Buroc, Study, Research

বেতন বৃদ্ধির আবেদনপত্র

অনেকে বেতন বৃদ্ধির কথা ভাবেন কিন্তু আবেদন করেন না। অনেকে আবার আবেদন করেন কিন্তু লিখিত দরখাস্ত জমা দেন না। অনেকে আবার লিখিত দিলেও ঠিকভাবে বা ভালভাবে লিখতে পারেন না। তাদের জন্য একটি নমূনা দেয়া হলো।

নিচে বেতন বৃদ্ধির জন্য একটি বিস্তারিত, মানবিক ও আবেগিক আবেদনপত্রের নমুনা দেওয়া হলো। এতে ৬ সদস্যের একটি পরিবারের কর্তা হিসেবে আবেদনকারীর দৈনন্দিন সংগ্রাম, মূল্যস্ফীতির চাপ এবং পরিবারের প্রতি দায়বদ্ধতার চিত্র ফুটিয়ে তোলা হয়েছে।

তারিখ: ০১ মার্চ, ২০২৬

প্রতি,
সম্মানিত ব্যবস্থাপনা পরিচালক
মেসার্স রহিম এন্টারপ্রাইজ লিমিটেড
১২৩, নয়াপল্টন, ঢাকা-১০০০

বিষয়: বেতন বৃদ্ধির জন্য আবেদন

জনাব

আমার নাম মোঃ কামরুল হাসান। আমি গত ৮ বছর ধরে আপনাদের প্রতিষ্ঠানের অ্যাকাউন্টস বিভানে জুনিয়র অফিসার হিসেবে কর্মরত আছি (কর্মী আইডি: RE-২০১৮-৩৪৫)। এই দীর্ঘ সময়ে আমি প্রতিষ্ঠানের প্রতি সর্বোচ্চ নিষ্ঠা ও একনিষ্ঠভাবে দায়িত্ব পালন করে আসছি। কিন্তু আজ আমি অত্যন্ত কুণ্ঠিতচিত্তে এবং বাধ্য হয়ে আপনার কাছে একটি মানবিক আবেদন নিয়ে হাজির হয়েছি।

স্যার, আমার পরিবারের কথা একটু বলার অনুমতি চাই। আমি একটি ৬ সদস্যের পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি। আমার পরিবারে আছেন—

১. আমার বৃদ্ধ পিতা (৭২ বছর) — বার্ধক্যজনিত নানা রোগে ভুগছেন, প্রতি মাসে তাঁর ওষুধ খরচই ৩-৪ হাজার টাকা।
২. আমার বৃদ্ধা মাতা (৬৮ বছর) — তিনিও অসুস্থ, ডায়াবেটিস ও প্রেসারের রোগী।
৩. আমার স্ত্রী — তিনি সংসার দেখাশোনা করেন, আমাদের ছোট ছেলে-মেয়েদের দেখেন।
৪. আমার ছেলে (১০ বছর) — পঞ্চম শ্রেণিতে পড়ে, টিউশন ও স্কুলের খরচ চলে।
৫. আমার মেয়ে (৭ বছর) — দ্বিতীয় শ্রেণিতে পড়ে, সেও লেখাপড়া শিখছে।

স্যার, যখন ৮ বছর আগে আমি এই চাকরিতে যোগ দিই, তখন আমার বেতন ছিল ১২,০০০ টাকা। বর্তমানে বিভিন্ন সময়ে বৃদ্ধি পেয়ে আমার বেতন দাঁড়িয়েছে ২২,০০০ টাকায়। কিন্তু এই আট বছরে সংসারের খরচ যে কত বেড়েছে, সেটা হয়তো আমি শুধু শব্দে প্রকাশ করতে পারব না।

আমার দৈনন্দিন খরচের একটি ছোট হিসাব দিচ্ছি:

খাত মাসিক খরচ (প্রায়)
ভাড়া (বাসা) ৬,০০০ টাকা
খাদ্যশস্য (চাল, ডাল, তেল ইত্যাদি) ৮,০০০ টাকা
সবজি, মাছ, মাংস (অল্পস্বল্প) ৪,০০০ টাকা
বাবা-মায়ের ওষুধ ৩,৫০০ টাকা
ছেলে-মেয়ের স্কুলের বেতন ও বইখাতা ২,৫০০ টাকা
বিদ্যুৎ-পানি-গ্যাস বিল ২,০০০ টাকা
অন্যান্য (সাবান, পরিবহন, জরুরি খরচ) ২,০০০ টাকা
মোট প্রায় ২৮,০০০ টাকা

স্যার, এই টেবিলটা দেখলে বুঝতে পারবেন, আমার আয় ২২,০০০ টাকা হলেও খরচ ২৮,০০০ টাকা। অর্থাৎ প্রতি মাসে প্রায় ৬ হাজার টাকা ঘাটতি থাকে। এই ঘাটতি কোনোমতে বন্ধু-আত্মীয়ের কাছ থেকে ধার করে, বা কোনো রকমে কম খেয়ে মেটাই। কিন্তু দিন দিন এই চাপ এত বেড়ে গেছে যে, আমি আর সামলাতে পারছি না।

গত কয়েক মাসে বাজারে যা দ্রব্যমূল্যের উর্ধ্বগতি, তা তো আপনিও জানেন। চালের দাম দ্বিগুণ, সবজির দাম আকাশছোঁয়া, তেল-ডালের দাম তো আগুন। স্যার, আমাদের বাসায় গত কয়েক মাস ধরে মাছ-মাংস প্রায় বন্ধই বলা চলে। ছেলেমেয়েরা যখন বলে, “বাবা আজ মাছ খাব,” তখন আমার বুক ফেটে যায়। ওদের চাহিদা মেটাতে না পারার কষ্টটা ভাষায় প্রকাশ করতে পারব না।

আমার বৃদ্ধ পিতার কথাই ধরুন। ডাক্তার বলেছেন, তাঁকে নিয়মিত কিছু পরীক্ষা করাতে হবে এবং ভালো মানের ওষুধ খেতে হবে। কিন্তু সেই খরচ জোগাড় করতে পারি না বলে তাঁকে শুধু সাধারণ ওষুধেই চালিয়ে যেতে হচ্ছে। তিনি কিছু বলেন না, কিন্তু চোখে চোখে দেখি তাঁর কষ্ট। আর আমার মা, তিনিও অনেক অসুস্থ। তাদের শেষ বয়সে ভালো কিছু খাওয়াতে পারি না, ভালো চিকিৎসা দিতে পারি না—একটি ছেলে হিসেবে এ আমার সবচেয়ে বড় ব্যর্থতা।

স্যার, আপনি হয়ত ভাবছেন, এতদিন তো চলছিলাম, এখন কেন এত সমস্যা? স্যার, চলছিলাম কিন্তু ধার করে। এখন ধার দেওয়ার লোকও ফিরিয়ে নিয়েছে। পথ বসার জায়গা নেই। ৬টি প্রাণী আমার দিকে তাকিয়ে থাকে—তাদের পেট চলে শুধু আমার এই আয়ের ওপর। আমি চাইলেই সাইডে অন্য কোনো কাজ করতে পারি না, কারণ অফিসের সময় ১০ ঘণ্টা। এরপর ক্লান্ত শরীর নিয়ে বাসায় ফিরি। স্যার, আমি কখনো অফিস ফাঁকি দিইনি, কোনো দিন অসৎ উপায়ে এক পয়সাও উপার্জন করিনি। শুধু সততা আর নিষ্ঠা নিয়েই টিকে আছি।

স্যার, এই পরিস্থিতিতে আমার একমাত্র ভরসা আপনি এবং এই প্রতিষ্ঠান। আপনি যদি মানবিক দৃষ্টিতে আমার অবস্থা বিবেচনা করে আমার বেতন কিছুটা বাড়িয়ে দেন, তাহলে হয়তো আমার পরিবারটা বেঁচে থাকার মতো কিছুটা স্বস্তি পাবে। আমার ছেলেমেয়েরা মাছ খেতে পারবে, বাবা-মা ভালো ওষুধ খেতে পারবেন, এবং আমার স্ত্রী রান্নাঘরে হিসাব মিলিয়ে আর কাঁদবে না।

আমি কমপক্ষে ৩০,০০০ টাকা বেতন প্রত্যাশা করছি। এতে আমার সংসারের চাকা কিছুটা স্বাভাবিক হবে। এই প্রতিষ্ঠানের জন্যই আমি সারা জীবন কাজ করে যেতে চাই। আমাকে একটু বাঁচতে দিন, আমার পরিবারটাকে একটু বাঁচতে দিন।

স্যার, আপনি আমার আবেদনটি পড়েছেন। এখন আপনার হাতেই আমার পরিবারের ভবিষ্যৎ। আপনি যদি সাহায্যের হাত বাড়ান, আমি এবং আমার পরিবার চিরকাল আপনার কাছে কৃতজ্ঞ থাকব।

ধন্যবাদ ও শ্রদ্ধাভরে,

আপনারই একজন বিশ্বস্ত কর্মচারী

[স্বাক্ষর]
মোঃ কামরুল হাসান
পদবি: জুনিয়র অফিসার (অ্যাকাউন্টস)
কর্মী আইডি: RE-২০১৮-৩৪৫
মোবাইল: ০১৮১৮-৫৫৬৬৭৭
ইমেইল: kamrul.re@email.com

সংযুক্তি:
১. পরিবারের সদস্যদের তালিকা ও বয়স
২. বাবা-মায়ের ওষুধপত্রের প্রেসক্রিপশনের কপি
৩. বাসা ভাড়ার রশিদের কপি
৪. ছেলে-মেয়ের স্কুলের বেতনের রশিদ

Comments

No comments yet. Why don’t you start the discussion?

Leave a Reply