ভিডিও বাইট ও ভিডিও পিআর
জাহাঙ্গীর আলম শোভন
বই: প্রেস রিলিজ গাইডলাইনস
আজকাল ইলেকট্রনিক্স মিডিয়ার বিকাশ অডিও ভিজ্যুয়াল কনটেন্ট এর বাস্তবতাকে সামনে এনে দিয়েছে। শুধু টেলিভিশনে ভিডিও প্রকাশ করা হয়, তাই নয়। ভিডিও বার্তাটি আপনার ইউটিউব চ্যানেলের জন্যও অত্যাবশ্যক। এছাড়া আজকাল প্রায় সব অনলাইন পত্রিকা এবং দৈনিক পত্রিকাও নিউজের সাথে ভিডিও প্রকাশ করে থাকে। এতে করে একদিকে সংবাদটি সমৃদ্ধ হয় অন্যদিকে তারা পাঠক আকৃষ্ঠ করতে পারেন। শুধু কি তাই? আপনি একই কনটেন্ট লেখার চেয়ে বা লেখার পাশাপাশি সংশ্লিষ্ঠ একটা ভিডিও প্রকাশ করলেও দেখবেন যে, ভিডিও পোস্টটির ভিউ বহুগুনে বেড়ে যায়।
আমাদের দেশে এখনো যারা পিআর পাঠান তারা ভিডিওকে সময়ক্ষেপন ও কখনো কখনো বাড়তি কাজ মনে করেন। ইভেন্ট এর ব্যস্ততার মাঝে অনেকে ভিডিও কনটেন্ট তৈরীর জন্য বাড়তি সময় শ্রম অর্থ বা লোক নিয়োগ করতে চান না। এতে কিন্তু নিজেরাই পিছিয়ে পড়েন।
প্রথমত: আপনি সংবাদের মতো করেই একটা ভিডিও পিআর কোনো দক্ষ এজেন্সি, সাংবাদিক ও নিয়োজিত ব্যক্তিকে দিয়ে তৈরী করে পাঠাতে পারেন। সেটা নিয়মিত পিআর এর মতো বেসিক তথ্য, পণ্য বা ইভেন্ট সম্পর্কিত তথ্য, ২ জনের মতামত ইত্যাদি থাকবে, অবশ্যই ভিডিও আকারে।
দ্বিতীয়ত: যদি এটি কোনো ইভেন্ট হয়ে থাকে তাহলে সেখানে ভিআইপি গেস্ট যে মন্তব্য করেছেন। বা পণ্য ও সেবা সম্পর্কে তাদের মতামত নিয়ে সেগুলো ২০-২৫ সেকেন্ডের বাইট আকারে শুধু বক্তব্য অংশটুকু ভিডিও করে অন্যান্য বক্তব্য টেক্স পিআরে পাঠাতে পারেন। মন্ত্রী বা সচিব পর্যায়ের হলে মন্তব্য আরেকটু বড়ো হলেও ক্ষতি নেই।
তৃতীয়ত: আপনার ইভেন্টটার পুরো অংশকে সংক্ষেপ করে একটা ভিডিও পিআর বা বাইট পাঠাতে পারেন। একনজরে গেস্টদের চেহারা থাকবে, অডিয়েন্স থাকবে, ডায়াস থাকবে, ব্যাকগ্রাউন্ড ব্যানারটা থাকবে। যাতে পুরো প্রোগ্রামটি কি তা বোঝা যায়। আর থাকতে পারে। নিউজ বাইট ভয়েজওভার। যাতে নেপথ্যে একজন ধারাবিবররণী দিয়ে দিল। এটা হতে পারে আপনার হাতে লেখা পিআর এর ভয়েসওভার।
চতুর্থত: আর কিছু না হোক যে পণ্যটি নিয়ে পিআর সেটির একটি ফিচার ভিডিও অন্তত দেয়ার চেষ্টা করতে পারেন। পণ্য না হয়ে সেবা হলে সে সেবাটি কিভাবে প্রসেস করেন। কিভাবে সোর্স থেকে এনে গুদামজাত করেন সেখানে থেকে কোয়ালিটি মেনে কিভাবে বাজারজাত করণ করেন এই প্রক্রিয়াটিও আপনি একটি ভিডিও বার্তার মাধ্যমে দেখাতে পারেন। এবং সেটিকে লিখিত পিআর এর সাথে পাঠিয়ে দিতে পারেন সংবাদ মাধ্যম কার্যালয়ে।
মোটকথা হলো ভিডিও কনটেন্ট এর যুগে ভিডিও পিআর এর মাধ্যমে প্রচার সুবিধাটা নেবেন না কেন? প্রয়োজনে একটি করে পেনড্রাইভ বা সিডি সহ আপনি ভিডিও পিআর পাঠান। অথবা গুগল ড্রাইভে লোড করে আপনি লিংক শেয়ার করেন। আর কোনোভাবে না হলে আপনার ইউটিউব চ্যানেলে লোড করেও লিংক পাঠাতে পারেন। তবে মনে রাখতে হবে এক্ষেত্রে এই ভিডিওটির আবেদন সংবাদ মাধ্যমের কাছে কমে যাবে। কোনো মাধ্যমে প্রকাশিত হয়ে যাওয়ার পর এর যেমন সংবাদ মূল্য কমে যায় তেমনি সংবাদকর্মীরাও প্রকাশিত কনটেন্ট প্রকাশের ব্যাপারে আগ্রহী থাকেন না। কোনো কোনো পত্রিকার নীতি হলে অন্য কোনো মাধ্যমে প্রকাশিত সংবাদ তারা প্রকাশ করবেন না যদি সেটা জাতীয় স্বার্থ সংশ্লিষ্ট কোনো ইস্যু না হয়।
তাহলে এবার মূল বিষয়গুলো ব্যাখ্যা করা যাক-
ভিডিও সংবাদ: আগেই বলেছি। আপনি যে সংবাদ বা পিআর টি সংবাদ মাধ্যমে লেখা ও ছবিসহ পাঠাচ্ছেন। টিভি চ্যানেলের কথা মাথায় রেখে সে একই পিআরটি অথবা ভিন্ন আরেকটি পিআর বা ভিডিও রিলিজ তৈরী করে সাথে পাঠান। আপনি যা বলতে চান তাই তুলে ধরেন। সংবাদের নিয়ম অনুসারে কি ঘটেছে, কে ঘটিয়েছে কবে কখন কোথায়? ইত্যাদি সাথে পণ্য, সেবা বা ইভেন্টের ছবি। কর্মকর্তা, অতিথি বা ভোক্তার মন্তব্য খুব সংক্ষেপে। এবং সর্বশেষ এটি কি দামে কোথায় পাওয়া যাবে। বা এই কর্মসূচী বাস্তবায়িত হলে কি উপকার হবে এই দিয়ে শেষ করে দিলেন। এটা মোটামোটি ৩ মিনিটের বেশী হওয়া কোনোভাবে কাম্য নয়। বাস্তবতা হলো, হয়তো আপনার জন্য তার সময় বরাদ্দ মাত্র ৩০ সেকেন্ড।
শুধু যে ইভেন্ট এর পরে ভিডিও বার্তা প্রকাশ করা যাবে তা নয়। খুব জনগুরুত্বপূর্ণ এবং জনআগ্রহী বিষয় হলে ইভেন্ট এর আগেও ছোট বার্তা প্রকাশ করা যায়। বিশেষ করে সেটা যদি কোনো ভিআইপি’র বার্তা হয়ে থাকে। যেমন ডিজিটাল ওয়াল্ডের আগে মন্ত্রীরা এ সম্পর্কিত ভিডিও বাইট ইলেকট্রনিক্স মিডিয়াতে প্রকাশ করে থাকেন। যাতে তারা তরুনদেরকে নিমন্ত্রন জানান এবং বলে থাকেন যে, আমরাও আসছি আপনারাও আসুন ইত্যাদি ইত্যাদি।
কিছু জনসংযোগ সংস্থা ভিডিও স্টেশনগুলি রিলিজ (ভিএনআর) প্রেরণ করে যা পূর্বে ধারণকৃত ভিডিও প্রোগ্রাম যা টিভি স্টেশনগুলি হুবহু প্রচার করা যেতে পারে। এসব প্রচার অনেক সময় নির্দিষ্ঠ ফি এর বিনিময়ে বিজ্ঞাপন আকারেও প্রকাশ করা হয়ে থাকে। কিছু কিছু ভিডিও সংবাদে দেখা যায় সংবাদিটিকে আকর্ষনীয় করার জন্য খেলোয়াড়, মুভি-তারকা ও স্যোস্যাল সেলিব্রেটিদের সাক্ষাৎকার যুক্ত করা হয়েছে। এগুলি টিভি নিউজ এর মতো ওয়েবের জন্যও তৈরী করা হতে পারে। ভিডিও স¤প্রচারের মাধ্যমে দৃষ্টি আকর্ষনের দূর্বলতা কাটিয়ে জনগণের বিশ্বাসযোগ্যতা বাড়ানোর কৌশল হিসেবে ভিডিও সংবাদকে ব্যবহার করা হয় এবং এটা বেশ কার্যকর যদি কনটেন্ট স্মার্টলি উপস্থাপন করা যায়।
ভিডিও সংবাদ কখনো পডকাস্টে পরিণত হতে পারে। টিভি ও প্রিন্টিং পেপারে সময় ও স্থানের সীমাবদ্ধতা থাকলেও সামাজিক মাধ্যমে বিশেষ করে অনলাইনে তা নেই। ফলে এখানকার জন্য ভিডিও কিংবা পডকাস্ট আলাদা করে একটু লম্বা করে তৈরী করা যায়। তবে অতটা লম্বা নয় যতটা লম্বা হলে শ্রোতা দর্শক আগ্রহ হারিয়ে ফেলতে পারে। যেমন ১.৫ মিনিটের পিআর যদি আপনি টিভির জন্য বানান তাহলে এখানে সেটা সর্বোচ্চ সাড়ে ১ থেকে ২ মিনিটের মধ্যে হওয়া ভাল। আপনি যদি ৩ মিনিটের একটা নিউজ ফেসবুকের জন্য বানান। আর এর একটা বড় ভার্সসন ইউটিউব চ্যানেলের জন্য চান। সেটা ৫ মিনিট হওয়া ভাল। তবে প্রতিটি মিনিটের প্রতিটি অংশে যেন দেখার মতো কনটেন্ট থাকে। শুধু বড় করার জন্য বড় করলে হিতে বিপরীত হতে পারে।
ভিডিও কোয়ালিটি:
১. যদি টিভি চ্যানেলের জন্য আপনার ভিডিও পাঠাতে হয় তাহলে অবশ্যই এইচডি কোয়ালিটি হতে হবে। প্রয়োজনে আগেই ফোন করে জেনে নিতে হবে। কোন ফরম্যাট হলে তারা ভিডিও প্রদর্শনীতে স্বাচ্ছন্দ বোধ করবেন। সাইজের ব্যাপারেও জেনে নিতে পারেন। বিশেষ করে ভিডিও চিত্র ধারণ অবশ্যই পেশাদার কাউকে দিয়ে করাবেন তা না হলে তা প্রদর্শনের যোগ্য বলে বিবেচিত হবে না।
২. ভিডিও ধারণ এর সময় ফটোগ্রাফীর ক্ষেত্রে যেসব প্রাথমিক বিষয় আলোচনা করা হয়েছে তা মনে রাখতে হবে।
৩. ভিডিওচিত্র ধারণের সময় মূল সাবজেক্ট ঠিকমতো আসছে কিনা খেয়াল রাখতে হবে। পাশাপাশি গুরুত্বপূর্ন কোনো অবজেক্ট কাটা বা বাদ পড়ছে কিনা দেখতে হবে।
৪. ছবির ফ্রেমটা সমান্তরাল নাকি ডানে বামে কাত হয়ে আছে?
৫. ফ্রেমের মধ্যে সব ঠিক আছে নাকি কেটে যাচ্ছে?
৬. ক্যামেরাকে খুব বেশী ঘোরানো যাবে না খুব জোরে সরিয়ে নেয়া যাবে না।
৭. ক্যামেরার সেটিং, ফোকাস ও পার্সপেকশান আগেই ঠিক করে নিতে হবে।
৮. ক্যামেরা না ঘুরিয়ে যতটা সম্ভব স্ট্যাবল রেখে একটার পর একটা শর্ট নিতে হবে।
৯. লং শটের পরে ক্লোজ শর্ট এভাবে শর্ট সাজাতে হবে।
১০. ফটোগ্রাফির রুলস অব থার্ডের কথা যতটা সম্ভব মনে রেখে ক্যামেরার ফ্রেম ঠিক করতে হবে।
১১. এম্বিয়েন্ট সাইন্ড এর দিকে খেয়াল রাখতে হবে। ক্যামেরার সামনে দিয়ে অনাকাংিখত ব্যক্তিদের চলাফেরা রোধ করতে হবে।
১২. বক্তব্য নেয়ার বিষয় হলে ভিন্ন ভিন্ন এঙ্গেল থেকে ক্যামেরা ধরে বৈচিত্র আনা যেতে পারে।
১৩. সাউন্ড ছাড়াও পারিপাশ্বিক অন্যান্য শট নিয়ে রাখা ভাল। যেমন মনোযোগী দর্শক। দর্শকের হাতে পন্যটির প্যাকেট, পুরষ্কার হাতে বিজয়ী ইত্যাদি বিষয় সংশ্লিষ্ঠ শর্ট পরে সম্পাদনার সময় ভয়েস ওভারে জুড়িয়ে দিলে এগুলো ভিন্ন মাত্রা যোগ করে।
১৪. আর অবশ্যই শর্ট নেয়ার সময় ১০ সেকেন্ড আগে থেকে শুরু করে ২০ সেকেন্ড পরে পর্যন্ত নিয়ে রাখতে হয়। যাতে এডিটিং এর সময় সঠিক পয়েন্টে কেটে নেয়া যায়।
ভিডিও এডিটিং:
ভিডিও শর্ট নেয়ার মতো ভিডিও এডিটিং ও একটি শিল্প। একটি ভাল ভিডিও শর্ট ছাড়া যেমন একটি সুন্দর ভিডিও কনটেন্ট তৈরী করা যায়না তেমনি ভাল এডিটিং না হলেও ভিডিওটি প্রকাশযোগ্য হয়ে উঠে না। ভিডিও এডিটিং এর ক্ষেত্রে একজন এডিটর কয়টি টুলস জানেন? কয়টি পদ্ধতি জানেন? বা কতটি ভিডিও এডিটিং সফটওয়ার জানেন তার চেয়ে গুরুত্বপূর্ন হলো তিনি বিষয়টি কতটা বোঝেন। একটি সুন্দর ভিডিও এডিটিং এর জন্য যে রুচিবোধ দরকার সেটা তার কতটা রয়েছে।
তবে আমমরা এখানে যে ভিডিও এিিডটিং নিয়ে আলোচনা করছি। এ ধরনের ভিডিওর জন্য অনেক কিছু জানার প্রয়োজন নেই। কেবল সঠিক কার্ট টি কোথায় দিতে হবে সঠিক জোড়াটি কোথায় দিতে হবে কোন জিনিসটি দিতে হবে কোনটি না হলে চলবে আর কোনটির পরে কোনটি দিতে হবে। এইটুকু বুঝলে তিনি দিনশেষে ভাল একটা কিছু দিতে পারবেন।
এজন্য অনেকে এই কাজের জন্য সংবাদ মাধ্যমের পেশাদার এডিটরকে হায়ার করে থাকেন।
গত শতকের শেষের দিকে একটা ভিডিও ম্যাগাজিন বের হতো নাম স্টার ডায়রী। আশির দশকে যেমন চিত্রালী বাঙালীর অন্যতম বিনোদন মাধ্যমে ছিল। স্টার ডায়রী তেমনটা হয়ে উঠেনি। যেমন একটা বিনোদন ম্যাগাজিনে তারকাদের নানা কিছু থাকে। এটা ছিল ভিডিও ম্যগাজিন। ভিডিও ট্যাপের এই ম্যাগাজিন বাজারের ১০/২০ টাকার ম্যাগাজিনের তুলনায় দামী ছিল বলে মধ্যবিত্তের ঘরে শোভা পায়নি। কারণ তখন খুম কম মধ্যবিত্ত ভিডিও ফিতা কিনে মুভি দেখত। বরং তারা ভিডিও ক্লাব থেকে ভাড়া দিতে পছন্দ করত।
যাইহোক। আজকাল ভিডিও কনটেন্ট এর চাহিদা, জনপ্রিয়তা এবং প্রভাব তিনটাই বেশী। তাই অবশ্যই আপনার মেসেজটি সর্বোচ্চ প্রচার রুপ দিতে ভিডিও পিআর করুন। একটি রিপোটারের মতো করে ৩ মিনিটের একটি ভিডিও সংবাদ মাধ্যমে পাঠান অথবা গুগলে আপলোড করে লিংক পাঠান। জরুরী নয় এটা রিপোর্টের মতোই হতে হবে। শুধু বাইট বা মন্তব্য পাঠালেও সাথে লিখিত পিআর দিলে সংবাদ মাধ্যম সমন্বয় করে নিতে পারে।
ভিডিওর সাধারণ কিছু বিষয়
১. ছবিতে আলো ও শব্দ যেন ভাল থাকে
২. মূল বিষয় যেন সঠিকভাবে উঠে আসে
৩. ক্যামেরা যেন খুব বেশী জার্ক না করে বেশী মুভ না করে।
৪. আশপাশের অপ্রয়েজনীয় সাউন্ড না থাকে।
৫. বক্তব্যের গুরুত্বপূর্ অংশ যেন কেটে না যায়।
এটা একেবারেই একটি প্রাথমিক ধারণা। ভিডিও ব্যাপারটি যেহেতু টেকনিক্যাল সেহেতু আপনি দক্ষ কাউকে নিয়োগ করলে আপনার কাজ সহজ হয়ে যাব। অবশ্য সে লোকটি যদি ইলেকট্রনিক্স মিডিয়ার সাথে সম্পৃক্ত থাকে। তাহলে ব্যাপারটা আরেকটা জমবে বৈকি!
