স্বাধীনতার চেতনা ও তার পক্ষ-বিপক্ষ: আদর্শ বনাম সুবিধাবাদ
একটি জাতির জীবনে স্বাধীনতা কেবল একটি নির্দিষ্ট তারিখ বা ভূখণ্ডের মানচিত্র নয়; স্বাধীনতা হলো একটি নিরন্তর প্রক্রিয়া এবং একটি পবিত্র আমানত। ১৯৭১ সালে দীর্ঘ রক্তক্ষয়ী সংগ্রামের মধ্য দিয়ে আমরা যে স্বাধীনতা অর্জন করেছি, তার মূল চেতনা ছিল সাম্য, মানবিক মর্যাদা ও সামাজিক সুবিচার। কিন্তু সময়ের পরিক্রমায় ‘স্বাধীনতার চেতনা’ শব্দবন্ধটিকে রাজনৈতিক স্বার্থে ব্যবহার করে এর প্রকৃত অর্থকে কলুষিত করার চেষ্টা করা হয়েছে। স্বাধীনতার পক্ষ-বিপক্ষ নির্ধারণের মাপকাঠি এখন আর কেবল ১৯৭১-এ সীমাবদ্ধ নেই, বরং তা বর্তমানের কর্মফল এবং দেশের প্রতি দায়বদ্ধতার ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে।
স্বাধীনতার অবিভাজ্য চেতনা
স্বাধীনতার চেতনা কোনো স্থবির বিষয় নয়। এটি একটি প্রবহমান আদর্শ। মনে রাখতে হবে, সময়ের পরিবর্তনে পক্ষ-বিপক্ষ ভিন্ন হতে পারে, কিন্তু স্বাধীনতার মূল চেতনা—অর্থাৎ দেশের সার্বভৌমত্ব রক্ষা এবং মানুষের অধিকার নিশ্চিত করা—একই থাকে।
যে ব্যক্তি ৪৭শে দেশের পক্ষে ছিলেন, তিনি যদি কোনো অপরাধ না করেই ৭১ এ দেশের পক্ষে না থাকার কারণে বা পুরনো পক্ষ নিয়ে পড়ে থাকার কারণে বা পাকিস্তানের পক্ষে না থাকার কারণে বা দেশের বিপক্ষে থাকার কারণে শত্রু, রাজাকার হিসেবে চিহ্নিত হয়ে থাকেন এবং একই কারণে নিগৃহিত হয়ে থাকেন। (যদিও একই কারণে মানে দেশের পক্ষে না থাকার কারণে কোনো কোনো ক্ষেত্রে প্রাণেরও হানি হয়েছে)
তাহলে মনে রাখতে হবে, যে ব্যক্তি একাত্তরে দেশের পক্ষে ছিলেন, তিনি যদি আজ দেশের সম্পদ লুণ্ঠন করেন, খুনের রাজনীতি করেন বা বিদেশী এজেন্টের ভূমিকা পালন করেন, তবে তিনি আর স্বাধীনতার চেতনার ধারক থাকতে পারেন না। পক্ষান্তরে, নতুন প্রজন্মের কেউ যদি আজ দেশের সার্বভৌমত্ব রক্ষায় বুক চিতিয়ে দাঁড়ায়, তবে সে-ই আধুনিক সময়ের প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধা।
লুণ্ঠন ও দেশবিরোধী অপতৎপরতা
স্বাধীনতা অর্জনের পরপরই একটি সুবিধাবাদী গোষ্ঠী সুপরিকল্পিতভাবে দেশের সম্পদ লুটে মত্ত হয়েছে। বিদেশে অর্থ পাচার করা এবং সেই অর্থে দেশের অভ্যন্তরে বিভক্তি সৃষ্টি করা তাদের প্রধান কৌশলে পরিণত হয়েছে। যারা স্বাধীনতাকে পুঁজি করে দেশ বিক্রি করেছে, তারা আজ বিদেশে বিলাসবহুল জীবনযাপন করছে। কিন্তু দুর্ভাগ্যের বিষয় হলো, দেশে তারা রেখে গেছে একদল ‘অনুগামী’ বা চামচা, যারা এখনো একাত্তরের আবেগকে বিক্রি করে দেশকে কার্যত পরাধীন রাখার বা বিদেশের আজ্ঞাবহ করার ‘রাজাকারি’ স্বপ্নে বিভোর থেকেছে। তারা কি এখনো মুক্তিকামী জনতার কাতারে থাকতে পারে?
-
দলবাজি ও দুর্নীতি: স্বাধীনতার দোহাই দিয়ে চুরি, ডাকাতি ও চাঁদাবাজিকে জায়েজ করার চেষ্টা করা হয়েছে।
-
বিদেশী এজেন্ডা বাস্তবায়ন: দেশের স্বার্থ বিসর্জন দিয়ে অন্য রাষ্ট্রের গোলামি করাকে ‘কূটনীতি’ বলে চালিয়ে দেওয়ার অপচেষ্টা চলেছে।
কিন্তু ৪৭ এর মুক্তি চেতনাকে ৭১ এ গ্রহণ না করলেও ৭১ এর মুক্তি চেতনাকে এখন ব্যবহার হচ্ছে। প্রশ্ন হচ্ছে এটা কতটা সঠিক। ৭১ এর মুক্তি চেতনা বাংলাদেশ যতদিন থাকবে ততদিন থাকবে। এবং ৭১ এর মুক্তিযোদ্ধারা সমান সম্মানের থাকবে।
কিন্তু কেউ যদি ইতোমধ্যে সে অবস্থান পরিবর্তন করে বা মুলে মুক্তি ও স্বাধীনতার চেতনার কথা বলে বাস্তবে বিদেশী শক্তির তাবেদারীর জন্য দেশের অভ্যন্তরে বিদেশী শক্তির হস্তক্ষেপ বহাল রাখার জন্য কাজ করে তাহলে সে ইতোমধ্যে দেশদ্রোহী হয়ে গেছে। তার স্বাধীনতার চেতনা মূল্যহীন।
একইভাবে কেউ যদি স্বাধীনতার নামে দেশের মানুষের স্বাধীনতা হরণ করে তার ভোটাধিকার ও বাকাধিকার লুটে নেয়, দেশের সম্পদ বিদেশ পাচার করে বা পাচার করতে কাজ করে, দেশের মানুষকে শুধুমাত্র তার সাথে েএকমত না হওয়ার জন্য হত্যা করে গুম করে মামলা ও হামলা করে। সে এবং তার সকল সহযোগী অবশ্যই দেশদ্রোহী, গনবিরোধী, রাজাকার ও স্বাধীনতাবিরোধী এখানে কোনো আর ‘‘কিন্তু’’ নেই।
পক্ষ-বিপক্ষের নতুন সমীকরণ
একাত্তরে যারা বাংলাদেশের পক্ষে ছিল, তাদের অবদান অনস্বীকার্য। কিন্তু সেই কৃতিত্বের দোহাই দিয়ে পরবর্তীকালে লুটেরা, হত্যাকারী বা গুম-খুনের রাজনীতির পক্ষ নেওয়া ব্যক্তিদের আর ‘স্বাধীনতার পক্ষ’ বলা চলে না।
-
প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধা: যে ব্যক্তি দেশের মানুষের পক্ষে দাঁড়ায়, ন্যায়ের কথা বলে এবং দেশের সম্পদ রক্ষা করে, সে-ই নিজেকে প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে উপস্থাপন করে।
-
বিপথগামী যোদ্ধা: যে এককালে দেশের জন্য লড়েছেন কিন্তু পরে দেশবিরোধী কাজে লিপ্ত হয়েছেন, তাকে চিহ্নিত করার সময় এসেছে। এক যুদ্ধের যোদ্ধাকে অন্য যুদ্ধের যোদ্ধার মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে বিতর্ক সৃষ্টি করা অনুচিত। প্রত্যেকের ত্যাগের আলাদা আলাদা সম্মান দিতে হবে, কিন্তু অপরাধের ক্ষেত্রে কোনো আপস করা চলবে না।
দায়বদ্ধতা ও সামাজিক বিচার
দেশদ্রোহী বা গণবিরোধী কর্মকাণ্ডে লিপ্ত ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে আমাদের দৃষ্টিভঙ্গি হওয়া উচিত সুনির্দিষ্ট:
-
উপেক্ষা (Ignore): যারা একসময় দেশের পক্ষে থেকে এখন স্বার্থের কারণে বিপক্ষে চলে গেছে, প্রাথমিক পর্যায়ে তাদের গুরুত্বহীন করে দিতে হবে।
-
সতর্কীকরণ: তাতেও যদি তারা দেশবিরোধী কাজ বন্ধ না করে, তবে তাদের অতীত এবং বর্তমানের বৈপরীত্য মনে করিয়ে দিতে হবে।
-
সামাজিক প্রত্যাখ্যান: যদি একই অপরাধ অব্যাহত থাকে, তবে সামাজিকভাবে তাদের দেওয়া সকল উপাধি ও সম্মাননা প্রত্যাহার করতে হবে। কারণ, অপরাধী কোনো উপাধির আড়ালে নিজেকে লুকাতে পারে না।
-
আইনি বিচার: যে নিজেই একসময়ের মুক্তিকামী ছিল কিন্তু পরে খুন, গুম ও লুণ্ঠনের সাথে জড়িত হয়েছে, তাকে তার অপরাধের উপযুক্ত সাজা ভোগ করতে হবে। অপরাধের বিচার না হওয়া স্বাধীনতার চেতনার অবমাননা।
স্বাধীনতার চেতনা মানেই হলো শোষণমুক্ত, বৈষম্যহীন এবং একটি আত্মমর্যাদাশীল রাষ্ট্র গড়ে তোলা। যারা স্বাধীনতার মহান অর্জনকে নিজেদের পকেট ভরার মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করে এবং বিদেশের কাছে দেশ বিক্রি করতে চায়, তারা যে পরিচয়েই থাকুক না কেন—তারাই প্রকৃত দেশদ্রোহী। অতীতের ভুল থেকে শিক্ষা নিয়ে বর্তমানের প্রতিটি দেশপ্রেমিক যোদ্ধাকে সম্মান দিয়ে আমাদের ঐক্যবদ্ধ হতে হবে। কেবল তখনই আমরা একটি প্রকৃত স্বাধীন, অসাম্প্রদায়িক ও প্রগতিশীল বাংলাদেশ গড়ে তুলতে সক্ষম হবো।
দেশপ্রেম কোনো মৌসুমী ব্যবসা নয়। যে ব্যক্তি আজ দেশের মানুষের রক্ত চোষে এবং বিদেশের গোলামি করে, সে একাত্তরে যাই থাকুক না কেন, বর্তমানে সে স্বাধীনতার বিপক্ষ শক্তি। আর যে তরুণ আজ দেশের সার্বভৌমত্ব রক্ষায় লড়ছে, সে-ই আগামীর স্বাধীনতার সূর্যসৈনিক।

