Islami Politics

বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সাফল্য

সাফল্যের পথে জামায়াতের পথচলা

 

উপমহাদেশে ইসলামী রেনেসাঁ এবং তৎকালীন আর্থ-সামাজিক প্রেক্ষাপটে সংগঠনের যাত্রা শুরু হয় ব্রিটিশ ভারতে ১৯৪১ সালে। উপমহাদেশের মানুষের রাজনৈতিক পথচলা শুরুর প্রায় ৫৬ বছর পরে। ১৯৮৫ সালে প্রথম ভারতীয় কংগ্রেস প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে এদেশের মানুষের রাজনৈতিক পরিচয় শুরু হয়।

 একটি আদর্শিক সংগঠন হিসেবে জামায়াতে ইসলামীর মূল মেনিফেস্টো এবং সমাজ সংস্কারের অঙ্গীকার। তাদের দীর্ঘদিনের স্লোগান ‘‘আল্লাহর আইন চাই-সৎ লোকের শাসন চাই‘‘। যদিও সাম্প্রতীক সময়ে ক্ষমতায় গেলে ক্রমান্বয়ে শরীয়া আইন ও প্রাথমিক পর্যায়ে কল্যাণ রাষ্ট্রের কথা বলছে। যা কিছু মানুষের কাছে তাদেরকে প্রিয় আবার কিছু মানুষের কাছে অপ্রিয় করে তুলেছে।

 শৃঙ্খলার মাধ্যমে তৃণমূল পর্যায়ে ক্যাডার ভিত্তিক সংগঠনের বিস্তার হলেও তাদের সাংগঠনিক স্তর মূলত জ্ঞান, মেধা, যোগ্যতা ও নেতৃত্বভিত্তিক। মানে সংগঠনের প্রতিটি স্তর পার হওয়ার জন্য সকল কর্মীকে পুস্তক পাঠ, প্রতিবেদন পেশ, পরীক্ষা ও দায়িত্বপালনে যোগ্যতার প্রমাণ দিতে হয়।

সমালোচনা ও বিতর্ক

ঐতিহাসিক বিতর্ক: ১৯৭১ সালের স্বাধীনতা যুদ্ধে বিতর্কিত ভূমিকা ও এর পরবর্তী রাজনৈতিক অভিঘাত।

আইনি ও রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ: দলটির নিবন্ধন বাতিল এবং শীর্ষস্থানীয় নেতাদের বিচারের মুখে পড়ার ঘটনাপ্রবাহ।

জনমত ও মেরুকরণ: বাংলাদেশের মূলধারার রাজনীতিতে জামায়াতকে নিয়ে চলমান বিতর্ক এবং জনমানসে এর প্রভাব। যেমন একজন নারী প্রধানমন্ত্রীর অধীনে একটি মানবরচিত সংবিধানের আয়ত্বে ক্ষমতার অংশীদার হওয়া। বুর্জোয়া দলকে সমর্থন দেয়া ইত্যাদির কারণে ঐতিহাসিক ভাবে সব সময় কিছু সমালোচনা তাদের চলার পথের সাথী হয়ে রয়েছে।

 সাফল্য ও অর্জন

কঠোর সাংগঠনিক কাঠামো দ্বারা তারা বাংলাদেশের অন্যতম সুশৃঙ্খল এবং ক্যাডার ভিত্তিক দল হিসেবে নিজেদের টিকিয়ে রেখেছে। আর্থ-সামাজিক অবদান তাদেরকে তাদের সামাজিক গ্রহণযোগ্যতা বাড়িয়ে তুলেছে। যেমন- শিক্ষা, স্বাস্থ্য এবং জনকল্যাণমূলক প্রতিষ্ঠান পরিচালনার মাধ্যমে জনগণের একটি অংশের আস্থা অর্জন।

অর্থনৈতিক প্রভাবও তাদের ভাল।  দেশের ব্যাংকিং খাত এবং ব্যবসা-বাণিজ্যে আদর্শিক মডেলে শক্তিশালী অবস্থান তৈরি করেছে। বাংলাদেশের সবচেয়ে বিস্তৃত ও এক সময়ের সবচেয়ে সফল ব্যাংক ‘‘ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ লি. তাদের প্রচ্ছায়ায় পরিচালিত হয়।

সংসদীয় রাজনীতিতে বিভিন্ন সময়ে জোটবদ্ধভাবে সরকার গঠন এবং সংসদে প্রতিনিধিত্বের মাধ্যমে রাষ্ট্রীয় নীতি নির্ধারণে প্রভাব ইতিহাস থেকে মুছে দেয়া যাবে না।

দাওয়াতী সাফল্য:

জামায়াতে ইসলামী প্রথম ভারতীয় উপমহাদেশে ইসলামী সংগঠন, রাজনীতি ও শাসনতন্ত্রের ধারণা নিয়ে আসে। এর আগে মুসলিম লীগ ছিল মুসলিমদের অধিকার আদায়ের দল ইসলামী শাসন ব্যবস্থা কায়েমের দল নয়। এর নেতারা ইসলামী ভাবধারা ও জীবন ধারায় বিশ্বাসী ছিলো না।

স্বাধীন বাংলাদেশে জামায়াতে ইসলামীর দাওয়াতের কারণে লক্ষ লক্ষ সাধারণ বাংলা ও ইংরেজী শিক্ষিত যুবক যুবতী কোরআন হাদীস চর্চা শিখেছে। যুবকদের মধ্যে নামায পড়ার রেওয়াজ চালু হয়েছে। যা একসময় মাদ্রাসা শিক্ষার বাইরে ছিলো না বললেই চলে।

জামায়াতে ইসলামী কোরআনী ভাবধারায় এক বৈপ্লবিক পরিবর্তন আনে। আগে যেখানে মানুষ মিলাদ ও দোয়ার মাহফিল কিংবা শুধু ওয়াজ ও জিকির মাহফিল আয়োজন করতো সেখান থেকে তারা ‘‘তাফসিরুল কোরআর মাহফিল‘‘ ও সীরাতুন্নবী (স) মাহফিল এর সূচনা করে। এর ফলে মানুষ জানতে পারে কোরআন শুধু তাবিজ, জিয়ারত আর নামায পড়ার জন্য নয় কোরআর রাষ্ট্রীয় সংবিধানের মূল ভিত্তি।

সাংগঠনিত সাফল্য

জামায়াতে ইসলামী ১৯৭১ সালে ৩-৭ শতাংশ সমর্থন ছিল। কারণ তখন পাকিস্তানপন্থী মুলদল ছিলো মুসলিম লীগ। কিন্তু স্বাধীন বাংলাদেশে তারা সংসদে ১৪% ভোট ও ৬% আসন পেয়েছে। ১৯৯১,১৯৯৬ এবং ২০০১ সালে তারা সরকার গঠন ও পতনের কারণ হয়েছে।

জামায়াতের ছাত্র সংগঠন ৮০ এর দশকে দেশের বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে শক্ত ভিত্তি তৈরী করেছিল। পরে অন্যান্য বুর্জোয়া সংগঠন এর হামলা ও পেশী শক্তির কাছে পিছু হটলেও। বর্তমানে দেশের সব শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে তাদের একচ্ছত্র আধিপত্য রয়েছে। ২০২৫/২৬ সালে দেশের ৫টি বিশ্ববিদ্যালয় সংসদ নির্বাচনে তারা ৮৫% জয় পেয়ছে।

জামায়াত স্তরভিত্তিক একটি সুশৃংখল সংগঠন তৈরী করেছে। যাদের মধ্যে পদ নিয়ে প্রতিযোগিতা নেই। নেতৃত্ব ও আনগত্যের এই সুশৃংখলা তাদের একটি সুন্দর ভবিষ্যৎ উপহার দিতে পারে।

সামাজিক সাফল্য

জামায়াতে ইসলামীর কর্মসূচীর প্রথম ধাপ হলো দাওয়াহ। যদিও বাংলাদেশে তা কার্যক্ষেত্রে বদলে গিয়ে রাজনীতি গুরুত্ব পেয়েছে। তথাপি সামাজিক সাফল্য তাদের সবচেয়ে বেশী।

বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে তাদের ছাত্র সংগঠন প্রথমত, তারা বাংলাদেশের রাজনীতির নোংরা চাঁদাবাজি ও দখলবাজি থেকে নিজেদেরকে বের করতে সক্ষম হয়েছে। বিভিন্ন সময়ে তাদের প্রভাব রক্ষার জন্য সংঘর্ষে জড়ানো এবং গোপনীয় ও ছদ্মবেশে সাংগঠনিক কার্যক্রম পরিচালনা করলেও তারা মেধাবী ছাত্রদের সম্মিলন ঘটিয়ে তাদেরকে যোগ্য নাগরিক হিসেবে গড়ে তোলার জন্য কাজ করেছে।

সারাদেশে বিভিন্ন ধরনের রাজনৈতিক নেতাকর্মীরা যে ধরনের নেতিবাচক কর্মকান্ড যেমন তোলাবাজি, দখল ইত্যাদির সাথে জড়িত থাকলেও। জামায়াত এসব কিছু থেকে দূরে রয়েছে। ফলে ধর্মীয় রাজনীতি কিংবা ১৯৭১ সালের পাকিস্তানের সমর্থনের মতো বিতর্ক থাকলেও তাদের সামাজিক গ্রহণযোগ্যথা বহুগুনে বৃদ্ধি পেয়েছে।

সামাজিক সংগঠন হিসেবে বোধকরি তাদের সবচেয়ে বেশী সাফল্য। তারা নানারকম সামাজিক কার্যক্রম দলের ভেতরে এবং বাইরে পরিচালনা করে থাকে। এছাড়া সারাদেশে তারা শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, হাসপাতাল ও অন্যান্য সামাজিক প্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে সমাজ সেবা ও নিজেদের সামাজিক অবস্থান সুসংহত করেছে।

রাজনৈতিক সাফল্য

জামায়াতে ইসলামী ৩ বার সরকার গঠন ও সরকার পতনের কারণ হলেও তারা মূলত ১ বার সরকারের অংশ হয়েছে। ২০০১ সালে গঠিত জোট সরকারে তারা ২ জন মন্ত্রীর পদ পায়। তাদের মন্ত্রীরা জনকল্যাণমূলক কাজ করে যেমন প্রশংসিত হোন তেমনি তাদের বিরুদ্ধে কোনো দূর্নীতির অভিযোগ না থাকায় তারা নিজেদের অনন্য উচ্চতায় নিয়ে যান।

২০০৯ থেকে ২০০৪ পর্যন্ত ফ্যাসিবাদী সরকারের দমন নিপীড়নে তাদের কয়েক হাজার কর্মী নিহত, লাখ লাখ কর্মীর কারাবরণ, শত শত নেতাকর্মীর গুম, ১৩ জন শীর্ষ নেতার ফাঁসি এমনকি কোনো রাজনৈতিক কার্যক্রম প্রকাশ্যে করতে না দেয়ার পরও। তারা দেশ থেকে পালিয়ে যাননি এবং নিজেদের সাংগঠনিক ও দাওয়াতে কার্যক্রম বন্ধ করেননি। যার ফল হিসেবে তারা বিগত দেড় বছরে দেশের সবচেয়ে জনপ্রিয় দল বাজাদের ঘাড়ে নি:শ্বাস ফেলছে। জামায়াত জোট আগামী নির্বাচনে সংরকার গঠনের সমূহ সম্ভাবনা রয়েছে।

বোধকরি জামায়াত ও শিবিরের সবচেয়ে বড় সাফল্য হলো চব্বিশের ফ্যাসিবাদ বিরোধী অভ্যুত্থানে কৌশলগত নেতৃত্ব ও সরকারের পতন ঘটিয়ে রাজনীতিতে চালকের আসনে বসা। তাদের নেতাকর্মীরা একটি অভ্যুত্থানের প্রস্তুতি নিয়ে রেখেছিল তাদের অপেক্ষা ছিল একটি গণ আন্দোলন দানা বেঁধে উঠার জন্য। কোটা সংষ্কার আন্দোলনে তারা পেছন থেকে পরিকল্পনা ও সলতে দিয়েছিল। সরকারের খুনের নেশা যখন চেপেছে তখন তা আন্দোলন ঘরে ঘরে ছড়িয়ে পড়েছ। আর তখনি সাধারণ জনগনের সাথে তাদের নেতাকর্মী, নারী কর্মী, সারাদেশের ছাত্র জনতা, শ্রমিক জনতা, কওমী মাদ্রাসার ছাত্র, বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র ছাত্রী, বেসরকারী বিশ্ববিদ্যালয় এমনকি সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের একটি অংশ এই  আন্দোলনে সম্পৃক্ত হয়ে একে সফল করে তুলেছে।

বলা হয়ে থাকে বাংলাদেশের ইতিহাসে সবচেয়ে হিংস্র এবং শক্তিশালী স্বৈরাচার পতনে তাদের গুরুত্বপূর্ণ অবদান তাদেরকে রাজনীতির চালকের আসনে বসিয়ে দেয়।

অর্থনৈতিক সাফল্য

একসময় জামায়াতের নেতাদের কেউ কেউ বিশেষ করে কোনো আলেম বা মসজিদের ইমাম যাকাতের অর্থেও চলতেন। কিন্তু ক্ষমতা বা রাষ্ট্র থেকে কোনো সহযোগিতা না নিয়ে। নিজেদের ঐকান্তিক চেষ্টা ও ঐক্যবদ্ধ কার্যক্রম দ্বারা তারা এখন হাসপাতাল, স্কুল, ব্যাংক, মিডিয়া ও ফার্মাসিউটিক্যাল কোম্পানীর মালিক। বেশীরভাগ প্রতিষ্ঠান আশাতীত সফলতা দেখালেও। তাদের অনেক প্রতিষ্ঠান ফ্যাসিবাদী সরকার জোর করে দখল করে এবং বন্ধ করে দিয়েও তাদের অর্থনৈতিকভাবে ধ্বংস করতে পারেনি। পারষ্পরিক, সহযোগিতা, ধৈর্য ও আস্থাশীল মনোভাব তাদেরকে আগের চেয়ে শক্তিশালী করেছে।

জামায়াত বাংলাদেশের প্রচলিত নন-অফিসিয়াল চাঁদা নিয়ে সংগঠন পরিচালনা করে না। তারা সকল সদস্যদের সামান্য সহযোগিতা তথা বায়তুল মাল দিয়ে সাংগঠনিক কার্যক্রম পরিচালনা করে। তারা সংগঠন এর নামে জমি, বাড়ি ক্রয় ও নানা সম্পত্তি অর্জন এবং এসবখাতে বিনিয়োগ করে থাকে। ফলে তাদের অর্থনৈতিক ভিত্তি বেশ টেকসই।

উপসাংহার

শুধু ২৪ এর আন্দোলন নয়। ফ্যাসিবাদের পতনের পর বিভিন্ন ইস্যুতে তাদের অবস্থান ছিল জনগনের ইচ্ছের পক্ষে এবং বিশেষ করে উল্লেখ্য হলো, একটি ইসলামী ভাবধারার দল হয়েও তারা বর্তমান প্রজন্মের আশা আকাংখা যতটা ধরতে পেরেছে আর অন্য কোনো পুরনো রাজনৈতিক দল তা করতে পারেনি। আর এই সুক্ষ্ম ব্যাপারটি তাদেরকে ভবিষ্যতে ক্ষমতার স্বাদ দিলেও অবাক হওয়ার কিছু থাকবেনা।

লেখা: জাহাঙ্গীর আলম শোভন

Comments

No comments yet. Why don’t you start t