সরকার ২০০০ সালের কপিরাইট আইন রহিত করে ১৮ সেপ্টেম্বর গেজেট প্রকাশের মাধ্যমে নতুন কপিরাইট আইন বলবৎ করা হয়েছে ১৯টি অধ্যায়ে বিন্যস্ত করে (২০২৩ সালের ৩৪নং আইন)। যা নীচে বাংলাদেশের ২০২৩ সালের নতুন *কপিরাইট আইন (Act No. XXXIV of 2023 / Act No. 1452) এই নামে ছিল।
২০০০ সালের আইনের একটি বড় দুর্বলতা ছিল কপিরাইট বিষয়ে ব্যাপক সচেতনতার অভাব। নতুন আইনে সংশ্লিষ্ট পক্ষদের সচেতনতা বৃদ্ধির জন্য বিভিন্ন বিধান রাখা হয়েছে, যা কপিরাইট সংস্কৃতি গড়ে তুলতে সহায়ক হতে পারে।
ডিজিটাল মিডিয়ার বিস্তারে ইউটিউবসহ নানা প্ল্যাটফর্মে গান, নাটক ও অন্যান্য সৃজনশীল কাজ ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হলেও বহু ক্ষেত্রে প্রণেতারা তাদের ন্যায্য আয়ের অংশ থেকে বঞ্চিত হন। নতুন কপিরাইট আইনে এসব ডিজিটাল মাধ্যমে অর্জিত আয়ে স্রষ্টার অধিকার সংরক্ষণের বিষয়টি স্পষ্টভাবে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে, যা সময়ের দাবি ছিল।
কপিরাইট রেজিস্ট্রারের দায়িত্ব পালনে ন্যায়সংগততা নিশ্চিত করতে নতুন আইনে সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনার সুযোগ রাখা হয়েছে। এতে রেজিস্ট্রার নতুন বা গুরুত্বপূর্ণ তথ্য উদ্ঘাটিত হলে কিংবা সাক্ষ্যপ্রমাণে ভুল ধরা পড়লে নিজ উদ্যোগে বা আবেদনের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনা করতে পারবেন।
নতুন আইনে ‘সম্প্রচার সংস্থা ও সম্পাদনকারীর অধিকার ও মেয়াদ’ শিরোনামে একটি পৃথক অধ্যায় যুক্ত হয়েছে। পাশাপাশি ‘লোকজ্ঞান ও লোকসংস্কৃতির অধিকার সুরক্ষা’ বিষয়েও নতুন অধ্যায় সংযোজন করা হয়েছে। যুগের চাহিদা অনুযায়ী ডিজিটাল কর্মের সংজ্ঞা নির্ধারণ করাও এ আইনের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক।
বাংলাদেশে কপিরাইট ব্যবস্থাপনার একটি বড় সমস্যা দীর্ঘদিন ধরে কপিরাইট সমিতির কার্যকর অনুপস্থিতি। উন্নত ও উন্নয়নশীল দেশে কপিরাইট সমিতি স্রষ্টা ও ব্যবহারকারীর মধ্যে মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকা পালন করে এবং জনসচেতনতা বাড়াতে কার্যকর ভূমিকা রাখে। এই বাস্তবতা বিবেচনায় নতুন আইনে কপিরাইট সমিতি বিষয়ে একটি পূর্ণাঙ্গ অধ্যায় যুক্ত করা হয়েছে, যা ইতিবাচক উদ্যোগ।
লাইসেন্স প্রদান ও গ্রহণ কপিরাইট ব্যবস্থাপনার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ, যা দীর্ঘমেয়াদি আয় ও অংশীজনদের প্রাপ্যতা নিশ্চিত করে। এ কারণে নতুন আইনে লাইসেন্স সংক্রান্ত বিষয়ে একটি আলাদা অধ্যায় যুক্ত করা হয়েছে।
মেধাসত্ত্ব কেবল দেশীয় পরিসরে সীমাবদ্ধ নয়; এর আন্তর্জাতিক মাত্রাও রয়েছে। এ বাস্তবতা মাথায় রেখে আন্তর্জাতিক কপিরাইট বিষয়ে পৃথক অধ্যায় যুক্ত করে দেশের কপিরাইট ব্যবস্থাপনাকে বৈশ্বিক কাঠামোর সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ করার চেষ্টা করা হয়েছে।
আইনের মূল উদ্দেশ্য ও পরিধি
এই আইন প্রণেতাদের (সৃষ্টি-কর্তাদের) মূল সৃজনশীল কার্য — সাহিত্য, নাটক, সংগীত, চলচ্চিত্র, চিত্রকর্ম, শব্দ-ধ্বনি রেকর্ডিং, সম্প্রচার, স্থাপত্য নকশা, ডাটাবেজ, তথ্য-প্রযুক্তি-ভিত্তিক ডিজিটাল কর্ম এবং লোকজ সাংস্কৃতিক কর্মসহ বিভিন্ন ধরণের কাজের কপিরাইট সুরক্ষা প্রদান করে।
ই-কর্ম, ডিজিটাল মিডিয়া ও সোশ্যাল প্ল্যাটফর্মের মতো তথ্য-প্রযুক্তি-ভিত্তিক ডিজিটাল কার্যকলাপেও কপিরাইট সুরক্ষা সংযোজন করা হয়েছে, যা আগের ২০০০ সালের আইনে যথাযথভাবে অন্তর্ভুক্ত ছিল না।
“কপিরাইট”-এর সাথে সম্পর্কিত অপারেটিভ ও প্রশাসনিক সংজ্ঞা—যেমন অনুলিপিকারী যন্ত্র, অভিযোজন, পাবলিক ডোমেইন ইত্যাদি—আইনে বিস্তারিতভাবে সংজ্ঞায়িত হয়েছে।
কিন্তু বাংলাদেশের অন্যান্য আইনের মতোই এই আইনের পরিধি ও শাস্তি বৃদ্ধি করা হয়েছে। আর সব হলো অপরাধ সংগঠনের পরে। যা ব্রিটিশ আমলের রাষ্ট্র সরকার ব্যবস্থার প্রতিরুপ। বর্তমান বিশ্বে আইনের শাস্তির চেয়ে প্রতিকার ও প্রতিরোধের যে বিষয়গুলো থাকে। সেটা অনুপস্থিত।
বিশেষ করে, বুদ্ধিভিত্তিক সম্পদ সুরক্ষার নির্দেশনা নেই। বুদ্ধিভিত্তিক সম্পদ সংশ্লিষ্ঠ পক্ষগুলোর সমন্বয়ে একটি কাউন্সিল বা একাধিক কাউন্সিল এর সমন্বয়ে একটি ফেডারেশন গঠনের মৌলিক তাগিদ তা উপেক্ষা করা হয়েছে। ফলে আইনের আওতা বাড়লেও দীর্ঘদিনের অনেক সমস্যার সমাধান হয়নি বা হবে না।
বিশেষ করে, আমরা যদি একটি গানের কথা বলি সেখানে গীতিকার, সুরকার, শিল্পী অনেকের অধিকার থাকতে পারে। গানটি কেউ ব্যবহার করতে চাইলে কার কাছ থেকে অনুমতি নেবে। অথবা কাকে কতটা রয়ালিটি দেবে তা নিয়ে অনেক সমস্যা হয় এবং হয়েছে। মোবাইল কনটেন্ট এর ক্ষেত্রে যাচ্ছেতাই ব্যবহার হয়েছে। সৃজনশীল লোকেরা ঠকেছে। কারণ কনটেন্ট প্রোভাইডারগণ প্রোডাকশান হাউজ থেকে শিল্পগুলো নিয়েছে যার কপিরাইট হয়তো শিল্পী বা গীতিকারের নামে। একটি কাউন্সিল থাকলে কোনোরুম আদালতি ছাড়া এসব সমস্যার সমাধান করা যেত। এখন আইন আদালতের দীর্ঘসূত্রীতার ভয়ে অনেকে ঝামেলায় না গিয়ে চুপচাপ থাকেন। মাঝখানে অন্যকেউ সুবিধাভোগী হয় আর সৃজণশীল লোকেরা না খেয়ে মরে।
বাংলাদেশের মতো দেশে কপিরাইট ভঙ্গকারীরা সব সময় আইনের ফাঁকফোকর খুঁজে বেড়ায় এবং প্রযুক্তির অগ্রগতির সঙ্গে সঙ্গে কপিরাইট সংশ্লিষ্ট ঘটনাপ্রবাহও দ্রুত রূপ বদলায়। তাইওয়ান, জাপান কিংবা দক্ষিণ কোরিয়ার মতো দেশগুলোতে কপিরাইট আইন ঘন ঘন পর্যালোচনা ও হালনাগাদ করা হয়। সেই প্রেক্ষাপটে একটি কপিরাইট আইন প্রণয়ন করতে পাঁচ বছর বা তার বেশি সময় পেরিয়ে যাওয়া নিঃসন্দেহে দুঃখজনক। সবচেয়ে বেদনার বিষয় হলো—এখন যে নতুন কপিরাইট আইন আমাদের হাতে এসেছে, চতুর্থ শিল্পবিপ্লব ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তানির্ভর নতুন বাস্তবতায় দাঁড়িয়ে এটিকে পুরোপুরি সময়োপযোগী বলা কঠিন।
আইনগুলো যুগোপযোগী করার জন্য সবার আগে একটি কাঠামো নীতিমালা ঠিক করতে হবে। এবং সমস্ত আইনকে সে কাঠামো অনুযায়ী পরিবর্তন করতে হবে। কপিরাইট আইন ছাড়াও কপিরাইট বিধিটিকে কয়েকটি ভালে আলাদা করার প্রয়োজন ছিল সেটিও করা হয়নি। যেমন চলচ্চিত্র কপিরাইট বিধি, ডিজিটাল কপিরাইট বিধি ইত্যাদি। সবকিছু এক বিধিতে করার কারণে এখানে মূল উদ্দেশ্য ব্যাহত হতে চলেছে বলে আমি মনে করি।
বর্তমান কপিরাইট আইন ২০২৩ এর কিছু উল্লেখযোগ্য দিক।
২০২৩ সালের আইনে কপিরাইট বিষয়টিকে সাধারণ মানুষের জন্য সহজবোধ্য করার লক্ষ্যে বহু নতুন সংজ্ঞা যুক্ত করা হয়েছে। ২০০০ সালের আইনের অনেক ধারা ভেঙে তা বিস্তৃতভাবে পুনর্বিন্যাস করা হয়েছে এবং উপধারা সংযোজন করা হয়েছে। পাশাপাশি নতুন ধারা যুক্ত হয়েছে এবং বর্তমান বাস্তবতায় অপ্রাসঙ্গিক কিছু বিষয় বাদ দেওয়া হয়েছে।
এই আইনে নৈতিক অধিকার, অর্থনৈতিক অধিকার, রিলেটেড রাইটস, পাবলিক ডোমেইন ইত্যাদি গুরুত্বপূর্ণ ধারণা সুস্পষ্টভাবে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। আগের আইনে রিলেটেড রাইটস—বিশেষত সংগীত, নাটক ও পরিবেশনা শিল্পীদের অধিকার—যথাযথভাবে উপস্থাপিত ছিল না। ফলে বিভিন্ন পক্ষের মধ্যে দীর্ঘদিন দ্বন্দ্ব ও অনিশ্চয়তা বিরাজ করছিল। নতুন আইনে রিলেটেড রাইটসকে তুলনামূলকভাবে স্বচ্ছ, বিস্তৃত ও কাঠামোবদ্ধ করা হয়েছে এবং এ বিষয়ে পৃথক অধ্যায় সংযোজন করা হয়েছে।
সৃজনশীল কাজের লাইফটাইম ও মেয়াদ:
• সাহিত্য, নাট্য, সংগীত বা শিল্পকর্মের কপিরাইট প্রণেতার জীবদ্দশা + মৃত্যুর পর ৬০ বছর পর্যন্ত থাকে। র্ডিং, ফটোগ্রাফ ও তথ্য-প্রযুক্তি-ভিত্তিক ডিজিটাল কর্মেও সাধারণত প্রকাশের পরবর্তী ৬০ বছর পর্যন্ত কপিরাইট থাকে। • সম্প্রচার সংস্থার সম্প্রচারকৃত বিষয়ের কপিরাইট পুনরুৎপাদন অধিকার প্রকাশের পর ২৫ বছর পর্যন্ত সুরক্ষিত।
আইনি অধিকার ও লাইসেন্স:
কপিরাইট ধারক/স্বত্বাধিকারী নিজ অধিকার লাইসেন্স বা অন্যকে হস্তান্তর করতে পারবেন এবং আইন অনুযায়ী তা স্বীকৃত হবে। • কপিরাইট সমিতি নির্মিত কাজের লাইসেন্স প্রদান, রয়্যালটি আদায় ও বণ্টন কার্য সম্পাদনে আইনগত অনুমোদন পাবে এবং এর কার্যক্রম নিয়ন্ত্রিত শর্তে পরিচালিত হবে। • যদি স্বত্বাধিকারী জনস্বার্থের বিপরীতে লাইসেন্স প্রদান বা অনুমতি প্রদান নাকচ করেন, আইনের অধীন বিশেষ পরিস্থিতিতে কপিরাইট বোর্ড তাদের লাইসেন্স দিতে থাকতে পারে এবং ক্ষতিপূরণ নির্ধারণ করতে পারে।
লঙ্ঘন ও শাস্তিমূলক বিধান
কপিরাইট লঙ্ঘনের ক্ষেত্রে আইনের প্রথাগত প্রতিকার — নিষেধাজ্ঞা, ক্ষতিপূরণ ও অন্যান্য প্রতিকার — পাওয়া যাবে। • যে কোনও ব্যক্তি যদি বৈধ স্বত্ব ছাড়াই কপিরাইট-যুক্ত কাজ করেন, তা অপরাধ হিসেবেই গণ্য করে ৫,০০,০০০ টাকার জরিমানা পর্যন্ত বিধান রয়েছে। • এই শাস্তি প্রযোজ্য হতে পারে স্বত্বাধিকারী না হয়ে কোনো কাজ প্রকাশ, পরিবেশন, বাণিজ্যিক ব্যবহার বা বিক্রয়/ভাড়া প্রদানের ক্ষেত্রে।
ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম ও নবায়ন
ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে অপব্যবহার, স্ট্রিমিং, ডাউনলোড, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে কপিরাইট কার্যকলাপেও আইন প্রযোজ্য করা হয়েছে যা আগের আইনের তুলনায় অনেক বেশি ব্যাপক। কপিরাইট বোর্ড ও রেজিস্ট্রারকে মজবুত করে ডিজিটাল কপিরাইট রেজিস্ট্রি, নজরদারি ও বিরোধ নিষ্পত্তির ব্যবস্থাও আইনে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।
এছাড়া লোকজ্ঞান ও লোকসংস্কৃতির অধিকার সুরক্ষাও এই আইনের একটি গুরুত্বপূর্ণ সংযোজন। দীর্ঘদিন ধরে লোকজ সাংস্কৃতিক সম্পদ ব্যবহৃত হলেও এর স্বত্ব ও অধিকার সুরক্ষার বিষয়টি স্পষ্ট ছিল না। নতুন আইনে এ শূন্যতা পূরণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে কপিরাইট অফিসকে কার্যকরভাবে ক্ষমতায়ন করা হয়েছে। পূর্বে কপিরাইট সংরক্ষণে সবচেয়ে কার্যকর ব্যবস্থা ছিল টাস্কফোর্সের মাধ্যমে মোবাইল কোর্ট পরিচালনা, যা নির্বাহী আদেশের ভিত্তিতে পরিচালিত হতো। নতুন আইনে এই কার্যকর পদ্ধতিকে আইনগত কাঠামোর আওতায় আনা হয়েছে, যা বাস্তব প্রয়োগে একটি বড় অগ্রগতি।
দৃষ্টিপ্রতিবন্ধীদের অধিকার সুরক্ষার বিষয়টিও কপিরাইট আইনে গুরুত্ব পাওয়ার দাবি রাখে। ছাপানো হরফে প্রকাশিত অনেক বই দৃষ্টিপ্রতিবন্ধীদের জন্য পাঠযোগ্য নয়। এসব বইকে ডিজিটাল টকিং বুক, ব্রেইল, অ্যাকসেসিবল ইলেকট্রনিক টেক্সট বা অন্য কোনো উপযোগী পদ্ধতিতে রূপান্তরের সুযোগ কপিরাইট আইনে নিশ্চিত করা হলে তা সবার জন্য অন্তর্ভুক্তিমূলক শিক্ষার লক্ষ্য অর্জনে সহায়ক হবে।
আইনের ব্যাখ্যা ও প্রয়োগ সহজ হলে তার সুফল ভোগকারীদের কাছে পৌঁছায়। সে কারণেই আইনের শেষাংশে ‘বিবিধ’ নামে একটি অধ্যায় যুক্ত করে কপিরাইট রেজিস্ট্রার ও কপিরাইট বোর্ডকে দেওয়ানি আদালতের মতো ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে। অবৈধ সম্প্রচার বন্ধে রেজিস্ট্রারকে তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নেওয়ার ক্ষমতাও প্রদান করা হয়েছে।
তবে মনে রাখতে হবে, কপিরাইট আইনের কার্যকারিতা শুধু শাস্তিমূলক ব্যবস্থার ওপর নির্ভর করে না। মানুষের মানবিকতা, চেতনা ও নৈতিকতা জাগ্রত করাও সমান গুরুত্বপূর্ণ। কেবল কঠোর অভিযানের মাধ্যমে কপিরাইট আইন কার্যকর করতে চাইলে তা সব সময় সুখকর ফল নাও দিতে পারে। শক্তিশালী সামাজিক নৈতিকতা ও সচেতনতার মধ্য দিয়েই এই আইন সবচেয়ে কার্যকর হতে পারে।
