jULY

খুলে গেলো সংষ্কারের দুয়ার

বাংলাদেশ: খুলে গেলো সংষ্কারের দুয়ার

নতুন বাংলাদেশে “জুলাই সনদ ও গণভোটের মাধ্যমে সংবিধান ও রাষ্ট্র কাঠামো সংস্কারের সুযোগটি দেশের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক ঐতিহাসিক পরিপ্রেক্ষিতে গুরুত্বের সঙ্গে দেখা হচ্ছে। ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টে ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থান বাংলাদেশের রাজনীতিতে এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা করে এবং দীর্ঘ বছর ধরে বিরাজমান স্বৈরাচারী ও একচেটিয়া শাসনের বিরুদ্ধে জনগণের চাওয়া পরিবর্তনের তরঙ্গ সৃষ্টি করে। এই প্রেক্ষাপটে “জুলাই জাতীয় সনদ (July National Charter)” নামে একটি বিস্তৃত সংস্কার প্রস্তাবই সাংবিধানিক ও রাজনৈতিক পুনর্গঠনের মূল প্রস্তাব হিসেবে গণ্য হয়েছে।

“জুলাই সনদ” সংবিধানের কাঠামোতে দক্ষিণতান্ত্রিক ও গণতান্ত্রিক নীতির প্রতিফলন ঘটানোর লক্ষ্য রাখে। এতে রয়েছে সংসদীয় ব্যবস্থাকে পুনর্গঠন, দ্বিকক্ষে সংসদ (bicameral parliament) গঠনের প্রস্তাব, প্রধানমন্ত্রী মেয়াদ সীমিত করার উদ্যোগ, রাষ্ট্রপতির কিছু ক্ষমতা পুনর্বিবেচনা, নারী প্রতিনিধিত্ব বাড়ানো এবং বিচারব্যবস্থা ও নির্বাচন কমিশনসহ গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানের স্বাধীনতা ও স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার মতো ধারাবাহিক সংস্কারমূলক বিষয়।

সাধারণ মানুষের সার্বভৌম ভোটাধিকার প্রয়োগের মাধ্যমে গণভোট আয়োজন করা হয়, যা ২০২৬ সালের ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের সঙ্গে একসাথে অনুষ্ঠিত হলো। এই গণভোটে সংবিধান সংস্কারের পক্ষে “হ্যাঁ” ভোট প্রাধান্য পায় এবং ভোটারের একটি বড় অংশ—গণভোটে প্রায় ৬০-৬৮% উপস্থিতিতে ‘হ্যাঁ’ জয়ী হয়েছেন বলে সরকারি ফলাফল জানায়। এর ফলে দেশের নতুন সংসদকে এখন দুইটি দায়িত্ব সামলাতে হবে—সরকার পরিচালনা এবং সদ্য গৃহীত জুলাই সনদ অনুসারে সংবিধান সংস্কারের কাজ এগিয়ে নেওয়া।

এই প্রসেসটি বাংলাদেশকে একটি গভীর সম্প্রদায়ভিত্তিক সংবিধান পরিবর্তনের দিকে ধাবিত করছে, যেখানে রাজনৈতিক দল, আন্তর্জাতিক ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ের নাগরিক, শিক্ষাবিদ ও রাজনৈতিক কর্মীরা সক্রিয়ভাবে অংশ নিচ্ছেন। যদিও রূপায়ণে কিছু জটিলতা ও মতভেদের ইঙ্গিতও পাওয়া যাচ্ছে, “জুলাই সনদ” ও গণভোটের মাধ্যমে জনগণের সরাসরি অংশগ্রহণ দেশকে একটি নতুন রাজনৈতিক ও সংবিধানিক অধ্যায়ে প্রবেশ করাচ্ছে—এটি ভবিষ্যতের বাংলাদেশে অধিকতর গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান ও অংশগ্রহণমূলক শাসনব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি স্থাপন করেছে।

২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থান এবং পরবর্তী সময়ে গঠিত অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের হাত ধরে বাংলাদেশে একটি ‘নতুন বাংলাদেশ’ বা রাষ্ট্র সংস্কারের ঐতিহাসিক সুযোগ তৈরি হয়েছে। এই পরিবর্তনের কেন্দ্রে রয়েছে ‘জুলাই সনদ’ বা ছাত্র-জনতার আকাঙ্ক্ষা এবং একটি নতুন সামাজিক চুক্তির রূপরেখা। গণভোট ও সংবিধান সংস্কারের মাধ্যমে যে সুযোগগুলো সৃষ্টি হয়েছে, তা নিচে পর্যায়ক্রমে আলোচনা করা হলো:

১. সংবিধানের আমূল সংস্কার ও নতুন সামাজিক চুক্তি

দীর্ঘদিন ধরে বাংলাদেশের সংবিধানে ক্ষমতার যে চরম ভারসাম্যহীনতা ছিল, তা দূর করার একটি সুবর্ণ সুযোগ তৈরি হয়েছে। বর্তমান সংস্কার প্রক্রিয়ায় প্রধানমন্ত্রী ও রাষ্ট্রপতির ক্ষমতার ভারসাম্য রক্ষা, টানা দুই মেয়াদের বেশি প্রধানমন্ত্রী না থাকার বিধান এবং ৭০ অনুচ্ছেদের সংস্কারের মাধ্যমে সংসদ সদস্যদের স্বাধীন মত প্রকাশের সুযোগ তৈরির প্রস্তাব আলোচিত হচ্ছে। ‘জুলাই সনদ’ মূলত নাগরিকের হারানো ভোটাধিকার এবং মৌলিক অধিকার ফিরিয়ে দেওয়ার এক অঙ্গীকারনামা, যা সংবিধানের নতুন কাঠামোতে প্রতিফলিত হতে পারে।

২. গণভোটের মাধ্যমে জনআকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন

সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে ‘গণভোট’ (Referendum) ব্যবস্থা বাতিল করা হয়েছিল, যা জনগণের সরাসরি মত প্রকাশের একটি গুরুত্বপূর্ণ পথ বন্ধ করে দিয়েছিল। বর্তমানে রাষ্ট্র কাঠামোর আমূল পরিবর্তনের জন্য পুনরায় গণভোট প্রথা চালু করার জোর দাবি উঠেছে। এর মাধ্যমে কোনো গুরুত্বপূর্ণ জাতীয় ইস্যুতে বা সংবিধানের মৌলিক কাঠামো পরিবর্তনের ক্ষেত্রে সরাসরি জনগণের রায় নেওয়ার সুযোগ তৈরি হবে, যা গণতন্ত্রকে কেবল নির্বাচনকেন্দ্রিক না রেখে অংশগ্রহণমূলক করে তুলবে।

৩. রাষ্ট্র কাঠামোর প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার

জুলাই অভ্যুত্থানের পর রাষ্ট্র কাঠামোর প্রধান স্তম্ভগুলোকে (বিচার বিভাগ, নির্বাচন কমিশন, পুলিশ এবং দুর্নীতি দমন কমিশন) দলীয় প্রভাবমুক্ত করার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে।

  • বিচার বিভাগের স্বাধীনতা: নির্বাহী বিভাগ থেকে বিচার বিভাগকে পূর্ণাঙ্গভাবে আলাদা করে প্রধান বিচারপতি নিয়োগের স্বচ্ছ নীতিমালা করার সুযোগ এসেছে।

  • নির্বাচন কমিশন: একটি স্থায়ী ও নিরপেক্ষ নির্বাচন কমিশন কাঠামো গঠন করা, যাতে ভবিষ্যতে আর কোনো নির্বাচনে জালিয়াতির সুযোগ না থাকে।

  • প্রশাসনিক সংস্কার: আমলাতন্ত্রকে রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার বন্ধ করে একটি দক্ষ ও জনবান্ধব প্রশাসন গড়ে তোলা।

৪. জুলাই সনদ ও অন্তর্ভুক্তিমূলক বাংলাদেশ

‘জুলাই সনদ’ বা অভ্যুত্থানের চেতনা কেবল ক্ষমতা বদল নয়, বরং বৈষম্যহীন একটি সমাজ বিনির্মাণের রূপরেখা দেয়। এর মাধ্যমে ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী, ধর্মীয় সংখ্যালঘু এবং প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর অধিকার সংবিধানে সুসংহত করার সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে। একটি ‘অন্তর্ভুক্তিমূলক জাতীয় পরিচয়’ গঠনের মাধ্যমে জাতিগত বিভাজন দূর করে ঐক্যবদ্ধ বাংলাদেশ গড়ার এটিই শ্রেষ্ঠ সময়।

৫. জবাবদিহিতা ও স্বচ্ছতার সংস্কৃতি

জুলাই বিপ্লব পরবর্তী সময়ে সরকারের প্রতিটি স্তরে জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার দাবি উঠেছে। বিশেষ করে গত ১৫ বছরের গুম, খুন এবং দুর্নীতির বিচার নিশ্চিত করার মাধ্যমে ‘বিচারহীনতার সংস্কৃতি’ ভাঙার একটি পথ তৈরি হয়েছে। এটি ভবিষ্যতে যেকোনো সরকার বা রাষ্ট্রপ্রধানকে স্বৈরাচারী হওয়া থেকে বিরত থাকতে বাধ্য করবে।

নতুন বাংলাদেশ: জুলাই সনদ বাস্তবায়নের সুযোগ ও করণীয়

গত বছরের জুলাই গণঅভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ রাষ্ট্রকাঠামো ও সংবিধান সংস্কারের একটি ঐতিহাসিক সুযোগ তৈরি করে। এই সুযোগকে কাজে লাগাতে ২০২৫ সালের ১৭ অক্টোবর ‘জুলাই জাতীয় সনদ, ২০২৫’ ঘোষণা করা হয়, যা পরে ৮৪টি সংস্কার প্রস্তাবনায় রূপ নেয় । এই সনদ ও পরবর্তী পদক্ষেপগুলোই এখন ‘নতুন বাংলাদেশ’ গঠনের মূল ভিত্তি।

১. গণভোটের ঐতিহাসিক ফলাফল

সদ্য সমাপ্ত একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়ে, গত ১২ ফেব্রুয়ারি ২০২৬-এ জুলাই সনদের সংবিধান সংস্কারসংক্রান্ত ৪৮টি প্রস্তাবের ওপর অনুষ্ঠিত গণভোটে বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জিত হয়েছে। প্রায় ৬০.২৬ শতাংশ ভোটারের অংশগ্রহণে ‘হ্যাঁ’ ভোটে জয়লাভ করেছে । এর মাধ্যমে সংস্কার প্রক্রিয়ায় জনগণের সরাসরি সমর্থন এবং এই পথে এগিয়ে যাওয়ার বৈধতা স্পষ্ট হয়েছে।

২. সর্বাত্মক রাজনৈতিক ঐকমত্য

এই সংস্কার প্রক্রিয়াকে সর্বজনীন করতে জাতীয় ঐকমত্য কমিশন গঠিত হয়। এই কমিশনে দীর্ঘ সাত মাস ৩৩টি রাজনৈতিক দল ও জোটের সঙ্গে আলোচনার পর সনদ প্রণীত হয় । শুরুতে জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) সনদে সই না করলেও, সম্প্রতি গত ১৫ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ তারা সনদে স্বাক্ষর করেছে । ফলে এখন জুলাই সনদের পক্ষে একটি বিস্তৃত জাতীয় ঐকমত্য প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। একইসঙ্গে, জুলাই অভ্যুত্থানের চেতনা রক্ষায় ‘জুলাই গণঅভ্যুত্থান সুরক্ষা ও দায় নির্ধারণ অধ্যাদেশ, ২০২৬’-এর খসড়া অনুমোদন দেওয়া হয়েছে, যা অভ্যুত্থানে অংশগ্রহণকারীদের আইনগত সুরক্ষা নিশ্চিত করবে ।

৩. নির্বাচিত সরকারের দায়িত্ব

গণভোটের ফলাফলের ভিত্তিতে এবং জুলাই সনদ বাস্তবায়ন আদেশ, ২০২৫-এর অধীনে, আগামী নির্বাচিত সংসদ (ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ) এখন সংবিধান সংস্কারের দায়িত্ব পালন করবে। সম্প্রতি ১২ ফেব্রুয়ারি ২০২৬-এ অনুষ্ঠিত নির্বাচনে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা (৩০০ আসনের মধ্যে ২১২টি আসন) পেয়েছে । এই বিপুল জনাদেশপ্রাপ্ত সরকারের ওপর এখন সবচেয়ে বড় দায়িত্ব হলো জনগণের দেয়া এই আদেশ ও সনদকে সম্মান জানিয়ে প্রস্তাবিত সংস্কারগুলো সংবিধানে অন্তর্ভুক্ত করা।

সুযোগ কাজে লাগাতে করণীয়

১. দ্বিকক্ষ বিশিষ্ট সংসদ ও অন্যান্য কাঠামোগত সংস্কার: জুলাই সনদের মূল প্রস্তাবগুলোর মধ্যে রয়েছে দ্বিকক্ষ বিশিষ্ট সংসদ ব্যবস্থা প্রবর্তন এবং জাতীয় নির্বাচন পরিচালনার জন্য একটি ঐকমত্য-ভিত্তিক তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা পুনঃপ্রবর্তন । নতুন সংসদের প্রথম কাজ হওয়া উচিত এই সাংবিধানিক কাঠামো চূড়ান্ত করা।
2. নতুন সংবিধান প্রণয়ন: এনসিপির প্রস্তাবিত দাবি অনুযায়ী, গণভোটের রায় অনুসারে নির্বাচিত সংসদের ওপর প্রদত্ত গাঠনিক ক্ষমতাবলে সংবিধান সংস্কার করে এর নাম হবে ‘বাংলাদেশ সংবিধান, ২০২৬’ । এই নাম ও কাঠামোতে অভূতপূর্ব ঐকমত্য তৈরি হয়েছে, যা কাজে লাগানো জরুরি।

3. প্রতিষ্ঠান সংস্কার: শুধু সংবিধান নয়, বিচার বিভাগ, প্রশাসন ও অর্থনৈতিক খাতের গভীর সংস্কার জরুরি। ইতোমধ্যে সরকার বেশ কয়েকটি সংস্কার কমিশনের প্রতিবেদন প্রস্তুত করেছে । নির্বাচিত সরকারের উচিত এই প্রতিবেদনগুলো দ্রুত বাস্তবায়ন করা। উদাহরণস্বরূপ, আগামী নির্বাচন অবাধ ও সুষ্ঠু করতে বিগত তিনটি জাতীয় সংসদ নির্বাচনের অনিয়ম তদন্তে ইতোমধ্যে একটি কমিটি গঠন করা হয়েছে ।

সাম্প্রতিক গণভোট ও জাতীয় নির্বাচনের মধ্য দিয়ে ‘জুলাই সনদ’ বাস্তবায়নের পথ এখন সুগম। এবার দায়িত্ব নির্বাচিত সরকারের। জনগণের প্রত্যাশা, নতুন সংসদ যাতে দ্রুত জুলাই সনদের আলোকে সংবিধান ও রাষ্ট্রকাঠামো সংস্কার করে একটি সত্যিকারের ‘নতুন বাংলাদেশ’ গড়ে তোলে। এই সংস্কার প্রক্রিয়ায় কোনো গড়িমসি বা পিছুটান জাতির জন্য হতাশাজনক হবে।

বাংলাদেশের এই রূপান্তর কেবল একটি সরকার পরিবর্তন নয়, বরং এটি রাষ্ট্রের ‘ডিএনএ’ পরিবর্তনের একটি প্রক্রিয়া। যদি জুলাই সনদের চেতনাকে ধারণ করে সংবিধান ও রাষ্ট্র কাঠামো সংস্কার করা যায়, তবে বাংলাদেশ দীর্ঘমেয়াদী রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ও প্রকৃত গণতন্ত্রের পথে যাত্রা শুরু করবে।

নোট: লেখাটি ৩ টি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সাহায্য নিয়ে তৈরী করা হয়েছে।