পরিবেশ সুরক্ষায় চাই আইনি কাঠামো
স্কুল জীবন থেকে পত্র-পত্রিকার চিঠিপত্র কলাম আর সরকারী দপ্তরে সমস্যার সমাধান নিয়ে লেখার অভ্যাস আমার। প্রথমবার সম্ভবত ২০১৩ কি ১৪ সালে পরিবেশ অধিদপ্তরে আমার লেখার প্রেক্ষিতে একটি শুনানিতে দাওয়াত পাই। পরে তারা পলিথিন নিয়ন্ত্রণের একটি ‘‘ধারণাপত্র’’ জমা দিতে বলে। জমা দিই। সেটা সেখানে শেষ।
২০২৪ এর আগষ্টের পরে আমি শুধুমাত্র পরিবেশ উপদেষ্ঠাকে ৪বার মেইল করেছি। ধন্যবাদও পেয়েছি। পরিবেশ ও প্রাকৃতিক সুরক্ষা সম্পদ আইনের করার কথা বলেছি। পরিবেশ সুরক্ষায় আলাদা আদালতের কথা বলেছি। পরিবেশ পুলিশের কথা বলেছি। পরিবেশ ও সৌন্দর্য রক্ষায় জনগনের অংশগ্রহণ বিষয়ক বিধিমালার কথা বলেছি। এগুলো নমূনা বা ড্রাপ্ট দিয়েছে। সেন্টমার্টিন দ্বীপ সুরক্ষায় পরিবেশ ও স্থানীয় জনগনের স্বার্থ রক্ষার জন্য কি করা যায় সেটাও বিস্তারিত একটি পরিকল্পনা দিয়েছি।
সম্প্রতি সিলেটের পাথর লুটের ঘটনায় যেকোনো নাগরিকের মতো আমিও হতাশ হয়েছি। আরো হতাশার বিষয় হলো ১ বছর ধরে ঘটনা ঘটেছে অথচ কেউ দেখলো না। আরো হতাশার বিষয় হলো বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতা যারা পরিবেশ বিষয়ে অভিজ্ঞ নয়। তাদের পাথর তোলার পক্ষের বয়ান। আরো হতাশার বিষয় হলো দল থেকে বহিষ্কার করেই ক্ষান্ত। কোনো গ্রেপ্তার নেই। পাথর ফিরিয়ে আনার ব্যবস্থা নেই। জরিমানাও নেই। যেখানে যাবজ্জীবন কারাদন্ড হওয়া দরকার ছিল।
এবার আসি পরিবেশ বিষয়ক যেসব পরামর্শ দিয়েছি সেগুলোর বিষয়ে
ক) পরিবেশ ও প্রাকৃতিক সুরক্ষা সম্পদ আইন
বাংলাদেশের আর্থ সামাজিক অবস্থা বিবেচনায় পরিবেশ আইনকে যুগোপোযোগী না করলে এর সুফল পাওয়া যাবে না। এখানে শাস্তির বিধান থাকতে হবে। দায়িত্বপ্রাপ্তদের দায়মুক্তি রাখা যাবে না। পরিবেশ আদালত এর মাধ্যমে দ্রুত মামলা নিষ্পত্তি করতে হবে। ক্ষেত্রে বিশেষে ‘‘সমসাময়’’ Sameday রায় ঘোষণা করতে হবে। পৃথিবীর অনেক দেশেই আইন ব্যবস্থা এখন এই পর্যায়ে রয়েছে। অবশ্যই সকল আইনকে সময় উপযোগী করতে হবে। আইন, বিচার ও প্রশাসন ব্যবস্থা ঢেলে সাজাতে হবে। যা আমি বিস্তারিত প্রস্তাবনায় দিয়েছি।
খ) পরিবেশ আদালত
পরিবেশ আদালত এই জন্য থাকবে যাতে মামলা দ্রুত নিষ্পত্তি হয়। এবং পরিবেশ সুরক্ষা প্রয়োজন এমন স্থানে আদালত স্থাপন করা যায়। এছাড়া এর বিচারক ও আইনজীবিগণ পরিবেশ বিষয়ে দক্ষ হয়ে উঠেন। পরিবেশ আইন বিষয়ক এক বছরের ডিপ্লোমা কোর্স চালু করে সে কোর্স সরকারী বেসরকারী উভয় প্রতিষ্ঠানে দিয়ে এ আদালত সকলকে এই বিষয়ে দক্ষ করে তুললে সুফল পাওয়া যাবে। এই কাঠামোও আমি তৈরী করে দিতে প্রস্তুত রয়েছি।
গ) পরিবেশ পুলিশ
পৃথিবীর অনেক দেশে পরিবেশ পুলিশ রয়েছে। বাংলাদেশ যেভাবে নদী, খাল, পাহাড়, পাথর, বালি, গাছ ও প্রকৃতিকে ধ্বংস করা হচ্ছে। তাতে পরিবেশ পুলিশ দরকার। যাদের আলাদা ইউনিফর্ম হবে। বিভাগীয় পর্যায়ে আলাদা পুলিশ লাইন থাকবে। জেলা পর্যায়ে পরিবেশ থানা থাকবে। থানা পর্যায়ে ‘‘ওসি-পরিবেশ’’ ও তার নিজস্ব টিম থাকবে। পরিবেশ সুরক্ষা করতে হবে এমন স্থানে তাদের ক্যাম্প থাকবে। উপজেলা পর্যায়ে মেজিস্ট্রেট থাকবে। নিয়মিত তারা পরিবেশ সুরক্ষায় কাজ করবে। রাস্তায় ময়লা ফেললেও তা তাদের এখতিয়ারের মধ্যে থাকতে হবে।
ঘ) পরিবেশ কর
এই ব্যয় মেটানোর জন্য পরিবেশ কর থাকবে। এটা সাধারণ জনগন পর্যায়ে খুব কম থাকবে। যেমন সকল সাধারণ করতাদার জন্য বছরে হয়তো ৫শ থেকে ১ হাজার টাকা। টাকা থাকলো। কিন্তু বাড়ির মালিক ও কমার্শিয়াল এর জন্য থাকবে বছরে ১ হাজার থেকে ৫ হাজার টাকা। শিল্প কারখানার জন্য থাকবে বর্গফুট অনুসারে। থাকবে বজ্যকর। যাদের বেশী বর্জ তারা তা দিবে।
এছাড়া যারা সরকারী ও প্রাকৃতিক সম্পদ এতদিন দখল করেছে। দিন ও বছর হিসেবে দখলি কর দিতে হবে। কেউ সীমানার বেশী বাড়ি নির্মাণ করলে তা না ভাঙ্গা পর্যন্ত তাকে বাড়তি কর দিতে হবে। যা সেখানকার আয়ের ৫০% হবে। এসব পরামর্শ আমি সরকারের আয় বৃদ্ধি সংক্রান্ত প্রস্তাবপত্রে উপস্থাপন করেছি।
এভাবে এসব কর সরকারের আয় বাড়াবে এবং পরিবেশ সংক্রান্ত ব্যয় সংকুলানের সহজ হবে।
ঙ) পরিবেশ সমিতি ও পরিবেশ রক্ষায় জনগনের অংশগ্রহণ সংক্রান্ত বিধিমালা
যেসব এলাকায় পরিবেশ সমিতি ও পরিচ্ছন্নতা সমিতি থাকবে। তাদের সদস্য হলে করহার স্বাভাবিক থাকবে। যারা সদস্য হবে না তাদের কম দ্বিগুন হবে। পরিবেশ সমিতি বিধিমালা থাকবে। প্রতিটি এলাকায় একটি সমিতি থাকতে হবে। বা হাউজিং সোসাইটির পরিবেশ কমিটি থাকতে হবে। প্রতি ১ বর্গকিলোমিটারের মধ্যে ১টি সমিতি ও অফিস থাকবে। যাদের একসাথে ১০ হাজার বগর্গফুটের বেশী জায়গা রয়েছে। তারা ২শ ফুটের একটি অফিস সরকারী কাজের জন্য দেয়া বাধ্যতামূলক হবে। যা আমি আবাসন বিধিমালায় লিখেছি। তাহলে এই জায়গাগুলোতে সরকারী, টিকাকেন্দ্র, প্রাণীসেবা ক্লাব, পরিবেশ ক্লাব, স্পো্র্্টস ক্লাব পরিচালিত হবে। যেগুলো স্থানীয় সরকার থেকে লাইসেন্স দেবে এবং তারা কোনো সরকারী অনুদান পাবে না।
প্রতিটি ব্যক্তির জন্য পরিবেশ বিষয়ক একটি প্রশিক্ষণ বাধ্যতামূলক করতে হবে। যা স্থানীয় সমিতি ও স্কুল থেকে এবং এনজিও থেকে দেয়া হবে। এজন্য সরকার একটি নির্দেশকিা প্রণয়ন করবে। সরকারী চাকুরি, বিদেশগমন, নির্বাচনে প্রার্থী, যেকোনো লাইসেন্স প্রাপ্তির জন্য এই প্রশিক্ষণ সনদ বাধ্যতামুলক হবে। প্রশিক্ষণ ফি থাকবে। যা সমিতিগুলোর আয়ের উৎস হবে।
কেউ চাইলে এককভাবেও পরিবেশ বিষয়ক স্বেচ্ছাসেবি হতে পারবে। কেউ সমিতিকে অনুদান দেবে কেউ নিজেই এলাকায় ময়লার বাক্স বা ভ্যান দিবে। তারা তাদের এই স্বেচ্ছাসেবি কাজের জন্য উপজেলা পরিবেশ কর্মকর্তার কাছ থেকে প্রশংসাপত্র গ্রহণ করবে। বিধিমালায় বিস্তারিত থাকবে যে, কতটা কাজ করলে সে প্রশংসা পত্র পাবে। এটা হলে প্রশিক্ষণ এবং সদস্য হওয়ার বিষয়ে শিথিলতা থাকবে। এর কোনোটাই না হলে পরিবেশ কর দ্বিগুন দিতে হবে। যা আয়করের সাথে যুক্ত হবে।
সেন্টমার্টিন দ্বীপ সুরক্ষায় পরিবেশ ও স্থানীয় জনগনের স্বার্থ রক্ষার জন্য কি করা যায় সেটাও বিস্তারিত একটি পরিকল্পনা দিয়েছি। সে বিষয়ে আলাদা লিখনী রয়েছে।
লেখা: জাহাঙ্গীর আলম শোভন
(অন্য একটা লেখার সংক্ষিপ্তরুপ)
ছবি: লেখকের সৌজণ্যে

