনতা ও স্কিল টেস্টের ব্যবস্থা করা যেতে পারে। এতে গ্রামীণ জনগণ সহজেই বিদেশযাত্রার প্রস্তুতি নিতে পারবে।

৯. প্রবাস বন্ধু ২৪/৭ আন্তর্জাতিক হেল্পলাইন

বিশ্বের যেকোনো দেশ থেকে বাংলা ভাষায় প্রবাসীরা জরুরি সহায়তা পাওয়ার জন্য ২৪ ঘণ্টার আন্তর্জাতিক হেল্পলাইন চালু করা প্রয়োজন। এতে আইনি, চিকিৎসা, দূতাবাস ও নিরাপত্তা সহায়তা পাওয়া যাবে।

১০. ব্লু-কলার থেকে হাই-স্কিল মাইগ্রেশন রূপান্তর প্রকল্প

বাংলাদেশকে কম দক্ষ শ্রম রপ্তানিকারক দেশ থেকে উচ্চ দক্ষ মানবসম্পদ রপ্তানিকারক দেশে রূপান্তর করতে AI, Robotics, Healthcare, Marine Technology, Renewable Energy ও IT খাতে বিশেষ প্রশিক্ষণ প্রকল্প চালু করা প্রয়োজন।

১১. NRB স্টার্টআপ কাউন্সিল গঠন প্রকল্প

বিদেশে থাকা বাংলাদেশি উদ্যোক্তা, বিনিয়োগকারী ও পেশাজীবীদের সমন্বয়ে “NRB Startup Council” গঠন করা যেতে পারে। এটি দেশে স্টার্টআপ বিনিয়োগ, প্রযুক্তি স্থানান্তর ও আন্তর্জাতিক ব্যবসায়িক নেটওয়ার্ক গঠনে কাজ করবে।

১২. রেমিট্যান্সভিত্তিক প্রবাসী সন্তান স্কলারশিপ প্রকল্প

যেসব প্রবাসী বৈধ চ্যানেলে নিয়মিত রেমিট্যান্স পাঠান, তাদের সন্তানদের জন্য বিশেষ শিক্ষা বৃত্তি চালু করা যেতে পারে। এতে বৈধ রেমিট্যান্স বাড়বে এবং প্রবাসী পরিবারের শিক্ষাগত নিরাপত্তা নিশ্চিত হবে।

১৩. জাতীয় প্রবাস বীমা কর্মসূচি

বিদেশগামী কর্মীদের জন্য একটি সমন্বিত বীমা চালু করা প্রয়োজন, যেখানে মৃত্যু, দুর্ঘটনা, চাকরি হারানো, চিকিৎসা ও লাশ দেশে পাঠানোর খরচ অন্তর্ভুক্ত থাকবে। এতে প্রবাসীদের পরিবার আর্থিক নিরাপত্তা পাবে।

১৪. প্রবাসী বিনিয়োগ আবাসন, হোটেল ও রিসোর্ট উন্নয়ন প্রকল্প

প্রবাসীদের নিজস্ব বিনিয়োগে প্রতিটি জেলায় আবাসিক হোটেল, রিসোর্ট ও পর্যটন অবকাঠামো নির্মাণে বিশেষ সহায়তা দেওয়া যেতে পারে। এতে জেলা পর্যায়ে পর্যটন শিল্প ও কর্মসংস্থান বাড়বে।

১৫. প্রবাসী ক্যাম্প ও শিক্ষা-দক্ষতা উন্নয়ন কমপ্লেক্স প্রকল্প

হজ্জ ক্যাম্পের আদলে আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরসংলগ্ন শহরগুলোতে “প্রবাসী ক্যাম্প ও কমপ্লেক্স” স্থাপন করা যেতে পারে। একই সঙ্গে বাংলাদেশ উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে প্রবাসীদের জন্য অনলাইন ভাষা শিক্ষা, কারিগরি প্রশিক্ষণ ও ডিপ্লোমা কোর্স চালু করা যেতে পারে। এতে কর্মীরা বিদেশে অবস্থান করেও নিজেদের দক্ষতা বাড়াতে পারবেন।

বাংলাদেশের প্রবাসীরা শুধু বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের উৎস নন; তারা দেশের এক বিশাল অর্থনৈতিক, সামাজিক ও কৌশলগত শক্তি। কিন্তু এই শক্তিকে পরিকল্পিতভাবে কাজে লাগাতে না পারলে ভবিষ্যতের বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় বাংলাদেশ পিছিয়ে পড়বে। তাই সময় এসেছে “শ্রম রপ্তানি” ধারণা থেকে বেরিয়ে এসে “দক্ষ মানবসম্পদ, প্রবাসী বিনিয়োগ ও বৈশ্বিক বাংলাদেশি নেটওয়ার্ক” কেন্দ্রিক নতুন অভিবাসন নীতি গ্রহণ করার।

প্রস্তাবিত ১৫টি প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে দেশে বৈধ রেমিট্যান্স বাড়বে, দক্ষ কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে, প্রবাসীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত হবে এবং বাংলাদেশ বিশ্ববাজারে আরও শক্তিশালী অবস্থান অর্জন করবে। একই সঙ্গে এটি প্রবাসীদের সঙ্গে রাষ্ট্রের সম্পর্ককে আরও মানবিক, আধুনিক ও অংশীদারিত্বভিত্তিক করে তুলবে।

Comments

No comments yet. Why don’t you start the discussion?

Leave a Reply