আওয়ামীলীগ কি রাজনীতিতে অশৌচ?
আওয়ামীলীগ বাংলাদেশের রাজনীতিতে কি ব্রাত্য থাকবে নাকি ফিরে আসবে। এনিয়ে মাঠ সরগরম থাকবে যতক্ষণ না এর সুরাহা হলেও বিতর্ক থাকবে। প্রথমত, হাজার ভুল, অপরাধ ও পাপ থাকলে কি একটি গোটা দলকে নিষিদ্ধ করতে হবে, দোষতো করেছে ব্যক্তি, দল নয় ? তাদেরকে কি ভুল শোধরানোর সুযোগ দেয়া যাবে না? দ্বিতীয়ত, যে দলটির মুক্তিযুদ্ধের গৌরব ইতিহাস ও জনপক্ষ থাকা সত্বেও তারা বার বার গণতন্ত্র, দেশ ও জনতার বিপক্ষে অবস্থান নিয়েছে, জনবিরোধী ও দেশবিরোধী কাজ করছে। বার বার ক্ষমতায় থাকার হাজার হাজার মানুষ খুন করেছে এমনকি প্রতিবার গোটা দল বা দলের বেশীর ভাগ লোক সেসব সমর্থন করেছে এবং করছে সূতরাং যা হয়েছে তার জন্য পুরো দল দায়ী ব্যক্তির সাথে দলকেও তাদের রাজনৈতিক অধিকার থেকে বিরত রাখতে হবে। কারণ সংঘবদ্ধ হয়ে মানুষের সামাজিক, রাজনৈতিক, মৌলিক ও মানবিক অধিকার হরণ করেছে।
আসুন গোটা বিষয়টা বিশ্লেষণ করা যাক- কারো প্রতি অন্ধ আবেগ নয় আবার প্রতি বিরোধ নয়। আমরা নিরপেক্ষভাবে খোলামনে আলোচনা করে দেখব কোনটা বেশী যুক্তিযুক্ত এবং ইনসাফ ভিত্তিক হয়। আওয়ামীলীগের রাজনীতি নাকি নিষিদ্ধতা।
১* আওয়ামী লীগ স্বাধীনতার কান্ডারী আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে বাংলাদেশ স্বাধীন হয়েছে। তাই আওয়ামীলীগের ভুল ত্রুটি থাকতে পারে। কিন্তু আওয়ামী লীগ নিষিদ্ধ হতে পারে না।
২* বাংলাদেশের সবচেয়ে পুরনো শুধু স্বাধীনতা নয়, ভাষা আন্দোলন, ৬৯ এর গণঅভ্যুত্থান, ৭০ এর নির্বাচন, ৯০ এর স্বৈরাচার বিরোধী আন্দোলন এবং ৯৬ এ তত্ববধায়ক সরকার প্রতিষ্ঠার আন্দোলনে আওয়ামী লীগ যুগপত ভূমিকা রেখেছে তাই আওয়ামী লীগ কে বাদ দিয়ে বাংলাদেশের রাজনীতি হতে পারে না।
৩* যেকোনো ব্যক্তির রাজনৈতিক অধিকার আছে, যেকোনো দলেরও সে অধিকার আছে। এই অধিকার থেকে কোনো ব্যক্তি বা দলকে বঞ্চিত করা যায়না। তাহলে গণতন্ত্র ক্ষুন্ন হয়।
৪ * আওয়ামী লীগ ১টা দল ১টা প্লাটফর্ম বা ১টা ইঞ্জিন। এখানে চালকের দোষ থাকতে পারে। যে মানুষগুলো ভুল সিদ্ধান্ত নিয়েছে বা অপরাধ করেছে তারা দোষী হতে পারে। দল দোষী হবে কেন?
আওয়ামীলীগ নিষিদ্ধের বিপক্ষে এই যুক্তিগুলো কতটা সঠিক, আসুন বিশ্লেষণ করা যাক।
১* স্বাধীনতা যুদ্ধে দেশের কতিপয় ব্যক্তি বাদে সকলের অবদান রয়েছে। সেখানে আওয়ামীলীগও রয়েছে। কারো একক অবদানে দেশ স্বাধীন হয়নি। বরং আওয়ামী লীগের বেশীর ভাগ শীর্ষনেতা ভারতে পালিয়ে আয়েশি জীবন পার করেছে। এবং খোদ শেখ মুজিবর রহমান পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী হওয়ার জন্য নির্বাচনে অংশ নিয়েছে। ক্ষমতায় বসতে আলোচনায় যোগ দিয়েছে। স্বাধীনতার ঘোষণাও দেননি। পরে তারা নানা রকম গালগল্প তৈরী করেছে। তবুও আমরা যদি স্বীকার করি যে,স্বাধীনতা পরবর্তী তাদের নেতৃত্ব বেশীরভাগ মুক্তিযোদ্ধা মেনে নিয়েছে। তাহলে তারা স্বাধীনতার পরে যত অপকর্ম করেছে সেগুলো বিবেচনায় নিলে তাদের স্বাধীনতা যুদ্ধে অবদানের কথা বলে ছাড় দেয়ার কোনো যৌক্তিকতা নেই?
কারণ ক) ভারতের স্বাথে বার বার অসম ও অবৈধ চুক্তি করে তারা বাংলাদেশের স্বাধীনতাকে নিজেরাই ভুলুণ্ঠিত করেছে।
খ) ভারতের স্বার্থে কাজ করে, বাংলাদেশকে ভারতের বাজারে পরিণত করে, বাংলাদেশের শিক্ষা ব্যবস্থা ধ্বংস করে, স্বাস্থ্য ব্যবস্থা পঙ্গু করে তারা ভিনদেশের স্বার্থ রক্ষা করেছে বছরের পর বছর বার-বার। তাই স্বাধীনতার কৃতিত্ব তাদেরকে দেয়া অন্যায়। লাখো শহীদের রক্তে স্বাধীন দেশেকে তারা পরাধীন দেশের মতো করে রেখেছে যুগের পর যুগ।
গ) তারা মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে থেকেও ৭২-৭৫ হাজারো মুক্তিযোদ্ধাকে বিরোধী মত দমনের নামে হত্যা করেছে, জেলে পুরেছে। তাই স্বাধীনতার পর আওয়ামীলীগ হিসেবে পুরো দলের অবস্থান আর মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে বা বাংলাদেশের স্বাধীনতার পক্ষে ছিলনা। যদি পাকিস্তানের ২৪ বছর তাদেরকে স্বাধীনতাকামী দল হিসেবে ধরে নিই তাহলে বাংলাদেশের ৫৫ বছর তারা স্বাধীনতা সার্বভৌত্বের বিরুদ্ধে কাজ করেছে। সেজন্য স্বাধীনতা অবদানের জন্য আওয়ামীলীগকে ছাড় দেয়ার কোনো যৌক্তিকতা নেই।
ঘ) যে মুক্তিযোদ্ধারা আওয়ামী লীগকে স্বীকৃতি ও সম্মান দিয়েছে তারাই তাদের ত্যাগ করেছে। আওয়ামী লীগ জন সমর্থন ৯০% থেকে ৩৩% সেখান থেকে নেমে বর্তমানে ১০% এর নিচে এসেছে। এবং বিগত নির্বাচনগুলোতে সবচেয়ে বেশী মুক্তিযোদ্ধা প্রার্থী দেখা গেছে বিএনপিতে , আওয়ামী লীগে নয়। ২০০০সাল পর্যন্ত ২২৩০ জন মুক্তিযোদ্ধা জামায়াতে যোগ দিয়েছে। এখন এই সংখ্যা আরো বেশী হবে। তাই মুক্তিযুদ্ধ আর আওয়ামী লীগ এখন আর সমান্তরাল নয়।
২) স্বাধীনতা যুদ্ধ, ভাষা আন্দোলন, ৬৯ এর গণঅভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ এর ভূমিকার জন্য স্বাধীনতার পর নির্বাচন ছাড়াই জনগন তাদেরকে রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব দিয়েছিল। তার বিনিময়ে তারা হাজার হাজার বিরোধীকে হত্যা, ১০ হাজার বিরোধীকে জেলবন্দী, বাকশাল কায়েম, চুরি, লুটতরাজ, দূর্ভিক্ষ উপহার দিয়েছিল। তাদের সাথে রাজনৈতিক দেনা পাওনা ৭৫ শেষ হয়ে গিয়েছে। তাদেরকে অতীত থেকে টেনে এনে রাজনীতিতে পূণবহাল করে দেশের ভবিষ্যত নষ্ট করার কোনো মানে হয়না। এবং যারা তা করেছে সেটা বার বার ভুল প্রমাণিত হয়েছে।
৯০ এর স্বৈরাচার বিরোধী আন্দোলন হাসিনা জাতীয় বেইমানের ভূমিকা পালন করেছে। সূতরাং এতে তাদের কৃতিত্ব প্রশ্নবিদ্ধ। ৯৬ এ তত্ববধায়ক সরকার প্রতিষ্ঠার আন্দোলন ছিল জামায়াতের ফর্মূলা। এটা আওয়ামী লীগ গ্রহণ করলেও নিজেরা তা বাতিল করেছে। এছাড়া যে উন্নয়নের কথা বলা হয় সেটাও তারা উন্নয়নের চেয়ে ১০গুণ বেশী লুট করে তাকে নষ্ট করে দিয়েছে। তাই এসব যুক্তিতে আওয়ামীলীগ পূণবাসনের কথা বলা সম্পূর্ণ অবান্তর যুক্তি।
৩* যেকোনো ব্যক্তির রাজনৈতিক অধিকার আছে, যেকোনো দলেরও সে অধিকার আছে। এটা সব সময়ের জন্য সঠিক নয়। তা যদি হতো দেশে দেশে যুগে যুগে বিভিন্ন সংগঠন নিষিদ্ধ হতো না এবং বিভিন্ন সংগঠনকে সন্ত্রাসী সংগঠন বলা হতো না। যেকোনো প্যারামিটারে এখন আওয়ামীলীগ খুটি, সন্ত্রাসী ও লুটেরা সংগঠন।
* আওয়ামী লীগের হাতে নিহত মানুষের সংখ্যা বিগত ৫৫ বছরে ২০ হাজার ছাড়িয়ে গেছে।
* নির্যাতিত মানুষের সংখ্যা অগনিত। বাংলাদেশের বেশীরভাগ মানুষ কোনো ভাবে লীগ দ্বারা নির্যাতিত হয়েছে।
* লুট ও টাকা পাচার পৃথিবীর ইতিহাসে সব রেকড ছাড়িয়ে গেছে। এই মুহুর্তে পৃথিবীতে যদি ৫টি সংগঠনও নিষিদ্ধের দাবীদার হয় তারমধ্যে আওয়ামী লীগ অন্যতম।
৪ * ব্যক্তির জন্য দলকে দোষারোপ করা ঠিক নয়। এই মতবাদ আওয়ামীলীগের জন্য প্রযোজ্য নয়। কারণ এই দলটি যা যা করেছে তাদের ৯০ভাগ লোক তা সমর্থণ করেছে আরো ৯ ভাগ লোক তা মেনে নিয়েছে মাত্র ১ ভাগ বা তারও কমসংখ্যক লোক মৃদুভাবে দ্বিমত পোষন করেছে। যারা তাদের কার্যক্রমকে সমর্থন করেনি তারা বহুআগে সে দল ত্যাগ করেছে। কোনো ব্যক্তি বা ব্যক্তিবর্গ নয়। যা করেছে পুরো দল মিলে করেছে। তাই দলকেই তাদের রাজনৈতিক অধিকার থেকে সরাতে হবে। তা না হলে এদেশের মানুষ ফ্যাসিজম থেকে কখনো মুক্তি পাবে না।
দুটি উদাহরণ দিয়ে বিষয়টি আরো পরিষ্কার হবে
ক)ইসরাইলের মতো অভিশপ্ত দেশের সরকারের সাথে দ্বিমত পোষন করে ইহুদিরা ফিলিস্তিনের পক্ষে তথা ন্যায়ের পক্ষে মাঠে নেমেছে। এরা তাদের চেয়ে বড়ো অভিশপ্ত। কারণ এদেরকে কেউ কখনো দলীয় স্বার্থের উর্ধ্বে কথা বলতে দেখেনি।
খ) যুগে তাদের এত খুন রাহাজানি সর্বশেষ লুটপাট আর আয়নাঘর কাহিনী সেসাথে ৩৬ দিনে ১৬শ মানুষকে প্রকাশ্য হত্যার পরও দেশ-বিদেশ থেকে তাদের লোকেরা এখনো হুমকি দিয়ে চলেছে।
এতকিছুর পরও কেউ যদি বলে তারা ব্যক্তি দোষ করেছে দল নয় বা তাদের রাজনীতির অধিকার আছে। তাহলে হয়তো বিক্রি হয়ে গেছে তা না হলে সুস্থ্য নয়? প্রশ্ন থাকলো?
যারা মনে করে আওয়ামী লীগ মানুষের যেসব অধিকার হরণ করেছে সম্মিলিত ভাবে। তাদের ক্ষেত্রে তাই করা হবে ন্যায় বিচার। খুনের বদলে বিচার ফাঁসি বা জেল। লুটের বদলে সম্পত্তি ক্রোক। অধিকার হরনের বদলে তাদের অধিকার সীমিতকরণ এতটুকু বিচার না হলে সমাজে নির্যাতনের এই চক্র চলতেই থাকবে। এটা কি যুক্তিসঙ্গত?
প্রশ্ন থাকলো।

