কয়েকটি উন্নয়নশীল দেশের বিনিয়োগ আকর্ষণনীতি
উদীয়মান অর্থনীতিতে বিনিয়োগ-বান্ধব নীতি ও তাদের সাফল্যের গল্প: ভারত, ভিয়েতনাম, মালয়েশিয়া, থাইল্যান্ড, হংকং ও রুয়ান্ডা। এই দেশগুলোকে ব্যক্তিগতভাবে বাছাই করে ইন্টারনেটে সার্চ দিয়ে তাদের কৌশলগুলো জেনেছি। যা এআই দ্বারা গুচিয়ে উপস্থাপন করা হলো-
বিশ্বের উন্নত অর্থনীতির বাইরেও অনেক উদীয়মান দেশ বৈদেশিক বিনিয়োগ আকর্ষণের ক্ষেত্রে ঈর্ষণীয় সাফল্য অর্জন করেছে। এসব দেশের মধ্যে ভারত, ভিয়েতনাম, মালয়েশিয়া, থাইল্যান্ড, হংকং এবং আফ্রিকার রুয়ান্ডা উল্লেখযোগ্য। রাজনৈতিক সদিচ্ছা, সংস্কারমূলক অর্থনৈতিক নীতি, অবকাঠামোগত উন্নয়ন এবং প্রযুক্তি ব্যবহার করে তারা বৈদেশিক বিনিয়োগকারীদের আস্থা অর্জনে সক্ষম হয়েছে। এ প্রবন্ধে দেশভিত্তিক তাদের বিনিয়োগ-বান্ধব নীতি ও বাস্তবায়ন তুলে ধরা হলো।
ভিয়েতনাম: রপ্তানি-ভিত্তিক অর্থনীতি ও শ্রম-নির্ভর কৌশল
মূল নীতিমালা ও উদ্যোগ:
-
অর্থনৈতিক মুক্তি (Doi Moi) সংস্কার: ১৯৮৬ সাল থেকে সমাজতান্ত্রিক বাজার অর্থনীতির দিকে ধাবিত হওয়া।
-
কম খরচের শ্রমবাজার: শ্রমনির্ভর উৎপাদনের জন্য বড় আকর্ষণ।
-
বহু ফ্রি ট্রেড এগ্রিমেন্ট (FTA): ইউরোপীয় ইউনিয়ন, চীন, জাপান ও CPTPP এর সঙ্গে চুক্তি।
-
Industrial Parks এবং Export Processing Zones: বিদেশি কোম্পানির জন্য ভূমি ও সুবিধা নিশ্চিত।
ফলাফল:
বিশেষ করে ইলেকট্রনিক্স, গার্মেন্টস ও মোটর যন্ত্রাংশ খাতে FDI প্রবাহ ৩৬ বিলিয়ন ডলার (২০২৩) ছাড়িয়েছে। দক্ষিণ কোরিয়া ও জাপান প্রধান বিনিয়োগকারী।
মালয়েশিয়া: প্রযুক্তি ও পরিষেবা খাতে ফোকাসড নীতি
মূল নীতিমালা ও উদ্যোগ:
-
Malaysia Investment Development Authority (MIDA): দ্রুত ও দক্ষ অনুমোদন প্রক্রিয়া।
-
MSC Malaysia: প্রযুক্তি কোম্পানির জন্য কর ছাড় ও অবকাঠামো সুবিধা।
-
উচ্চমানের অবকাঠামো ও যোগাযোগ ব্যবস্থা।
-
সেবা ও পর্যটন খাতে বিদেশি অংশীদারিত্ব উৎসাহিত।
ফলাফল:
২০২৩ সালে মালয়েশিয়ার FDI ছিল প্রায় ২৫ বিলিয়ন ডলার। প্রযুক্তি, ফিনান্স ও বায়োটেক খাতে উল্লেখযোগ্য প্রবৃদ্ধি।
থাইল্যান্ড: ‘Thailand 4.0’ মডেল ও বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল
মূল নীতিমালা ও উদ্যোগ:
-
Thailand 4.0: উচ্চমূল্য সংযোজন খাত যেমন: রোবটিক্স, এভিয়েশন, বায়োটেক ইত্যাদিতে বিনিয়োগ উৎসাহ।
-
Board of Investment (BOI): কর অবকাশ, জমি সুবিধা, ভিসা/ওয়ার্ক পারমিট সহজীকরণ।
-
Eastern Economic Corridor (EEC): জাপান ও চীনা বিনিয়োগকারীদের জন্য আকর্ষণীয় হাব।
ফলাফল:
থাইল্যান্ডে ২০২৩ সালে ১৮ বিলিয়ন ডলারের বেশি বিনিয়োগ এসেছে। অটোমোবাইল ও প্রযুক্তি খাতে দ্রুত বৃদ্ধি।
হংকং: উন্মুক্ত অর্থনীতি ও আন্তর্জাতিক ফাইন্যান্সিয়াল হাব
মূল নীতিমালা ও উদ্যোগ:
-
কর হার মাত্র ১৬.৫% (কর্পোরেট), কোনো VAT নেই।
-
‘One Country, Two Systems’ নীতি: ব্যবসার স্বাধীনতা ও আইনি স্বচ্ছতা বজায়।
-
স্বাধীন বিচারব্যবস্থা ও শক্তিশালী ব্যাংকিং নেটওয়ার্ক।
-
হংকং ইনভেস্ট: সরকারি বিনিয়োগ সহায়তা সংস্থা।
ফলাফল:
হংকং এফডিআই প্রবাহ ২০২৩ সালে ১৪০ বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়েছে, যা মূলত চীন, যুক্তরাষ্ট্র ও ব্রিটেন থেকে এসেছে।
ভারত: সংস্কার, ডিজিটালাইজেশন ও উৎপাদন-ভিত্তিক কৌশল
মূল নীতিমালা ও উদ্যোগ:
-
‘Make in India’ (২০১৪): উৎপাদন খাতে বৈদেশিক বিনিয়োগ আকর্ষণের জন্য এটি একটি ঐতিহাসিক কর্মসূচি। ২৫টি খাত চিহ্নিত করে নীতিগত প্রণোদনা দেওয়া হয়।
-
স্বয়ংক্রিয় রুটে FDI অনুমোদন: একাধিক খাতে সরকারি অনুমোদন ছাড়াই FDI অনুমোদিত।
-
Digital India ও GST: ডিজিটাল পরিষেবা সহজ হওয়ায় ব্যবসার খরচ কমেছে এবং কর ব্যবস্থা একীভূত হয়েছে।
-
Industrial Corridors ও Smart Cities: দীর্ঘমেয়াদী অবকাঠামো উন্নয়ন কর্মসূচি।
ফলাফল:
ভারত ২০২৩ সালে ৭০ বিলিয়ন ডলার FDI আকর্ষণ করেছে। প্রযুক্তি, টেলিকম, এবং ই-কমার্স খাতে সবচেয়ে বেশি বিনিয়োগ এসেছে।
রুয়ান্ডা: আফ্রিকার বিনিয়োগ-বান্ধব মডেল
মূল নীতিমালা ও উদ্যোগ:
-
One-Stop Centre for Investors: বিনিয়োগ অনুমোদনের জন্য ৪৮ ঘণ্টার টার্গেট।
-
কর হ্রাস ও ভূমি ব্যবস্থাপনা ডিজিটালাইজেশন।
-
দুর্নীতিমুক্ত প্রশাসন ও সুশাসনের মডেল।
-
Rwanda Development Board (RDB): বিনিয়োগ, পর্যটন ও শিক্ষা-সহ নানা খাত এক ছাতার নিচে।
ফলাফল:
রুয়ান্ডা World Bank-এর “Ease of Doing Business” র্যাংকে আফ্রিকার মধ্যে শীর্ষস্থানীয় এবং ২০২৩ সালে প্রায় ১.৬ বিলিয়ন ডলারের FDI আকৃষ্ট করে—আবাসন, কৃষি ও ICT খাতে।
সার্বিক বিশ্লেষণ: এই দেশগুলো কীভাবে সফল হলো
| দেশ | মূল কৌশল | প্রধান খাত |
|---|---|---|
| ভারত | উৎপাদন, ডিজিটাল সেবা, সংস্কার | প্রযুক্তি, ই-কমার্স |
| ভিয়েতনাম | শ্রমনির্ভর উৎপাদন, FTA | ইলেকট্রনিক্স, পোশাক |
| মালয়েশিয়া | প্রযুক্তি পার্ক, কর ছাড় | আইটি, স্বাস্থ্য |
| থাইল্যান্ড | উচ্চ প্রযুক্তি ও EEC | গাড়ি, রোবোটিক্স |
| হংকং | কর অবকাশ, স্বাধীন বিচার | ব্যাংকিং, ট্রেড |
| রুয়ান্ডা | সুশাসন, দ্রুত অনুমোদন | কৃষি, ICT |
এই ছয়টি দেশ প্রমাণ করেছে যে, ভৌগলিক অবস্থান কিংবা প্রাকৃতিক সম্পদ নয়—বিনিয়োগবান্ধব নীতি, দক্ষ প্রশাসন, এবং রাজনৈতিক সদিচ্ছাই FDI আকৃষ্ট করার মূল উপাদান। বাংলাদেশসহ অন্যান্য উন্নয়নশীল দেশ যদি তাদের উদাহরণ অনুসরণ করে বাস্তবভিত্তিক, দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ কৌশল গ্রহণ করে—তবে তারাও বৈদেশিক বিনিয়োগ ও টেকসই উন্নয়নে নতুন দিগন্ত উন্মোচন করতে পারবে।
ছবি: জাহাঙ্গীর আলম শোভন

