বিনিয়োগ আকর্ষণে বাংলাদেশের জন্য সম্ভাব্য নীতি, কৌশল ও পরিকল্পনা
– বাংলাদেশে বিনিয়োগের পরিবেশ গত এক দশকে উন্নত হলেও এখনও কিছু বড় চ্যালেঞ্জ রয়ে গেছে। প্রথমত, আমলাতান্ত্রিক জটিলতা ও দীর্ঘসূত্রতা বিদেশি এবং দেশীয় বিনিয়োগকারীদের নিরুৎসাহিত করে। দ্বিতীয়ত, অবকাঠামোর ঘাটতি—বিশেষত নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ, গ্যাস ও মানসম্মত পরিবহন ব্যবস্থার অভাব—শিল্প স্থাপনকে ব্যাহত করে। তৃতীয়ত, রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা ও নীতিগত অনিশ্চয়তা অনেক বিনিয়োগকারীর আস্থা কমিয়ে দেয়। এছাড়া জমি অধিগ্রহণের জটিলতা, কর কাঠামোর অস্পষ্টতা এবং দক্ষ জনশক্তির ঘাটতিও বড় বাধা হিসেবে কাজ করে।
বিভিন্ন সমস্যা চ্যালেঞ্জ ও সম্ভাবনা বিশ্লেষণ করে বাংলাদেশের জন্য কতিপয় করনীয় প্রস্তাব করছি।
১ সহজ ও বিনিয়োগবান্ধব নীতিমালা ও প্রশাসনিক সংস্কার
- একক ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে সব ধরনের লাইসেন্স, ছাড়পত্র, ট্যাক্স এবং ইউটিলিটি সেবার অনুমোদন।
- অনুমোদন প্রক্রিয়ার নির্দিষ্ট সময়সীমা নির্ধারণ।
- বিদেশি বিনিয়োগকারীদের জন্য চুক্তি বাস্তবায়ন, আন্তর্জাতিক সালিশি সুবিধা ও আইনি নিরাপত্তা নিশ্চিত করা।
- বিডাতে বিনিয়োগ ডেস্কে অনুমোদন সংক্রান্ত সকল কাজ ১ জন কর্মকর্তা করতে পারবে এধরনের ব্যবস্থা করা।
২ অবকাঠামো ও লজিস্টিকস খাতে উন্নয়ন
- চট্টগ্রাম, মোংলা ও পায়রা বন্দরের সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং আধুনিক লজিস্টিক চেইনের উন্নয়ন।
- শিল্পাঞ্চল ও বাণিজ্যিক জোনের সঙ্গে সড়ক, রেল ও অভ্যন্তরীণ নৌপথের উন্নত সংযোগ।
- নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ ও গ্যাস সরবরাহ নিশ্চিত করা।
- যানজট নিরসনে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করা। ( যা আমার ভিন্ন প্রস্তাবনায় বিস্তারিত রয়েছে)
- লাস্ট মাইল ডেলিভারী ও লাস্ট মাইল সিকিউরিটি নিশ্চিত করা।
- বিমানবন্দরে রপ্তানীমুখী অবকাঠামো উন্নয়ন করা।
৩ বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল (SEZ) ও শিল্প নগরীকে কার্যকর করা
- পরিকল্পিত ও প্রস্তুত ‘প্লাগ অ্যান্ড প্লে’ অবকাঠামোসহ SEZ দ্রুত চালু করা।
- অগ্রাধিকার ভিত্তিতে ১০টি ইকোনমিক জোন পুর্ণাঙ্গভাবে চালু করা।
- কয়েকটি ইকোনমিক জোনকে বিভিন্ন দেশের জন্য নির্ধারিত করা।
- কয়েকটি ইকোনমিক জোন শুধু বিদেশী বিনিয়োগের জন্য নির্ধারণ করা
- কয়েকটি ইকোনমিক জোন দেশীয় উদ্যোক্তাদের জন্য বরাদ্ধ করা।
- কয়েকটি ইকোনমিক জোন প্রবাসীদের জন্য আলাদা করা
- খাতভিত্তিক জোন (যেমন—আইটি পার্ক, কৃষিপণ্য প্রক্রিয়াকরণ জোন) গঠন করা।
- বিশেষ বিশেষ পণ্যের জোন গড়ে তোলা।
- দক্ষ ও স্বশাসিত জোন ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ নিয়োগ দেয়া।
৪️ মানবসম্পদ উন্নয়ন ও দক্ষতা প্রশিক্ষণ
- কারিগরি প্রশিক্ষণ ও শিক্ষাক্রমকে শিল্পের চাহিদার সাথে সামঞ্জস্য করা।
- ইন্ডাস্ট্রি-একাডেমিয়া পার্টনারশিপ চালু করা।
- বিদেশি বিনিয়োগকারীদের জন্য প্রশিক্ষিত ও কর্মঠ জনশক্তির প্রাচুর্য তুলে ধরা।
- সময়োপোযোগী শিক্ষানীতি ও সিলেবাস তৈরী করা।
- চায়নাসহ শিল্পোন্নত দেশগুলোর সহযোগিতায় প্রতি বিভাগে ১টি করে কারিগরি বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপন করা।।
- সফট স্কিল এর জন্য একটি দ্বীপকে শিক্ষাদ্বীপ ঘোষণা করে সেখানে অবাকাঠামো তৈরী করা।
৫জিটাল গভর্ন্যান্স ও ই-সার্ভিসের সম্প্রসারণ
- ভূমি রেজিস্ট্রি, ট্যাক্স, ট্রেড লাইসেন্সসহ বিভিন্ন সরকারি সেবা ডিজিটাইজ করা।
- ‘ইনভেস্টর ওয়ান-স্টপ সার্ভিস’ চালু ও নিয়মিত হালনাগাদ রাখা।
- তথ্যভাণ্ডার ও গ্রাফিক্সসহ আকর্ষণীয় ই-ড্যাশবোর্ড তৈরি।
- নিজস্ব অফিস ব্যবস্থাপনা সিস্টেম তৈরী করে তা সরকারী কাজে বাস্তবায়ন করা।।
৬️আকর্ষণীয় প্রণোদনা প্যাকেজ ও স্বচ্ছ নিয়মনীতি
- কর্মসংস্থান, রপ্তানি বৃদ্ধি ও পরিবেশবান্ধব উৎপাদনের উপর ভিত্তি করে করছাড় বা ভর্তুকি।
- অধিকাংশ খাতে সহজ বিদেশি মালিকানা অনুমোদন।
- মুনাফা সহজে দেশে ফিরিয়ে নেওয়ার সুযোগ।
- বিনিয়োগকারীদের সম্মান ও স্বীকিৃত
৭ ব্যবসায়িক পরামর্শ বোর্ড গঠন ও নীতিমালার পর্যালোচনা
- প্রধান উপদেষ্ঠার নেতৃত্বে জাতীয় বিনিয়োগ পরামর্শ পরিষদ গঠন।
- ব্যবসায়ী নেতৃবৃন্দ, বিদেশি বাণিজ্য ফোরাম ও স্টার্টআপ কমিউনিটির সঙ্গে নিয়মিত সংলাপ।
- BIDA ও BEZA কে আরও শক্তিশালী ও স্বাধীন করা।
- BIDA ও BEZA এর নিজস্ব গেস্টহাইজ প্রতিষ্ঠা
- প্রতিবছর বিনিয়োগ সংক্রান্ত নীতিমালার রুটিন ওয়ারী পরিবর্তন এবং যেকোনো সময়ে প্রয়োজনীয় সংশোধন।
- শহর ভিত্তিক বিনিয়োগ সম্মেলন আয়োজন।
৮ বাংলাদেশকে একটি বৈশ্বিক বিনিয়োগ ব্র্যান্ডে রূপান্তর
- আন্তর্জাতিক পর্যায়ে ব্র্যান্ডিং: “Invest in Bangladesh: Resilient & Ready”
- বিদেশি বিনিয়োগ সম্মেলন, রোড শো ও ডায়াসপোরা বিনিয়োগ উৎসাহ কর্মসূচি।
- সফল ব্যবসায়ীদের গল্প তুলে ধরা, মিডিয়া কভারেজ নিশ্চিত করা।
- জাতীয় বিনিয়োগ পুরষ্কার চালু করা।
- প্রবাসীদের মধ্য থেকে সেরা বিনিয়োগকারীকে ‘‘দেশমিত্র’’ উপাধি দেয়া।
৯ টেকসই ও সবুজ বিনিয়োগে অগ্রাধিকার
- পরিবেশবান্ধব শিল্প (সবুজ পোশাক কারখানা, নবায়নযোগ্য জ্বালানি, রিসাইক্লিং) উৎসাহিত করা।
- ESG (Environment, Social, Governance) মানদণ্ড অনুসরণে সহযোগিতা।
- কার্বন ক্রেডিট মার্কেট, সবুজ বন্ড ইত্যাদির উন্নয়ন।
- পরিবেশ বিষয়ক শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ জোরদার করা।
- পরিবেশ মন্ত্রণালয়ের অধীনে পরিবেশ বিষয়ক সামাজিক সংগঠনের অনুমোদন সহযোগিতা দেয়া।
- পরিবেশ বিষয়ক সামাজিক ব্যবসায় বিনিয়োগের জন্য বিশেষ তহবিল গঠন ও ঘোষনা করা
- পরিবেশ বান্ধব সৃজনশীল উদ্যোগের জন্য ভিন্ন করনীতি তৈরী করা।
- পরিবেশ নষ্ট না করার জন্য পরিবেশ আইন, পরিবেশ পুলিশ ও পরিবেশ কর চালু করা।
১০. ️ সামাজিক ব্যবসাকে প্রাতিষ্ঠানিক রুপ দেয়া।
* সামাজিক ব্যবসার জন্য ভিন্ন ট্রেড লাইসেন্স ক্যাটাগরি তৈরী করা
* সামাজিক ব্যবসা সমিতি নামে আলাদা এসোসিয়েশন অনুমোদন দেয়া।
* সামাজিক ব্যবসার জন্য ব্যাংকগুলোতে বিশেষ ঋণ তহবিল চালু করা।
* প্রতি বছর দেশের যেকোনো ১টি জেলায় জাতীয় সামাজিক ব্যবসা সম্মেলন আয়োজন করা।
১১ আঞ্চলিক ও দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য চুক্তি জোরদার করা
- ASEAN, EU, আফ্রিকার সঙ্গে FTA বা PTA সম্পাদনের উদ্যোগ।
- এলডিসি উত্তরণ পরবর্তী বাজার প্রবেশাধিকার সংরক্ষণে কূটনৈতিক ও অর্থনৈতিক কৌশল।
- BBIN, BIMSTEC ও BRI’র মতো আঞ্চলিক উদ্যোগে কার্যকর অংশগ্রহণ।
- এলডিসি উত্তরণে যেসব দেশ কাজ করছে তাদের নিয়ে একটি জোট গঠন করা এবং পারষ্পরিক সহযোগিতা বৃদ্ধি করা।
১২ অতিরিক্ত কিছু কৌশলগত প্রস্তাব:
- বিদেশি বিনিয়োগের জন্য স্বয়ংক্রিয় জমি বরাদ্দ নীতি প্রণয়ন করা।
- স্টার্টআপ ও ইনোভেশন সেক্টরে যৌথ বিনিয়োগ প্ল্যাটফর্ম গঠন করা।
- কর্পোরেট ট্যাক্স রেট ক্রমান্বয়ে হ্রাস করা।
- আইটি ও ডিজিটাল পণ্য খাতে এক্সপোর্ট ইনসেনটিভ স্কিম চালু করা।
১৩।। বিশেষ
বিনিয়োগ বোর্ড এর বাংলাদেশে বিনিয়োগের তথ্য সংক্রান্ত আলাদা একটি ওয়েবসাইট থাকবে এটি কমপক্ষে বিশ্বের ৫০টি ভাষায় থাকবে। বাংলাদেশ প্রোডাক্টস ডিরেক্টর নাম দিয়ে আলাদা পণ্য সেবার পোর্টাল তৈরী করতে হবে। যেখানে দেশের সব পণ্য সেবার তথ্য থাকবে। প্রতিষ্ঠাগুলো নিজেরা আইডি খুলে তা পোস্ট করবে।
অবকাঠামো, পর্যটন, লজিস্টিকস, সড়ক ব্যবস্থাপনা, দক্ষ জনশক্তি, একুশ শতকের উপযুক্ত শিক্ষা, বিশ্বমানের স্বাস্থ্যসেবা, জননিরাপত্তা, ব্যবসা সহজীকরণসহ বিভিন্ন বিষয়ে আমার অন্যান্য প্রস্তাবগুলো রয়েছে। যা বিনিয়োগের ক্ষেত্রে সহায়ক হতে পারে। সেগুলো এখানে আলোচনা করে কলেবর বাড়াতে চাইনা।
তবে এসব চ্যালেঞ্জ সত্ত্বেও বাংলাদেশে বিনিয়োগের বিপুল সম্ভাবনা রয়েছে। বড় আকারের তরুণ জনসংখ্যা, ভোগযোগ্য বাজার, তুলনামূলকভাবে কম শ্রমমূল্য এবং ক্রমবর্ধমান প্রযুক্তিগত অগ্রগতি বিদেশি বিনিয়োগকারীদের আকৃষ্ট করছে। সরকার ইতোমধ্যে ১০০টি বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল (SEZ) ও হাইটেক পার্ক গড়ে তোলার মাধ্যমে দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ কাঠামো তৈরি করছে। একাধিক বাণিজ্য চুক্তি, রপ্তানিমুখী শিল্প যেমন গার্মেন্টসের বাইরেও ফার্মাসিউটিক্যাল, আইটি ও কৃষি-প্রযুক্তি খাতে সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচন করছে। নীতিনির্ধারকরা যদি বিনিয়োগ-বান্ধব সংস্কার জোরদার করেন, তাহলে বাংলাদেশ আগামী দশকে দক্ষিণ এশিয়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ বিনিয়োগ গন্তব্যে পরিণত হতে পারে।
প্রস্তাবক: জাহাঙ্গীর আলম শোভন
