সাইদা খানম: নতুন সময় যেখান থেকে শুরু হয়
আজকের পর্বের নায়ক একজন নারী, যিনি ক্যামেরার লেন্স দিয়ে ইতিহাস ধরে রেখেছেন, কিন্তু নিজে ইতিহাসের পাতা থেকে প্রায় উবে গিয়েছিলেন। তিনি সাইদা খানম — বাংলাদেশের প্রথম পেশাদার নারী আলোকচিত্রী। সেই সময়ে, যখন পূর্ব পাকিস্তানের মেয়েরা ঘরের বাইরে বের হতেন ঘোড়ার গাড়ির ঘেরাটোপে, তখন তিনি একা কাঁধে ক্যামেরা নিয়ে ঘুরে বেড়িয়েছেন রাজপথ থেকে রাষ্ট্রীয় অনুষ্ঠান, মুক্তিযুদ্ধের ট্রেনিং ক্যাম্প থেকে সত্যজিৎ রায়ের সেট— সব জায়গায় । চলুন, শুনি সেই অদম্য নারী সত্তার গল্প।
জন্ম, শৈশব ও বেড়ে ওঠা: ইছামতির তীরে “বাদল”
১৯৩৭ সালের ২৯ ডিসেম্বর। পাবনার ইছামতি নদীর তীরে। সেখানকার মনোরম প্রাকৃতিক পরিবেশে জন্ম নেওয়া একটি মেয়ের ডাকনাম রাখা হয়েছিল “বাদল” । তাঁর পৈতৃক নিবাস ফরিদপুরের ভাঙ্গা হলেও জন্ম ও শৈশব কেটেছে পাবনার নানাবাড়িতে। বাবা আবদুস সামাদ খান ছিলেন সরকারি স্কুল পরিদর্শক এবং মা নাছিমা খাতুন । সাইদা খানম ছিলেন ছয় ভাইবোনের মধ্যে সবার ছোট ।
শৈশব থেকেই তাঁর স্বাস্থ্য খুব একটা ভালো ছিল না। অসুস্থ হয়ে দোতলার জানালার পাশে শুয়ে তিনি দেখতেন প্রকৃতির রঙবদল, গাছের ডালে পাখির আনাগোনা, আর আকাশের তারা। সেই দৃশ্যগুলো চিরকাল ধরে রাখার ইচ্ছা থেকেই কি তাঁর ক্যামেরার প্রতি অনুরাগ জন্মায়? তিনি নিজেই লিখেছেন, “এসব কি ধরে রাখা যায় না!!” ।
তবে সাইদা খানম যে শুধু ক্যামেরা নিয়েই বড় হননি, তা কিন্তু নয়। তাঁর বড় বোনেরা ছিলেন পথিকৃৎ। বড় ভাই আবদুল আহাদ ছিলেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সাক্ষাৎ ছাত্র এবং বাংলাদেশের জাতীয় সংগীতের স্বরলিপিকার। বড় বোন মহসিনা আলী ছিলেন সে সময়ের নারী চিত্রশিল্পীদের অন্যতম। আর মেজ বোন হামিদা খানম ছিলেন প্রথম মুসলিম নারী হিসেবে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে দর্শনশাস্ত্রে এমএ পাস করা এবং ঢাকার হোম ইকোনমিকস কলেজের প্রতিষ্ঠাতা অধ্যক্ষ। খালা মাহমুদা খাতুন সিদ্দিকাও ছিলেন স্বনামধন্য কবি। এমন একটি শিক্ষিত ও প্রগতিশীল পরিবারে বেড়ে ওঠায় তাঁর মানস গঠনে তার প্রভাব পড়েছিল বলেই মনে হয় ।
সেই সময়ের আরেক বিখ্যাত মুখের সঙ্গেও ছোটবেলায় তাঁর দেখা হয়েছিল। নানাবাড়ির একই পাড়ায় ছিল বাংলা চলচ্চিত্রের মহানায়িকা সুচিত্রা সেনদের বাড়ি। সুচিত্রা সেন তখন “রমা” নামের এক স্কুলপড়ুয়া তরুণী। বয়সে ছয় বছরের বড় বলে সাইদা খানম তাঁকে “দিদি” বলে ডাকতেন ।
শিক্ষাজীবন ও আলোকচিত্রের সূচনা: প্রথম ক্লিক
মাত্র ১২-১৩ বছর বয়সে, ১৯৪৯ সালে, তিনি প্রথম ক্যামেরা হাতে তুলে নেন । তখন পূর্ব বাংলায় মুসলিম নারীদের জন্য সামাজিক বাধা ছিল অপরিসীম। ছবি তোলা তো দূরের কথা, শিক্ষার অধিকারই ছিল সীমিত। কিন্তু সাইদা খানমের ক্ষেত্রে বিষয়টি ছিল উল্টো। তাঁর মেজ বোন হামিদা খানম যুক্তরাষ্ট্র থেকে একটি ‘রলিফ্লেক্স’ বা ‘রলিকর্ড’ ক্যামেরা এনে দিয়েছিলেন, যা তখন পেশাদাররাও ব্যবহার করতেন । বাবাও খুব প্রগতিশীল ছিলেন। তিনি মাত্র দুটি জায়গায় ছবি তুলতে নিষেধ করেছিলেন— বিয়ের আসর আর স্টেডিয়াম। প্রথমটা তিনি মেনেছিলেন, কিন্তু স্টেডিয়ামে গিয়ে খেলার ছবি তুলতে হয়েছে কাজের প্রয়োজনে ।
তবে পেশাদার আলোকচিত্রী হয়ে ওঠার পেছনে সবচেয়ে বড় ভূমিকা ছিল “জায়েদী স্টুডিও”র মালিক জায়েদী সাহেবের। সে সময় ঢাকায় মাত্র দুটি স্টুডিও ছিল। জায়েদী সাহেব তাঁকে ছবি তোলার বিভিন্ন কৌশল শিখিয়েছেন, অ্যাপারচার, এক্সপোজার, কম্পোজিশন সম্পর্কে ধারণা দিয়েছেন এবং ফটোগ্রাফির ওপর প্রচুর বই পড়তে দিয়েছেন। সাইদা খানম নিজেই বলেছেন, “জায়েদী সাহেবই আমার ফটোগ্রাফির প্রথম শিক্ষক” ।
আলোকচিত্র চর্চার পাশাপাশি তিনি লেখাপড়াও চালিয়ে গেছেন। ১৯৬৮ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাংলা ভাষা ও সাহিত্যে স্নাতকোত্তর এবং ১৯৭২ সালে লাইব্রেরি সায়েন্সে আরেকটি স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন ।
চ্যালেঞ্জ ও সংগ্রাম: একক যোদ্ধার পথচলা
সেই সময় একজন নারী হয়ে প্রকাশ্যে ক্যামেরা নিয়ে ঘোরাটা মোটেও সহজ ছিল না। ঢাকা তখন মফস্বল শহরের মতো। মেয়েরা পথে-ঘাটে খুব একটা বের হতেন না। সাইদা খানম যখন রাস্তায় দাঁড়িয়ে ছবি তুলতেন, অনেকে বিরূপ মন্তব্য করত, কেউ কেউ ঢিল ছুড়েও মারত । কিন্তু তিনি কখনো এসব গায়ে মাখতেন না। পরিবারকে দুশ্চিন্তায় ফেলবেন বলে বাড়িতেও বলতেন না।
তিনি কখনো বিয়ে করেননি। নিজের জীবন সম্পর্কে তাঁর মন্তব্যটা খুব চোখে লাগে। তিনি বলেছিলেন, “আমি বিয়ে করিনি তো! বিয়ে করলে ছবি তোলা হতো না। ক্যামেরাকে যারা বড় বেশি ভালোবাসে তারা বিয়ে করেন না। ক্যামেরাই আমাকে সংসার জীবন থেকে আলাদা করে দিয়েছে” । এই একটি বাক্যেই বলে দেয়, শিল্পের প্রতি তাঁর নিবেদন কত গভীর ছিল।
কাজের জায়গাটাও তিনি বেছে নিয়েছিলেন এমনভাবে, যাতে ছবি তোলার জন্য পর্যাপ্ত সময় পান। ১৯৭৪ থেকে ১৯৮৬ সাল পর্যন্ত তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের সেমিনার লাইব্রেরিতে লাইব্রেরিয়ান হিসেবে কাজ করেছেন । একবেলা লাইব্রেরির কাজ, বাকি সময় নিজের মতো করে ছবি তোলা— এই ছিল তাঁর রুটিন ।
উল্লেখযোগ্য অবদান: ইতিহাসের সাক্ষী
সাইদা খানমের ক্যামেরায় ধরা আছে বিশ্বের অসংখ্য খ্যাতনামা ব্যক্তিত্ব। রানি এলিজাবেথ, মাদার তেরেসা, মার্শাল টিটো, অড্রে হেপবার্ন, ইন্দিরা গান্ধী থেকে শুরু করে চন্দ্রবিজয়ী নীল আর্মস্ট্রং, এডউইন অলড্রিন ও মাইকেল কলিন্স— সবার ছবি তিনি নিজ হাতে তুলেছেন ।
তবে তাঁর সবচেয়ে আলোচিত কাজ হলো ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধ শুরুর আগে ঢাকার আজিমপুর এলাকায় অস্ত্র হাতে প্রশিক্ষণরত নারী মুক্তিযোদ্ধাদের ছবি তোলা। এই দুর্লভ ছবিগুলো বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে অমূল্য সংযোজন ।
১৬ ডিসেম্বর বিজয়ের দিনে তিনি আরেকটি ঐতিহাসিক মুহূর্ত ধরে রাখতে চেয়েছিলেন। হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টালের (বর্তমান ইন্টারকন্টিনেন্টাল ঢাকা) সামনে পাকিস্তানি সেনারা গোলাগুলি শুরু করলে তিনি খবর পেয়ে সেখানে ছুটে যান। প্রচণ্ড গোলাগুলির কারণে সেদিন ছবি তোলা সম্ভব হয়নি, কিন্তু তাঁর সেই দুঃসাহস দেখে অনেকেই অবাক হয়েছিলেন ।
তাঁর আরেকটি অনন্য কীর্তি হলো অস্কারজয়ী চলচ্চিত্রকার সত্যজিৎ রায়ের সঙ্গে কাজ করা। ১৯৬২ সালে ‘চিত্রালী’ পত্রিকার হয়ে সত্যজিৎ রায়ের সাক্ষাৎকার ও ছবি তুলতে গিয়ে তিনি ব্যাপক সমাদৃত হন । সিনেমাটোগ্রাফার না হয়েও তিনি সত্যজিৎ রায়ের ‘মহানগর’, ‘চারুলতা’ এবং ‘কাপুরুষ ও মহাপুরুষ’ ছবির আলোকচিত্রী হিসেবে কাজ করেছিলেন । পরবর্তীতে সত্যজিৎ রায়ের সঙ্গে তাঁর সাক্ষাৎ ও কাজের অভিজ্ঞতা নিয়ে তিনি ‘আমার চোখে সত্যজিৎ রায়’ নামে একটি বইও রচনা করেন ।
সাফল্য ও পথচলা: আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি
সাইদা খানমের প্রতিভা দেশের সীমানা পেরিয়ে বিদেশেও ছড়িয়ে পড়েছিল। ১৯৫৬ সালে ঢাকায় আন্তর্জাতিক প্রদর্শনীতে অংশ নেওয়ার পর সেবছরই জার্মানির ‘ইন্টারন্যাশনাল অ্যাওয়ার্ড কোলন’ পুরস্কার পান তিনি ।
১৯৬০ সালে ‘অল পাকিস্তান ফটো প্রতিযোগিতা’য় প্রথম হন । জাপানের ইউনেসকো অ্যাওয়ার্ড, অনন্যা শীর্ষ দশ পুরস্কার, বেগম পত্রিকার ৫০ বছর পূর্তি পুরস্কার, বাংলাদেশ ফটোগ্রাফিক সোসাইটির সম্মানসূচক ফেলো— এসব পেয়েছেন তিনি। অবশেষে ২০১৯ সালে আলোকচিত্রে অসামান্য অবদানের জন্য বাংলাদেশ সরকার তাঁকে সর্বোচ্চ বেসামরিক সম্মান ‘একুশে পদক’ এ ভূষিত করে ।
দেশের বাইরে ভারত, জাপান, ফ্রান্স, সুইডেন, পাকিস্তান, সাইপ্রাস ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে তাঁর ছবির প্রদর্শনী হয়েছে ।
ক্যামেরার পাশাপাশি তিনি নিয়মিত লেখালেখিও করেছেন। তাঁর রচিত গ্রন্থগুলোর মধ্যে ‘ধূলোমাটি’ (১৯৬৪), ‘স্মৃতির পথ বেয়ে’ (২০১৩), ‘আমার চোখে সত্যজিৎ রায়’ (২০০৪) এবং ‘আলোকচিত্রী সাইদা খানম-এর উপন্যাসত্রয়ী’ উল্লেখযোগ্য । ১৯৪৯ সালে মাত্র ১২ বছর বয়সে তাঁর প্রথম গল্প ছাপা হয়েছিল সাপ্তাহিক বেগম পত্রিকায় ।
সার্বিক মূল্যায়ন: এক অনন্য নারী সত্তা
সাইদা খানম শুধু একজন আলোকচিত্রী ছিলেন না। তিনি ছিলেন একজন গল্পকার, একজন সাহিত্যিক, একজন স্বেচ্ছাসেবী, একজন দেশপ্রেমিক। মুক্তিযুদ্ধের পর হাসপাতালে নার্স সংকট দেখা দিলে তিনি হলি ফ্যামিলি হাসপাতালে স্বেচ্ছাসেবী নার্সিংয়ের কাজ করেছেন ।
তিনি ছিলেন প্রচারবিমুখ। হয়তো এ কারণেই তাঁর নামটি ততটা আলোচনায় আসেনি, যতটা আসা উচিত ছিল । কিন্তু আলোকচিত্রের ইতিহাসে তাঁর কাজের গুরুত্ব অপরিসীম। তিনি শুধু নিজে ছবি তোলেননি, একই সাথে আগামী প্রজন্মের নারী আলোকচিত্রীদের জন্য পথ তৈরি করে গেছেন। সেই সময়ে একজন নারী হয়েও তিনি দেখিয়ে দিয়েছেন, ক্যামেরা হাতে ইতিহাসের সাক্ষী হওয়া যায়, ইতিহাস তৈরি করা যায়।
২০২০ সালের ১৮ আগস্ট ৮২ বছর বয়সে ঢাকায় শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন এই কিংবদন্তি নারী আলোকচিত্রী । মৃত্যুর আগ পর্যন্ত তিনি ক্যামেরা সঙ্গী করেছিলেন। আলোকচিত্রী সাহাদাত পারভেজ সত্যজিৎ রায়ের শেষ সময়ে সাইদা খানমের একটি হৃদয়বিদারক স্মৃতিচারণ করেছেন। সত্যজিৎ রায় তখন ইনটেনসিভ কেয়ারে, প্রায় অচেতন। সাইদা খানম বিজয়া রায়কে অনুরোধ করলেন, ‘আমি কী একবার মানিকদাকে দেখার সুযোগ পেতে পারি?’ বিজয়া রায় তাঁকে নিয়ে গেলেন এবং সত্যজিতের কানে বলে দিলেন, ‘বাদল এসেছে।’ সত্যজিৎ ক্ষীণ কণ্ঠে বললেন, ‘কেমন আছো বাদল?’ । যে মানুষটি সত্যজিৎ রায়ের শিল্পকে ক্যামেরায় ধরে রেখেছিলেন, তিনিই শেষবারের মতো তাঁর হাতটি স্পর্শ করলেন।
সাইদা খানমের পুরো জীবনটাই ছিল এক অনন্য অধ্যায়। তিনি আমাদের দেখিয়ে গেছেন, স্বপ্ন দেখতে হলে, স্বপ্ন পূরণ করতে হলে বাধা আসবেই, কিন্তু সেই বাধা পেরিয়ে নিজের পথ নিজেকেই তৈরি করে নিতে হয়। ক্যামেরার মতোই তাঁর জীবন ছিল একটি খোলা ফ্রেম, যেখানে তিনি নিজের মতো করে আলো আর ছায়া সাজিয়ে নিয়েছিলেন।
