রাগ
রাগ

মনে উৎকণ্ঠা জাগে কেন

মনে উৎকণ্ঠা জাগে কেন

আমরা প্রায়ই দেখি, কোনো কারণ ছাড়াই হঠাৎ মন অস্থির হয়ে ওঠে, বুক ধড়ফড় করে, হাত-পা ঠান্ডা হয়ে যায়, বা এক ধরনের অজানা ভয় কাজ করে। এই অনুভূতিকে আমরা সাধারণত “উৎকণ্ঠা” বা “অস্থিরতা” বলে থাকি। কিন্তু আসলে এটি শুধু মানসিক প্রতিক্রিয়া নয়, বরং মানবদেহের একটি প্রাকৃতিক জৈবিক প্রক্রিয়া। আমাদের মস্তিষ্কের ভেতর এমন একটি অংশ রয়েছে, যা সরাসরি এই অনুভূতির জন্য দায়ী—এর নাম লোকাস সিরুলিয়াস (Locus Coeruleus)।

লোকাস সিরুলিয়াস হলো মস্তিষ্কের স্টেম বা তলদেশে অবস্থিত একটি অতি ক্ষুদ্র অঞ্চল। আকারে ছোট হলেও এর কাজ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কয়েক হাজার স্নায়ুকোষ দ্বারা গঠিত এই অংশটি মূলত শরীরের “সতর্কতা” ব্যবস্থা নিয়ন্ত্রণ করে। যখনই আমরা কোনো বিপদ, আশঙ্কা বা অজানা পরিস্থিতির মুখোমুখি হই, তখন এই অংশটি সক্রিয় হয়ে ওঠে এবং শরীরে একধরনের রাসায়নিক সংকেত পাঠায়। এর ফলে আমরা সতর্ক হই, মনোযোগ বাড়ে, আবার কখনও অতিরিক্ত চিন্তা বা ভয়ের কারণে অস্থিরতা সৃষ্টি হয়।

এই পুরো প্রক্রিয়ার মূল রাসায়নিক উপাদান হলো নোরিপাইনেফেরিন (Norepinephrine)। এটি এক ধরনের নিউরোট্রান্সমিটার, যা মস্তিষ্কের কোষগুলোর মধ্যে বার্তা আদান-প্রদান করে। নোরিপাইনেফেরিন মূলত শরীরকে “লড়াই অথবা পালাও” (Fight or Flight) প্রতিক্রিয়ার জন্য প্রস্তুত করে। অর্থাৎ, যখনই আমরা ভয় বা উদ্বেগ বোধ করি, শরীর সঙ্গে সঙ্গে বিপদের মোকাবিলার জন্য প্রস্তুত হয়—হৃদস্পন্দন বেড়ে যায়, ঘাম হয়, শ্বাস-প্রশ্বাস দ্রুত হয়, আর মনোযোগ ভয় বা সমস্যার দিকে কেন্দ্রীভূত হয়।

তবে এই প্রক্রিয়া সব সময় ক্ষতিকর নয়। বরং অল্পমাত্রার উৎকণ্ঠা মানুষকে সচেতন রাখে, কাজের প্রতি মনোযোগ বাড়ায় এবং বিপদের সময় দ্রুত সিদ্ধান্ত নিতে সাহায্য করে। সমস্যা হয় তখনই, যখন এই উৎকণ্ঠা অযথা বা দীর্ঘস্থায়ী হয়ে যায়। অতিরিক্ত নোরিপাইনেফেরিন নিঃসরণ হলে মস্তিষ্ক সব সময় সতর্ক অবস্থায় থাকে, ফলে মন অস্থির হয়ে পড়ে, ঘুমের সমস্যা দেখা দেয় এবং মানসিক চাপ বেড়ে যায়।

চিকিৎসাবিজ্ঞানের গবেষণায় দেখা গেছে, উদ্বেগ বা ভয়জনিত রোগীদের ক্ষেত্রে ‘ভ্যালিয়াম (Valium)’ জাতীয় ওষুধ ভালো ফল দেয়। এটি লোকাস সিরুলিয়াসে নোরিপাইনেফেরিনের নিঃসরণ বন্ধ করে দেয়, ফলে মস্তিষ্ক ধীরে ধীরে স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে আসে। এই কারণে বারবিচুয়েট শ্রেণির ওষুধের তুলনায় ভ্যালিয়াম বেশি কার্যকর হিসেবে বিবেচিত হয়।

বিশেষজ্ঞরা বলেন, উৎকণ্ঠা সম্পূর্ণভাবে দূর করা সম্ভব নয়, কারণ এটি মানবদেহের স্বাভাবিক প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা। তবে নিয়মিত ব্যায়াম, পর্যাপ্ত ঘুম, ধ্যান, এবং মানসিক প্রশান্তি বজায় রাখার অভ্যাস উৎকণ্ঠা নিয়ন্ত্রণে রাখতে সাহায্য করে। তাই মন অস্থির লাগলে ভয় না পেয়ে বরং বুঝে নেওয়া উচিত—এটি শরীরেরই একটি সংকেত, যা আমাদের সজাগ রাখে, সতর্ক করে এবং জীবনের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় প্রস্তুত করে।

সূত্র: জ্ঞানের কথা
সৌজন্যে: টিম শোভনীয়
ছবি: ekushey-tv.com

Comments

No comments yet. Why don’t you start the discussion?

Leave a Reply