ইসলাম ও বৈশ্বিক মানবতাবোধ

ইসলাম ও বৈশ্বিক মানবতাবোধ

ইসলাম ও বৈশ্বিক মানবতাবোধ

স্বামী লক্ষ্মী শংকরাচার্য

বই: ইসলাম আতংক না আদর্শ

ইসলামের ব্যবহারিক মানবীয় আদর্শ সম্পর্কে জানতে আমরা পবিত্র কুরআন মাজীদের আরো কিছু আয়াত পাঠ করে বোঝার করার চেষ্টা করব। মনে রাখতে হবে কুরআন এমন এক ধর্মগ্রন্থ যা শুধু আদেশ দেয়নি। বরং এই কুরআন যার উপর নাযিল হয়েছে সে বিশ্বনবী তার জীবনের মাধ্যমে কুরআনের নির্দেশাবলীয় বাস্তবিক ও ব্যবহারিক রুপ আমাদের সামনে উপস্থাপন করেছেন।

‘তোমরা পূর্র্ব দিকে মুখ ফেরাও বা পশ্চিম দিকে ফেরাও, এতেই পূণ্য বা নেকী নেই, তবে আসল কল্যাণ হচ্ছে একজন মানুষ ঈমান আনবে আল্লাহর উপর, পরকালের উপর, ফেরেশতাদের উপর, (আল্লাহর) কিতাবের উপর, নবী রাসূলদের উপর এবং আল্লাহর দেয়া ধন স¤পদ তাঁরই আনুকুল্য পাবার মানসে আত্মীয় স্বজন, এতীম মেসকীন ও পথিক মোসাফিরের জন্য ব্যয় করবে, সাহায্যপ্রার্থী মানুষদের, দাসদের থেকে মুক্ত করার কাজে অর্থ ব্যয় করবে, নামায প্রতিষ্ঠা করবে, যাকাত আদায় করবেযারা প্রতিশ্রুতি দিয়ে তা পালন করে, ক্ষুধা দারিদ্রের সময় ও দু:সময়ে ধৈর্য ধারণ করে, (মূলত) এরাই হচ্ছে সত্যবাদী এবং এরাই হচ্ছে প্রকৃত আল্লাহকে সমীহ করা লোক।’ কুরআন মাজীদ, সূরা-২, আল বাকারা, আয়াত-১৭৭
‘তোমরা একে অন্যের স¤পদ অন্যায় অবৈধভাবে আত্মসাত করো না, (আবার) জেনে বুঝে অন্যায়ভাবে অন্যের স¤পদ ভোগ করার জন্য এর তা থেকে বিচারকদের সামনে ঘুষ (কিংবা উপঢৌকন) হিসেেেব রেখো না।  কুরআন মাজীদ, সূরা-২, আল বাকারা, আয়াত ১৮৮
‘যদি তোমরা প্রকাশ্যে দান-খয়রাত করো, সেটা ভাল। আর যদি গোপনে অভাবী লোকদের সাহায্য করো, তবে তা তোমাদের জন্য আরো ভাল। আর এদান তোমাদের (কিছু) পাপকেও মুছে দেবে। আর তোমরা যা কিছু কর আল্লাহ সবকিছু অবগত।  কুরআন মাজীদ, সূরা-২, আল বাকারা, আয়াত ২৭১
‘আল্লাহ সূদকে পতনশীল করে দেন এবং দান খয়রাতকে সমৃদ্ধিশীল করেন এবং আল্লাহ কোনো অকৃতজ্ঞ পাপীকে পছন্দ করেন না।’  কুরআন মাজীদ, সূরা-২, আল বাকারা, আয়াত ২৭৬
‘হে ঈমনদারগণ, তোমরা আল্লাহকে ভয় করো, আগের যে (সূদ) বাকি আছে তোমরা তা ছেড়ে দাও, যদি সত্যিই তোমরা আল্লাহর উপর ঈমান এনে থাকো। যদি তোমরা তা না করো, তাহলে জেনে রাখো অতপর আল্লাহ তাআলা ও তাঁর রসূলের পক্ষ থেকে (তোমাদের বিরুদ্ধে) যুদ্ধের ঘোষণা থাকবে, আর যদি তোমরা (সুদ থেকে) ফিরে আসো তাহলে তোমরা তোমাদের মূলধন ফিরে পাবে, তোমরা কারো উপর যুলুম করো না, আর তোমাদের উপরও যুলুম করা হবে না। যদি (ঋণ গ্রহীতা) ব্যক্তি কখনো অভাবগ্রস্থ হয়ে পড়ে তাহলে তার সচ্ছল হওয়া পর্যন্ত তাকে সময় দাও; আর যদি (ঋণকে) সদকা (বা দান) করে দাও, তাহলে আরো ভালো; সেটা তোমরা হয়তো জানো। তোমরা সেদিনের ভয় করো, যেদিন তোমাদের সবাইকে আল্লাহর দিকে ফিরি যেতে হবে, সেদিন প্রত্যেক ব্যক্তিকে তার অর্জণ করা কাজের ফল বুঝিয়ে দেয়া হবে, তাদের কারো প্রতি প্রতি কোনো অন্যায় করা হবে না।’ কুরআন মাজীদ, সূরা-২, আল বাকারা, আয়াত ২৭৮-২৮১
‘যদি ইয়াতিমের সম্পদ (তোমাদের কাছে থাকে), তাদের কাছে ফিরিয়ে দাও। আর তাদের পবিত্র (এবং উত্তম) মালের সঙ্গে (নিজেদের খারাপ ও) নিকৃষ্ট মালকে বদল করো না। তাদের মালকে নিজেদের মালের সঙ্গে মিলিয়ে দিয়ে আত্মসাৎ করো না। যা খুব কঠিন পাপের কাজ।’  কুরআন, সূরা-৪, আননিসা আয়াত-২
‘যে ব্যক্তি অনাথদের মাল অবৈধভাবে ভক্ষণ করে, সে নিজের উদয়ে আগুন ভর্তি করে এবং তাকে দোযখে নিক্ষেপ করা হবে।’  কুরআন, সূরা-৪, আন নিসা আয়াত-১০
তোমরা কখনো ইয়তিমদের স¤পদের কাছেও যাবে না, তবে উদ্দেশ্য যদি ভালো হয় তাহলে সে একটা নির্দিষ্ট বয়সসীমায় পেঁৗঁছা পর্যন্ত (কোনো পদক্ষেপ নিলে তা ভিন্ন কথা), পরিমাপ ও ওজন (করার সময়) ন্যায্যভাবেই তা করবে, আমি (কখনো) কারো ওপর তার সাধ্যসীমার বাইরে কোনো দায়িত্ব চাপাই না, যখনি তোমরা কোনো ব্যাপারে কথা বলবে তখন ইনসাফ প্রতিষ্ঠা করবে, যদি তা (তোমাদের একান্ত) আপনজনের (বিরুদ্ধে)-ও হয়, তোমরা আল্লাহ কে দেয়া সব অংগীকার পূরণ করো এ হচ্ছে তোমাদের (জন্যে বিধান); এর মাধ্যমে আল্লাহ তোমাদের আদেশ দিয়েছেন (তোমরা যেন এগুলো মেনে চলো), আশা করা যায় তোমরা উপদেশ গ্রহণ করতে পারবে।’  কুরআন মাজীদ, সূরা-৬, আনআম আয়াত ১৫২
তোমাদের দান-অনুদান গরীব দুঃখীদের জন্য আর তাদের জন্য যারা সাদকা সংক্রান্ত কাজ করে এবং তাদের জন্য যাদের মন জয় করা হলো উদ্দেশ্য এবং দাস মুক্ত করার জন্য এবং ঋণগ্রস্তদের (ঋণ পরিশোধ করার জন্য) এবং আল্লাহর পথে ও পথিকদের (সাহায্যের) জন্যও (এই মাল খরচ করা উচিত)। (এই অধিকারসমূহ) আল্লাহর পক্ষ থেকে নির্ধারিত করে দেওয়া হয়েছে (যা তোমরা অমান্য করতে পারনা)। আর আল্লাহ সবকিছু জানেন, তিনি প্রজ্ঞাবান।’  কুরআন মাজীদ, সূরা-৯, আনফাল, আয়াত ৬০
‘তোমরা ইয়াতিমদের স¤পদের কাছেও যেয়ো না, তবে এমন কোনো পন্থায় যা (এতীমের জন্যে) উত্তম (বলে প্রমাণিত) হয় তা বাদেযতোক্ষণ পর্যন্ত সে (এতীম) তার বয়োপ্রাপ্তির পর্যায়ে উপনীত হয় এবং তোমরা (এদের দেয়া যাবতীয়) প্রতিশ্রুতি মেনে চলো, কেননা (কেয়ামতের দিন এ) প্রতিশ্রুতির ব্যাপারে (তোমাদের) জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে।’
‘কোনো কিছু পরিমাপ করার সময় মাপ কিন্তু পুরোপুরিই করবে, আর (ওজনে) দাঁড়িপাল্লা সোজা করে ধরবে; (লেনদেনের ব্যাপারে) এই হচ্ছে উত্তম পন্থা এবং পরিণামে (-র দিক থেকে) এটাই হচ্ছে উৎকৃষ্ট। যে বিষয়ে তোমার কোনো জ্ঞান নেই, (অযথা) তার পেছনে পড়ো না; কেননা (কেয়ামতের দিন) কান, চোখ ও অন্তর, এ সব কয়টির (ব্যবহার) স¤পর্কে তাদেরক জিজ্ঞেস করা হবে। আল্লাহর যমীনে (কখনোই) দম্ভভরে চলো না, কেননা (যতোই অহংকার করো না কেন), তুমি কখনো এ যমীন বিদীর্ণ করতে পারবে না, আর উচ্চতায়ও তুমি কখনো পর্বত সমান হতে পারবে না। (হে নবী,) এগুলো সবই (খারাপ কাজ,) এর মন্দ দিকগুলো তোমার মালিকের কাছেও একান্ত ঘৃণিত।  কুরআন মাজীদ, সূরা-১৭, বনী ঈসরাইল, আয়াত ৩৪-৩৮
‘(হে নবী,) তুমি বলো, হে মানুষ, আমি (তো) তোমাদের জন্যে (আযাবের) একজন সু¯পষ্ট সতর্ককারী মাত্র, যারা (আল্লাহর ওপর) ঈমান আনে এবং (সে অনুযায়ী) নেক কাজ করে, তাদের জন্যে রয়েছে (আল্লাহ র) ক্ষমা ও সম্মানজনক জীবিকা। (অপরদিকে) যারা আমার আয়াতসমূহ ব্যর্থ করে দেয়ার চেষ্টা করে, তারাই জাহান্নামের অধিবাসী হবে।’  কুরআন, সূরা-২২, আল হাজ্জ আয়াত ৪৯-৫১
‘(হে মানুষ, মাপের সময়) তোমরা পুরোপুরি মেপে দেবে, (মাপে কম দিয়ে) তোমরা ক্ষতিগ্রস্থ লোকদের দলভুক্ত হয়ো না। পাল্লা ঠিক রেখে ওজন করবে, মানুষদের পাওনা কখনো কম দেবে না এবং দুনিয়ায় ফেতনা ফাসাদ সৃষ্টি করো না, ভয় করবে তাঁকে যিনি তোমাদের এবং তোমাদের আগে যারা গত হয়ে গেছে তাদের সবাইকে সৃষ্টি করেছেন। কুরআন, সূরা ২৬, আল ফুরকান, আয়াত ১৮১-১৮৪
‘‘দুর্ভোগ রয়েছে এমনসব ব্যক্তির জন্য, যারা সামনে পেছনে মানুষদের নিন্দা করে, যে (কৃপণ) অর্থসঞ্চিত করে এবং তা কেবল গুনে গুনে রেখে দেয়, সে মনে করে, তার অর্থ চিরকাল তার হয়ে থাকবে; বরং অনতিবিলম্বে সে পিষনকারী (আগুনে) নিক্ষিপ্ত হবে, তুমি কি জানো, পিষণকারী (আগুন) কেমন? আল্লাহ তাআলার প্রজ্বলিত এক বিশেষ অগ্নি(গর্ভ), যা মানুষের হৃদয় অঙ্গার করে; সে (অগ্নিগর্ভের) উপর ঢাকনা দিয়ে রাখা হবে, আর উঁচু উঁচু খুটিতে তা গেথে রাখা হবে।’ কুরআন মাজীদ, সূরা ১০৪, আল হুমাযাহ আয়াত ১-৯
‘তুমি কি সে ব্যক্তিকে লক্ষ্য করেছো, যে শেষ বিচারের দিনকে অস্বীকার করে, এ তো হচ্ছে সে ব্যক্তি, যে ইয়াতীমকে গলাধাক্কা দিয়ে বের দেয়, দরিদ্রকে খাবার দিতে সে কখনো আহবান করে না; দুর্ভোগ রয়েছে সেসব নামাযীর জন্যও, যারা নিজেদের সালাত থেকে উদাসীন, তারা সৎ কাজকর্মের শুধু লোক দেখানোর জন্য করে থাকে, এবং ছোটোখাটো জিনিস পর্যন্ত দিতে চায়না।’  কুরআন মাজীদ, সূরা-১০৭, আল মাউন, আয়াত ১-৭
‘(হে নবী,) তুমি বলো, আমি আশ্রয় গ্রহণ করছি প্রভাতের রবের কাছে, তাঁর সৃষ্টি করা অনিষ্টের প্রভাব থেকে, আমি আশ্রয় গ্রহণ করছি রাতের অন্ধকারের অনিষ্ট থেকে, যখন তা পরিব্যপ্ত হয়, গিরায় ফুঁৎকার দিয়ে যাদুটোনাকারিণীদের অনিষ্ট থেকেও, হিংসুক ব্যক্তির হিংসার অনিষ্ট থেকেও যখন সে হিংসা করে।’ কুরআন, সূরা ১১৩, আল ফালাক, আয়াত-১-৫
‘(হে নবী,) তুমি বলো, আমি আশ্রয় গ্রহণ করছি মানুষের রবের কাছে, মানুষের অধিপতির কাছে, মানুষের (একমাত্র) মাবুদের কাছে, তার অনিষ্ট থেকে, যে কুমন্ত্রণা দিয়ে পালায়, যে মানুষের অন্তরে কুমন্ত্রণা দেয়, জ্বিনদের মধ্য থেকে (হোক বা) মানুষদের মধ্য থেকে হোক।’  কুরআন, সূরা ১১৪, আন নাছ, আয়াত ১-৬

Comments

No comments yet. Why don’t you start the discussion?

Leave a Reply