জুলাই গণহত্যা: কেন এই লাশের মিছিল

জুলাই গণহত্যা: কেন এই লাশের মিছিল

জুলাই গণহত্যা: কেন এই লাশের মিছিল

জুলাই ১ থেকে আগষ্ট ৫ মোট ১৫শ এর বেশী ছাত্র জনতার মৃত্যু বাংলাদেশের রাজনীতির ইতিহাসে সবচেয়ে কালো অধ্যায় হয়ে থাকবে। এই লাশের মিছিল নিয়ে নানা চর্চিত চরবণ চলছে। সাধারণ মানুষ একে সহজ ভাষায় একটি রাজনৈতিক দলের অন্যান্য সন্ত্রাসী কর্মকান্ডের মতো দলীয় প্রদানের নির্দেশে উচ্চপদস্থদের সহযোগিতায় পুলিশ ও দলীয় সন্ত্রাসীদের মাধ্যমে এবং তাদের দলের লোকদের মৌণ সমর্থক ও প্রশাসনের অন্যান্য নিরবতার মধ্য দিয়ে বাস্তবায়ন করা হয়েছে বলে এক কথায় বলে দেয়।

কারণ এই প্রতিটি বিশেষনের প্রমাণ তারা স্বচক্ষে দেখেছে।

১। দলীয় প্রদানের নির্দেশনা, মানুষ জানে এই নেত্রী সব সময় এভাবে নির্দেশনা দিয়ে মানুষ হত্যা করিয়েছে। এবং তারা দলের ভেতর যারা মানুষ হত্যা করতে পেরেছে তাদেরকে নানারকম পুরষ্কারে পুরষ্কৃত করেছে। শুধু তাই নয়। নিজ দলের একজন যদি আরেকজনকে খুন করেন তিনি খুনীর পক্ষ নিয়েছেন তাকে সহযোগিতা ও পূনবাসন করেছেন। শত শত প্রমাণও রয়েছে।

২। দলের শীর্ষ নেতারা একই নীতিতে চলে এবং জুলাই গণহত্যায় তাদের কর্মকান্ড বেশীরভাগই প্রকাশ্যে ছিল। তাদের মতামত প্রকাশ্যে ছিল। সূতরাং এটাও প্রতিষ্ঠিত।

৩। বাংলাদেশেতো বটেই সম্ভবত পৃথিবীতে এই একটি দল যাদের দলের লোকেরা যত অন্যায় করুন। ভেতরে কেউ সমালোচনা বা প্রতিবাদ করে না। যদি ধরে নেয়া হয় মানুষ মারায় বর্তমান বিশ্বে ইসরাইল তথা ইহুদিরা সব নৈতিকতা ও বিবেচনার উর্ধে।ব। প্রতিদিন চোখের সামনে ফিলিস্তিনীদের লাশ যেমন তাদের কাছে একটি ভিডিও গেম। সে দেশেও রাস্তায় মানুষকে প্রতিবাদ করতে দেখা যায়। আর এই দলটাতে কাউকে কখনো আনুষ্ঠানিক প্রতিবাদ বা সমর্থন প্রত্যাহার করতে দেখেনি কেউ। যে ২/১ জন বিচ্ছিন্ন ভাবে তাদের অবস্থান পরিবর্তন করেছেন। তারা অতি নগন্য তবে তারা সম্মানের।

৪। দলীয় লোকদের সহযোগিতা এটা কক্সবাজার কিংবা রংপুর, চূয়াডাঙ্গা কিংবা সিলেট। সব জায়গায় দলের লোকজন নিরস্ত্র সাধারণ মানুষের উপর ছড়াও হয়ে যেভাবে লাশের মিছিল লম্বা করেছে। ১৫ বছরের ঘটনা আর ৩৬ দিনের ঘটনা সব এক সূত্রে গাঁথা।

৫। প্রশাসনের নিরবতা ! হ্যাঁ ৯৬ সালে আরো কম সমস্যায় সচিবরা সরকারকে সহযোগিতা করা থেকে সরে দাড়ায়। এরশাদ বিরোধী আন্দোলনে ২৪ জনের নাম এলেও এই সংখ্যা অর্ধ শতাধিক হবে বলে বিভিন্ন সংবাদ মাধ্যমে এসেছে। তাতেও সেনাবাহিনী থেকে এরশাদের প্রতি সমর্থন প্রত্যাহার করার কারণে তাকে সরে যেতে হয়েছে। এখানে দেড় হাজার মানুষের মৃত্যুর পরও না আমলারা কোনো অবস্থান নিয়েছে না সেনাবাহিনী কোনো অবস্থান নিয়েছে। বরং সবাই সরকারকে সহযোগিতা করেছে।

৩ আগষ্ট সেনাবাহিনী জনগনের উপর অস্ত্র ধরবেনা এই বার্তার পর সবকিছু রাতারাতি বদলে যায় তাতে কোনো সন্দেহ নেই। কিন্তু তিনটি কারণে সেনাবাহিনী বাধ্য হয়।

ক) জাতিসংঘে শান্তিরক্ষী বাহিনী থেকে বাদ পড়ার আশংকা

খ) জুনিয়র অফিসারদের ও সেনাদের বিদ্রোহের আশংকা

গ) অস্ত্র চালিয়েও জনগনকে নিবৃত করতে না পারার আশংকা।

এবার আসি কেন লাশের এই মিছিল। ২০১৮ সালে যখন নিরাপদ সড়ক বিরোধী আন্দোলন হয় তখন আজকের এই ছেলেগুলো ৭ম থেকে ১১তম ক্লাসে পড়তো। তারা আজকে এই আন্দোলনের নেতৃত্বে। যদিও বিষয়টি সিআরআই-সহ সকলের দৃষ্টি এড়িয়ে গেছে। কারণ সে ছেলেগুলোর সে আন্দোলনের আত্মবিশ্বাসেই আজকে তারা এখানে নেতৃত্ব দিয়েছে। যাইহোক ২০১৮ সালে সরকার একরকম চুপ থেকে রাস্তা ঘাটের নিয়ন্তণ ছাত্রদের উপর ছেড়ে দিয়ে, কোনো অ্যাকশন না নিয়ে কোনো অবান্তর কথা না বলে খুব কৌশলগতভাবে এক সময় পরিস্থিতি সামলে নেয়। এই নিয়ে অন্য এক সময় লিখব।

কিন্তু ২০২৪ সালে তারা এতগুলো ভুল কেন করতে গেলো

১) দাবী আমলে না নিয়ে কৌশলে আদালতকে ব্যবহার করে নিজেদের ইচ্ছের প্রতিফলন ঘটানো।

২) দাবীর বিষয়ে ইতিবাচক মনোভাব না দেখিয়ে দলীয় প্রদান থেকে শুরু করে তাদের সর্বস্তরের নেতাকর্মীদের আন্দোলনকে কটাক্ষ করা, দমনের চেষ্টা করা।

৩) ছাত্রলীগ দিয়ে হামলা চালিয়ে আন্দোলন দমনের চেষ্টা করা।

৪) গোয়েন্দাবাহিনী কতৃক আন্দোলনের নেতৃত্বস্থানীয়দের আটক ও জিম্মি করা।

৫) গুলি চালিয়ে হত্যার মাধ্যমে আন্দোলন দমনের চেষ্টা করা।

প্রতিটি কৌশলই ভুল ছিল। অথচ ২০১৮ নিরাপদ সড়কের সময় সরকার কি করেছিল দেখি একবার

১) যেহেতু শিক্ষার্থীদের কোনো অস্ত্র ও বিশৃংখলা ছিল না তাই তারা সড়কের নিয়ন্ত্রণ তাদের হাতে ছেড়ে দেয়।

২) কিছু জায়গায় ছাত্রলীগ আন্দোলনকারীদের উপর হামলা করলেও সব জায়গায় সেটা হয়নি। এবং সবকিছু এভাবে সামাজিক মাধ্যমে দৃশ্যমান হয়ে উঠেনি। বা হামলার জন্য হাই কমান্ড থেকে সরাসরি বা পরোক্ষ মদদের বিষয়ে সামনে আসেনি।

৩) শিক্ষার্থীরা যখন মন্ত্রী এমপি ও সেনাদের লাইসেন্সবিহীন গাড়ি ধরছিল তখন তারাও একরকম ভুল স্বীকার করে নমনীয়তার পরিচয় দিয়েছে।

৪) বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীদের ৪/৬ জন করে থানায় ধরে এনে অভিভাবক খবর দিয়ে মুচলেকা নিয়েছে  যাতে তারা আন্দোলন না করে তারপর ছেড়ে দিয়েছে। এটা একটা দমননীতি হতে পারে। কিন্তু হত্যাকান্ডের চেয়ে হয়তো ভাল ছিল। তাই এটা ব্যাক ফায়ার করে নি।

চারটি শিথিল কৌশল একটা বৃহৎ আন্দোলনকে ছোট করে একসময় নি:শেষ করে দিয়েছে অথচ ৫টি বড়ো ধরনের ভুল একটি ছোট ইস্যুভিত্তিক আন্দোলনকে জাতীয় আন্দোলনে রুপ দিয়েছে। এবার আমি মুল বিষয়।

কেন লাশের মিছিল?

বাংলাদেশের ইতিহাসে ২০২৪ সাল এক বিভীষিকাময় মোড় নিয়েছিল। হাজার হাজার ছাত্র, তরুণ, পথচারি, সাধারণ মানুষ একত্র হয়েছিল একটি দাবিতে—নির্বাচন, গণতন্ত্র, ন্যায়বিচার। কিন্তু এই মানুষের ঢেউ থামাতে ক্ষমতাসীনদের পছন্দ ছিল রক্ত। ফলাফল—মাত্র কয়েক সপ্তাহে ১৫৮১ জন মৃত্যুবরণ করে, যাদের অধিকাংশই ছিল তরুণ, নিরস্ত্র এবং রাষ্ট্রের নাগরিক।

এই লাশের মিছিল কেবল সংখ্যা নয়, এটি একটি রাষ্ট্রযন্ত্রের নিষ্ঠুরতা, এক সরকারব্যবস্থার আতঙ্ক, এবং ভ্রান্ত ধারণার ফলাফল।

প্রথম কারণ: আতঙ্ক সৃষ্টি দমন নীতির পুনরাবৃত্তি

সরকারের ভেতরের একটি অংশের বিশ্বাস ছিল—যদি তারা শুরুতেই “হাজার খানেক লাশ ফেলতে পারে”, তবে বাকিরা ভয় পেয়ে ঘরে ঢুকে পড়বে। এই চিন্তা একেবারেই নতুন নয়। ইতিহাস ঘেঁটে দেখলে দেখা যায়, একনায়কতান্ত্রিক শাসকেরা প্রায়ই এমন কৌশল নেয়—“ভয় দেখিয়ে নিয়ন্ত্রণ।”
তারা বুঝে উঠতে পারেনা যে কখনো কখনো আর মানুষ ভয় পায় না, বরং মরতে মরতে আরো জেগে উঠে।

দ্বিতীয় কারণ: হিরো তৈরির পথ রুদ্ধ করা

প্রথম দিকের শহীদদের মধ্যে অন্যতম ছিলেন আবু সাইয়িদ, যিনি পুলিশের গুলিতে নিহত হন। এই মৃত্যু যেন আরেক নূর হোসেন, আরেক ডা. মিলনের জন্ম না দেয়—এই ভয়ে, সরকার আর একক কোনো নামকেই সামনে আসতে দিতে চায়নি। তাদের ধারণা ছিল মৃত্যু বেশী হলে আর কেউ হিরো হবে না। যেটা ইসরাইলে করছে ফিলিস্তিনবাসীদের উপর।

তাদের কৌশল ছিল সরাসরি—হাজার হাজার মানুষকে হত্যা করো, যেন গণনায় কেউ না থাকে। একটি মুখ যেন আন্দোলনের প্রতীক না হয়ে ওঠে। এ এক সিরিয়াল কিলিংয়ের কৌশল, যেখানে ব্যক্তিগত দোষের বদলে পরিকল্পিতভাবেই গুম, খুন, ধর্ষণ এমনভাবে সাজানো হয়েছিল যে, একটার পর একটা ঘটনা চাপা পড়ে যায়। বিগত দিনের পত্রিকাগুলো কেউ বিশ্লেষণ করলে এর প্রমাণ পাবে। তারা তাদের ১৫ বছরর সফলতাকে একই ভাবে উদযাপন করতে চেয়েছিল। এক ইলিয়াছ আলী গুম ছাপা পড়ে গিয়েছিল আরো ১ হাজার গুমের নিচে।

তৃতীয় কারণ: হত্যাকে পুরষ্কারের সিঁড়ি বানানো

এই হত্যাযজ্ঞের সবচেয়ে ভয়ংকর দিক ছিল এর পেছনের প্রণোদনা। গত দেড় দশকে যারা গুম, খুন, দমনপীড়নে সক্রিয় ছিল, তারা শুধু প্রমোশনই পায়নি—তারা পেয়েছে কোটি কোটি টাকার সম্পদ গড়ার সুযোগ, বিদেশে টাকা পাচার, ক্ষমতা ও আইনের ঊর্ধ্বে থাকার লাইসেন্স। তারা টাকা, ক্ষমতা, জমি দখলের অবৈধ ক্ষমতা, নারীবাজির ক্ষমতা এমনকি ক্যাসিনো ব্যবসার শক্তি। সব তারা যেন পৃথিবীতে স্বর্গ পেয়েছে।

এমন এক সংস্কৃতি তৈরি করেছিল যা একটি ভয়ানক প্রতিযোগিতার দিকে যায় পুলিশ, আমলা ও দলীয় নেতাদের। কে কত বেশি হত্যা করতে পারল, কে কতটা নির্মম হতে পারল—তার ওপর ভিত্তি করে ভবিষ্যৎ নির্ধারিত হতো পুলিশের ভেতরে এবং দলের অভ্যন্তরে।

শ’খানেক পুলিশ ও দলীয় নেতাকর্মী এমন ছিল যারা পূর্বে এ ধরনের নিষ্ঠুরতা করে পুরষ্কৃত হয়েছিল। এ কারণেই পুলিশ ও দলের ভেতরের একটি অংশ ২০২৪ সালের হত্যাকাণ্ডকে “ক্যারিয়ার গঠনের সুযোগ” হিসেবে দেখেছিল।

কেন এই গণহত্যাই সরকার পতনের কারণ হলো?

মানুষ চুপ থাকলেও সবসময় ভীত থাকে না। যখন প্রিয়জন হারায়, যখন চোখের সামনে বন্ধুকে গুলি করে হত্যা করা হয়, যখন কেউ আর রাস্তায় নামতে পারবে কি না জানে না—তখন আতঙ্কের সীমা পেরিয়ে তা রূপ নেয় প্রতিরোধে।

শুরুতে বিচ্ছিন্ন, নেতৃত্বহীন আন্দোলন ধীরে ধীরে এক গণঅভ্যুত্থানে রূপ নেয়। ১৫৮১ জন শহীদের রক্ত তখন আর ভয় ছড়ায় না, ছড়ায় আগুন। এই আগুনেই গলে যায় একটি দমন-পীড়নভিত্তিক ক্ষমতা। সরকার পতন তখন সময়ের ব্যাপার মাত্র।

যখন মৃত্যুকে সহজ করে দেয়া হয় তখন আর মানুষ মৃত্যুকে ভয় পায়না। যেভাবে শেখহাসিনা পরিবারকে হত্যা করার কারণে মানুষের মৃত্যুতে তার কোনো অনুভূতি হয় না। উল্টো কটাক্ষ অভিনয় ও নানা ছলচাতুরী করে।

লাশের মিছিল আজ ইতিহাসের অনুচ্ছেদ নয়, এটি একটি জাতির চেতনার কেন্দ্রবিন্দু। এই লেখার প্রতিটি বাক্যে, প্রতিটি যুক্তিতে, প্রতিটি নামহীন শহীদের রক্ত লেগে আছে।

১৫শ এর বেশী ছাত্র জনতা শুধু শহীদ হয়নি—তারা জন্ম দিয়েছে নতুন প্রভাতের। যে রক্তে লেখা হয় ইতিহাস, সেই ইতিহাসের পাতায় একদিন স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে—২০২৪ সালের অভ্যুত্থান কেবল রাজনৈতিক পরিবর্তন নয়, এটি ছিল মানুষের, মনুষ্যত্বের, মর্যাদার জাগরণ।

তবে তারা এখানেই থামে নি। তাদের কাজকে আড়াল করার জন্য তারা ম্যাট্রিকুলাস ডিজাইন, বুলেট ইস্যু, কিছু মানুষ মৃত ভাবা হয়েছে পরে ফেরত আসছে, এছাড়া জুলাই যোদ্ধাদের নানা ভুল ভ্রান্তি প্রচার করে আবারো খুণের লীলা খেলার প্রকাশ্য হুমকি দিচ্ছে।