focus and time

দেশে দেশে দূর্নীতি দমনে সাফল্য: শিক্ষা নিতে পারে বাংলাদেশ

বিশ্বের বিভিন্ন দেশের দুর্নীতি দমন কৌশল: অভিজ্ঞতা, বাস্তবতা ও আমাদের জন্য শিক্ষা

– জাহাঙ্গীর আলম শোভন

দুর্নীতি কেবল একটি দেশের প্রশাসনিক ব্যর্থতা নয়, বরং এটি একটি সামাজিক, রাজনৈতিক এবং অর্থনৈতিক সংকট। বাংলাদেশসহ বিশ্বের বহু দেশ একসময় দুর্নীতির ভয়াবহ থাবায় বিপর্যস্ত ছিল। তবে কিছু দেশ সফলভাবে এই সংকট মোকাবিলা করেছে। তাদের বাস্তব অভিজ্ঞতা ও কৌশল আমাদের জন্য হতে পারে শিক্ষা ও অনুকরণীয় উদাহরণ।

রুয়ান্ডা: প্রযুক্তিনির্ভর সুশাসন

একসময় রুয়ান্ডা ছিল যুদ্ধবিধ্বস্ত ও চরম দুর্নীতিগ্রস্ত একটি রাষ্ট্র। তবে সরকার “জিরো টলারেন্স” নীতির ভিত্তিতে দুর্নীতি রোধে প্রযুক্তিনির্ভর ব্যবস্থা গ্রহণ করে। নাগরিক সেবা ডিজিটাল হয়, অডিট ও স্বচ্ছতা নিশ্চিত হয়, আর আমলাদের জবাবদিহির আওতায় আনা হয়। বর্তমানে রুয়ান্ডা আফ্রিকার সবচেয়ে স্বচ্ছ দেশগুলোর অন্যতম।

রোমানিয়া: উচ্চপর্যায়ের দুর্নীতির বিরুদ্ধে বিচার

রোমানিয়ায় একসময় মন্ত্রী থেকে শুরু করে রাষ্ট্রপতি পর্যন্ত দুর্নীতির অভিযোগে অভিযুক্ত ছিলেন। কিন্তু “DNA” (National Anti-Corruption Directorate) নামে একটি স্বাধীন প্রতিষ্ঠান গঠনের মাধ্যমে বিচার কার্যক্রম শুরু হয়। অনেক উচ্চপদস্থ নেতার সাজা হয়। ফলে জনগণের আস্থা ফিরে আসে।

দক্ষিণ কোরিয়া: রাজনৈতিক দুর্নীতি দমনে দৃঢ়তা

সাবেক রাষ্ট্রপতি পার্ক গিউন হে সহ বহু উচ্চপর্যায়ের রাজনীতিবিদের বিরুদ্ধে তদন্ত করে তাদের শাস্তি নিশ্চিত করে কোরিয়া সরকার। দুর্নীতির বিরুদ্ধে সোচ্চার হয়ে সরকার গণতন্ত্র ও প্রশাসনের মধ্যে স্বচ্ছতা ফিরিয়ে আনে।

এস্তোনিয়া: ডিজিটাল সরকার ও দুর্নীতি রোধ

এস্তোনিয়া ছিল সাবেক সোভিয়েত রাষ্ট্র। বর্তমানে এটি বিশ্বের অন্যতম প্রযুক্তিনির্ভর রাষ্ট্র, যেখানে প্রায় সব সরকারি কাজ ই-সিস্টেমে হয়। এতে ঘুষের সুযোগ কমেছে, কারণ সবকিছু অনলাইনে ট্র্যাক হয়। এই মডেল “ই-গভর্ন্যান্স” নামে বিশ্বে সমাদৃত।

উরুগুয়ে: জবাবদিহিতার সংস্কৃতি গঠন

উরুগুয়ে দুর্নীতি দমনে প্রশাসনিক স্বচ্ছতা, দলীয় হস্তক্ষেপহীন তদন্ত এবং সাধারণ নাগরিকদের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করে। এতে দেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতিতেও ইতিবাচক প্রভাব পড়ে।

দক্ষিণ আফ্রিকা: কমিশনের মাধ্যমে রাষ্ট্রীয় দুর্নীতির উন্মোচন

‘জন্ডো কমিশন’ গঠন করে দক্ষিণ আফ্রিকা রাষ্ট্রীয় সম্পদের অপব্যবহার, বিশেষ করে গোপন লেনদেন ও ক্ষমতার অপব্যবহারের ঘটনা তদন্ত করে। অভিযুক্তদের জবাবদিহির আওতায় আনা হয়, ফলে একটি চাঞ্চল্য সৃষ্টি হয়।

সংযুক্ত আরব আমিরাত: অর্থপাচার রোধে আইন ও প্রতিষ্ঠান

দুবাইসহ আমিরাতে অর্থপাচার বড় একটি সমস্যা হয়ে উঠেছিল। সরকার UAE Accountability Authority গঠন করে এবং AML (Anti-Money Laundering) আইন কঠোর করে। ব্যাংকিং সিস্টেম ও রিয়েল এস্টেট খাতে স্বচ্ছতা আনে।

ফ্রান্স: সাপিন II আইন ও কর্পোরেট স্বচ্ছতা

২০১৬ সালে ফ্রান্স “Sapin II” আইন পাশ করে, যার মাধ্যমে রাজনৈতিক ও ব্যবসায়িক দুর্নীতি প্রতিরোধে কড়া আইনগত পদক্ষেপ নেওয়া হয়। এতে কোম্পানিগুলিকে অভ্যন্তরীণ দুর্নীতি দমন নীতি রাখতে বাধ্য করা হয়।

ব্রাজিল: কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও ডেটা অ্যানালিটিক্স

“Operation Car Wash” নামে দুর্নীতি দমন অভিযানের পাশাপাশি ব্রাজিল সরকার AI-ভিত্তিক ডেটা অ্যানালিটিক্স ব্যবহার করে সন্দেহজনক আর্থিক কার্যক্রম চিহ্নিত করে। এতে বাজেট দুর্নীতি উল্লেখযোগ্যভাবে কমে।

যুক্তরাষ্ট্র: বৈশ্বিক দুর্নীতি দমনে নেতৃত্ব

“Foreign Corrupt Practices Act (FCPA)” মার্কিন কোম্পানিগুলিকে আন্তর্জাতিক লেনদেনে ঘুষ বন্ধে বাধ্য করে। বিশ্বজুড়ে বহু বহুজাতিক কোম্পানি শাস্তির মুখে পড়ে, যা আন্তর্জাতিক দুর্নীতি প্রতিরোধে এক দৃষ্টান্ত তৈরি করে।

অস্ট্রেলিয়া: রাজনৈতিক অনুদানে স্বচ্ছতা

রাজনৈতিক ফান্ডিংয়ে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করে অস্ট্রেলিয়া। জনগণ জানতে পারে কোন কোম্পানি বা ব্যক্তি কত টাকা দিয়েছে। “Public Interest Disclosure Act” হুইসেলব্লোয়ারদের সুরক্ষা দেয়।

গুয়াতেমালা: জাতিসংঘ সহায়তায় দুর্নীতি দমন

CICIG নামে একটি আন্তর্জাতিক কমিশন গঠন করে গুয়াতেমালা সরকার জাতিসংঘের সহায়তায় দুর্নীতিবাজদের বিচারের আওতায় আনে। এটি লাতিন আমেরিকার দুর্নীতি দমনে সফল উদাহরণ।

লিথুয়ানিয়া: হুইসেলব্লোয়ার সুরক্ষা

হুইসেলব্লোয়ার আইন কার্যকর করে প্রশাসনের দুর্নীতি ফাঁসকারীদের সুরক্ষা দেওয়া হয়। এতে ভিতরে থাকা সৎ কর্মীরা ভয়হীনভাবে দুর্নীতি তুলে ধরতে পারে।

বাংলাদেশের জন্য শিক্ষণীয় করনীয়

১. স্বাধীন দুর্নীতি দমন কমিশন দরকার, রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত।
২. সেবা ও প্রশাসন ডিজিটাল হলে ঘুষের সুযোগ কমে।
৩. দুর্নীতিবিরোধী আইনের কঠোর প্রয়োগ ও দ্রুত বিচার প্রয়োজন।
৪. জনসম্পৃক্ততা ও গণমাধ্যমের স্বাধীনতা অপরিহার্য।
৫. হুইসেলব্লোয়ারদের সুরক্ষা আইন জরুরি।

দুর্নীতির বিরুদ্ধে লড়াই কোনো একদিনের কাজ নয়। এটি রাজনৈতিক সদিচ্ছা, প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার, প্রযুক্তির ব্যবহার, নাগরিক সচেতনতা এবং আন্তর্জাতিক মানদণ্ডের সঙ্গে মিল রেখে গড়ে তুলতে হয়। বিশ্বের সফল উদাহরণগুলো আমাদের শেখায়—স্বচ্ছতা সম্ভব, যদি তার জন্য প্রয়োজনীয় দৃঢ়তা ও উদ্যোগ থাকে।

তথ্য ও ছবি ইন্টারনেট, পূণলিখন: চ্যাট জিপিটি

Comments

No comments yet. Why don’t you start the discussion?

Leave a Reply