Salman-Shah
Salman-Shah

সালমান শাহ একজন বাংলাদেশী কিংবদন্তি

আধুনিক ঢালিউডের প্রথম সুপারস্টার

সালমান শাহ এমন একজন বাংলাদেশী অভিনেতা ও মডেল যিনি খুবই কম সময়ে কিংবদন্তি বনে গিয়েছেন। সালমান শাহ ছিলেন অসাধারণ অভিনেতা, সুদর্শন চেহারা, আকর্ষণীয় ব্যক্তিত্ব ও সবার কাছে অত্যন্ত জনপ্রিয়। যা তার মৃত্যুর পরে একটুও কমেনি। তার জনপ্রিয়তা আকাশচুম্বী। তার পর্দায় উপস্থিতি, বাচনভঙ্গি, বাহ্যিক সৌন্দর্য ও ফ্যাশন সেন্স ছিল সেই সময়ের তুলনায় অনেক বেশি আধুনিক। এজন্য এই সময়ে জনপ্রিয় অভিনেতারা তার ফ্যাশন এবং অভিনয় অনুপ্রেরণা হিসাবে দেখেন (শাকিব খান, আরিফিন শুভ, শরীফুল রাজ, সিয়াম আহমেদ এবং নিরব হোসেন সহ বেশ কয়েকজন)। তার অনেক ফ্যাশন স্টেটমেন্ট বাংলাদেশের পপ সংস্কৃতিতে প্রবণতা হয়ে উঠেছে। বিভিন্ন চলচ্চিত্রে সালমান শাহ কপালে রুমাল বাঁধতেন, পরবর্তীতে দেখা যায় তার এই রুমাল বাঁধা তৎকালীন তরুণ সমাজের মধ্যে ট্রেন্ডে পরিণত হয়ে যায়। গণমাধ্যমে তাকে “বাংলাদেশের চলচ্চিত্র জগতের রাজপুত্র”, “নায়কদের নায়ক”, “আধুনিক ঢালিউডের প্রথম সুপারস্টার”, “অমর মহানায়ক” এবং “স্বপ্নের নায়ক” উপাধিতে ব্যক্ত করা হয়।

১৯৭১ সালে ১৯ সেপ্টেম্বর বাংলাদেশের সিলেট শহরে দাড়িয়া পাড়া তার নানা বাড়ির আব এ হায়াত ভবনে (যা এখন সালমান শাহ ভবন হিসেবে পরিচিত) জন্ম গ্রহণ করেন। তার মাতা নীলা চৌধুরী ও পিতা কমর উদ্দিন চৌধুরী। তার জন্মগত নাম শাহরিয়ার চৌধুরী ইমন।

তিনি পড়াশোনা শুরু করেন খুলনার বয়রা মডেল হাইস্কুলে। ১৯৮৭ সালে তিনি ঢাকার ধানমন্ডি আরব মিশন স্কুল থেকে মাধ্যমিক পাস করেন ও আদমজী ক্যান্টনমেন্ট কলেজ থেকে উচ্চ মাধ্যমিক এবং ধানমন্ডির মালেকা সায়েন্স কলেজ (বর্তমান ডক্টর মালেকা বিশ্ববিদ্যালয় কলেজ) থেকে বি.কম. পাস করেন।

সর্বপ্রথম ১৯৮৬ সালে বিটিভিতে হানিফ সংকেতের অনুষ্ঠান ইত্যাদিতে একটি মিউজিক ভিডিওর মডেল হিসেবে কাজ করেন। এরপরে তিনি কয়েকটি বিজ্ঞাপন ও স্টেজ শোতে মডেল কাজ করেন। ১৯৮৫ সালে বিটিভিতে আকাশ ছোঁয়া নাটক দিয়ে অভিনয় শুরু করেন। পরে দেয়াল (১৯৮৫), সব পাখি ঘরে ফিরে (১৯৮৫), সৈকতে সারস (১৯৮৮), নয়ন (১৯৯৫), স্বপ্নের পৃথিবী (১৯৯৬) নাটকে অভিনয় করেন। ১৯৯৫ সালে নয়ন নাটকটি শ্রেষ্ঠ একক নাটক হিসেবে বাচসাস পুরস্কার লাভ করে। তিনি ১৯৯০ সালে মঈনুল আহসান সাবের রচিত উপন্যাস অবলম্বনে নির্মিত পাথর সময় ও ১৯৯৪ সালে ইতিকথা ধারাবাহিক নাটকে অভিনয় করেন।

১২ আগস্ট ১৯৯২ তার খালার বান্ধবীর মেয়ে সামিরা হককে বিয়ে করেন সালমান শাহ। সামিরা হক একজন বিউটি পার্লার ব্যবসায়ী। তিনি সালমানের ২টি চলচ্চিত্রে তার পোশাক পরিকল্পনাকারীর কাজও করেন। সালমান নতুন সঙ্গীত, ফ্যাশন এবং মোটরসাইকেল ও গাড়ির প্রতি শৌখিন ছিলেন। সবার প্রতি তার বন্ধুত্বপূর্ণ ব্যবহার, হৃদয়গ্রাহী মনোভাব এবং সহায়তাসুলভ আচরণ ছিল। শাহরুখ খানের সাথে সালমান শাহের অনেক ভাল সম্পর্ক ছিল এবং ১৯৯৫ সালে তিনি শাহরুখের বাড়িতে গিয়েছিলেন।

১৯৯৩ সালে আনন্দ মেলা প্রযোজনা প্রতিষ্ঠান তিনটি হিন্দি ছবি (সনম বেওয়াফা, দিল ও কেয়ামত সে কেয়ামত তক) এর মেধাস্বত্ব নিয়ে চলচ্চিত্র পরিচালক সোহানুর রহমান সোহানের কাছে আসে এর যে-কোনো একটির বাংলা পুনঃনির্মাণ করার জন্য। কিন্তু তিনি নায়ক-নায়িকা খুঁজে পাচ্ছিলেন না। তখন তিনি সিদ্ধান্ত নেন সম্পূর্ণ নতুন মুখ দিয়ে ছবি নির্মাণের। মৌসুমীকে নায়িকা নির্বাচিত করলেও নায়ক খুঁজে পাচ্ছিলেন না। তখন খোশনূর আলমগীর ‘ইমন’ নামে একটি ছেলের খোঁজ দেন। পরিচালক প্রথম দেখাতেই তাঁকে পছন্দ করে ফেলেন এবং সনম বেওয়াফা ছবির জন্য প্রস্তাব দেন। যখন ইমন ‘কেয়ামত সে কেয়ামত তক’ ছবির কথা জানতে পারেন তখন তিনি সেই ছবিতে অভিনয়ের জন্য জোরাজুরি করেন। তিনি জানান যে তিনি সেই সিনেমা মোট ২৬ বার দেখেছেন। অনেক জোরাজুরির পর পরিচালক কেয়ামত থেকে কেয়ামত চলচ্চিত্রটি নির্মাণের জন্য রাজি হন এবং নাম পরিবর্তন করে সালমান শাহ রাখা হয়। পরে মৌসুমীর সাথে তিনি আরও তিনটি চলচ্চিত্রে অন্তরে অন্তরে (১৯৯৪), স্নেহ (১৯৯৪) ও দেনমোহর (১৯৯৫) অভিনয় করেন। সাড়ে তিন বছরের ছোট সময়ের ক্যারিয়ারে তিনি মোট ২৭টি চলচ্চিত্রে অভিনয় করেন। যার বেশিরভাগই ছিল ব্যবসাসফল। ক্যারিয়ারের চূড়ায় থাকার সময় ১৯৯৬ সালের ৬ সেপ্টেম্বর মৃত্যুবরণ করেন।

তার মৃত্যুর আগে মন মানে না ছবির অর্ধেক কাজ শেষ হয়েছিল। তার মৃত্যুর পর চিত্রনায়ক রিয়াজ বাকি ছবি সম্পূর্ণ করেন। এছাড়াও কে অপরাধী, তুমি শুধু তুমি, প্রেমের বাজি সহ বেশকিছু মুভি সালমান শাহ অর্ধেক শুটিং করে মারা যান। পরবর্তীতে প্রেমের বাজি ছাড়া বাকি সিনেমাগুলি অন্য নায়ককে দিয়ে নতুন করে শুটিং করা হয়। সালমানের সিনেমার মধ্যে শুধুমাত্র প্রেমের বাজি সিনেমার কাজ পরে আর করা হয়নি।

১৯৯৬ সালের ৬ সেপ্টেম্বর সালমান শাহ মারা যান। ঢাকার ইস্কাটনে নিজের বাসায় ফ্যানের সাথে ঝুলন্ত মরদেহ পাওয়া যায়। ময়নাতদন্ত প্রতিবেদনে আত্মহত্যার কথা বলা হলেও তার মৃত্যুতে রহস্য থেকে যায়। অনেকেই তার মৃত্যুর জন্য স্ত্রী সামিরাকে দায়ী করেন। এমনকি তার পরিবারের পক্ষ থেকে স্ত্রী সামিরা সহ আরো কয়েকজনের নামে মামলা করা হয়। কিন্তু আজ পর্যন্ত এই মামলার আর কোনো কিছু হয়নি। ২০২০ সালের ২৪ ফেব্রুয়ারি তদন্ত বিভাগ জানায় যে তিনি আত্মহত্যাই করেছিলেন। শাহজালালের মাজারের পাশে সালমান শাহের সমাধি করা হয়।

Comments

No comments yet. Why don’t you start the discussion?

Leave a Reply