বিলুপ্ত পেশা: বিগত ৪০ বছরে বাংলাদেশে হারিয়ে যাওয়া কিছু পেশা
মানুষের প্রয়োজন থেকেই পেশার জন্ম হয়। আবার সময়ের পরিবর্তন, প্রযুক্তির অগ্রগতি এবং জীবনযাত্রার মানের উন্নয়নের কারণে কিছু পেশার বিলুপ্তিও ঘটে। ৪০ বছর আগেও যেসব পেশা ছিল জীবিকা অর্জনের একমাত্র মাধ্যম, সেসব পেশা আজ ইতিহাসের অংশ মাত্র। নতুন প্রযুক্তি, যন্ত্রপাতি, নাগরিক সুবিধা এবং আধুনিক জীবনধারার কারণে অনেক পেশা আজ হারিয়ে গেছে, সেইসঙ্গে আবার অনেক নতুন পেশাও সৃষ্টি হয়েছে।
আজ আমরা আলোচনা করব এমন কিছু পেশা নিয়ে, যেগুলো বিগত চার দশকে প্রায় বিলুপ্ত হয়ে গেছে:
১. ভিস্তিওয়ালা:
একসময় ঢাকায় সুপেয় পানির ব্যবস্থা ছিল না। ভিস্তিওয়ালারা চামড়ার ব্যাগে করে পানি সরবরাহ করতেন বাড়ি বাড়ি। ১৮৭৮ সালের আগে এটি একটি জরুরি ও সম্মানজনক পেশা ছিল। পরবর্তীতে নলকূপ, পাইপলাইন ও পানি সরবরাহ ব্যবস্থার উন্নয়নে এই পেশা হারিয়ে যায়।
২. গাড়োয়ান:
দুই চাকার গরুর গাড়ি চালানো ছিল তাদের কাজ। একসময় এটি পল্লী অঞ্চলে গুরুত্বপূর্ণ পেশা ছিল, বিশেষ করে পণ্য পরিবহনে। তবে মোটরচালিত যানবাহনের কারণে এই পেশা আজ প্রায় নেই।
৩. ধুনারী:
লেপ-তোশক তৈরির জন্য তুলা ধুনন ছিল ধুনারীদের কাজ। এখন এটি শিল্পকারখানার পণ্যে পরিণত হওয়ায় এই হাতে তৈরি পেশাটিও বিলুপ্তির পথে।
৪. রানার:
এক স্থান থেকে আরেক স্থানে দ্রুতগতিতে বার্তা পৌঁছে দিতেন। প্রযুক্তির উন্নয়নে আজ ইমেইল, মোবাইল, মেসেজিং অ্যাপ রানারদের জায়গা দখল করে নিয়েছে।
৫. পালকি বেহারা:
চাকা ছাড়া পালকি বহনের জন্য যেসব মানুষ নিয়োজিত থাকতেন, তারা ছিলেন পালকি বেহারা। সমাজে একসময় এটি মর্যাদাপূর্ণ পেশা ছিল। এখন যানবাহনের যুগে এই পেশা ইতিহাস।
৬. সাপুড়ে:
বিভিন্ন এলাকায় সাপ খেলা দেখিয়ে মানুষকে বিনোদন দিতেন। বন-জঙ্গল উজাড় হওয়া এবং বন্যপ্রাণী সুরক্ষা আইন প্রণয়নের ফলে সাপুড়েরাও হারিয়ে গেছেন।
৭. টাইপিস্ট:
টাইপরাইটার দিয়ে লেখালেখি করতেন টাইপিস্টরা। এখন কম্পিউটার ও প্রিন্টারের যুগে টাইপরাইটারের ব্যবহার বন্ধ হয়ে গেছে, টাইপিস্ট পেশাও হারিয়ে গেছে।
৮. মোবাইল কল সার্ভিসিং:
একসময় মোবাইলে কথা বলার জন্য কল বুথ ছিল। সেখান থেকেই মানুষ ফোন করত। এখন সবাই নিজস্ব মোবাইল ফোন ব্যবহার করেন, ফলে এই সার্ভিসিং পেশাও বিলুপ্ত।
৯. পত্র লেখক:
অশিক্ষিত বা কম শিক্ষিত মানুষের চিঠি লেখার জন্য পত্র লেখক থাকতেন। টেলিগ্রাম, টেলিফোন ও পরে মোবাইল আসার পর তাদের আর প্রয়োজন হয় না।
১০. পাংখা ওয়ালা:
বড় পাখা নেড়ে বাতাস করার জন্য লোক নিয়োজিত থাকতেন। এখন বৈদ্যুতিক ফ্যান, এসি এসবের কারণে এ পেশাও নেই।
১১. নৈচাবন্দ:
ঢাকায় হুকার নল বানানোর পেশা ছিল নৈচাবন্দদের। সিগারেটের জনপ্রিয়তার সঙ্গে সঙ্গে হুকা হারিয়ে গেছে, ফলে নৈচাবন্দ পেশাও বিলুপ্ত।
১২. দাস্তান গাড়িয়া:
গল্প বলা ছিল তাদের পেশা। দরবারে, হাটে, মেলায় দাঁড়িয়ে গল্প বলতেন। বিনিময়ে তারা খ্যাতি পেতেন, অর্থ নয়। এখন টেলিভিশন, সিনেমা, ইউটিউব বিনোদনের আধুনিক মাধ্যম হওয়ায় তারা আর নেই।
১৩. কলম মেকানিক:
ঝর্ণা কলম নষ্ট হলে তা মেরামত করতেন কলম মেকানিকরা। রাবারের বল ফেটে গেলে বা কালি লিক করলে স্কুল-কলেজের পাশে বসতেন তারা। এখন বলপেন ও ডিজিটাল লেখার যুগে তাদেরও আর দেখা যায় না।
শেষ কথা
সময়ের পরিবর্তনে সমাজ এবং মানুষের জীবনধারার মতো পেশাও পরিবর্তিত হয়। এক সময় জনপ্রিয় অনেক পেশাই আজ বিলুপ্ত। বর্তমানে জনপ্রিয় পেশাও একদিন হয়তো ইতিহাস হয়ে যাবে। তথ্য ও প্রযুক্তির অগ্রগতির সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলতেই পুরনো কিছু হারিয়ে যায়। হারানো পেশাগুলোকে আমরা যতই স্মরণ করি না কেন, তা আর আমাদের জীবনে ফিরে আসবে না।

