Bangladesh

সামাজিক পর্যটন ও বাংলাদেশে এর সম্ভাবনা

সামাজিক পর্যটন ও বাংলাদেশে এর সম্ভাবনা
জাহাঙ্গীর আলম শোভন

বাংলাদেশে সামাজিক পর্যটনের ধারণাটি প্রথম শুরু হয়েছিল একটি ব্যতিক্রমধর্মী ভ্রমণ উদ্যোগের মাধ্যমে। দেশের বিভিন্ন পর্যটন স্থানে থাকা, খাওয়া, এবং যোগাযোগ ব্যবস্থার উল্লেখযোগ্য উন্নয়ন হলেও, এসব অবকাঠামো পর্যটনের প্রয়োজন অনুযায়ী গড়ে ওঠেনি। পাশাপাশি, এই উন্নয়নের সঙ্গে দেশীয় সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের সংযোগও খুব সীমিত। উদাহরণস্বরূপ, খুলনায় চিংড়ি, রাজশাহীতে আম, এবং সিলেটে চা-বাগানের মনুমেন্ট যেমন কিছু জায়গায় তৈরি করা হয়েছে, তেমন উদ্যোগ দেশের প্রতিটি জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে নেওয়া উচিত।

বাংলাদেশের পর্যটন স্থাপনার নকশায় দেশীয় ঐতিহ্যের ছাপ খুবই কম। হোটেল-মোটেলগুলো অধিকাংশ ক্ষেত্রেই পাশ্চাত্য ধাঁচে নির্মিত, যা আমাদের দেশের সংস্কৃতি ও ইতিহাসকে উপস্থাপন করে না। বাংলাদেশ পর্যটন কর্পোরেশনের মোটেলগুলোতে অন্তত ঐতিহাসিক স্থাপত্যের আদলে কিছু পরিবর্তন আনা যেতে পারে। উদাহরণস্বরূপ, ময়নামতি বৌদ্ধবিহার বা পাহাড়পুরের নকশা অন্তর্ভুক্ত করে প্রবেশপথ, ছাদ বা বাইরের আদলে দেশীয় ঐতিহ্যের ছোঁয়া দেওয়া সম্ভব।

সামাজিক পর্যটনের সূচনা

২০১৬ সালে তেঁতুলিয়া থেকে টেকনাফ পর্যন্ত জাহাঙ্গীর আলম শোভনের পায়ে হাঁটার ভ্রমণ একটি অনন্য দৃষ্টান্ত। এই ভ্রমণটি ছিল সামাজিক পর্যটনের প্রথম প্রয়াস, যেখানে আমি বিভিন্ন সামাজিক কর্মসূচিতে অংশগ্রহণ করি এবং পথে পথে গরিব ও অসহায় মানুষকে সহায়তা করি। এর ফলে ভ্রমণটি শুধুমাত্র একটি ব্যক্তিগত অভিযান না থেকে সামাজিক কল্যাণের প্রতীক হয়ে ওঠে।

সামাজিক পর্যটনের ধরণ

সামাজিক পর্যটন মূলত বিভিন্ন ধরণের কার্যক্রম নিয়ে গঠিত, যার মধ্যে রয়েছে:

কমিউনিটি-বেজড ট্যুরিজম: স্থানীয় জনগণের অংশগ্রহণে ট্যুরিস্টদের সেবা প্রদান।

জীবনমুখী পর্যটন মানুষের জীবনযাত্রা এবং তাদের দৈনন্দিন সংগ্রামকে উপস্থাপন করে মানবিক আবেদন সৃষ্টি।

গ্রামীণ পর্যটন: গ্রামের সংস্কৃতি এবং জীবনযাত্রার সঙ্গে পরিচিত হওয়ার সুযোগ।

কৃষিভিত্তিক পর্যটন: কৃষি ও কৃষকের কার্যক্রম পর্যবেক্ষণ এবং সেখান থেকে শিক্ষা নেওয়া।

সমাজকল্যাণমূলক পর্যটন: ভ্রমণের পাশাপাশি স্থানীয় মানুষের জন্য কল্যাণমূলক কাজ করা।

মানবিক পর্যটন ভ্রমণের সময় কোনো অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়ানো।

দুর্যোগ পর্যটন: প্রাকৃতিক দুর্যোগ বা দুর্ঘটনাগ্রস্ত এলাকায় গিয়ে সহায়তা প্রদান।

অর্থপূর্ণ পর্যটন: ভ্রমণ বা পর্যটনকে যেকোনো অর্থে অর্থপূর্ণ করে তোলা। যদিও এই অর্থে সব সামাজিক পর্যটন অর্পূর্ণ

পরিবেশ বান্ধব পর্যটন: পরিবেশ এর ক্ষতি হয় না পরিবেশ এর উপকার হয় বা পরিবেশ নিয়ে কোনো কাজ হয় এমন পর্যটন। অনেকে ইকো ট্যুরিজম ও বলেন।

আনুষ্ঠানিক যাত্রা

সামাজিক পর্যটনের আনুষ্ঠানিক যাত্রা শুরু হয় ২০১৭ সালের সেপ্টেম্বর মাসে, যখন আমি ও ভলান্টিয়ার বাংলাদেশের ১৭ জন তরুণের একটি দল সেন্টমার্টিন দ্বীপে যাই। সেখানে আমরা দুটি পরিচ্ছন্নতা অভিযান পরিচালনা করি, যা দ্বীপের ট্যুরিস্টদের রেখে যাওয়া আবর্জনা পরিষ্কার করতে সহায়ক হয়। এছাড়াও, আমরা দ্বীপের প্রায় ৫০০ মানুষকে তাদের রক্তের গ্রুপ জানতে সহায়তা করি। এটি ছিল সেন্টমার্টিনের ইতিহাসে প্রথম ব্লাড গ্রুপিং কার্যক্রম। এর পর প্রতিবছর এটা অব্যাহত রয়েছে। গড়ে ৩০ থেকে ৪০ জন যোগ দিচ্ছে প্রতিবছর। এবং এই কাজটি এখন অনেকে করছে।

সামাজিক পর্যটনের তাৎপর্য

সামাজিক পর্যটন শুধুমাত্র একটি ভ্রমণ অভিজ্ঞতা নয়, বরং এটি সমাজের প্রতি দায়বদ্ধতার প্রতিফলন। নতুন এই ধারণাটি পর্যটনকে মানবিক মূল্যবোধ এবং সামাজিক কল্যাণের সঙ্গে যুক্ত করেছে। স্থানীয় জনগণের জীবনমান উন্নয়ন এবং প্রাকৃতিক সম্পদের টেকসই ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে সামাজিক পর্যটন বাংলাদেশের পর্যটন খাতকে নতুন উচ্চতায় নিয়ে যেতে সক্ষম।

Comments

No comments yet. Why don’t you start the discussion?

Leave a Reply