Osman Goni

মো ওসমান গনির পায়ে হেঁটে বিশ্বভ্রমণ: ২১ হাজার কিলোমিটারের মহাকাব্য

পরিব্রাজক ওসমান গণি: পায়ে হেঁটে বিশ্বজয়ের এক বিস্মৃত মহাকাব্য

সীমান্ত, দারিদ্র্য কিংবা অনিশ্চয়তা—কোনো কিছুই তাকে থামাতে পারেনি। পিঠে একটি চটের ব্যাগ, কাঁধে একটি ক্যামেরা, আর বুকভরা দুর্দম সাহস—এই সামান্য সম্বল নিয়েই প্রায় ৪৫ বছর আগে এক তরুণ বেরিয়ে পড়েছিলেন পৃথিবীকে জানার অভিযানে। তাঁর নাম ওসমান গণি।

একসময় তিনি পায়ে হেঁটে ২২টি দেশ ভ্রমণ করে বিশ্ববাসীকে বিস্মিত করেছিলেন। পশ্চিম পাকিস্তান থেকে শুরু করে ইরান, ইরাক, সিরিয়া, লেবানন, জর্দান, মিশর, বার্মা, থাইল্যান্ড, মালয়েশিয়া, সিঙ্গাপুর, দক্ষিণ ভিয়েতনাম, হংকং, ফরমোজা, ফিলিপাইন, ইন্দোনেশিয়া, নেপাল, আফগানিস্তান ও ভারত—মোট ২২টি দেশ। দীর্ঘ ৭ বছরে তিনি অতিক্রম করেন প্রায় সাড়ে ২১ হাজার মাইল পথ—সবই পায়ে হেঁটে।

কিন্তু এই বিশ্বজয়ী মানুষটির আজকের বাস্তবতা নির্মম। বয়সের ভারে ন্যুব্জ, প্যারালাইসিসসহ নানা দুরারোগ্য ব্যাধিতে আক্রান্ত হয়ে তিনি এখন কুড়িগ্রাম জেলার উলিপুর উপজেলার এক নিভৃত গ্রামে মানবেতর জীবনযাপন করছেন। তাঁর সেই বিস্ময়কর ভ্রমণকাহিনীর পান্ডুলিপিগুলো বুকের কাছে আগলে রেখেই কাটছে দিন। মাঝে মাঝে তিনি প্রশ্ন করেন—“আমার এই ভ্রমণ কাহিনী কি কোনোদিন বই হবে না? ভবিষ্যৎ প্রজন্ম তাহলে কিভাবে অনুপ্রাণিত হবে?”

স্বপ্নের বীজ বপন

স্কুলজীবনেই তাঁর মনে ভ্রমণের বীজ রোপিত হয়। একদিন দুই সাইকেল আরোহী পর্যটকের সঙ্গে সাক্ষাৎ তাঁর জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দেয়। তাদের মুখে শোনা ভ্রমণের গল্প তাঁকে শিহরিত করে তোলে। তখনই তিনি সংকল্প করেন—একদিন তিনিও বেরিয়ে পড়বেন পৃথিবী দেখতে।

দারিদ্র্য ছিল তাঁর নিত্যসঙ্গী। কিন্তু সাহস, স্বপ্ন আর অদম্য মনোবলই ছিল তাঁর আসল পুঁজি। অবশেষে ১৯৬৪ সালের ২৭ এপ্রিল, তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের টেকনাফ থেকে তেঁতুলিয়া পায়ে হেঁটে অতিক্রম করে তিনি শুরু করেন তাঁর বিশ্বভ্রমণের যাত্রা।

বিপদসংকুল অভিযাত্রা

এই দীর্ঘ ভ্রমণ ছিল না কোনো রোমান্টিক সফর; বরং ছিল জীবন-মৃত্যুর এক টানটান লড়াই। ইরাক থেকে ইরান যাওয়ার পথে মরু ডাকাতদের হাতে তিনি সর্বস্ব হারান। ফিলিপাইনের দক্ষিণাঞ্চলে সমুদ্রপথে যাত্রাকালে ঝড়ে তাঁর নৌকা বিধ্বস্ত হয়। পরে স্বাধীনতাকামী মোরো যোদ্ধারা তাঁকে ধরে নিয়ে যায় ইন্দোনেশিয়ার একটি দ্বীপে। সেখান থেকেও তিনি পালিয়ে আবার যাত্রা শুরু করেন।

এতসব বিপদের মাঝেও তাঁর পথচলা থেমে থাকেনি। বরং এই অভিজ্ঞতাগুলোই তাঁর জীবনকে করে তোলে আরও বিস্ময়কর।

বিশ্বমঞ্চে এক বাঙালির পরিচয়

ওসমান গণির এই সাহসিক ভ্রমণ বিশ্বজুড়ে আলোড়ন তোলে। বিভিন্ন দেশের সংবাদপত্রে তাঁর ছবি ও কাহিনী প্রকাশিত হয়। ভ্রমণের সময় তিনি বহু দেশের রাষ্ট্রপ্রধানদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন এবং তাঁদের সঙ্গে নৈশভোজে অংশ নেওয়ার সুযোগ পান। সেই স্মৃতিগুলো আজও তাঁর চোখে আলোর ঝলক এনে দেয়।

অপূর্ণ প্রতিশ্রুতির বেদনা

জীবনের শেষ প্রান্তে এসে তাঁর সবচেয়ে বড় আক্ষেপ—অপূর্ণ প্রতিশ্রুতি। ২০০৩ সালের ২০ এপ্রিল তিনি তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার সঙ্গে সাক্ষাৎ করে তাঁর ভ্রমণকাহিনীর পান্ডুলিপি প্রকাশের অনুরোধ জানান। এজন্য ৬০ হাজার টাকা বরাদ্দও হয় এবং এক মন্ত্রীকে দায়িত্ব দেওয়া হয়। কিন্তু বাস্তবে আর কিছুই এগোয়নি।

এর আগেও নানা প্রতিশ্রুতি এসেছে—রাষ্ট্রপ্রধান, মন্ত্রী, আমলা—অনেকেই আশ্বাস দিয়েছেন, কিন্তু কেউ কথা রাখেনি। ফলে এই মানুষটি আজ অভিমানী, নীরব।

হারানো সম্পদ, হারানো জীবন

১৯৬৫ সালে ইরানে অবস্থানকালে তাঁর সমস্ত অর্থ চুরি হয়ে যায়। পরে আঞ্চলিক উন্নয়ন সংস্থার পক্ষ থেকে ৩ হাজার মার্কিন ডলার সহায়তা পেলেও সেই টাকার পুরোটা তিনি তেহরানে পাকিস্তান দূতাবাসে জমা রাখেন। বহু চেষ্টা করেও সেই টাকার পুরোটা আর ফেরত পাননি।

ভাঙনের সাথে সংগ্রাম

ব্রহ্মপুত্র নদের ভাঙনে তাঁর বাড়িঘর, সম্পদ সবই হারিয়ে যায়। কুড়িগ্রামের চিলমারী থেকে উলিপুর উপজেলার তবকপুর গ্রামে শ্বশুরবাড়িতে আশ্রয় নিয়ে তিনি পরিবারসহ বসবাস করছেন।

শেষ চাওয়া

যে মানুষটি একসময় পৃথিবীকে পায়ে হেঁটে জয় করেছিলেন, আজ তিনি সময় ও অবহেলার কাছে পরাজিত। তবুও তাঁর গ;ল্প আমাদের মনে করিয়ে দেয়—স্বপ্ন, সাহস আর দৃঢ়তা থাকলে মানুষ সত্যিই অসম্ভবকে সম্ভব করতে পারে।

প্রায় ৮০ বছর বয়সী এই বিশ্বভ্রমণকারী মানুষের এখন আর তেমন কোনো চাওয়া নেই। তাঁর একমাত্র স্বপ্ন—তাঁর ভ্রমণকাহিনী বই আকারে প্রকাশিত হোক। সেই বই পড়ে নতুন প্রজন্ম আবারও সাহস পাবে, আবার কেউ হয়তো বেরিয়ে পড়বে পৃথিবী জয়ের অভিযানে। শেষ পর্যন্ত জোনাকি প্রকাশনা থেকে তার বইটি আলোর মুখ দেখেছে। ২০১৩ সালে। বইটি পাওয়া যায় রকমারি ডট কম এ ও

লিংক: https://www.rokomari.com/book/63538/mohammad-osman-ganir-paya-hete-bissa-bharoman

Comments

No comments yet. Why don’t you start the discussion?

Leave a Reply