শেয়ালের কুমড়ো চুরি
জাহাঙ্গীর আলম শোভন
(শেয়ালের-কুমড়ো-চুরি, গল্প, শেয়াল আর ইঁদুর, মজার গল্প, শিক্ষনীয় গল্প, হাসির গল্প, ২ ভাইয়ের গল্প, গ্রামের গল্প, লোকজ গল্প, জাহাঙ্গীর আলম শোভনের গল্প)
এক ছিল বন লাগোয়া গ্রাম। সেখানে অনেকগুলো কৃষক পরিবার বাস করতো। বড়মিয়া নামে গ্রামে একজন বয়স্ক ও সরল কৃষক বাস করতেন। তার ভাইদের মধ্যে তিনি সবচেয়ে বড় এজন্য তার নাম মানুষের মুখে মুখে বড় মিয়া নামে পরিচিতি পায়। বড় মিয়ার ছিল ১টা রুটির দোকান ২টা জমি একটি কমড়ো ক্ষেত আর একটি গম ক্ষেত। রুটির দোকানে রুটি বানিয়ে মিষ্টি কুমড়োর পায়েস এর সাথে বিক্রি করে তার সংসার চলতো। তার ছোট ছেলে বোকা তাই তাকে গমক্ষেত পাহারা দেয়ার কাজ দিতো কারণ গমক্ষেত শুধু গরু ছাগল থেকে পাহারা দিতে হতো। আর বড় ছেলে ক্ষেত কুমড়ো ক্ষেত পাহারা দিতো। কারণ এটা ছিল জটিল। কেননা এখানে শেয়াল, কাঠবিড়ালী, খরগোশ, শুয়োর ইঁদুর অনেকে কুমড়ো খেয়ে নষ্ট করতো।
একদিন বড় মিয়া মারা যান। তার ছিল দুই ছেলে লালু আর বুলু। তাদের মধ্যে একজন চালাক আরেকজন বোকা। লালু ছিল বড় আর চালাক। বুলু ছিল ছোট আর বোকা। বড় ছেলে নতুন করে নিজেদের মধ্যে ভাগ করলো নিজে নিল গম ক্ষেত আর ছোটোকে দিল কুমড়ো ক্ষেত।
কিছুদিন যাওয়ার পর ছোট লক্ষ্য করলো কুমড়ো গুলো সব কামড়ে দিয়ে রাখা। সে বুঝতে পারলনা কে তার কুমড়ো খায়। একদিন রাতে সে পাহারা দেয়ার সিদ্ধান্ত নিল। সে রাতে সে দেখলো রাত গভীর হলে গর্ত থেকে ইঁদুর এসে কুমড়ো খেয়ে যায়। তারপর সে মহা বিপদে পড়ে গেলো। ইঁদুরকে কিভাবে মোকাবিলা করবে সে বুঝতে পারছিল না।
তার ছিল এক শেয়াল বন্ধু। শিয়ালের বাচ্চাটিকে সে ছোটবেলায় বনের কাছে পেয়ে ঘরে এনে গরুর দুধ খাইয়ে পেলে পুষে বড় করেছিল। তারপর শিয়ালটি তার পোষ মেনে যায়। তার কাছে থাকতে চায়। কিন্তু শেয়াল যেহেতু বনের পশু আবার পাড়ার কুকুরগুলো শেয়ালটিকে দুচোখে দেখতে পেতনা। সুযোগ পেলে কামড়ে দিতো। তখন সে নিজেই বনে গিয়ে শেয়ালটিকে ছেড়ে আসে। তবুও শেয়ালটি মাঝে মধ্যে তারসাথে দেখা করতো আসতো। সে বনের কাছে গিয়ে ‘‘হুক্কা’’ বলে ডাক দিলে শেয়ালটি ‘‘হুয়া’’ বলে সাড়া দিয়ে তার কাছে চলে আসতো। তখন দুজনে কিছুক্ষণ খেলাধুলা করে একে অপরের কাছ থেকে বিদায় নিতো।
পরের দিন বুলু বনের কাছে গিয়ে হুক্কাকে ডাকলো হুক্কা আসার পর তাকে ইশারা দিয়ে এবং কুমড়ো দেখিয়ে সব বলল। হুক্কার ছোখ দেখে বুঝলো সে বিষয়টি বুঝতে পেরেছে এবং সে এ ব্যাপারে তাকে সাহায্য করবে।
সত্যি সত্যি রাতের বেলা হুক্কা তার ২ জন শিয়াল বন্ধু নিয়ে এসে বুলুর জমি পাহারা দিচ্ছিল। তারপর বুলু নিশ্চিন্ত মনে ঘুমাতে গেল।
কিছুদিন যাওয়া পর আবারো কুমড়ো খাওয়া দেখল। তখন প্রায় সব কুমড়ো পাকাছিল। বুলু আবারো হুক্কাকে ডাকলো। হুক্কা বন থেকে এসে সাড়া দিলো। কিন্তু হুক্কার আচরণ কেমন যেন অস্বাভাবিক মনে হলো। তারপর সে রাতে এসে দেখলো তিন শিয়াল জমি পাহারা দিচ্ছে। কিন্তু সকালে এসে দেখলো অনেক কুমড়ো খাওয়া। তখন সে বুঝতে পারলনা ঘটনা কি ঘটেছিল।
সে রাতে এসে ঘটনা বোঝার চেষ্টা করলো। সে লুকিয়ে লুকিয়ে দেখতে চাইলো ঘটনা কি ঘটে। সে দেখলো তিন শিয়াল বসে মজা করে তার কুমড়ো খাচ্ছিল। তখন সে শেয়ালকে হাতে নাতে ধরতে তাদের সামনে এসে হাজির হলো। এমন সময় শেয়ালগুলো হুক্কা হুয়া করে ডেকে উঠলো, এবং তার দিকে তেড়ে আসলো। এবং একটি শেয়াল ১টা কুমড়ো নিয়ে জঙ্গলের দিকে চলে গেল।
তারপর বুলু বুঝতে পারলো। এই শেয়ালগুলো তার বন্ধু হুক্কা নয়। এরা অন্য শেয়াল। তখন সে মনে মনে চুপ করে তাদেরকে চিনতে না পারার ভান করে থাকলো। কিছু না বলে ঘরে চলে এলো।
এদিকে সারা গ্রামে এটা চাউর হয়ে গেল যে, বুলুর বন্ধু শেয়াল হুক্কা তার নিজের ক্ষেতের কুমড়া খেয়ে সাবাড় করলো। গ্রামের লোকেরা একটা ছড়া বানালো-
‘‘তাইরে নাইরে বন্ধুরে কুমড়া খাইলো ইন্দুরে কুমড়া লইয়া শিয়াল ব্যাটা পালাইলো কি জঙ্গলে জঙ্গলে…। তার বড় ভাই লালুও তাকে দেখে এই ছড়া কাটতো। তাতে বুলু ভীষন অপমান ও লজ্জা পেত। তার ভাই তাকে লজ্জা দিলেও সে কিভাবে শেয়াল ও ইঁদুর থেকে জমি পাহারা দিতো সে তাকে বলতো না।
তারপর বুলু গ্রামের এক প্রবীণ ও বুদ্ধিমান ব্যক্তি তিন মাথার সাথে দেখা করতে গেল। বেশী বুদ্ধি থাকায় গ্রামের লোকেরা তাকে তিন মাথা বলতো। তার আসল নাম হাজী নাদরের জ্জমান লোকে তাকে নাদু মিয়া বলতো। তিনি ছিলেন গল্পের সে বিখ্যাত ব্যক্তি আদু মিয়ার বড় ভাই। বে ব্যক্তিকে এক শ্রেণীতে অনেক বছর থাকার জন্য আমরা সকলে চিনি। আদু মিয়া বোকা হলেও নাদু মিয়া বুদ্ধিমান ও বিচক্ষণ। সবাইকে বুদ্ধি পরামর্শ দিতেন। গ্রামের লোকেরাও বিপদে আপদে তার কাছে বুদ্ধির জন্য আসতো।
তিন মাথার পরামর্শ নিয়ে বুলু পরের দিন সারাদিন যে একটা ফাঁদ বানালো। যাতে শেয়াল আটকে যায়। পরের দিন জমিতো ফাঁদ পাতলো। সে ফাঁদে পরের দিন তিনটা শেয়াল ধরা পড়লো। সে যখন এসে দেখতে পেল তখন তার বন্ধু হুক্কাও পাশে ছিল। কিন্তু হুক্কা ফাঁদে পা দেয়নি। সে অনেকদিন মানুষের সাথে থাকার কারণে ফাঁদ সম্পর্কে জানতো।
তারপর বুলু হুক্কাকে ১টা কুমড়া পুরষ্কার দিয়ে বিদায় করলো। পরের দিন থেকে ফাঁদে আটকা পড়ার ভয়ে আর কোনো শেয়াল জমিতে আসেনি।
তারপর বুলু আগের মতো তার জমি চাষ করে সুখে শান্তিতে বসবাস করতে লাগলো।
গল্প : একটি গ্রামীণ ছড়া থেকে অনুপ্রাণীত হয়ে।
ছবি: চ্যাট জিপিটি

