সারাবিশ্বের ভূমিহীন ও আশ্রয়হীণ মানুষ
ওভারভিউ (Overview)
ভূমিহীনতা ও আশ্রয়হীনতা হলো বহুমাত্রিক বৈশ্বিক সমস্যা। এক প্রান্তে রয়েছে শহরের রাস্তায় খোলা আকাশের নিচে রাত কাটানো মানুষ; অন্য প্রান্তে রয়েছে অনানুষ্ঠানিক বসতিতে গাদাগাদি করে থাকা পরিবার অথবা এমন মানুষ, যাদের বসবাস আছে ঠিকই কিন্তু নেই কোনো নিরাপদ ভূমি-অধিকার।
এই সমস্যার পরিমাপ কঠিন, কারণ দেশভেদে সংজ্ঞা ভিন্ন—কোথাও “সম্পূর্ণ আশ্রয়হীণ”, কোথাও “অপর্যাপ্ত আবাসনে বসবাসকারী”, কোথাও “অভ্যন্তরীণভাবে বাস্তুচ্যুত”, আবার কোথাও “আইনগত ভূমি-স্বত্বহীন” হিসেবে গণনা করা হয়।
তবুও বিভিন্ন বিশ্বস্ত আন্তর্জাতিক সূত্র একই চিত্র তুলে ধরে—বিশ্বজুড়ে শত শত মিলিয়ন মানুষ পর্যাপ্ত আবাসন থেকে বঞ্চিত, এবং কয়েক কোটি থেকে কয়েকশ কোটি মানুষ কোনো স্থিতিশীল বাসস্থান বা নিরাপদ ভূমির অধিকার ছাড়াই জীবনযাপন করছে।
প্রতিবছর কত মানুষ ভূমিহীন বা আশ্রয়হীণ হয়?
এই সংখ্যা পুরোপুরি নির্ভর করে ব্যবহৃত সংজ্ঞার ওপর—
অপর্যাপ্ত আবাসন / অনিরাপদ ভূমি
UN-Habitat ও সংশ্লিষ্ট বিশ্লেষণ অনুযায়ী, ১৬০ কোটিরও বেশি মানুষ বর্তমানে অপর্যাপ্ত আবাসনে বাস করছে বা নিরাপদ ভূমি-স্বত্ব থেকে বঞ্চিত। সাম্প্রতিক কিছু সমন্বিত বিশ্লেষণে দেখা যায়, যদি আবাসনের সব ধরনের অপ্রতুলতা একসাথে ধরা হয়, তাহলে এই সংখ্যা ২৫০–৩০০ কোটির কাছাকাছি পৌঁছে যায়।
এই হিসাবের মধ্যে বস্তিবাসী, অনানুষ্ঠানিক বসতির মানুষ এবং অনিশ্চিত মালিকানার অধীনে বসবাসকারীরাও অন্তর্ভুক্ত।
সম্পূর্ণ আশ্রয়হীণ মানুষ (Shelterless / Homeless)
যারা একেবারে ঘরহীন—অর্থাৎ রাস্তায় ঘুমায় বা জরুরি আশ্রয়কেন্দ্রে থাকে—তাদের সংখ্যা উৎস ও বছরভেদে ব্যাপকভাবে ভিন্ন। রক্ষণশীল বৈশ্বিক হিসাবগুলো সাধারণত কয়েক কোটি মানুষের কথা বলে। তবে বিভিন্ন মানবাধিকার সংগঠন ও গবেষণায় দেখা যায়, সংজ্ঞা অনুযায়ী বিশ্বজুড়ে প্রায় ১০ কোটির মতো মানুষকে আশ্রয়হীণ হিসেবে গণ্য করা যেতে পারে।
এর পাশাপাশি আরও কয়েকশ কোটি মানুষ বস্তি বা অস্থায়ী আবাসনে বসবাস করছে, যা “অপর্যাপ্ত আবাসন” হিসেবে বিবেচিত।
প্রতিবছরের চালিকাশক্তি: উচ্ছেদ ও বাস্তুচ্যুতি
প্রতিবছর কয়েক কোটি মানুষ জোরপূর্বক উচ্ছেদ বা বাস্তুচ্যুত হয়। জাতিসংঘের তথ্যমতে, শুধু সংঘাত ও সহিংসতার কারণেই ২০২৩ সালের শেষে অভ্যন্তরীণভাবে বাস্তুচ্যুত মানুষের সংখ্যা দাঁড়ায় ৬৮.৩ মিলিয়নে, যা সরাসরি ভূমিহীনতা ও আশ্রয়হীনতা বাড়িয়ে দেয়।
এই তথ্যগুলো একত্রে দেখলে বোঝা যায়—পরিসরটি বিপুল:
কয়েকশ কোটি মানুষ অনিরাপদ আবাসনে,
কয়েক কোটি থেকে শত কোটি মানুষ তীব্র আশ্রয়হীনতা বা ভূমি-স্বত্বহীনতায়।
এবং প্রতিবছর সংঘাত, দুর্যোগ, উচ্ছেদ ও অর্থনৈতিক ধাক্কায় নতুন করে আরও লাখো-কোটি মানুষ ভূমিহীন ও আশ্রয়হীণ হয়ে পড়ছে।
ভূমিহীনতা ও আশ্রয়হীনতার কারণ কী?
ভূমিহীনতা ও আশ্রয়হীনতা সাধারণত একাধিক, পরস্পর-সংযুক্ত কারণে সৃষ্টি হয়—
সংঘাত, সহিংসতা ও জোরপূর্বক বাস্তুচ্যুতি
যুদ্ধ ও স্থানীয় সহিংসতা হঠাৎ করে বিপুল জনগোষ্ঠীকে বাস্তুচ্যুত করে। তারা ঘরবাড়ি ও ভূমি-অধিকার হারায়। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে অভ্যন্তরীণ বাস্তুচ্যুতির হার ইতিহাসের সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছে।
প্রাকৃতিক দুর্যোগ ও জলবায়ু পরিবর্তন
ঘূর্ণিঝড়, বন্যা, খরা ও সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি ঘরবাড়ি ও কৃষিজমি ধ্বংস করে বা এলাকাকে বসবাসের অযোগ্য করে তোলে। ফলে মানুষ বাধ্য হয়ে স্থানান্তরিত হয় এবং শেষ পর্যন্ত অনিরাপদ, অনানুষ্ঠানিক আবাসনে আশ্রয় নেয়। জলবায়ু-জনিত ধাক্কা এখন আবাসন অনিশ্চয়তার অন্যতম প্রধান চালক।
উচ্ছেদ, ভূমি দখল ও অনিরাপদ মালিকানা
নগর পুনর্গঠন, অতিরিক্ত ভাড়া, কিংবা আইনি বিরোধপূর্ণ ভূমি-স্বত্বের কারণে প্রতিবছর লাখো মানুষ উচ্ছেদের শিকার হয়। জাতিসংঘ বারবার জোরপূর্বক উচ্ছেদকে ভূমিহীনতার বড় কারণ হিসেবে চিহ্নিত করেছে।
দারিদ্র্য ও সাশ্রয়ী আবাসনের অভাব
আবাসন ব্যয় বেড়ে যাওয়া, আয়ের স্থবিরতা এবং সাশ্রয়ী ঘরের সংকট নিম্ন-আয়ের পরিবারগুলোকে আশ্রয়হীনতা বা বস্তিতে ঠেলে দেয়। অনেক শহরেই আবাসনের চাহিদা সরবরাহকে বহু গুণ ছাড়িয়ে গেছে।
দ্রুত নগরায়ণ ও গ্রাম-থেকে-শহর অভিবাসন
কর্মসংস্থানের আশায় মানুষ শহরে আসে, কিন্তু শহরগুলোর কাছে নতুন মানুষকে ধারণ করার মতো অবকাঠামো ও আবাসন থাকে না। এর ফল হয় বিশাল অনানুষ্ঠানিক বসতি।
স্বাস্থ্য ও সামাজিক কারণ
মানসিক অসুস্থতা, মাদকাসক্তি, পারিবারিক ভাঙন, কর্মহানি এবং সামাজিক নিরাপত্তা ব্যবস্থার অভাব মানুষকে আশ্রয়হীনতার দিকে ঠেলে দেয়।
নীতিগত ও শাসনগত ব্যর্থতা
দুর্বল ভূমি শাসনব্যবস্থা, সীমিত সামাজিক সুরক্ষা এবং দুর্বল নগর পরিকল্পনা আবাসন অনিশ্চয়তাকে আরও বাড়িয়ে তোলে এবং প্রতিরোধকে কঠিন করে তোলে।
এই কারণগুলো পরস্পরের সঙ্গে যুক্ত—যেমন জলবায়ু বিপর্যয় সংঘাত সৃষ্টি করতে পারে, আবার নগরায়ণ ও সাশ্রয়ী আবাসনের অভাব একসাথে বিশাল বস্তি তৈরি করতে পারে।
কোথায় ভূমিহীনতা ও আশ্রয়হীনতা সবচেয়ে বেশি?
সংজ্ঞার ভিন্নতার কারণে দেশভিত্তিক সুনির্দিষ্ট তালিকা আলাদা হলেও সামগ্রিক প্রবণতা স্পষ্ট—
-
এশিয়া ও আফ্রিকায় বস্তি, অনানুষ্ঠানিক বসতি ও অনিরাপদ আবাসনে বসবাসকারী মানুষের সংখ্যা সবচেয়ে বেশি। কারণ এই দুই মহাদেশেই বিশ্বের অধিকাংশ মানুষ বাস করে এবং দ্রুত নগরায়ণ এখানেই বেশি।
-
ভারত, নাইজেরিয়া, পাকিস্তান, বাংলাদেশসহ কয়েকটি জনবহুল উন্নয়নশীল দেশে ভূমিহীন ও অপর্যাপ্ত আবাসনে বসবাসকারীর সংখ্যা তুলনামূলকভাবে বেশি।
-
উন্নত দেশগুলোতেও (যেমন যুক্তরাষ্ট্র ও OECD-ভুক্ত দেশগুলো) আশ্রয়হীনতা একটি বড় সমস্যা, যদিও সংখ্যাগতভাবে তা জনবহুল উন্নয়নশীল দেশগুলোর তুলনায় কম।
সংক্ষেপে—এশিয়া ও আফ্রিকায় সংখ্যাগত চাপ সবচেয়ে বেশি; কিছু উন্নয়নশীল দেশ জনসংখ্যা ও দুর্বল আবাসন ব্যবস্থার কারণে শীর্ষে; আর উন্নত দেশগুলোতে আশ্রয়হীনতা স্থানীয়ভাবে গুরুতর হলেও মোট সংখ্যায় তুলনামূলক কম।
কোন দরিদ্র বা উন্নয়নশীল দেশগুলো জনসংখ্যাজনিত আবাসন চাপ সামাল দিতে পারছে না?
অনেক নিম্ন ও মধ্য-আয়ের দেশ জনসংখ্যা বৃদ্ধি ও অভিবাসনের ফলে সৃষ্ট আবাসন চাহিদা সামাল দিতে ব্যর্থ হচ্ছে, বিশেষ করে যেখানে—
-
সরকারি আবাসন কর্মসূচিতে অর্থায়ন অপর্যাপ্ত,
-
নগর পরিকল্পনা ও ভূমি নিবন্ধন দুর্বল,
-
সামাজিক সুরক্ষা ব্যবস্থা সীমিত।
দক্ষিণ এশিয়া ও সাব-সাহারান আফ্রিকার বিস্তীর্ণ অঞ্চলে অনানুষ্ঠানিক বসতি সম্প্রসারণের গতি সরকারি সক্ষমতাকে ছাড়িয়ে গেছে। দ্রুত নগরায়ণ, জলবায়ু ঝুঁকি ও দুর্বল শাসনব্যবস্থার সমন্বয় এসব দেশকে বিশেষভাবে ঝুঁকিপূর্ণ করে তুলছে।
ভবিষ্যতে কোথায় ভূমিহীনতা ও আশ্রয়হীনতা বাড়বে—এবং কেন?
কয়েকটি সমান্তরাল প্রবণতা ভবিষ্যৎ চাপের দিক নির্দেশ করে—
দ্রুত নগরায়ণ
জাতিসংঘের পূর্বাভাস অনুযায়ী ২০৫০ সালে বিশ্বের প্রায় ৬৮% মানুষ শহরে বসবাস করবে। বড় নীতিগত পরিবর্তন না হলে অনানুষ্ঠানিক আবাসনে মানুষের সংখ্যা বাড়বে।
জলবায়ু-ঝুঁকিপূর্ণ অঞ্চল
নিম্নভূমি উপকূলীয় দেশ, ছোট দ্বীপ রাষ্ট্র এবং খরাপ্রবণ অঞ্চলগুলোতে (দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া, সাহেল অঞ্চল, প্রশান্ত ও ভারত মহাসাগরীয় দ্বীপপুঞ্জ) জলবায়ু-চালিত বাস্তুচ্যুতি ও আশ্রয়হীনতা বাড়বে।
সংঘাতপ্রবণ রাষ্ট্র
যেসব অঞ্চলে সংঘাত চলমান বা বাড়ছে, সেখানে অভ্যন্তরীণ বাস্তুচ্যুতি ও আশ্রয়হীনতা আরও তীব্র হবে।
আবাসন ব্যয়ের সংকট
যেসব শহরে আয় বাড়ছে না অথচ আবাসন বাজার উত্তপ্ত, সেখানে সামাজিক আবাসন ও ভাড়াটে সুরক্ষা না বাড়ালে আশ্রয়হীনতা বাড়বেই।
সংক্ষেপে—এশিয়া ও আফ্রিকার বহু দেশ, জলবায়ু-ঝুঁকিপূর্ণ উপকূলীয় অঞ্চল এবং সংঘাতপ্রবণ রাষ্ট্রগুলোতে পরিস্থিতি আরও খারাপ হওয়ার আশঙ্কা সবচেয়ে বেশি।
ভূমিহীন ও আশ্রয়হীণ মানুষের মানবিক ও মানবাধিকার সংকট
নিরাপদ আশ্রয় না থাকলে মানুষ একের পর এক সংকটে পড়ে—
-
তাৎক্ষণিক শারীরিক ঝুঁকি: আবহাওয়ার প্রভাব, আঘাত ও মৃত্যুঝুঁকি, খাদ্য অনিরাপত্তা
-
স্বাস্থ্য সংকট: অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ, সংক্রামক রোগ, মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যা
-
নিরাপত্তা ঝুঁকি: সহিংসতা, শোষণ, যৌন ও লিঙ্গভিত্তিক সহিংসতা
-
অর্থনৈতিক বঞ্চনা: ঠিকানা না থাকায় কাজ, ব্যাংকিং বা সামাজিক সুবিধা থেকে বাদ পড়া
-
শিক্ষা ব্যাহত হওয়া: শিশুদের স্কুল ছাড়তে বাধ্য হওয়া
-
আইনি অনিশ্চয়তা: ভূমি-স্বত্ব না থাকায় ক্ষতিপূরণ বা উন্নয়ন সুবিধা না পাওয়া
-
প্রজন্মগত দারিদ্র্য: এক প্রজন্ম থেকে আরেক প্রজন্মে অনিশ্চয়তার উত্তরাধিকার
কী কাজ করে—এবং কী আরও বিস্তৃত করা দরকার?
গবেষণা ও বাস্তব অভিজ্ঞতা কয়েকটি সমাধানের দিকে ইঙ্গিত করে—
-
প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা: ভাড়াটে সুরক্ষা, উচ্ছেদ প্রতিরোধ ও সামাজিক নিরাপত্তা
-
নিরাপদ ভূমি-স্বত্ব: নিয়মিতকরণ ও সাশ্রয়ী ভূমি নিবন্ধন
-
সাশ্রয়ী আবাসন সরবরাহ: সামাজিক আবাসন ও বস্তি উন্নয়ন
-
দুর্যোগ ঝুঁকি হ্রাস ও জলবায়ু অভিযোজন
-
লক্ষ্যভিত্তিক সেবা: স্বাস্থ্য, মানসিক স্বাস্থ্য, নগদ সহায়তা ও কর্মসংস্থান
-
উন্নত তথ্য সংগ্রহ: সঠিক নীতি নির্ধারণের জন্য জাতীয় পর্যায়ের নির্ভরযোগ্য পরিমাপ
ভূমিহীনতা ও আশ্রয়হীনতা কোনো একক নীতিগত সমস্যা নয়; এটি অর্থনৈতিক, পরিবেশগত, রাজনৈতিক ও সামাজিক জটিলতার সমষ্টি। সমস্যার পরিসর বিশাল—কয়েকশ কোটি মানুষ অপর্যাপ্ত আবাসনে, আর কয়েক কোটি থেকে শত কোটি মানুষ তীব্র আশ্রয়হীনতা বা অনিরাপদ ভূমি-স্বত্বে বাস করছে। এর বড় অংশই কেন্দ্রীভূত এশিয়া ও আফ্রিকায়, যেখানে জলবায়ু পরিবর্তন, সংঘাত ও দ্রুত নগরায়ণ একসাথে কাজ করছে।
এই প্রবণতা উল্টাতে হলে প্রয়োজন সমন্বিত উদ্যোগ—প্রতিরোধ, নিরাপদ ভূমি-স্বত্ব, সাশ্রয়ী আবাসন, সামাজিক সুরক্ষা ও জলবায়ু-সহনশীল পরিকল্পনা। সর্বোপরি প্রয়োজন রাজনৈতিক সদিচ্ছা—আশ্রয়কে একটি মৌলিক মানবাধিকার হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়ার মানসিকতা।
