হাজী নাদরের জ্জামান: এক পরিশ্রমী ও ন্যায়নিষ্ঠ মানুষের গল্প
নোয়াখালী জেলার কোম্পানীগঞ্জ উপজেলার মোহাম্মদনগর গ্রামে, আনুমানিক ১৯০১ সালে জন্ম নেওয়া হাজী নাদরের জ্জামান ছিলেন এক অসাধারণ মানুষ। এক সাধারণ কৃষক পরিবারে তাঁর জন্ম হলেও, জীবনের পথে তিনি হয়ে উঠেছিলেন অসাধারণত্বের এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত।
সে সময়ে উপকূলীয় এই অঞ্চলে ছিল না কোনো শিক্ষা প্রতিষ্ঠান। তাই প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা থেকে বঞ্চিত হয়েছিলেন তিনি। কিন্তু জীবনই ছিল তাঁর সবচেয়ে বড় পাঠশালা। নিজের কর্মদক্ষতা আর অধ্যবসায় দিয়ে তিনি পেরিয়ে গেছেন সময়ের সীমানা, ছাড়িয়ে গেছেন নিজের এলাকার গণ্ডি।
কর্মীর পরিচয়ে এক শিল্পীর গল্প
হাজী নাদরের জ্জামানের বাবা মোহাম্মদ আব্বাছ আলী ছিলেন কৃষক। কিন্তু হাজী সাহেব নিজেকে শুধু কৃষির মাঝেই আটকে রাখেননি। বাঁশ ও বেতের কাজে তিনি অর্জন করেছিলেন অসাধারণ দক্ষতা। এই কাজের সর্দার ও ঠিকাদার হিসেবে তাঁর পায়ের ছাপ পড়েছিল আসাম, ত্রিপুরা, মিজোরাম, মণিপুর, কলকাতা, আরাকান আর রেঙ্গুনের মতো দূরবর্তী অঞ্চলেও।
শুধু নিজেই কাজ করে থেমে যাননি, তাঁর হাত ধরে গড়ে উঠেছে অসংখ্য শিল্পী। তাঁর শিষ্যরা ছড়িয়ে পড়েছেন বাংলাদেশ, ভারত আর মিয়ানমারের নানা প্রান্তে। বৃহত্তর নোয়াখালী অঞ্চলে আজও মাঝে মাঝে চোখে পড়ে তাঁর হাতের তৈরি নিখুঁত বাঁশের কাজ। সেই অম্লান সৃষ্টি আজও যেন বেঁচে থাকার সাক্ষ্য দেয়। তাঁর সাগরেদরা এখনও গভীর শ্রদ্ধায় স্মরণ করেন এই গুণী কর্মগুরুকে।
শেকড়ের সন্ধানে
যদিও তিনি থাকতেন মামার বাড়িতে, তাঁর পৈতৃক নিবাস ছিল ফেনী জেলার দাগণভূঞা উপজেলার চন্ডিপুর গ্রামের রামেশ্বরপুর মৌজায়। এখন এই জায়গাটা ইসলামপুর নামে পরিচিত। নলদিয়া মেলার সন্নিকটে এই গ্রামটির সঙ্গেই জড়িয়ে আছে তাঁর পরিবারের ইতিহাস।
হাজী সাহেবের মাতৃপক্ষ অথবা পিতৃপক্ষের একটির পদবি ছিল খসরু। ধারণা করা হয়, মায়ের দিক থেকেই এই পদবির সূত্রপাত হতে পারে। তাঁর মা নিজের বাবার বাড়িতেই সন্তানদের নিয়ে কাটিয়েছেন জীবনের শেষ দিনগুলো। এই বাড়ির প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন দুই ভাই – জয়নুদ্দিন ও রিয়াজুদ্দিন। রিয়াজুদ্দিন ছিলেন আজীবন অবিবাহিত, আর জয়নুদ্দিনের বংশধরেরা আজও সেই বাড়িতে বসবাস করছেন। ধারণা করা হয়, তাদের পুরো নাম ছিল জয়নুদ্দিন খসরু ও রিয়াজুদ্দিন খসরু। হয়ত কোনো কারণে তাঁরা নিজেদের পরিচয় গোপন রেখেছিলেন, তাই জমিজমার কাগজপত্রেও পদবি ব্যবহার করেননি।
পূর্বপুরুষদের মুখে শোনা এই বাড়ির বা বংশের মূল উপাধি ছিল খসরু। তবে তারা কোনোভাবে পারস্য সম্রাট খসরুর সাথে সম্পর্কিত ছিলেন নাকি তাদের আদি নিবাস খসরুর সম্রাজ্য ছিলেন বলে তারা নিজেদের খসরু বংশ মনে করতেন তা নিশ্চিতভাবে এখন আর জানা যায় না। জয়নুদ্দিন খসরু জয়নুদ্দিন পাগড়িতে রুপান্তন হয়েছেন। আরো এটি জয়নুদ্দিন পাগড়ির বাড়ি নামে পরিচিত।
এক ইতিহাসের সাক্ষী
বড়দের মুখে শোনা গল্পে জানা যায়, নবাব সিরাজ উদ-দৌলার বাহিনীতে দেশে দেশে সৈনিক ছিলেন। সেই সূত্রেই হয়তো রিয়াজুদ্দিন ও জয়নুদ্দিন এদেশে এসেছিলেন। পলাশীর যুদ্ধে নবাবের পরাজয়ের পর তাঁরা পালিয়ে আসেন এই দূরবর্তী অঞ্চলে। কেউ কেউ বলে, ইংরেজ বাহিনীতে যোগ দেওয়ার প্রস্তাব ফিরিয়ে দিয়েছিলেন ধর্মপ্রাণ এই মানুষ দুজন। আবার কারো মুখে শোনা যায়, তাঁরা হয়ত সৈনিক ছিলেন না, বরং রাজ দরবারের কর্মচারী ছিলেন।
ফার্সি ভাষায় পারদর্শী হয়েও এখানে এসে তাঁরা বেছে নিয়েছিলেন চাষাবাদ। কারণ সে সময় এই অঞ্চলে অন্য কোনো পেশার সুযোগ ছিল না। মুর্শিদাবাদ ও কলকাতা থেকে দূরে, এই উপকূলীয় এলাকাটিই হয়ত তাঁদের কাছে নিরাপদ আশ্রয় মনে হয়েছিল।
বড়রা বলতেন, তাঁরা সব সময় মাথায় পাগড়ি পরতেন। আর সেই সূত্রেই আজও এলাকার মানুষের মুখে মুখে তাঁদের বাড়ির নাম “জনুদ্দিন পাগড়ির বাড়ি”। তাঁরা পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ পড়তেন, আশপাশের মানুষকেও উৎসাহিত করতেন ইসলামের পথে। ধারণা করা হয়, এই অঞ্চলে ইসলামের প্রসারে তাঁদের ছিল গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা। মজার ব্যাপার হলো, তাঁদের বাড়ির এক কিলোমিটারের মধ্যে কোনো ভিন্ন ধর্মাবলম্বীর বসতি ছিল না বা আগেও ছিল না। হয়ত নতুন করে এই অঞ্চলে মানুষ বসতি স্থাপন করার সময় মুসলমানরাই পছন্দ করেছিলেন এই পীর-ভক্ত পরিবারের পাশে থাকতে।
ইমানি শক্তির অটুট ধারা
মোহাম্মদ নগর গ্রামের শেষ সীমায়, ফেনী জেলার সীমানা ঘেঁষে ছিল কামলার দিঘীর নিকটে এই বাড়ি। তার ঠিক এক কিলোমিটার দূরেই ছিল দুধমুখার পীর মরহুম ইছহাক সাহেবের বাড়ি। জীবনের কোনো এক সময় হাজী নাদরের জ্জামান সেই পীরের সান্নিধ্যে আসেন। পীর সাহেবের হাতে বায়াত নিয়ে নামাজ শুরু করার পর থেকে মৃত্যুর আগ পর্যন্ত এক ওয়াক্ত নামাজও তিনি কসুর করেননি। জীবনের শেষ সতেরো দিন যখন তিনি অচেতন ছিলেন, তখনও ইশারায় নামাজ আদায়ের চেষ্টা করে গেছেন। এ যেন ঈমানের এক অটুট প্রতীক।
সংসার জীবন
হাজী সাহেব বিয়ে করেছিলেন কোম্পানীগঞ্জ উপজেলার চরপার্বর্তী গ্রামের সায়রা খাতুনকে। তাঁর শ্বশুর ইব্রাহিম খলিল উল্যাহ ছিলেন গ্রাম পুলিশ। তাঁরা “ভদ্র” বংশ হিসেবে পরিচিত ছিলেন। শোনা যায়, সাধারণ ও গড়পড়তা বাঙালির তুলনায় ছিলেন অনেক লম্বা।
এক অনন্য জীবনদর্শন
সময়ানুবর্তিতা আর কর্মনিষ্ঠায় ছিলেন এক অনন্য উদাহরণ। সারা জীবন তিনি মেনে চলেছেন একই রুটিন। ভোরবেলা ঘুম থেকে উঠে মসজিদে নামাজ পড়া। নামাজ শেষে সরাসরি জমিতে বা কাজে চলে যাওয়া। ঠিক যোহরের আজানের আগে ফিরে এসে গোসল-অজু করে নামাজ আদায়, তারপর দুপুরের খাবার। সামান্য বিশ্রাম নিয়ে আবার কাজে বের হওয়া। আসরের আগে ফিরে অজু করে মসজিদে যাওয়া। এশার নামাজ শেষে বাড়ি ফিরে খাওয়াদাওয়া, তারপর বিশ্রাম।
জীবনের এক দিনের জন্যও এই রুটিনে ব্যত্যয় ঘটেনি। কোন ঝড়-তুফান, কোন প্রতিকূলতা তাঁকে টলাতে পারেনি। কাজ না থাকলেও তিনি এই রুটিন মেনে চলেছেন।
সুস্থ জীবনের রহস্য
প্রায় পুরো জীবন কেটেছে সুস্থ আর কর্মময়। ৯৭ বছর বয়সে মৃত্যুর সতেরো দিন আগে অসুস্থ হওয়ার আগ পর্যন্ত তাঁর তেমন কোনো অসুস্থতা ছিল না। পরিশ্রম আর সাশ্রয়ী জীবন তাঁকে দিয়েছিল এক অটুট স্বাস্থ্য।
মিতব্যয়িতা আর উদারতা
খুব মিতব্যয়ী ছিলেন তিনি। কিন্তু সেই সঙ্গে ছিল উদারতার এক বিস্ময়কর দৃষ্টান্ত। পরিশ্রম করে নিজের জমিজমার মালিক হয়েছিলেন। জীবনে কখনও কারো হক নষ্ট করেননি। কাউকে টাকা ধার দিলে বা কারও কাছ থেকে ধার নিলে নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে ফেরত দেওয়া ছিল তাঁর অভ্যাস। বড় ছেলে সুলতান আহমদের বিয়েতে আত্মীয়স্বজন ও প্রতিবেশীদের জন্য তিন দিন ধরে ব্যবস্থা করেছিলেন খাওয়ার আয়োজন।
জীবনের শেষ অধ্যায়
১৯৮৫ সালে পবিত্র হজ্জ ব্রত পালন করে এসে তিনি হাজী উপাধি গ্রহণ করেন। দুই কন্যা, চার পুত্র আর অসংখ্য নাতি-নাতনির রেখে ১৯৯৮ সালের ২ আগস্ট তিনি চলে যান না ফেরার দেশে। নিজের বাড়ির সামনে ছোট্ট একটি কবর এখন চিরনিদ্রায় শায়িত এই অকৃত্রিম পরিশ্রমী মানুষটির। প্রতিদিন ভোরে মসজিদের আযানের সুরের সাথে মিশে আছে তাঁর অমলিন স্মৃতি।
সূত্র: নোয়াখালী পিডিয়া

