new Bangladesh

বাংলাদেশে প্রশাসনিক বিকেন্দ্রীকরণ

বাংলাদেশে প্রশাসনিক বিকেন্দ্রীকরণ ও নতুন বিভাগীয় রূপরেখা

রাষ্ট্র সংষ্কার পরামর্শ

বাংলাদেশের মৌজা, পাড়া, মহল্লা, গ্রাম, ইউনিয়ন, ওয়ার্ড, পৌরসভা উপজেলা, জেলা, বিভাগ ও কেন্দ্র পর্যায়ে কি ধরনের নতুন বিন্যাস ও বিভক্তি এবং মন্ত্রণালয় ও দপ্তর বিন্যাস ও বিভক্তির মাধ্যমে সেবাকে জনগনের নিকটবর্তী করা যায়, ছোটো খাটো বিষয়ে মাঠ পর্যায় থেকে সিদ্ধান্ত দেয়া যায়, সহজে আইন, বিধি ও সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করা যায় এবং দেশের সকল এলাকা প্রশাসনিক নজরে থাকে এমনকি ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণ হয় ও জনগনকে উচ্চ পর্যায়ে বা দূরে যেতে না হয়। সেজন্য নতুন ভৌগলিক, পোস্টাল, রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক বিভাগন ও বিকেন্দ্রীকরণ কেমন হবে একটা সংক্ষিপ্ত রুপরেখা তুলে ধরা হলো-

 

বাংলাদেশের বর্তমান প্রশাসনিক কাঠামো তুলনামূলকভাবে কেন্দ্রনির্ভর, জটিল ও বহুস্তরবিশিষ্ট। এর ফলে সাধারণ জনগণকে ছোটখাটো সেবার জন্যও উপজেলা, জেলা বা রাজধানী পর্যন্ত যেতে হয়। সিদ্ধান্ত গ্রহণে বিলম্ব ঘটে, স্থানীয় বাস্তবতা উপেক্ষিত থাকে এবং প্রশাসনিক নজরদারিতে ফাঁক সৃষ্টি হয়। এই প্রেক্ষাপটে প্রয়োজন একটি গভীর, বহুমাত্রিক ও বাস্তবভিত্তিক বিকেন্দ্রীকরণ, যেখানে ক্ষমতা, বাজেট ও সিদ্ধান্ত স্থানীয় পর্যায়ে ন্যস্ত থাকবে।

এই নথিতে বাংলাদেশের মৌজা থেকে কেন্দ্র পর্যন্ত নতুন ভৌগোলিক, পোস্টাল, রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক বিন্যাসের একটি বিস্তৃত রূপরেখা উপস্থাপন করা হলো।

 

সাধারণ নীতি

১) দেশের বড় গ্রামগুলোকে ভেঙ্গে ছোট ছোট নামের গ্রাম করতে হবে। শহরেও বড় এলাকাগুলোর মধ্যে ছোট এলাকা বানাতে হবে।

২) একই নামে পাশাপাশি একাধিক রাস্তার ক্ষেত্রে। এক নামে একটি রাস্তা রেখে বাকী রাস্তাগুলোর নতুন নাম নাম দিতে হবে।

৩) একই নামে একাধিক গ্রাম, ইউপি, উপজেলা রয়েছে তাদের নাম বদলাতে হবে। এজন্য একটি নীতিমালা তৈরী করতে হবে।

৪) নতুন নামের ক্ষেত্রে ধর্ম প্রচারক, মনীষী, মুক্তিযোদ্ধা, সমাজসেবক ও জুলাই যোদ্ধাদের এলাকাভিত্তিক নামের প্রাধান্য দিতে হবে।

৫) জীবন  দিয়ে সততার সাথে দায়িত্বপালনকারী সরকারী চাকুরেদের নামও যুক্ত করা যেতে পারে।

৬) নাম পরিবর্তনের জন্য একটি নীতিমালা তৈরী করতে হবে। এবং গণশুনানীর মাধ্যমে নতুন নাম রাখতে হবে।

৭) বড় ইউনিয়, উপজেলা ও জেলাকে ভাঙতে হবে।

৮) ১২-১৬টি বিভাগ, ৭২ থেকে ৯৬ টি জেলা ৬শর মতো উপজেলা তৈরী হবে যা প্রশাসনিক কাজে সহজ হবে।

৯) কুমিল্লা বিভাগ কুমিল্লার ৩ জেলাকে নিয়ে হবে। তবে মুল কুমিল্লা জেলাকে ৩ ভাগ করে একটিকে ময়নামতি জেলা করা যেতে পারে। নোয়াখালী সংলগ্ন উপজেলাগুলো নিয়ে কমলাংক নামে আলাদা জেলা হতে পারে। ঢাকার নিকটবর্তী জেলাগুলোতে নিয়ে হতে দাউদকান্দি বা মেঘনাকান্দি জেলা। শুধু নদীর নামে জেলা হলে নানা কনফিউশন তৈরী হতে পারে।

১০) জেলার নামে বিভাগের নাম না দিয়ে অন্য নামে দেয়া বেশী সহজ ও সুবিধাজনক।

১১) ঢাকা, চট্টগ্রামসহ বেশকিছু জেলাকে ভাগ করে ২ বা ৩ জেলা বানাতে হবে। বিশেষ করে ঢাকা জেলা ৪টি জেলা হওয়ার দাবীদার। এবং

১৩) নোয়াখালী বিভাগ করার জন্য নোয়াখালীর ৩ জেলা নিয়ে বিভাগ হতে পারে। সাথে গণশুণানীর মাধ্যমে চট্টগ্রাম জেলাকে ৩ ভাগ করে দক্ষিণ ও মধ্য অংশকে চট্টগ্রাম বিভাগের সাথে রেখে উত্তর অংশকে নোয়াখালী বিভাগের সাথে যুক্ত করা যেতে পারে। এবং নোয়াখালীর সাথে লাগানো জেলাকেও কুমিল্লার নতুন জেলাকে নোয়াখালী বিভাগের সাথে যুক্ত করা যেতে পারে। এতে নোয়াখালী বিভাগে জেলার সংখ্যা ৫টি হবে।

১৪) ঢাকা জেলাকে ৪ ভাগে ভাগ করলে নতুন নামগুলো জাহাঙ্গীর নগর, চিশতী নগর (ইসলাম খান চিশতীর নামে) ও শেরনগর (শেরশাহর নামে) রাখা যায়।

১৫) ঢাকা থেকে রাজধানী সরিয়ে আরিচা ঘাটের দিকে নিয়ে সেখানে নতুন ঢাকাকে পরিকল্পিত রাজধানী হিসেবে গড়ে তুলতে হবে। যা আমি প্রস্তাবনায় উল্লেখ করেছি। নতুন রাজধানীর নাম হবে জাহানগড় Jahangar (সম্রাট জাহাঙ্গীরের নাম থেকে অংশ নিয়ে আর পুরনো আমলের একটা শব্দ দিয়ে)

 

১. মৌজা, পাড়া ও মহল্লা পর্যায়

প্রস্তাবিত কাঠামো

  • মৌজা/মহল্লা প্রশাসনিক ইউনিট (MMU)
    • প্রতিটি মৌজা বা শহুরে মহল্লাকে একটি ক্ষুদ্র প্রশাসনিক ইউনিট হিসেবে স্বীকৃতি
    • জনসংখ্যা: গ্রামে ৮০০–১৫০০, শহরে ১৫০০–৩০০০

নেতৃত্ব ও দপ্তর

  • নির্বাচিত মহল্লা প্রতিনিধি/গ্রাম প্রতিনিধি
  • ১ জন প্রশাসনিক সহকারী (ডিজিটাল রেকর্ড রক্ষক) বা সরকার নিয়োজিত সেবা এজেন্ট।

ক্ষমতা ও দায়িত্ব

  • জন্ম-মৃত্যু নিবন্ধন (প্রাথমিক অনুমোদন) ও স্থানীয় বিরোধ মীমাংসা (মধ্যস্থতা)
  • সামাজিক নিরাপত্তা তালিকা প্রস্তুত ও স্থানীয় সমস্যা ডিজিটালভাবে ইউনিয়নে পাঠানো

উপকারিতা: জনগণের একেবারে দরজায় প্রশাসন, ক্ষুদ্র সিদ্ধান্ত স্থানীয়ভাবেই সমাধান

 

২. গ্রাম ও ওয়ার্ড পর্যায়

নতুন বিন্যাস

  • গ্রাম পরিষদ (Rural Ward Council) ও শহরে একীভূত ওয়ার্ড কাউন্সিল (বর্তমানের তুলনায় ছোট ও কার্যকর)

কাঠামো: গ্রাম সরকার, স্বেচ্চাসেবক

ক্ষমতা: প্রাথমিক অবকাঠামো অনুমোদন ওসামাজিক তদারকী

 

৩. ইউনিয়ন ও নগর ইউনিয়ন

ইউনিয়ন পুনর্গঠন

  • ইউনিয়নকে সার্ভিস হাব হিসেবে রূপান্তর/এক ইউনিয়নে সর্বোচ্চ ১৫–২০ হাজার জনসংখ্যা

নতুন দপ্তর

ইউনিয়ন সেবা কেন্দ্র (One-Stop Service): ভূমি, সামাজিক সুরক্ষা, পুলিশ লিয়াজোঁ ডেস্ক, আইনি সহায়তা, কর তদারকী

সিদ্ধান্ত ক্ষমতা

  • স্থানীয় বিধি (By-law) প্রণয়ন ও ইউনিয়ন পর্যায়ে জরিমানা ও প্রশাসনিক আদেশ

 

৪. উপজেলা পর্যায়: মূল বিকেন্দ্রীকরণ স্তম্ভ

উপজেলা রূপান্তর

  • উপজেলা হবে স্বায়ত্তশাসিত প্রশাসনিক জেলা-সমমান ইউনিট ও উন্নয়ন বিভাগ

ক্ষমতা বিকেন্দ্রীকরণ

  • ৬০–৭০% উন্নয়ন বাজেট উপজেলা পর্যায়ে
  • নিজস্ব জনবল নিয়োগের ক্ষমতা ও স্থানীয় আইন/বিধি পরীক্ষামূলকভাবে প্রয়োগ

দপ্তর কাঠামো

  • উপজেলা প্রশাসনিক বোর্ড
    • প্রশাসন, পুলিশ, প্রাথমিক আদালত, স্বাস্থ্য, জনসেবা কর্মকর্তা, শিক্ষা, ভূমি ও পরিবেশ, স্বাস্থ্য ও মানসিক স্বাস্থ্য, আইন ও বিচার, তথ্য ও মতামত

উপকারিতা

  • জেলা নির্ভরতা কমবে ও সিদ্ধান্ত দ্রুত বাস্তবায়ন হবে।

 

৫. জেলা পর্যায়: তদারকি ও সমন্বয়

জেলার নতুন ভূমিকা

  • সরাসরি সেবা নয়, বরং তদারকি, সমন্বয় কেন্দ্র, স্থানীয় প্রশাসন
  • বড় জেলাগুলোকে ভেঙ্গে নতুন জেলা করা।

জেলা পরিষদের ক্ষমতা

  • উপজেলা কার্যক্রম অডিট, আন্তঃউপজেলা বিরোধ নিষ্পত্তি, জেলা পর্যায়ের অবকাঠামো
  • শিক্ষা, স্বাস্থ্য, আইন, মানবাধিকার, মিডিয়া, জনমত, কর, কৃষি, খাদ্য উৎপাদন, রাজনীতি তদারকী ও সহযোগিতা

 

৬. বিভাগ পুনর্বিন্যাস

বর্তমান সমস্যা

  • বিভাগ বড়, দূরত্ব বেশি, কার্যকর নজরদারি কঠিন, বিভাগীয় পরিষদ, উপ মন্ত্রণালয় ও সচিবালয়

প্রস্তাব

  • ৮ বিভাগের পরিবর্তে ১২–১৪টি ছোট বিভাগ
  • প্রতিটি বিভাগে সর্বোচ্চ ৫–৮টি জেলা
  • বিভাগীয় সচিবালয় প্রতিষ্ঠা করে মন্তণালয়ের কাজ বিকেন্দ্রীকরণ করা।

বিভাগীয় ক্ষমতা

  • আঞ্চলিক পরিকল্পনা, প্রকল্প অনুমোদন, আঞ্চলিক আপিল ট্রাইব্যুনাল, বিভাগীয় ছায়া সংসদ প্রতিষ্ঠা

 

৭. কেন্দ্রীয় সরকার ও মন্ত্রণালয় পুনর্বিন্যাস

মন্ত্রণালয় কমানো

  • বর্তমান ~৫০ → ২৫–৩০টি শক্তিশালী মন্ত্রণালয়

নতুন কাঠামো,

  • নীতি নির্ধারণ → কেন্দ্র, বাস্তবায়ন → বিভাগ/উপজেলা

কেন্দ্রীয় ভূমিকা

  • সংবিধান> জাতীয় নিরাপত্তা >পররাষ্ট্র >ম্যাক্রো অর্থনীতি

 

৮. পোস্টাল ও ডিজিটাল বিভাগ

পোস্টাল কোড সংস্কার

  • মৌজা/মহল্লা ভিত্তিক ইউনিক কোড

ডিজিটাল অ্যাডমিন আইডি

  • প্রতিটি ইউনিটের QR/ডিজিটাল আইডি ও রিয়েল-টাইম ড্যাশবোর্ড

 

৯. রাজনৈতিক বিকেন্দ্রীকরণ

  • স্থানীয় দলীয় শাখার স্বাধীনতা ও স্থানীয় ইশতেহার বাধ্যতামূলক করা।
  • সংসদ সদস্যের ভূমিকা: আইন ও তদারকি ভিত্তিক হবে তা প্রশাসনিক নির্বাহী ক্ষমতার মতো হবে না।
  • এক নামে একাধিক এলাকার নাম বাদ দিয়ে গণ শুনানির মাধ্যমে কিছু এলাকার নতুন নাম রাখা হবে।
  • জেলা ও জেলা শহরের একই নাম থেকে বের করা হবে।
  • বিভাগ ও বিভাগীয় প্রধান জেলাকে একই নাম নাম থেকে বের করা হবে।
  • নতুন সড়ক সৃষ্টি করে প্রশাসনিক এলাকায় যোগাযোগ ব্যবস্থার সমন্বয় করা হবে।

পরামর্শ: জাহাঙ্গীর আলম শোভন, ছবি: কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা।

Comments

No comments yet. Why don’t you start the discussion?

Leave a Reply