বাংলাদেশের রাজনীতিতে কিছু দল ভোটের সময় হঠাৎ দৃশ্যমান হয়, আবার কিছু দল দীর্ঘমেয়াদে সাংগঠনিক ভিত্তি, আদর্শিক কাজ ও সামাজিক নেটওয়ার্কের মাধ্যমে নিজেদের অবস্থান তৈরি করে। জামায়াতে ইসলামী নিজেকে দ্বিতীয় ধরনের একটি দল হিসেবে উপস্থাপন করে—যারা শুধু নির্বাচনী রাজনীতি নয়, বরং সমাজভিত্তিক প্রভাব, দাওয়াতী কাজ, সংগঠিত কাঠামো এবং বিকল্প নেতৃত্ব তৈরির ওপর জোর দেয়। তাদের সমর্থকরা মনে করেন, গত এক যুগের বেশি সময় ধরে দমন–পীড়ন, সাংগঠনিক চাপে থাকা সত্ত্বেও টিকে থাকা—এবং নতুন প্রজন্মের মধ্যে পুনরায় জায়গা করে নেওয়া—দলটিকে আবারও একটি সম্ভাব্য নির্বাচনী শক্তিতে পরিণত করেছে।
তবে সাম্প্রতিক প্রেক্ষাপটে তাদের শক্তি দাঁড়িয়ে আছে মূলত চার জায়গায়: (১) শৃঙ্খলাপূর্ণ সংগঠন, (২) দীর্ঘমেয়াদী সামাজিক নেটওয়ার্ক, (৩) তরুণ নেতৃত্ব তৈরির ধারাবাহিকতা, (৪) জোট রাজনীতিতে কৌশলগত ভূমিকা।
এই উপাদানগুলো অনুকূলে এলে তারা আগামী নির্বাচনে বড় শক্তি হিসেবে আবির্ভূত হতে পারে—হয় সরাসরি আসন জিতে, নয়তো ক্ষমতার সমীকরণ নির্ধারণকারী শক্তি হিসেবে।
সাংগঠনিক শৃঙ্খলা ও স্তরভিত্তিক কাঠামো
জামায়াতের সবচেয়ে বড় শক্তি হিসেবে যেটা প্রায় সব রাজনৈতিক বিশ্লেষকই স্বীকার করেন, তা হলো তাদের ক্যাডারভিত্তিক, স্তরভিত্তিক ও শৃঙ্খলাপূর্ণ সংগঠন কাঠামো। তাই তাদের নেতৃত্বে প্রকাশ্য দ্বন্দ্ব কম, সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে দ্রুততা, কেন্দ্রীয় নির্দেশনা মাঠপর্যায়ে কার্যকরভাবে পৌঁছানো যায়। বাংলাদেশের অনেক দলে যেখানে পদ-পদবি নিয়ে প্রতিযোগিতা ও গ্রুপিং বড় সমস্যা, সেখানে জামায়াতের ভেতরে আনুগত্যনির্ভর কাঠামো তাদের নির্বাচনী মেশিনকে তুলনামূলকভাবে কার্যকর করে।
দীর্ঘমেয়াদী দাওয়াতী ও সামাজিক নেটওয়ার্ক
রাজনীতির বাইরে সামাজিক ও ধর্মীয় পরিমণ্ডলে প্রভাব বিস্তার জামায়াতের একটি কৌশলগত বিনিয়োগ হিসেবে কাজ করেছে। তাফসির মাহফিল, সীরাত আলোচনা, ইসলামী স্টাডি সার্কেল—এসবের মাধ্যমে তারা আদর্শিক সমর্থক তৈরি করেছে। শিক্ষিত তরুণদের একটি অংশ ধর্মীয় চর্চার সঙ্গে সংগঠিত জীবনের সংযোগ পেয়েছে। তাদের জন্য রয়েছে তাদের নানারকম প্রশিক্ষণ। স্থানীয় পর্যায়ে সামাজিক, শিক্ষামূলক ও মানবিক কার্যক্রমের মাধ্যমে নরম গ্রহণযোগ্যতা তৈরি হয়েছে। অনেক জায়গায় তারা সরাসরি দলীয় ব্যানারে না গিয়ে সামাজিক বা সেবামূলক পরিচয়ে উপস্থিত থেকেছে—যা রাজনৈতিক বিতর্ক এড়িয়ে সামাজিক প্রভাব বিস্তারে সহায়ক হয়েছে।
শিক্ষাঙ্গনে প্রভাব ও তরুণ নেতৃত্ব
জামায়াতের ছাত্রসংগঠন দীর্ঘদিন ধরেই তাদের ভবিষ্যৎ নেতৃত্ব তৈরির প্রধান ক্ষেত্র।
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ক্যাম্পাস রাজনীতিতে সহিংসতা, দখলদারিত্ব ও চাঁদাবাজির রাজনীতি নিয়ে সাধারণ শিক্ষার্থীদের মধ্যে যে বিরক্তি তৈরি হয়েছে, সেখানে জামায়াতপন্থী ছাত্ররাজনীতি নিজেদেরকে তুলনামূলক “শৃঙ্খলাপূর্ণ” ও “আইডিয়াভিত্তিক” হিসেবে উপস্থাপন করার চেষ্টা করেছে। ফলে— মেধাভিত্তিক ছাত্রদের একটি অংশ তাদের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে আর ক্যাম্পাস–ভিত্তিক নেটওয়ার্ক পরে জাতীয় রাজনীতিতে সাংগঠনিক শক্তি হিসেবে কাজ করতে পারে
দমন–পীড়নের বিপরীতে জনগনের সহানুভূতি
গত দেড় দশকে দলটির বিরুদ্ধে আইনি পদক্ষেপ, নিষেধাজ্ঞা, গ্রেপ্তার, বিচার—এসব বিষয় তাদের রাজনৈতিক বয়ানের বড় অংশ হয়ে গেছে। তাদের সমর্থকদের কাছে এটি “ত্যাগ ও নির্যাতনের ইতিহাস” হিসেবে উপস্থাপিত হয়, যা দুইভাবে কাজ করে— ভেতরের কর্মীদের মনোবল দৃঢ় করে কারণ তাদের নেতারা অত্যাচারের মুখে বিদেশে যায়নি এবং কর্মীদের পাশে ছিল। তাই একটি সহানুভূতিশীল ভোটার শ্রেণি তৈরি করে, যারা মনে করে “ওরা অনেক চাপ সহ্য করেছে”। বাংলাদেশের রাজনীতিতে নিপীড়িত শক্তি হিসেবে ইমেজ অনেক সময় ভোটে সহানুভূতি তৈরি করতে পারে—এটিও তাদের সম্ভাবনার একটি উপাদান। এবং সাধারণ মানুষের কাছে গ্রহণযোগ্যতা পেতে এটি সবচেয়ে বেশী কাজ করছে বলে মনে হয়।
অর্থনৈতিক ও প্রাতিষ্ঠানিক ভিত্তি
দলীয় রাজনীতির বাইরে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি ও নেটওয়ার্কের মাধ্যমে গড়ে ওঠা বিভিন্ন শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানের কারণে তাদের একটি স্বনির্ভর অর্থনৈতিক বলয় তৈরি হয়েছে বলে সমর্থকরা দাবি করেন। নিয়মিত চাঁদাভিত্তিক রাজনীতির ওপর নির্ভরশীল নয় তারা, তাদের সদস্যরা সকলে ক্রাউড ফান্ডিং করে স্ব স্ব এলাকায় দলের খরচ বহন করে। এই কাঠামো তৈরী হওয়ার কারণে দীর্ঘমেয়াদী সাংগঠনিক কার্যক্রম চালানো সহজ হয়। কর্মীদের আংশিক সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সম্ভব হয় পারষ্পরিক যোগাযোগ, সহযোগিতা ও সহমর্মিতার কারণে। এসব বিষয় রাজনৈতিক অনিশ্চয়তার মধ্যেও সংগঠন টিকিয়ে রাখার পেছনে এটি ভূমিকা রাখতে পারে।
এছাড়া তারা যোগ্য ও মেধাবী নাগরিক তৈরী করেছে। তারা তাদের ব্যক্তিগত জীবনে বিভিন্ন ক্ষেত্রে সফল হয়েছে। ফলে সেসব সফল কর্মী ও শুভাকাংখী তাদের জন্য সহায়ক হিসেবে ভূমিকা রেখেছে।
নতুন প্রজন্মের সঙ্গে ভাষা ও ইস্যুর সামঞ্জস্য
একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন হলো—শুধু ধর্মীয় স্লোগান নয়, বরং ন্যায়বিচারের বার্তা, , দুর্নীতিবিরোধিতা অবস্থান, সুশাসন প্রতিশ্রুতি ও বৈষম্যবিরোধী অবস্থানের প্রমাণ দেয়া। এসবই তারা বিগত দেড় বছরে অন্য দলের চেয়ে তুলনামূলক বেশী ইতিবাচকভাবে প্রমাণ করতে পেরেছে। এসব ইস্যুতেও নিজেদের অবস্থান তুলে ধরা।
ফলে তারা চেষ্টা করছে নিজেকে “শুধু ধর্মভিত্তিক দল” নয়, বরং “নৈতিক রাজনীতির বিকল্প” হিসেবে উপস্থাপন করতে। এবং ইতোমধ্যে জনগনের একটি অংশ জামায়াতকে সেরা বিকল্প মনে করছে। হয়তো তাদের কেউ কেউ এক সময় ‘‘ মধ্যপন্থী দল হিসেবে বিএনপিকে টিকিয়ে রাখতে হবে’’ এই ধারার রাজনীতিতে ছিলো।
তবে ‘‘ আওয়ামী লীগ যতই খারাপ হোক প্রগতিশীল, বামপন্থী, নাস্তিক ও সংখ্যালঘুদের জন্য তাকে টিকিয়ে রাখতে হবে‘‘ লীগকে বার বার পূণবাসনে অনেকগুলো বয়ানের মধ্যে এই বয়ানটি ছিল ব্যাপক। সেটি এখনো কতটা কার্যকর আছে এবং কত শতাংশ মানুষের কাছে কার্যকর আছে তা দেখার বিষয়।
তবে এর বিপরীতে জামায়াতের পক্ষে বেশ কিছু বয়ান তৈরী হয়েছে। যেমন
ক) সব দলের শাসন দেখা শেষ। সবাই ব্যর্থ। তাই জামায়াতকে একবার সুযোগ দেয়া উচিৎ।
খ) জামায়াতের নেতারা চাঁদাবাজি ও দূর্নীতির সাথে যুক্ত নয়। তারা প্রমাণ করেছে। তাই তাদের এবার সুযোগ দেয়া উচিৎ।
গ) ফাঁসি, নির্যাতন ও গুমের মুখেও তারা দেশত্যাগ না করে দেশপ্রেমের যে প্রমাণ দিয়েছে। তা অন্য কোনো দল দিতে পারেনি। তাই এখন ভোট তাদেররই প্রাপ্য।
ঘ) ইসলামী দলগুলোর মধ্যে জামায়াতই সবার চেয়ে এগিয়ে। তাছাড়া তারা কট্টর ইসলামপন্থী নয়। অন্যদের মদো তাই তাদের ভোট দিয়ে দেখা যেতে পারে।
ঙ) জামায়াত প্রমাণ করেছে তারা শুধু ইসলাম বিষয়ে নয়। তারা বিভিন্ন বিষয়ে রাষ্ট্র পরিচালনার জন্য দক্ষ লোক তৈরী করেছে। সূতরাং তারা পারবে দেশ চালাতে।
জোট রাজনীতি
বাংলাদেশে এককভাবে ক্ষমতায় যাওয়া কঠিন। তাই বৃহত্তর জোটে ভূমিকা রাখা জামায়াতের জন্য বাস্তবসম্মত পথ। ছোট ও মাঝারি দলগুলোকে একত্র করে তারা যদি একটি গ্রহণযোগ্য নির্বাচনী প্ল্যাটফর্ম তৈরি করতে পারে, তাহলে সরাসরি প্রথম দল না হয়েও কিংমেকার বা ক্ষমতার অংশীদার হওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়।
জামায়াত ইতোমধ্যে ১১ দলীয় জোট গঠন করেছে। যার মধ্যে অন্তত ৩টি দল রয়েছে যারা খুব একটিভ। এছাড়া ২৪ এর ফ্যাসিবাদ বিরোধী আন্দোলনের সামনে থাকা তরুনরা যে দল গঠন করেছে সে জাতীয় নাগরিক পার্টিও জামায়াত জোটের অংশ হয়েছে। ফলে জোটের রাজনীতিতে তারা সবচেয়ে সুবিধাজনক অবস্থায় রয়েছে।
তাদের বিপরীতে জাতীয়তাবাদী দল একক দল হিসেবে বাংলাদেশের সবচেয়ে শক্তিশালী না হলেও তারা সবচেয়ে জনপ্রিয় দল। কিন্তু জোটের রাজনীতি, সাম্প্রতিক সময়ের জনগনের প্রত্যাশা ও বিগত দেড় বছরে নিজেদের সংগঠন না গোছানোর কারণে তারা ব্যাকপুটে পড়ে গেছে। যা ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনের ফলাফলে প্রভাব বিস্তার করতে পারে। যদিও এই প্রভাব কাটাতে বিএনপি আওয়ামী লীগ ভোট টানার কৌশল নিয়েছে।
এখন সময় বলে দেবে আসল ফলাফল কার পক্ষে যায়।
আসন্ন নির্বাচন ২০২৬:
নির্বাচনের ফল নির্ভর করবে কয়েকটি বড় ভেরিয়েবলের ওপর তবে সম্ভাবনা যেখানে জামায়াত লাভবান হতে পারে। ইতোমধ্যে বিদেশী সংবাদ মাধ্যমগুলো ইঙ্গিত দিয়েছে জামায়াত তাদের ইতিহাসের সবচেয়ে ভাল ফল লাভ করতে যাচ্ছে। যদিও বাংলাদেশের মিডিয়া ও জরিপগুলো বেশীরভাগ বিএনপিকে এগিয়ে রাখছে। কিন্তু বাস্তবতায় বিশেষ করে সোস্যাল মিডিয়া ও বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর নির্বাচন বাংলাদেশী মিডিয়াকে সমর্থন করছেনা।
এখন ভোটারদের বড় অংশ প্রচলিত বড় দলগুলোর ওপর হতাশ থাকে, যদি তরুণ ভোটাররা “শৃঙ্খলাপূর্ণ ও আদর্শিক” বিকল্প খোঁজে, যদি জোট রাজনীতিতে তারা কৌশলগত আসন সমঝোতা করতে পারে এবং যদি সহানুভূতির ভোট ও নীরব ধর্মভিত্তিক ভোট একসঙ্গে সক্রিয় হয় তাহলে এই অবস্থায় তারা প্রধান বিরোধী দলের দৌড় থেকে সরকার গঠনের দৌড়ে রয়েছে যা বাস্তবতা হয়তো সময়ের ব্যাপার মাত্র।
কারণ ১৯৭১–সংক্রান্ত ঐতিহাসিক বিতর্ক এখনো বড় একটি মানসিক বাধা নেই। ৫৫ বছর পর মানুষ তাদের বর্তমান অবস্থানকে বড় করে দেখছে। শহুরে উদার ও মধ্যবিত্ত ভোটারের একটি অংশ তাদের নিয়ে যে সংশয় ছিল সাম্প্রতিক ঘটনাপ্রবাহ তা কেটে যাওয়ার ইঙ্গিত দেয়। আন্তর্জাতিক ও কূটনৈতিক প্রেক্ষাপটও ধর্মভিত্তিক রাজনীতির ক্ষেত্রে প্রভাব ফেলতে পারে বলে যে ভয় ছিল সেটাও আর নেই। ভারত ছাড়া সব দেশের কূটনৈতিকেরা জামায়াতের সাথে কাজ করার ব্যাপারে ইতিবাচক মনোভাব ব্যক্ত করেছে। সাংগঠনিক শক্তি সবসময় ভোটে রূপ না নিলেও এবার পরিস্থিতি তাদের পক্ষে রয়েছে কারণ তারা অবাধে ভোট চাইতে পারছে এবং ২/১টি বিচ্ছিন্ন ঘটনা বাদে তাদের নারী কর্মীরা দেশের মানুষের ঘরে ঘরে যাচ্ছে।
অতীতে নারী ভোটারগণ খালেদাজিয়াকে পছন্দ করার কারণে বিএনপিতে ভোট দিতো। তাদের একটা বড় অংশ নিজেদের নিরাপত্তার বিবেচনায় জামায়াত বেছে নিতে পারে। জামায়াত নারীদের নিরাপত্তার বিষয়টি সামনে এনে প্রচারণা চালাচ্ছে।
তবে আমার মতে, জামায়াতের পক্ষে সবচেয়ে বেশী জনমত সংগঠিত হয়েছে ২৪ এর ফ্যাসিবাদ বিরোধী আন্দোলনে ভূমিকা রাখা, বিগত দেড় বছরে সংষ্কারের পক্ষে আন্দোলন করা, সংযম এর পরিচয় দেয়া ও পরিবেশ পক্ষে আসার পর মাঠ পর্যায়ে বিশেষ করে নির্বাচনের ৬ মাস আগে থেকে ব্যাপক জনসংযোগ করা আর জোটের বিষয়টাতো আছেই। জোটের নেতারাও জামায়াতকে এসব কারণে বেছে নিয়েছে। তাদের আস্থা হলো জামায়াত জোটে গেলে তাদের বিদ্রোহী প্রার্থী তাদের জয়ের জন্য বাঁধা হবে না বরং সহযোগী হবে। যেটা বিএনপির ক্ষেত্রে কিছুটা বিপরীত।
অন্যদিকে শীর্ষে থেকেও বিএনপি পিছিয়ে পড়েছে প্রথমত সংষ্কারের বিষয়ে কিছু দ্বিমত করা, দেড় বছরে সংগঠন না গোছানো, জোট শক্তিশালী না করা, বিতর্কিত নেতাদের সামনে নিয়ে আসা, পতিতদের সহযোগিতা করা ইত্যাতি কারণে। এখন সময় বলে দেবে কোন সমীকরণ কতটা শক্তিশালী হিসেবে কাজ করছে।
