মুসলিম যুদ্ধ

মুসলিমরা যখন ভাতৃঘাতি হয়েছে!

ইতিহাসে মুসলিমদের দ্বারা মুসলিমদের হত্যা

আমরা মানুষ নিজেদেরকে যত ভাগে ভাগ করে শত্রু মিত্র বানিয়ে যুদ্ধ করি না কেন? মানুষের নিজের ভাই হত্যার অভিযোগ যেমন রয়েছে। স্বদেশী ও স্বজাতি হত্যার ইতিহাসও জঘণ্য। আমরা নিজদেশীয়দের যুদ্ধ ছাড়া নিজ সম্প্রদায়ের সাথে যুদ্ধের ইতিহাস প্রায় সব ধর্মে রয়েছে। এমনকি অহিংস বৌদ্ধ ধর্মেও।

এই লেখাটি মুসলিমদের সেসব দূভ্যগ্যের ইতিহাস নিয়ে। যেখানে তারা ছিল ভাতৃঘাতি বা আত্মঘাতি। ইসলামের ইতিহাসে এ ধরনের সহিংসতা প্রধানত তিনটি কারণে হয়েছে:

  1. রাজনৈতিক ক্ষমতার দ্বন্দ্ব

  2. মতবাদগত (শিয়া-সুন্নি) বিরোধ

  3. গোত্রীয় / জাতিগত আধিপত্য

 কালক্রমিক ঘটনা

 ১. খিলাফতের প্রথম গৃহযুদ্ধ (Fitna)

সময়টা ছিল ৬৫৬–৬৬১ খ্রি. রাসুলের wafat এর  মাত্র ২৫ বছর পরে শুরু মুসলিমদের ভাতৃঘাতি যুদ্ধ। সহজ কথায় একটা জেনারেশন চেঞ্জ হওযার সাথে সাথে। যা ছিল দু:খজনক ও কলংকজনকও বটে। কারণ খলিফা উসমান (রা.) হত্যার পর ক্ষমতা নিয়ে হযরত আলী (রা.) ও মুআবিয়া (রা.)-র সন্তান  এজিদের মধ্যে বিরোধ।
মুখ্য যুদ্ধটা হয় জমল  বা উটের যুদ্ধ। অংশ নেন  আয়েশা (রা.), তালহা, যুবাইর বনাম আলী (রা.)  নিহত হন প্রায় ১০,০০০ মুসলিম। পরে হয় সিফফিনের যুদ্ধ: আলী বনাম মুআবিয়ার   মধ্যে হয়। কথিত আছে এতে   নিহত  হন ৭০,০০০ মুসলিম। এখানে সংখ্যাগুলো নিয়ে ঐতিহাসিকদের মধ্যে মতবিরোধ আছে বৈকি?

 ২. কারবালা

 কারবালার  সময় কাল ৬৮০ খ্রি। এর মুয়াবিয়ার ছেলে ইয়াজিদ ইবনে মুআবিয়ার ক্ষমতা গ্রহণের বিরোধিতা করায় হোসাইন (রা.)-কে কারবালায় হত্যা। সাথে ছিলেন তার  আরো ৭২ সাথী।

 ৩. দ্বিতীয় ফিতনা ও হাররা হত্যাকাণ্ড

 ৬৮৩–৬৯২ খ্রিষ্টাব্দে  ইয়াজিদ খলিফার বিরুদ্ধে মদিনায় বিদ্রোহ। ঘটনাস্তরে হাররা হত্যাকাণ্ডে (৬৮৩ খ্রি.) সংঘঠিত হয়। মদিনায় ~১০,০০০ মুসলিম নিহতের কথা জানা যায়।

 ৪. আব্বাসীয় বিপ্লব ও উমাইয়া নিধন


 উমাইয়া বনাম আব্বাসীয় ক্ষমতার লড়াই হয় ৭৫০ খ্রিষ্টাব্দে। যুদ্ধে  হাজার হাজার উমাইয়া পরিবার সদস্য ও সমর্থক।

 ৫. ফাতেমীয়-আব্বাসীয় দ্বন্দ্ব

৯০০–১১০০ খ্রিষ্টাব্দে হয়  শিয়া ফাতেমীয় খেলাফত বনাম সুন্নি আব্বাসীয় সংকট। তারপর বিঘিত কয়েকশ বছরে শিয়া সুন্নিদের অনেক রক্ত ঝরেছে।

 ৬. সেলজুক-ফাতেমীয় সংঘর্ষ

সালটা ~১০৭০–১১০০। শিয়া বনাম সুন্নি রাজনৈতিক কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠান দ্বধন্ধ হয়েছে হাজারারো মানুষ।

 ৭. মোঙ্গল যুগে মুসলিমদের মধ্যকার বিশ্বাসঘাতকতা

 মোঙ্গলদের মুসলিম শাসনগুলো ধ্বংসের পিছনেও মুসলিম শাসকদের দ্বন্দ্ব অনেকাংশে দায়ী।
উদাহরণ : আলাউদ্দিন খোয়ারেজম শাহ যখন বাগদাদের সাথে সম্পর্ক খারাপ করে, তাতেই মোঙ্গলরা আক্রমণের পথ পায়।

 ৮. মোগল-সাফাভি-উসমানী সংঘর্ষ

সময় ছিল ১৫০০–১৭০০। কারণ ছিল, সাফাভিরা শিয়া, উসমানীরা সুন্নি।  ভারত ও পারস্যে প্রায়ই শিয়া-সুন্নি বিদ্বেষে রক্তপাত।

 ৯. আধুনিক যুগ

ইরাক-ইরান যুদ্ধ (১৯৮০–১৯৮৮):

সুন্নি শাসিত ইরাক বনাম শিয়া শাসিত ইরান।  বলা হয়ে থাকে প্রায় ১০ লাখ মুসলিম নিহত হয়েছিল।

সিরিয়া গৃহযুদ্ধ:

আসাদ সরকার (আলাভি শিয়া) বনাম সুন্নি বিদ্রোহী। এতে ৫ লাখের বেশি মুসলিম নিহত হয় বলে ধারণা করা হয়।

ইয়েমেন গৃহযুদ্ধ:

হুথি (শিয়া) বনাম সুন্নি নেতৃত্বাধীন সরকার। বিভিন্ন অসমর্থিত সূত্রে এখানে ৩ লাখ মুসলিম নিহতের খবর পাওয়া যায়।

পাকিস্তান ও আফগানিস্তানে শিয়া-সুন্নি সহিংসতা:

হাজার হাজার শিয়া মুসলিম আত্মঘাতী বোমায় নিহত। এছাড়া বছরের পর বছর ধরে নানাভাবে এখানে সংঘর্ষে মানুষ মারা যায়।

আনুমানিক হিসাব (১৪ শ বছরে)

ঘটনা আনুমানিক মুসলিম নিহত
প্রথম ফিতনা–কারবালা–হাররা ~৯০,০০০
আব্বাসীয় উমাইয়া দমন ~হাজার হাজার
ফাতেমীয়–আব্বাসীয় দ্বন্দ্ব ~দশ হাজার+
সাফাভি–উসমানী যুদ্ধ ~লাখের বেশি
ইরাক–ইরান ~১০ লাখ
সিরিয়া ~৫ লাখ+
ইয়েমেন ~৩ লাখ
পাকিস্তান–আফগান শিয়া-সুন্নি ~দশ হাজার+

কুর্দিদের ওপর আরব, তুর্ক ও ইরানি মুসলিমের দমন

তুরস্ক, ইরাক, সিরিয়া, ইরান – চারটি মুসলিম দেশেই কুর্দি মুসলিমদের নিজেদের সরকারই বারবার হত্যা করেছে। শুধু ইরাকে (সাদ্দাম হোসেনের সময়) আনফাল অভিযান (১৯৮৬–১৯৮৯)-এ আনুমানিক ১ লাখ ৮২ হাজার কুর্দি মুসলিম নিহত হয় বলে প্রকাশ। তুরস্কেও কয়েক লাখ কুর্দি নিহত বা গুম হওয়ার অভিযোগ আছে। এরা সবাই মুসলিম, কিন্তু জাতীয়তাবাদ ও কেন্দ্রীয় শাসনের কারণে মুসলিম দ্বারা মুসলিম নিধন।

 বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ (১৯৭১)

পাকিস্তানের পশ্চিমা নেতৃত্ব (মূলত পাঞ্জাবি মুসলিম সামরিক ও বুরোক্র্যাসি) ~৩০ লাখ বাঙালি মুসলমানসহ বহু হিন্দু হত্যা করেছে। এটি সবচেয়ে বড় মুসলিম দ্বারা মুসলিম গণহত্যার একটি উদাহরণ। যদিও বিভিন্ন বর্ণনায় এই সংখ্যা ৩ লাখ বলেও উল্লেখিত আছে। বাস্তবে ৯ মাসে ৩ লাখ হত্যাকান্ডও বিশ্বের অন্যান্য যুদ্ধের তুলনায় ব্যাপক বলা যায়। এছাড়া হাজার হাজার বাঙালি মুসলিম নারী ধর্ষণেরও শিকার।

 বেলুচিস্তান

পাকিস্তানের পাঞ্জাবি নেতৃত্বাধীন ফেডারেল সরকার বারবার বেলুচ মুসলিমদের দমন করেছে। ৭০-এর দশক থেকে এখন পর্যন্ত হাজার হাজার বেলুচ মুসলিম গুম ও হত্যা।

 আফগানিস্তান

আফগানিস্তানে তালেবান বনাম নর্থার্ন অ্যালায়েন্স, হাজারা-তাজিক-পাঠান লড়াই — সবই মুসলিম গোষ্ঠীর মধ্যে। ১৯৯০-এর দশকে তালেবান হাজারা মুসলিমদের ওপর গণহত্যা চালিয়েছিল (যেমন মাজার-ই-শরীফ হত্যাকাণ্ডে ~৮,০০০ হাজার মুসলিম নিহত হয় বলে কথিত আছে।

 আফ্রিকার মুসলিম দেশগুলোতে

সুদানে দারফুরে ~৪ লাখ মুসলিম নিহত, বেশির ভাগই আরব মুসলিম মিলিশিয়া (জনজাওয়িদ) দ্বারা। মালি, নাইজার, নাইজেরিয়া: তুহারেগ বনাম ফুলানি, হাউসা বনাম বোরনো — সবাই মুসলিম সম্প্রদায়ের। সোমালিয়ায় কাবিল সম্প্রদায়ভিত্তিক গৃহযুদ্ধও মুসলিম দ্বারা মুসলিম হত্যার উদাহরণ।

 এগুলো ধরলে আনুমানিক কত?

ঘটনা আনুমানিক মুসলিম নিহত
কুর্দি হত্যা ~৩ লাখ +
বেলুচ ~২০–৩০ হাজার +
বাংলাদেশ ১৯৭১ ~৩০ লাখ +
আফগানিস্তান গৃহযুদ্ধ ~২০ লাখ +
আফ্রিকা (দারফুর, সোমালিয়া, নাইজেরিয়া) ~১০ লাখ +

 দেখা যায়, মোট আনুমানিক মুসলিম দ্বারা মুসলিম হত্যা ইতিহাসে ৫০–৬০ লাখেরও বেশি, যদি আধুনিক জাতিগত সহিংসতা মিলিয়ে ধরি।

 কেন এগুলো ঘটেছে?

কারণ ব্যাখ্যা
জাতীয়তাবাদ যেমন পাকিস্তানে বাঙালি ও বেলুচ নিধন, তুরস্কে কুর্দি নিধন।
গোত্র ও উপজাতি আফগানিস্তান, সোমালিয়ায় ক্ল্যান-ভিত্তিক লড়াই।
রাজনৈতিক কর্তৃত্ব যেমন সুদান, নাইজেরিয়া, পাকিস্তানে কেন্দ্রীয় শাসন।
ধর্মের ব্যাখ্যার ভিন্নতা শিয়া-সুন্নি বিভাজন আফগানিস্তান, পাকিস্তানেও প্রভাব ফেলেছে।

ধর্মীয় আলেমদের ভূমিকা

বাংলাদেশে পাকিস্তানি মাওলানা ও কিছুৃ গ্রুপ ১৯৭১ সালে পাকিস্তানের পক্ষে অবস্থান নিয়েছিল। কেউ আবার নিরব ছিল।  বাংলাদেশের পক্ষে বাংলাদেশে কিছু আলেম ছিল মাত্র। আফগানিস্তানে তালেবানি মোল্লারা হাজারা হত্যা বৈধতা দিতে ‘রাফিজি’ ঘোষণা করেছে। তুরস্ক, ইরান, সুদানে অনেক ধর্মীয় নেতা জাতীয়তাবাদী বক্তব্য দিয়ে রাষ্ট্রের পাশেই থেকেছে।

সুতরাং পুরো ইসলামী ইতিহাসে শুধু মধ্যপ্রাচ্য নয়, দক্ষিণ এশিয়া, আফ্রিকা, সেন্ট্রাল এশিয়াতেও মুসলিম দ্বারা মুসলিম নিধন সবচেয়ে বেশি ঘটেছে। প্রধান কারণ গুলো ছিল জাতীয়তাবাদ, গোত্রবাদ, ক্ষমতা ও অর্থনৈতিক আধিপত্য। ধর্ম এখানে একটি আবেগপ্রবণ ‘কভার’ হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে, যদিও প্রকৃত ইসলামী চেতনা এর বিপরীত।

তবে খ্রিষ্টানদের বিশাল সব যুদ্ধ বিশেষ করে প্রথম ও দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ এবং ৩০০ বছর ধরে ইউরোপের ছোট ছোট যুদ্ধের কাছে এগুলো কিছুই না। অথচ সব ধর্মের রয়েছে প্রেম ও মানবতার কথা। এমনকি বৌদ্ধ ধর্মেরও অনেক এমন স্বজাতি নিধনের ঘটনা পাওয়া যায়। হিন্দু ধর্মে মহাভারত আর কুরুক্ষেত্র নিজেদের সুর আর অসুরের যুদ্ধের কথা বলে। প্রাচীণ ধর্মগুলোতেও আছে। মানুষ সব ভাল জিনিসগুলোকে মুলত নিজের ক্ষমতা ও প্রতিপক্ষ দমনের অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করে।

লোহা শক্ত ধাতু হয়েও যেমন একটি উপকারী জিনিস আবার প্রায় সব অস্ত্রে তার ব্যবহার রয়েছে। সোনা একটি তুলনামূলক নরম ধাতু এবং মানুষের প্রিয় হওয়া সত্বেও এটার জন্য যেমন যুদ্ধ ও মানুষ হত্যা হয়। তেমনি সোনাকেও ব্যবহার করা হয়। আমাদের শাসকেরা যখন আমাদেরকে অর্থনৈতিক জুলুম করে তখন ব্যাপারটা এরকমই।