দেশে দেশে পুরনো চিকিৎসা পদ্ধতি যা আজো টিকে আছে
পৃথিবীর নানা দেশে বহু প্রাচীন, দার্শনিক, আধ্যাত্মিক বা বৌদ্ধিক ভিত্তির উপর গড়ে ওঠা চিকিৎসা পদ্ধতি আছে—যেগুলোর উদ্দেশ্য মূলত বাণিজ্যিক নয়, বরং মানবিক সেবা, প্রাকৃতিক ভারসাম্য ও শারীরিক-মানসিক সুস্থতা অর্জন।
১. চীনা ঐতিহ্যবাহী চিকিৎসা: (Traditional Chinese Medicine – TCM)
এটা মূলত ২,৫০০ বছরের পুরনো, এর উৎস: হুয়াংদি নেইজিং (Yellow Emperor’s Inner Canon) যে দর্শনে এটি বিকশিত হয়েছে তা হলো ইন-ইয়াং বা পাঁচ উপাদান তত্ত্ব, চি (Qi) যার বাংলা অর্থ জীবনশক্তি।
উপাদানগুলো হলো – আকুপাংচার, হারবাল মেডিসিন (চীনা ভেষজ), কুপাংচার, থুইনা (চিকিৎসা ম্যাসাজ), চি-গং (শ্বাস ও শরীরের অনুশীলন)
প্রাচীন হলেও এর কার্যকারিতা এবং গ্রহণযোগ্যতা একে টিকিয়ে রেখেছে। এটি চীনে জাতীয় চিকিৎসাব্যবস্থার অংশ। আমেরিকা, কানাডা, ইউরোপ, অস্ট্রেলিয়ায় লাইসেন্সপ্রাপ্ত এবং বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা WHO অনুমোদিত কিছু চিকিৎসা পদ্ধতি
বিশেষ করে ব্যথা, গ্যাস্ট্রিক, মানসিক চাপ, গাইনোকলজিক সমস্যা, ইনসমনিয়া ইত্যাদিতে গবেষণাভিত্তিক কার্যকারিতা রয়েছে।
২. জাপানি ঐতিহ্যবাহী চিকিৎসা (Kampo Medicine)
এটি চীনা চিকিৎসা থেকে প্রভাবিত হলেও জাপানে ৫ম শতক থেকে প্রচলিত। এরপর নিজেদের মতো করে বিকশিত হয়েছে। এটা এতটাই বিকশিত হয়েছে যে, শুধু আলাদা নাম নয় আধুনিক জাপানে এটি মূলধারার চিকিৎসার অংশ
এই চিকিৎসার উপাদানের মধ্যে রয়েছে, হারবাল ফর্মুলা (যেমন: Juzentaihoto, Hochuekkito), মন ও দেহের ভারসাম্য, লক্ষণভিত্তিক ও শরীরভিত্তিক (体質 – Taishitsu) চিকিৎসা
বর্তমানে জাপানে ৮০% ডাক্তারের প্রেসক্রিপশনে Kampo ব্যবহৃত হয় এমনকি এটি স্বাস্থ্য বীমার আওতায় রয়েছে। কেউ কেউ এটাকে পশ্চিমা চিকিৎসার পরিপূরক হিসেবে ব্যবহার করে।
বিশেষ করে ক্যান্সার পেশেন্টদের সাপোর্ট থেরাপি. হজম, ক্লান্তি, নারীদের স্বাস্থ্য সমস্যার ক্ষেত্রে এর গবেষণাভিত্তিক স্বীকৃতি রয়েছে
৩. আয়ুর্বেদ (ভারত)
ভারতের আয়বের্দ চিকিৎসা পদ্ধতি প্রায় ৫ হাজার বছরের পুরনো। এর উৎস: বেদ, বিশেষ করে “আথর্ববেদ” হলেও অনেকে মনে করেন পরে এটি অন্যান্য ট্রাডিশনাল মেডিসিন থেকে সমৃদ্ধ হয়েছে। এর দর্শন হলো : দোশা (ভাত, পিত, কফ), পঞ্চতত্ব (পৃথিবী, জল, অগ্নি, বায়ু, আকাশ)
এই চিকিৎসার উপাদানের মধ্যে রয়েছে- হের্বস, তেল থেরাপি (Abhyanga), শিরোধারা, পঞ্চকর্ম (শরীরশুদ্ধির ৫টি পদ্ধতি), খাদ্যাভ্যাস ও জীবনাচার নিয়ন্ত্রণ
বর্তমানে ভারত সরকারের অধীনে “AYUSH” মন্ত্রণালয়, এটি ভারতের বাইরে বিশেষ করে ইউরোপ, আমেরিকাতে প্রচলন রয়েছে। ইউনেস্কো এটিকে প্রাচীন ঐতিহ্য হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে।
এটি দীর্ঘস্থায়ী ব্যাধি, স্নায়বিক সমস্যা, লিভার, মানসিক চাপ ও রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধিতে কার্যকর
৪. তিব্বতীয় চিকিৎসা (Sowa-Rigpa বা Tibetan Medicine)
আয়ুর্বেদ, চীনা এবং গ্রিক চিকিৎসার সংমিশ্রণে এই পদ্ধতির বিকাশ লাভ করে একে Gyud-Zhi (Four Medical Tantras)ও বলা হয়। এর দর্শন: “তিন দোশা” (loong, tripa, badkan) এর প্রকৃতি খাবার ও মানুষের ভারসাম্য
প্রধান উপাদানগুলো হলো- ভেষজ ও খনিজ উপাদান,ম্যাসাজ, মেডিটেশন, তান্ত্রিক চিকিৎসা ও মন্ত্রচিকিৎসা। বর্তমানে ভারতের লাদাখ, হিমাচল, নেপাল, ভুটান, চীনেও এটির প্রচলন আছে। ঐতিহ্য ইউনেস্কো স্বীকৃতি পেয়েছে আর তিব্বতের সর্বোচ্চ আধ্যাত্মিক ব্যক্তি দালাই লামার সুপারিশকৃত স্বাস্থ্যপদ্ধতি এটি।
৫. হিলিং থেরাপি ও ট্র্যাডিশনাল ইউরোপিয়ান মেডিসিন (TEM)
ইতিহাস ঘাটলে দেখা যায় প্রাচীন গ্রীক, রোমান ও ইউরোপীয় ফোক চিকিৎসার উপর ভিত্তি করে চিকিৎসা হতো। মূল দর্শণ হিপোক্রেটিসের তত্ত্ব (৪ হিউমার বা রস)
যে প্রধান উপাদান পদ্ধতির প্রাণ সেগুলো হলো- ভেষজ, সুগন্ধি থেরাপি (Aromatherapy), স্পাজ থেরাপি, ম্যাসাজ, হাঁটাহাঁটি (Therapeutic walking), খাদ্যভিত্তিক চিকিৎসা
এটি ইউরোপে বিশেষ করে জার্মানি, অস্ট্রিয়া, সুইজারল্যান্ডে জনপ্রিয়তা লাভ করেছে বহু আগে থেকে। ইউরোপিয়ান মেডিক্যাল ইউনিভার্সিটিতে TEM পড়ানো হয়ে থাকে।
ডিপ্রেশন, ইনসমনিয়া, হজমজনিত সমস্যায় এর কার্যকারিতা রয়েছে।
৬. Native American Traditional Healing
হাজার বছরের পুরনো, শামান ও ওষধি উদ্ভিদের ব্যবহারে এই পদ্ধতির চিকিৎসা চলে। বলা হয়ে থাকে এটি হলো আত্মা, প্রকৃতি ও মানুষের সংযোগ
এর প্রধান উপাদান হলো- স্যাজ স্মাজ (Sage smudge), ধূপ, প্রার্থনা, নৃত্য, প্রকৃতি নির্ভর ওষুধ, ভেষজ উদ্ভিদ, মেন্টরিং। মার্কিন সরকারের স্বীকৃত কিছু অঞ্চলে এই পদ্ধতির কিছু কিছু চিকিৎসা চলে বলে শোনা যায়। বিশেষ করে মানসিক চিকিৎসা ও রিহ্যাব কার্যক্রমে ব্যবহৃত।
৭. হোমিওপ্যাথি (Homeopathy)
ইতিহাস ও ভিত্তি বলতে গেলে প্রায় ২০০ বছর আগেই জার্মানিতে স্যামুয়েল হাহনেম্যান সৃষ্টি করেছিলেন, “like cures like” তত্ত্ব ও অতিশয় ক্ষুদ্র মাত্রায় প্রতিকার প্রয়োগ ইত্যাদি মূলনীতি verywellhealth.com। বাংলাদেশেও এটি জনপ্রিয়। ধীর গতির ও পাশ্বপ্রক্রিয়াহীন চিকিৎসা পদ্ধতি হিসেবে এর জনপ্রিয়তা রয়েছে।
এর ব্যাপ্তি হলো ১৯শ শতকে ইউরোপ–আমেরিকায় জনপ্রিয়তা অর্জন, আজও কিছু দেশে সমর্থিত CAM পদ্ধতি হিসাবে বিদ্যমান । কার্যকারিতা বলতে সাধারণ ঠাণ্ডা, পেটে গ্যাঁড়া, দুধ জনিত উপসর্গ ইত্যাদিতে ব্যবহৃত হলেও বৈজ্ঞানিক প্রমাণ সীমিত। যদিও কম পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া রয়েছে, তথাকথিত কার্যকারিতার কারণে আধুনিক চিকিৎসায় বিকল্প হিসেবে না; তবে কিছু দেশে সমন্বিত ব্যবহৃত হয়।
৮. বাংলাদেশের ভেষজ চিকিৎসা (Bengali Folk Herbal Medicine)
গ্রামীণ ও ক্ষুদ্র সম্প্রদায় যেমন বেদে, আদিবাসী ও স্থানীয় “ হোম ক্লিনিক” দ্বারা প্রচলিত হয়ে আসছে। এটিকে গবেষণা দ্বারা এর সঠিক ফর্মূলাগুলো বাছাই করে ভুল ফর্মূলাগুলো বাদ দেয়া দরকার। যা আজ অবদি কেউ করেনি। বিশেষ করে বেদে সম্প্রদায় ধরনের snake charm, snakebite ও বিপদ–সাপের কামড়ে চর্ম–ঔষধ, rheumatism, toothache, শিশু রোগে ঘরোয়া প্রাকৃতিক ওষুধ দেয়। কিন্তু এর মধ্যে এখনো ভুল পদ্ধতি এবং কিছু প্রতারণাও রয়েছে। যেমন ‘‘শিঙ্গা’’ নামের পদ্ধতি আরবীয় হিজামা ব্যবস্থার অনুরুপ কিন্তু ‘‘ঝাড়-ফুক’’ এর নামে প্রতারণাও করা হয়।
৯. প্রাচীন মিশরীয় চিকিৎসা (Ancient Egyptian Medicine)
ইতিহাস ও উৎস হলো ৩৫০০–২৫০০ খৃষ্টপূর্বাব্দ থেকে papyri (যেমন Ebers Papyrus, Edwin Smith Papyrus, Kahun Papyrus) এর উপর ভিত্তি; Imhotep প্রাচীন চিকিৎসক ও দেবতা ancientpedia.com+4pmc.ncbi.nlm.nih.gov+4egyptatours.com+4।
এর উপাদান ও পদ্ধতি বলতে- সস্তা করার জন্য ল্যাবে surgical tools • amulets, spells • wound care (honey, aloe, resins) • hydrotherapy (স্নান, প্যাকিং) •massage, dieta egyptatours.com+1world-archaeology.com+1।
কার্যকারিতার কথা বলতে গেলে প্রাকৃতিক অ্যান্টিমাইক্রোবায়াল উপাদান (honey, garlic, willow) প্রয়োগ করা হয়েছিল এবং cancer আক্রান্তদেরও শরীর খোঁজা হয়েছিল reddit.com। যা ইতিহাস থেকে জানা যায়। তবে এটির এখন আর সেভাবে প্রচলন নেই।
১০. অন্যান্য
নেপালের পাহাড়ে হতবুদ্ধিমত্ত রোগী সন্ন্যাসীরা (Buddhist Himalayan Monastic Medicine)যদিও সরাসরি তথ্যসংগ্রহ সীমাবদ্ধ, নেপালে বৌদ্ধ সন্ন্যাসীরা বহু শতাব্দী ধরে আয়ুর্বেদ, তিব্বতীয় ও স্থানীয় ভেষজ জ্ঞানের সন্নিবেশ রেখেছেন। এর ব্যবহার হলো মন–মানসিক প্রশিক্ষণ, মেডিটেশন, প্রার্থনা, ভেষজ নির্যাস, energy-balancing তন্ত্রচর্চা।
এছাড়া নাগা সন্ন্যাসীদের চিকিৎসা (Naga Tribe, Nagaland, India) এর পদ্ধতি হলো Ao ও অন্য Naga গোষ্ঠীর documented ethnomedicinal ব্যবস্থায় প্রাণীদেহ (bear gall bladder, snake bile, python fat) ব্যথা, ম্যালেরিয়া, childbirth ease ইত্যাদিতে অ্যান্টি-রিউমেটিক ও অ্যান্ট্টোড হিসাবে ব্যবহৃত।
এছাড়া হ্, হিজামা (Hijama) বা Wet Cupping Therapy বিশ্বজুড়ে প্রচলিত একটি প্রাচীন চিকিৎসা পদ্ধতি, যা বিশেষ করে ইসলামী ঐতিহ্যে গুরুত্বপূ্র্ণ।
সারাংশ
| চিকিৎসা পদ্ধতি | দেশ / উৎস | মূল দর্শন | আধুনিক অবস্থা | কার্যকারিতা |
|---|---|---|---|---|
| TCM | চীন | Qi, Yin-Yang | WHO স্বীকৃত, গ্লোবাল | হারবাল, আকুপাংচার |
| Kampo | জাপান | লক্ষণভিত্তিক ভারসাম্য | হেলথ ইনস্যুরেন্সে অন্তর্ভুক্ত | হজম, ক্যান্সার সাপোর্ট |
| Sowa-Rigpa | তিব্বত | Loong, Tripa | ইউনেস্কো স্বীকৃত | হ |
