প্রচলিত ই-কমার্সের বাইরে ব্যতিক্রম কয়েকটি ই-কমার্স মডেল

প্রচলিত ই-কমার্সের বাইরে ব্যতিক্রম কয়েকটি ই-কমার্স মডেল

প্রচলিত ই-কমার্সের বাইরে ব্যতিক্রম কয়েকটি ই-কমার্স মডেল

বর্তমান যুগে ই-কমার্সের ধারণা দ্রুত পরিবর্তিত হচ্ছে এবং প্রচলিত মডেলগুলির বাইরে নতুন নতুন ব্যবসায়িক কৌশল উদ্ভাবিত হচ্ছে। যেখানে বাজারে প্ল্যাটফর্মগুলো যেমন অ্যামাজন, দারাজ বা ব্র্যান্ড স্টোরগুলো সাধারণত জনপ্রিয়, সেখানে কিছু বিশেষ ই-কমার্স মডেল রয়েছে যা বাজারের বিভিন্ন চাহিদা পূরণ করছে। এই মডেলগুলো সাধারণত নতুন কৌশল, ভিন্ন ব্যবসায়িক পদ্ধতি এবং বিশেষায়িত শ্রেণীর প্রতি মনোযোগী। এখানে কয়েকটি উদাহরণসহ নতুন এবং ভিন্ন ই-কমার্স মডেল তুলে ধরা হলো:

১. সাবস্ক্রিপশন-বেসড ই-কমার্স

বিবরণ: সাবস্ক্রিপশন-বেসড ই-কমার্স মডেলটি গ্রাহকদের নিয়মিত ভিত্তিতে পণ্য বা সেবা সরবরাহ করে। এটি ব্যবসায়িক সংস্থাকে দীর্ঘমেয়াদী আয়ের সুযোগ সৃষ্টি করতে সহায়তা করে।

পদ্ধতি: গ্রাহকরা একটি নির্দিষ্ট পরিমাণ অর্থ সাবস্ক্রিপশন ফি দিয়ে নিয়মিত পণ্য বা সেবা পান, যা সাধারণত তাদের চাহিদা অনুযায়ী কাস্টমাইজ করা হয়।

উদাহরণ:

  • Dollar Shave Club – একটি গ্রুমিং কোম্পানি যা মাসিক সাবস্ক্রিপশনের মাধ্যমে শেভিং সামগ্রী সরবরাহ করে।

  • Blue Apron – একটি মেল কিট সাবস্ক্রিপশন সেবা যা হোম-কুকিং মেল প্রস্তুতির জন্য উপকরণ পাঠায়।

এই মডেলের সুবিধাসমূহ

  • পূর্বানুমানযোগ্য আয় বা বিক্রি সম্পর্কে পূর্বে অনুমান করা যায়।

  • গ্রাহকদের সাথে দীর্ঘসময় সম্পর্ক রেখে ব্যবসা করা যায়।

  •  সেবা এবং সুবিধাগুলো প্রয়োজনে পরিবতন বা কাস্টমাইজ করা যায়।

বিবরণ: ডাইরেক্ট-টু-কনজিউমার (D2C) মডেলটি ব্যবসায়ীগুলিকে গ্রাহকদের সঙ্গে সরাসরি সম্পর্ক স্থাপন করতে এবং তৃতীয় পক্ষের সাহায্য ছাড়া পণ্য বিক্রি করার সুযোগ দেয়।

পদ্ধতি: ব্যবসায়ীরা নিজেদের ওয়েবসাইট বা অ্যাপের মাধ্যমে সরাসরি গ্রাহকদের কাছে পণ্য বিক্রি করে, যাতে তারা দাম, ব্র্যান্ড এবং গ্রাহক সম্পর্ক নিয়ন্ত্রণ করতে পারে। অথ্যাৎ  উৎপাদনকারী বা আমদানী কারী নিজের অনলাইন শপে পণ্য বিক্রি করেন। সে অর্থে এটি নতুন বা ব্যতিক্রম নয়।

উদাহরণ:

  • Warby Parker – একটি চশমা কোম্পানি যা গ্রাহকদের সরাসরি চশমা বিক্রি করে, যেটি ঐতিহ্যবাহী খুচরা বিক্রেতা ব্যবস্থাকে এড়িয়ে চলে।

  • Glossier – একটি বিউটি ব্র্যান্ড যা সরাসরি গ্রাহকদের কাছে পণ্য বিক্রি করে।

সুবিধা:

  •  নিজস্ব পণ্য তাই দাম নিয়ন্ত্রণে অধিক ক্ষমতা।

  • গ্রাহকের সাথে সরাসরি সম্পর্ক উন্নয়ন ও  প্রতিক্রিয়া পাওয়ার সুযোগ।

  • নিজের পণ্য বিধায় বেশী লাভের সুবিধা।

৩. ক্রাউড সোর্সড ই-কমার্স

বিবরণ: ক্রাউডসোর্সড ই-কমার্স মডেলটি ফান্ডিং বা প্রি-অর্ডারের মাধ্যমে নতুন পণ্য বা সেবা বাজারে আনার জন্য গ্রাহকদের সাহায্য নেয়। গ্রাহকরা প্রাথমিক বিনিয়োগ বা অগ্রিম অর্ডার দিয়ে পণ্য বা সেবার বিকাশে সহায়তা করে।

পদ্ধতি: ব্যবসায়ীরা তাদের প্রজেক্ট ফান্ডিং বা প্রি-অর্ডারের জন্য ক্রাউডফান্ডিং প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করে।

উদাহরণ:

  • Kickstarter – একটি জনপ্রিয় ক্রাউডফান্ডিং প্ল্যাটফর্ম যা নতুন পণ্য বা সেবার জন্য অর্থ সংগ্রহ করে।

  • Indiegogo – একটি অন্য ধরনের ক্রাউডফান্ডিং প্ল্যাটফর্ম যা স্টার্টআপ বা উদ্যোগিদের প্রজেক্টে সাহায্য করে।

সুবিধা

  • পণ্য ধারণা যাচাই এবং প্রাথমিক বাজার গ্রহণযোগ্যতা নিশ্চিত করা।

  • গ্রাহকদের মাধ্যমে অর্থ সংগ্রহের সুযোগ।

  • বিনিযোগের অনিশ্চয়তা কমে যায়।

৪. সোশ্যাল মিডিয়া কমার্স

বিবরণ: সোশ্যাল কমার্স মডেলটি সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্মের সঙ্গে ই-কমার্সকে সংযুক্ত করে, যেখানে গ্রাহকরা সরাসরি সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্মেই পণ্য খুঁজে এবং কেনাকাটা করতে পারেন।

পদ্ধতি: সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্মগুলিতে (যেমন, ফেসবুক, ইনস্টাগ্রাম, টিকটক) পণ্য প্রদর্শন এবং শপিংয়ের সুযোগ দেওয়া হয়, যেখানে ব্যবহারকারীরা একই অ্যাপে পণ্য ক্রয় করতে পারেন।

উদাহরণ:

  • Instagram Shopping – ইনস্টাগ্রামে পণ্য ট্যাগিং করে গ্রাহকরা সরাসরি ক্রয় করতে পারেন।

  • Facebook Marketplace – ব্যবহারকারীরা সোশ্যাল নেটওয়ার্কের মধ্যে পণ্য কিনতে এবং বিক্রি করতে পারেন।

সুবিধা

  • সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহারকারীদের কাছে সোজাসুজি পৌঁছানো।

  • অনলাইনে ক্রেতাগোষ্টি তৈরী করা সহজ হয়।

  • প্রাথমিক বিনিয়োগ বেশী প্রয়োজন হয়না।
  • ক্ষদ্র উদ্যোক্তাদের জন্য ভাল

৫. ভয়েস কমার্স (V-Commerce)

বিবরণ: ভয়েস কমার্স হল এমন একটি মডেল যেখানে গ্রাহকরা ভয়েস কমান্ডের মাধ্যমে পণ্য বা সেবা কেনাকাটা করতে পারেন। এটি স্মার্ট স্পিকার বা ভয়েস অ্যাসিস্ট্যান্ট ব্যবহার করে কেনাকাটা করতে সহায়তা করে।

পদ্ধতি: গ্রাহকরা স্মার্ট ডিভাইস বা অ্যাসিস্ট্যান্টের মাধ্যমে ভয়েস কমান্ড দিয়ে পণ্য অর্ডার বা সেবা গ্রহণ করতে পারেন।

উদাহরণ:

  • Amazon Echo – Alexa ব্যবহার করে গ্রাহকরা পণ্য অর্ডার করতে পারেন।

  • Google Home – গুগল অ্যাসিস্ট্যান্ট ব্যবহার করে পণ্য অর্ডার করা যায়।

ফায়দা:

  • হাত-মুক্ত, সুবিধাজনক শপিং।

  • স্মার্ট হোম ডিভাইসের সঙ্গে একীভূত হওয়া যায়।

৬. অগমেন্টেড রিয়েলিটি ই-কমার্স (AR-Commerce)

বিবরণ: অগমেন্টেড রিয়েলিটি (AR) ই-কমার্স মডেলটি গ্রাহকদের তাদের বাস্তব পরিবেশে পণ্য কেমন দেখাবে তা আর্ন্তভুক্ত করার মাধ্যমে শপিংয়ের অভিজ্ঞতা উন্নত করে।

পদ্ধতি: গ্রাহকরা তাদের স্মার্টফোন বা ট্যাবলেট ব্যবহার করে AR প্রযুক্তির মাধ্যমে পণ্যগুলি তাদের বাস্তব পরিবেশে দেখতে পারেন।

উদাহরণ:

  • IKEA Place – একটি AR অ্যাপ যা গ্রাহকদের তাদের বাসায় আসবাবপত্র কেমন দেখাবে তা দেখতে সহায়তা করে।

  • L’Oreal AR Try-On – মেকআপ পণ্য ব্যবহারকারীরা তাদের মুখে ভার্চুয়ালি পরীক্ষা করতে পারেন।

সুবিধা

  • ক্রেতাদের সিদ্ধান্ত গ্রহণ সহজতর হয়।

  • অনলাইন শপিং এবং অফলাইন শপিংয়ের মধ্যে সেতু নির্মাণ।

৭. পিয়ার-টু-পিয়ার (P2P) ই-কমার্স

বিবরণ: পিয়ার-টু-পিয়ার (P2P) ই-কমার্স মডেলটি সাধারণত ব্যক্তির মধ্যে পণ্য বা সেবা সরাসরি বিক্রি ও কেনার সুযোগ দেয়।

পদ্ধতি: ব্যবহারকারীরা পণ্য বিক্রি বা ক্রয়ের জন্য নিজেদের প্রোফাইল তৈরি করে, সরাসরি লেনদেন করে এবং প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হয়।

উদাহরণ:

  • Bikroy.com – বাংলাদেশের একটি জনপ্রিয় প্ল্যাটফর্ম যেখানে ব্যবহারকারীরা বিভিন্ন পণ্য বিক্রি ও কিনতে পারেন।

  • eBay – বিশ্বব্যাপী একটি অনলাইন মার্কেটপ্লেস যেখানে ব্যক্তিগত বিক্রেতারা তাদের পণ্য বিক্রি করতে পারেন।

সুবিধা:

  • ব্যক্তিদের উদ্যোগী করা এবং ব্যবসা শুরু করার সুযোগ।

  • কম খরচে পরিচালনা করা।

৮. ভাউচার/ডিসকাউন্ট কোড বিক্রির মডেল

বিবরণ: এই মডেলে সরাসরি পণ্য বিক্রি না করে, ব্যবসা বিশেষ ডিসকাউন্ট বা ভাউচার কোড বিক্রি করে থাকে। গ্রাহকরা এই কোড ব্যবহার করে পণ্য কিনলে ছাড় পেয়ে থাকেন।

পদ্ধতি: ব্যবসায়ীরা তাদের সাইট বা তৃতীয় পক্ষের মাধ্যমে ডিসকাউন্ট কোড বিক্রি করে, যা পরবর্তীতে গ্রাহকরা পণ্য বা সেবায় ছাড় হিসেবে ব্যবহার করতে পারেন।

উদাহরণ:

  • Groupon – ডিসকাউন্ট কোড ও কুপন বিক্রির মাধ্যমে বিভিন্ন পণ্য এবং সেবা সরবরাহ করে।

  • CouponDunia – একটি সাইট যেখানে গ্রাহকরা বিভিন্ন ব্র্যান্ডের ডিসকাউন্ট কোড ও ভাউচার পেতে পারেন।

সুবিধা:

  • গ্রাহকদের কাছে বিশেষ ছাড় বা সুবিধা প্রদান।

  • ব্যবসার বিক্রির পরিমাণ বৃদ্ধি।

উপসংহার

ই-কমার্সের এই নতুন মডেলগুলো ব্যবসা এবং গ্রাহকের সম্পর্ককে আরও গভীর করেছে এবং ই-কমার্স শিল্পে নতুন সুযোগ সৃষ্টি করেছে। প্রযুক্তির দ্রুত উন্নয়ন, গ্রাহকের চাহিদা এবং নিত্য নতুন ধারণাগুলির কারণে, এই মডেলগুলো ভবিষ্যতে আরও বড় ভূমিকা রাখবে। ব্যবসায়ীদের জন্য এগুলো নতুন কৌশল গ্রহণের সুযোগ এবং গ্রাহকদের জন্য সুবিধাজনক শপিং অভিজ্ঞতা প্রদান করে।