নেপালের নারী

নেপালের নারী সমাজ

নেপালের নারী সমাজ

জাহাঙ্গীর আলম শোভন- নেপাল থেকে ফিরে (২০১৪)

বিশ্বের একমাত্র হিন্দু কিংডম নেপাল। রাজতন্ত্র থেকে ধীরে ধীরে গণতন্ত্রে উত্তরণ ঘটছে দেশটির । আয়তন ১৪৭১৮১ বর্গকিলোমিটার। বাংলাদেশের কাছাকাছি আয়তন হলেও জনসংখ্যা আমাদের ৬ ভাগের এক ভাগ।  বেশীরভাগ জনগোষ্ঠির জীবনধারা দরিদ্রসীমার অনেক নিচে। আর্থ সামাজিক রেখায় আমাদের চেয়ে পিছিয়ে থাকলেও প্রাকৃতিক সৌন্দর্য ও হিমালয়ের অবস্থানের কারণে নেপালের খ্যাতি ও পরিচিতি রয়েছে বিশ্বমন্ডলে। গৌতমবুদ্ধের জন্মস্থান হিসেবেও নেপাল আদৃত।

নেপালের রাজণীতিতে বামঘরানার একটা বিশাল প্রভাব রয়েছে। প্রতিবেশী চীনের মাও প্রভাব এখানে ব্যাপক। দীর্ঘদিনের রাজতন্ত্র এখানে সমাজতন্ত্রের প্রতি মানুষের দূর্বলতা সৃস্টি করেছে। রাজনৈতিক সহিংসতার দিক থেকে দক্ষিণ এশিয়ায় পাকিস্তান এবং বাংলাদেশের পরেই নেপালের স্থান।  নির্বাচনকে ঘিরে এখানেও কিছু সহিংসতা ঘটে।

নেপালের  জাতীয় আয়ের বড় অংশ আসে পর্যটন থেকে। তথাপিওনেপালের পিছিয়ে পড়ার পিছে কিছু কারণ রয়েছে প্রথমত নেপালের ভূগন্ডের মাত্র ২২% চাষাবাদ উপযোগী।  পুরো দেশটাই পাহাড় আর পাহড়। মাথাপিছু আয় ২৪০ মার্কিণ ডলার ।

প্রায়২৩ মিলিয়ন জনসংখ্যা অধ্যুষিত দেশটির অর্ধেকই নারী। তবে জীবনের প্রয়োজনে পারিবারিক জীবনে আর্থিক খাতে নারীর অংশগ্রহণ বাংলাদেশ ও ভারতের চেয়ে ভালো।  এটা খুব সহজে চোখে পড়ে। শহরের রাস্তায় সর্বত্র নারী পুরুষের সমান উপস্থিতি রয়েছে। এমনকি ফটপাতে ফলবিক্রেতার হকারদের মধ্যেও নারীদের সংখা উল্লেখযোগ্য।  মফস্বলের ছোট হোটেল লজ দোকানে নারীদের অংশগ্রহণ পুরুষদের তুলনায় বেশীই বটে। বর্তমানে মালয়েশিয়া ও মধ্যপ্রাচ্্েয নেপালের প্রচুর পুরষ এবং নারী কমীদের কর্ম সংস্থান হয়েছে।  অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায় পরিবারের পুরুষ সদস্য বিদেশ আর দেশে নারী সদস্যরা খেতে খামারে কাজ করছে অথবা দোকান পাট খুলে বসেছে। একটি পরিবারে সামনের দিকে একটি দোকান বা রেস্ট হাউস আর পেছনে তাদের বসবাসের বাড়ি। এমন হরদম চোখে পড়ে বিশেষ করে ট্যুরিজম এরিয়াতে।  বেশ কয়েকটি রেস্টুরেন্ট খাওয়া দাওয়া করলাম মা ক্যাশে বসেছেন আর তার মেয়েরা বেয়ারার কাজ করছেন সাথে বেতনভুক্ত হয়তো আরো দুটো মেয়েও আছে।  হাইওয়ে রেস্টুর্টেগুলোতে মেয়েদেরকেই বেশী দেখেছি পুরুষদের চেয়ে। এমনি একটা রেস্টুন্টে কথা বলছিলাম এরমালিক তথা মা তপতি রাণীর  এরসাথে।  তিনি বললেন আসলে একসময় পুরো নেপালই কৃষিনির্ভর ছিলো। কিন্তু জনসংক্যা আর মানুষের চাহিদা বৃদ্ধির কারনে সবাইকে বিকল্প পেশা বেছে নিতে হচ্ছে। বুঝলাম এধরনের ব্যবসা বানিজ্য যারা খুলতে পেরেছে তারা অন্যদের তুলনায় ভালোই আছে। কিন্তু যাদের ওই সামর্থটুকু নাই তারা ভারি বেকায়দায় আছে নেপালে।  জিনিসপত্রের মতো চলাফেরার ভাড়াও অনেক বেশী নেপালে। আর পাহাড়ী উচু নিচু রাস্তা,কাঠমান্ডুতে এক অংশে কিছু রিকসা দেখেছি। প্রধান চলাচল টেক্সিতে।  বাস সার্ভিস আছে। কিন্তু ভাড়া অনেক বেশী । বাধ্য হয়ে নেপালীরা চড়ে মোটর বাইকে।  ঢাকার রাস্তায় যেমন রিকসা আর রিকসা নেপালের রাস্তায় সারি সারি মোটর সাইকেল। এখানেও পুরুষ এবং নারীর সংখ্যা সমান। ঢাকায় যেখানে ১% মহিলাও পাওয়া যাবেনা সেখানে নেপালে মোটরসাইকেল ধারী নারী পুরুষের সংখ্যা প্রায় সমান। যারা শহরে চাকুরী করেন। তাদের বেশীরভাগ লোকেরই একটি মোটর সাইকেল আছে সে পুরুষ হোক আর নারী হোক। যাদের এতোটুকু নেই তারা সত্যিই অসহায়। তাদের বেশী ভাড়াগুনে, ঝুলে লোকাল বাসে পাড়ি দিতে হয় পাহাড়ী উচুনিচু রাস্তা।  অন্যান্য পন্যের মতো মোটরবাইক গুলোও চায়না অথবা ভারতীয়। ভারতীয় পন্যের অন্যতম বাজার নেপাল। কিছু সিমেন্ট ছাড়া নেপালীদের বলতে গেলে নিজস্ব পোডাক্টস নেই। যেগুলো আছে তার অনেকগুলোই ভারতীয় মালিকানাধীন। বংলাদেশী একটি পন্য দেখেছি সেটা হলো বসুন্ধরা পকেট টিস্যু। দাম জিজ্ঞেস করতেই দোকানী হাকালো একদাম ২০ রুপি। এখানে দোকান মালিক থেকে শুরু করে ব্যবসা বানিজ্যে ভারতীয় পন্য ও ভারতীয়দের একচ্চত্র আদিপত্য। নেপালের রাজনীতিও ভারতের অনুকুলে। অনেক নেপালী এজন্য রাজণীতিবিদদের প্রতি বেশ ক্ষুব্দ।

আর্থ সামাজিক কাজে নেপালের নারীদের ব্যাপক অংশগ্রহণ থাকলেও নেতৃত্বে তাদের অবস্থানশক্ত নয়। সূতরাং পরিবার ও রাষ্ট্রের জন্য কাজ করেও নিজের অধিকারের বেলায় এশিয়ার অন্যদেশের মতো এখানেও নারীরা ভালো নয়। বিষয়টি আমাকে বেশ পীড়া দিয়েছিল। নারী পরিবার অথবা সমাজ গঠনে সমানভাবে অংশ নিয়ে কেন তার নিজের পাওনার বেলায় পিছিয়ে থাকবে। এ সত্যি অবিচার।  কথা বলালাম একজন হিন্দু স্বামীজি নেপাল কংগেসেরে সদস্য কো রিলেজিওন সংগঠক তামুদা গৌতম এর সঙ্গে। তিনি জানালেন শিক্ষায়  পিছিয়ে থাকা এর অন্যতম কারণ।  আমার কাছে মনে হলো ধমীয় ট্যাবু ও পুরুষতান্ত্রিক সমাজের দৃষ্টিভঙ্গি এর প্রধান কারণ। এই বৈষম্যের সবচে বড়ো শিকার গ্রামের নারীরা। তারা একদিকে গৃহস্থালীর কাজ করে, কাজ করে মাঠে এমনকি বাজারে গিয়ে কলাটি পেরায়াটিও তাকে বিক্রি করতে হয়। কিন্তু দারিদ্রের টানাপোড়েন আর সামাজিক বৈষম্য নারীর মেরুদন্ডকে বাঁকিয়ে রেখেছে হাজার বছর ধরে।  হিন্দু অধ্যুষিত দেশ নেপাল । এখানে হিন্দু আচার কঠোরভাবে পালন করা হয়। যেহেতু হিন্দু ধর্মে পিতার সম্পতিতে নারীর অধিকার নেই। সেহেতু একজন নারী শক্ত ভিত্তির উপর দাড়াতেই পারেনা পরিবারের জন্য হাড়ভাঙা খাটুনি দেয়ার পরও। যদিও ২০০৬ সাল এর পর থেকে বেশকিছ’ সংস্থা নারীদের উন্নয়নের জন্য কাজ করছে।

শতকরা ৪% মুলিম আছে নেপালে তাদের অবস্থা আরো করুণ। যদিও এদের একটা অংশ ভারত ও পাকিস্তান থেকে আসা। মুসলিমদের দ্ধারা পরিচালিত একটি বিদ্যালয় পরিদর্শণ করতে গিয়েছিলাম কাটমান্ডুর কেন্দ্রস্থলেই। দেখলাম সারা কাঠমান্ডু শহরে মুসলিম মেযেদের প্রাথমিক শিক্ষায় ইংরেজীটুকু পড়ানোর জন্য কোনো মুসলিম শিক্ষিকা পাওয়া যায়নি।  এমনকি মাদ্রাসায় ইংরেজী অংক পড়ান হিন্দু নারী শিক্ষিকা এবং সেটা অন্য কোনো কারনে নয়। শুধুমাত্র  ইংরেজী পড়াতে পারে এমন মুসলিম রমনীর অভাবে। একুশ শতকে এটা শুনে অনেকেই অবাক হতে পারে।

নেপালের নারীদের উন্নয়নের জন্য সরকার ৬ দফা প্যাকেজের বিশেষ পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে। নারী কল্যানের জন্য  আলাদা মন্ত্রনালয় করা হয়েছে। বিশেষ করে নবম পরিকল্পনার মাধ্যমে সরকার কিছু কাজ করছে। এর মধ্যে তারা শিখ্ষাকে অগ্রাধিকার দিয়েছে। কিন্তু দূর্গম পাহাড়ী অঞ্ছলে এসব কাজকে ছড়িয়ে দেয়া সরকারের জন্য চ্যালেঞ্জ হয়ে দেখা দিয়েছে।

শিক্ষা ও চাকরীতে নারীর অংশগ্রহণ বাড়লেও সামাজিক অধিকার, নেতৃত্ব এবং সিদ্ধান্তগ্রহণ পক্রিয়ায় তারা বেশ পিছিয়ে এখনো। এ নিয়ে কথা বলেছিলাম নেপালের একটি টিভি চ্যানেলের নির্বাহী পরিচালক ইন্দিরা মানেন্দর এর সাথে। বললেন নারীদের অগ্রগতি হচ্ছেনা তা নয়। কিন্তু সেটা খুব গতিশীল নয়। তবে বেশকিছু বিষয়ে নারীদের অগ্রগতি চোখে পড়বে।।

নেপালের সংস্কৃতি বেশ সমৃদ্ধ তার পরিচয়ে মেলে এখানকার হেরিটেজগুলোতে। বাসায় গাড়িতে রেস্টুরেন্টে নেপালীগানের ব্যাপক শ্রƒতি দেখেছি। নেপালে অনেকগুলো টিভি চ্যানেল রয়েছে। ভারতীয় সংস্কৃতির প্রভাব থাকলেও নেপালীরা নিজেদের সংস্কৃতিকে প্রাধান্য দেয়।  রাস্তায় নেপালী মেয়েদের চলাফেরা বেশ স্বতস্পূর্ত। মনে হলো এদের ইভটিজিং করারমতো কারে তেমন সময় বা প্রয়োজন নেই।  বার বা ডান্স ফ্লোরগুলোতে নেপালী ও ভারতীয় মেয়েদের উপস্থিতি বেশ সচকিত। পর্যটন নির্ভর অর্থনীতি আর পর্যটন বান্ধব দেশে বর্হি সংস্কৃতির গড্ডালিকা অথবা অর্থের পিছে টানাটানির ঘরের মেয়েরা ছুটলে সেটা আসলেই অবাক হওয়ার কিছু নেই।

রাজনৈতিক প্রতিবন্ধকতা হোক আর সহিংসতার ঘটনা থাকুুক যেকোনো কারনেই হোক রাজণিিততে নেপালী নারীদের উপস্থিতি তুলনামুলক কম অন্যান্য সেক্টরের হিসেবে। এ বিষয়ে কথা বলছিলাম কয়েকজন নেপালির সাথে। তারা পুরুষকেন্দ্রীক সমাজব্যবস্থা আর অস্থির রাজনৈতিক পরিস্থিতিকেই দায়ী করলেন।

নেপালী সংস্কৃতির উল্লেকযোগ্য বিষয় হলো কুমারী পূজা। কুমারীপুজা ভারত ও বাংলাদেশেও হিন্দুদের মাঝে প্রচলিত আছে। কিন্তু নেপালে এর ঝাঁক জমক, ভাব আবেগ অনেক বেশী। পুরো আনুষ্ঠানিকতাও বেশ আভিজাত। সবচে মজার ব্যাপার হলো প্রতি বছর যে কিশোরী মেয়েটিকে কুমারীপূজার জন্য সাজানো হয়। নেপালে মেয়েিেটর আর বিবাহ হয়না  তাকে সারাজীবন কুমারী হয়ে থাকতে হয়।  নেপালীদের ধারণা তার উপর দেবী ভর করেছে সূতরাং তার সাথে আর কোনো মানুষ সংসার করতে পারবেনা। তাদের মধ্যে এক ধরনের ভীতি কাজ করে।  যদিও মেয়েটিকে সবাই ভক্তি শ্রদ্ধা করে এবং সরকার তাদের পূর্ণবাসনও করে তথাপি মেয়টি তার জীবনের স্বাভাবিক ইচ্ছা আকাংখা থেকে বঞ্চিত হয়। এ বিষয়ে কয়েকটি সংস্থা পরিবর্তনের চেষ্টা করে এখনো খুব একটা সফল হয়নি। সাম্প্রতিক বছরসমূহে ২/১টা মেয়ে এই ট্যাবু ভাংতে চেয়েছিলো। কিন্তু এই খবর যথাসম্ভব গোপন রাখা হয়।

বাংলাদেশে প্রচুর নেপালী শিক্ষার্থী রয়েছে। যাওয়ার সময় বিমানে দেখলাম আমাদের সহযাত্রী চিলো বেশকয়েকটি মেয়ে শূঔু বাংলাদেশের বিভিন্ন মেডিক্যাল কলেজের ছাত্রী তারা। ফেরার পথে আমাদের ফ্লাইটে আিিধপত্য ছিলো নেপালীদের মূলত তারা ঢাকা হয়ে কৃয়ালালামপুর যাচ্ছে জীডবিকার সন্ধানে। তাতেও দেখলাম এক তৃতীয়াংশ নারী কর্মী।

বাংলাদেশের সাথে নেপালের নৌ যোগাযোগ থাকতো অথবা ট্রানজিট থাকতো তাহলে একটি নতুন দিগন্ত উম্মোচিতহতো। বাংলাদেশীরা পেতো নেপালে ব্যবসা করার সুযোগ। আর নেপালীরা পেতো পছন্দের দামে মানসম্মত বাংলাদেশী পন্য। ভবিষতে যতি ট্রানজিট সুবিধা চালু হয় তাহলে একটা ক্ষেত্রে ব্যবসার সুযোগ খুব বেশী। নেপাল থেকে কাঠ রফতানীর মাধ্যমে আমরা কাঠের চাহিদা মেটাতে পারি আর নেপাল পারে বিদেশী  মূদ্রা অর্জণ করতে।

ছবি: Unflash

Comments

No comments yet. Why don’t you start the discussion?

Leave a Reply