“অন্যায় সে বা ওরা করবে কেন? এটা আমার অধিকার’’ এই নীতিতে কি চলছে দেশ
বেশিরভাগ সময় কোনো বিষয়ে লিখতে গেলে আমার একটি গল্প বা কৌতুক মনে পড়ে যায়। এই বিষয় নিয়ে লিখতে গিয়েও তেমনটা হয়েছে। একটা কৌতুক ও কিছু সামাজিক ঘটনাবলি দিয়ে লেখাটা শুরু করবো।
ভিক্ষুক গেরস্থ বাড়িতে ভিক্ষা চাইতে এসেছে। সদর দরজা ভিক্ষা চাওয়ার সময় পড়ে গেছে নতুন বই সামনে। একেবারে নতুন নয়। কয়েক মাস হয়েছে ছেলে বিয়ে করেছে। তো বই ভিক্ষুককে বলে দিলো ‘‘মাফ করেন বাবা আজ ভিক্ষে দিতে পারবনা’’। কারণ গত কয়েক মাসে বউ প্রতিদিন শাশুড়িকে এই কাজ করতে দেখেছে। মানে ভিক্ষুকদের কাছে মাফ চেয়ে ভিক্ষা না দেয়ার ফন্দি করতে দেখেছে। বউ যেহেতু জানে শাশুড়ি ভিক্ষা দেবে না। এই কাজ করবে। তাই বউ নিজেই সে কাজটা করে দিয়েছে। মাফ চেয়ে ভিক্ষুককে বিদায় করেছে।
দোতলা থেকে শাশুড়ি দেখলো প্রথমে ভিক্ষুক আসলো তারপর চলে গেলো। শাশুড়ি বউকে জানতে চাইলো বউ জানালো। ভিক্ষুক রীতিমতো ভিক্ষা চেয়েছিল বটে। তবে বউ মাফ চেয়ে বিদায় দিয়েছে ভিক্ষে দিতে হয়নি।
কিন্তু ব্যাপারটা শাশুড়ি কিছুতেই মেনে নিতে পারেনি। শাশুড়ি ভিক্ষুককে আবার ডাকলো। ভিক্ষুক আসলো। তারপর বলল‘‘যাও আজ ভিক্ষে দিতে পারবনা, মাফ করো’’।
কি বুঝলেন? শাশুড়ির এমনটা করার কারণ কি? কারণ হলো শাশুড়ি বলতে চান। যে ভিক্ষা দেয়ার ব্যাপারে তুমি মাফ করার কে? এটাতো আমি করবো।
বুঝতে পারছি। বিষয়ের সাথে কৌতুকটা যাচ্ছে না। তাহলে বাস্তব কিছু বিষয়ে আসি।
দেশে এক সময় খুব প্রচলিত ছেলে পাড়ার মেয়ে পাড়ার ছেলে। অঞ্জন দত্তের ‘‘রঞ্জনা’’ গানটি শুনলে বুঝবেন। বিষয়টা কেমন? মানে এ পাড়ার মেয়ের সাথে ও পাড়ার ছেলে প্রেম করতে পারবে না। আর এ পাড়ার ছেলে করলে দাদাদের কোনো সমস্যা নেই। প্রেমকে ছোটখাটো অপরাধ বিবেচনায় এমনটা করা হতো। আর জাতি সম্প্রদায়ের ক্ষেত্রে এমন চিন্তাতো সব সময় ছিল।
একবার একটা ঘটনা শুনেছিলাম। একটি মেয়ে ভিন সম্প্রদায়ের ছেলের প্রেমে পড়েছিল। বিষয়টি তার কাকাতো ভাইয়ের কাছে ধরা পড়ে যায়। কাকাতো ভাই বিষয়টি গোপন রাখার শর্ত হিসেবে তার সাথে প্রেম করার প্রস্তাব দেয়।
না বাবা, এটাও যথাযথ উদাহরণ নয়। আসুন আমরা বাস্তব ঘটনায় আসি।
১৯৪৭ সালের আগে ব্রিট্রিশবিরোধী আন্দোলন বেগবান হয়েছিল কারণ ব্রিটিশরা আমাদের ঠকাচ্ছিল, সম্পদ লুট করছিলো, শোষন করছিলো এমন অসংখ্য অভিযোগে। তারপর আমরা পাকিস্তান তৈরী করলাম এসব নিষ্পেষন থেকে মুক্তি পেতে।
ফলাফল, দেশ শাসন করলো পশ্চিম পাড়ার বড় ভাইয়েরা। আমাদেরকে তারা দেখতো দ্বিতীয় বা তৃতীয় শ্রেণীর নাগরিকের মতো। নানা আর্থ সামাজিক অধিকার থেকে বঞ্চিত করলো। কেড়ে নিতে চাইলো ভাষা ও রাজনৈতিক অধিকার।
ব্যাপারটা হলো এসব কাজ ব্রিটিশরা করবে কেন? এটা আমরাই করবো।
যে বাঙালীরা পাকিস্তান সৃষ্টি করলো ২৪ বছরের ব্যবধানে তারা বুঝতে পারলো যে, এই পাকিস্তান সে পাকিস্তান নয় যে পাকিস্তান তারা চেয়েছিল। তারা এবার বাংলাদেশ বানালো কারণ পাকিস্তানীরা আমাদের সম্পদ লুট করছে আর কথা বললে আমাদের গুলি করে মারছে, লাশ গুম করছে।
৩০ লক্ষ কিংবা ৩ লক্ষ রক্তের বন্যা পেরিয়ে তৈরী হলো বাংলাদেশ। এবার নিজেরা নিজেদের মারা শুরু হলো। প্রথম পর্বে পাকিস্তানের দোসর হওয়ার অভিযোগে কিছু লোককে মারা হলো, উচ্ছেদও দেশত্যাগী করা হলো। জনগত ভাবলো তারপর নিশ্চই আমরা নিজেরা মিলে দেশ গড়তে পারবো।
তারপর সরকারের বিরুদ্ধে যারা কথা বলল, তারাই মামলা হামলার শিকার হলো। ৭২ থেকে ৭৫ বিরোধীদের ২ হাজার ৫শ নেতাকর্মী খুন হলো। যাদেরকে দোষর বলে মারা হলো তাদেরতো কোনো পরিসংখ্যানই নেই। তারা ২৫ হাজারও হতে পারে।
তারপর একদলীয় শাসন। সে শাসন উৎখাত। তারপর সিপাহী জনতার বিপ্লব। বহুদলীয় গণতন্ত্র। প্রেসিডেন্ট উৎখাত। সামরিক প্রধানের ক্ষমতার মসনদ। স্বৈরাচার বিরোধী অভ্যুত্থান। গণতন্ত্র পুনরুদ্ধার। গণতন্ত্র লুট। হত্যা গুম, ভোট চুরি, অর্থ পাচার । তারপর ফ্যাসিবাদ উত্থান।
জনতা কয়েকজন ছাত্র যুবকের আহবানে মাঠে নেমেছিল। কারণ তারা ১৫ বছর ভোটের অধিকার হরণ করেছে। হাজারো মানুষকে হত্যা ও গুম করেছে। লাখো বিরোধীকে জেলে পুরেছে মামলা দিয়ে নির্যাতন করেছে। সর্বশেষ ৩৬ দিনে ১৬শ মানুষকে হত্যা করেছে। যাতের ৭০% কোনো রাজনীতি করে না। তাদের মধ্যে আবার ৮% শিশু।
তাই মানুষ ফ্যাসিবাদকে বিদায় করেছে। উত্থেজিত জনতা ফ্যাসিবাদের মূল উৎপাটন করতে। সরকারী ভবন ও থানা হামলা করেছে। ফ্যাসিবাদের প্রতিনিধিদের বসতবাড়ি জ্বালিয়ে দিয়েছে এমনকি এসব জায়গায় কেউ কেউ লুটপাটও করেছে।
প্রাথমিক ভাবে যেহেতু কোনো নেতৃত্ব নেই, সাইকো আপার মতো কোনো দলের নেতা এসব করতে বলে নাই এবং নির্যাতিত মানুষের ক্ষোভ ছিল, বিচারহীনতার সংষ্কৃতি ছিল এবং পুলিশ পলাতক ছিল। তাই বিষয়টি নেতিবাচক ও নজিরবিহীন হলেও অস্বাভাবিক ছিলো না।
কিন্তু এক বছর ধরে এমনটা চলা সমর্থন যোগ্য নয়।
প্রথমত, ৬২৬ জন ব্যক্তি যারা সরকারে থেকে নানারকম অন্যায় করেছে তাদেরকে সেনানিবাসে আশ্রয় রেখে সরে যেতে সুযোগ দেয়া হয়েছে। সারাদেশে আরো কয়েক হাজার অপরাধী এভাবে পার পেয়েছে। তখন দেশ সামরিক বাহিনীর নিয়ন্ত্রণে ছিল। এই বিষয়টি যেন জনগনের মধ্যে কোনো ক্ষোভ তৈরী না করে। সেজন্য হামলা ও লুটপাট করার সুযোগ দেয়া হয়েছে। কোথাও বাঁধা দেয়ার খবর পাওয়া যায়নি। কারণ লোকজন হামলা করার মাধ্যমে নিজেদের ক্ষোভ প্রসমন করবে। আর যদি সুযোগসন্ধানীরা বা হামলাকারীরা লুটপাট করতে পারে তারা হয়তো পালিয়ে যাওয়াদের বিষয় নিয়ে কথা বলবে না। এমনকি তারা নিজেরা অপরাধবোধে ভুগলে এই বিষয়টি তারা কোনো ইস্যু বানাবে না। বাস্তবে তাই হয়েছে।
কিন্তু ১ মাস পরও বিশেষ করে সরকার গঠন ও পুলিশের কাজে ফেরার পর। দেশে লুটপাট, অগ্নি সংযোগ, চাঁদাবাজি ও দখল চলেছে।
এখন প্রশ্ন হতে পারে ১৫ বছর যখন এসব হয়েছে। তখন আপানারা কোথায় ছিলেন। সন্দেহ নেই এই প্রশ্নটি খুব যৌক্তিক। কিন্তু কিছু কথা মনে রাখতে হবে।
১৫ বছর কোনো প্রতিবাদ হয়নি। এটা ঠিক নয়। প্রত্যেকে যার যার অবস্থান থেকে প্রতিবাদ করেছে।
আবার এটাও সত্য, হত্যা, গুম ও হামলা মামলার ভয়ে যেভাবে প্রতিবাদ করা দরকার সেভাবে করতে পারেনি বা করা হয়নি।
কিন্তু ফ্যাসিবাদকে যে কারণে উৎখাত করা হয়েছে। সেটি যদি বহাল থাকে বা সে আচরণগুলোই চলতে থাকে তাহলে আমাদের রাজনীতি, সমাজ ও নিরাপত্তার ঝুঁকিতো থেকেই যাবে।
মনে রাখতে হবে, জনগত অত্যাচারির বিষয়ে চুপ থাকতে পারে। কিন্তু অত্যাচারির পক্ষ কখনো নেবে না। এবং জনগনের মোটিভ ঘুরে গেলে শত্রু এসেও আস্তানা ঘাটতে পারে।
১৯৪৭ এর দেশভাগের সময় পাকিস্তানী নেতারাই বেশী সুবিধা পাবে তা জেনেও দেশভাগ মেনে নিয়েছিল। কারণ তখন দেশ স্বাধীন করা জরুরী ছিল।
১৯৭১ এর যুদ্ধে ভারতের স্বার্থ হাসিল হবে জেনেও জনগন প্রাণ দিয়েছিল কারণ পাকিস্তান তাড়ানো জরুরী ছিল।
২০২৪ এ আওয়ামী লীগ বিদায় হলে বিএনপি ক্ষমতায় আসবে, জামায়াত সামনের সারিতে আসবে তা জেনেও সর্বস্তরের মানুষ রাস্তায় নেমেছিল। কারণ খুনি সাইকোকে বিদায় করা জরুরী ছিল।
এভাবে ভবিষ্যতে যদি কেউ সীমা লঙ্গন করে এবং সে অবস্থায় যদি জনগনের মনে হয় তাদের বিদায় করা উচিৎ। তখন জনগন রাস্তায় নামবে?
নাও নামতে পারে। কিন্তু তখন জনগন রাস্তায় নামতে হবে না। শুধু নিরব থাকলেই খুনিরা এসে ঘরে ঘরে খুনের হোলি খেলবে।
কেউ যদি এখন মনে করে, আমরা যেমন ফ্যাসিবাদীদের পালিয়ে যেতে সাহায্য করেছি। সেদিন তারা আমাদের রক্ষা করবে বা পালিয়ে যেতে দিবে বা ঘটনা ঘটার আগে আমি পালিয়ে যাব। তারপর যা হবার হবে। এখন একবার কাম সেরে নিই। তাহলে সে নিজেই নিজের কবর খুড়ছে।
বিশেষ করে ৩২ নাম্বার কি ভাঙ্গা খুব জরুরী ছিল? অনেকে এর পক্ষে যুক্তি দিতে পারেন যে, এটা থাকলে এটা কেন্দ্র করে আলীগ আবার সক্রিয় হবে এখান থেকে লোক জড়ো করে তারা ঢাকা দখল করে আবার খুনের নেশায় মানতে। এগুলো যুক্তি নয় সত্যি। কারণ তারা এবং তাদের নেত্রী এগুলো প্রকাশ্য হুমকি দিচ্ছে। তাই এগুলো কোনো ধারণা ও সন্দেহ নয়। এটাই সত্যি।
কিন্তু বিকল্প উপায়তো রয়েছে। ৩২ নাম্বারে ফুল দিতে একসাথে ৫ জনের বেশী আসতে পারবেনা। বা একটি সংগঠন থেকে শুধু একজন আসতে পারবে। এভাবেও সেটা নিয়ন্ত্রণ করা যায়।
এখন এটাও কথা আসবে। সরকারতো নিয়ন্ত্রণ বা বাঁধা দিচ্ছেনা। জুলাই যোদ্ধা ব্যতিত কোনো দলের শীর্ষ থেকে বাধা দেয়ার ঘোষনা বা নির্দেশনাও দেয়া হয়নি। যারা প্রতিহত করছে তারাতো সাধারণ জনগণ। তারা ১৭ বছর নির্যাতিত ছিল। এই মুজিবকে সাইন হিসেবে ব্যবহার করে মানুষকে হত্যা করেছে। সূতরাং মুজিববাদ, মুজিব দর্শন ও মুজিবচিহ্নে উপর মানুষের ক্ষোভতো থাকবেই।
আমি এই যুক্তি খন্ডাতে যাবো না। আমি শুধু বলতে চাই। রাষ্ট্রের দায়িত্ব দেশের সকল স্থাপনা রক্ষা করা। দেশের সকল নাগরিকের নিরাপত্তা বিধান করা এবং দেশের স্থিতিশীলতা বজায় রাখা। রাষ্ট্র সেটা করছে কিনা? যদি করে সঠিক ভাবে করছে কিনা? আর যদি না করে তাহলে ব্যাপারটা কেমন দাড়ায়।
ভারতের প্রথম রাজনৈতিক দল ছিল কংগ্রেস, সেখান থেকে ভেঙ্গে জন্ম হলো মুসলিম লীগ, সেখান থেকে আওয়ামী মুসলিম লীগ, সেখান থেকে আওয়ামী লীগ, সেখান থেকে বাকশাল, সেখান থেকে আপা লীগ এবং সর্বশেষ সাইকো লীগ।
এখন তারা যা যা করেছে তা যদি নতুনদের, বা পরবর্তীদের বা তাদের যা উৎখাত করেছে তারাও করে। তাহলে যারা জীবন দিয়েছে তাদের প্রতি অশ্রদ্ধা শুধু নয় তাদের সে ত্যাগ ব্যর্থ হতে চলেছে।
অবস্থা দেখে মনে হয়েছে, কিছু মানুষের মানসিকতা এমন অবৈধ টাকা ওরা কামাবে কেন এটা আমরাও করতে পারি। ফ্যাসিবাদ তারা হবে কেন? আমরাও হতে পারি। অত্যাচার কারো একার ক্ষমতা নয়। আমাদেরও বাহুবল আছে।
লজ্জা, হতাশা, ক্ষোভ আর দুশ্চিন্ত এবং দু:স্বপ্ন নিয়ে আমাদের প্রতিটি দিন কাটতে পারে না। হয়তো পরের রাজপথে রক্ত আমাদের ঝরবে। আর হয়তো আগের এবং পরের সকল অত্যাচারি এক যাবে। আমি সে আশংকায় আশংকিত।
এখন হয়তো সাইকো আমলের খুন, মামলার পরিসংখ্যান বের করে দেখানো যাবে যে, তাদের চেয়ে কম হচ্ছে। কিন্তু তুলনামূলক ভালোর জন্য কেউ জীবন দেয়নি। তারা কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠির বিরুদ্ভে সংগ্রাম করেনি। তারা অন্যায়ের বিরুদ্ধে সংগ্রাম করেছে।
এখন যারা একই অন্যায় করবে তারা বিতাড়িতদের দোষর হিসেবে বিবেচিত হবে। জনতা আবারো তাদের পাওনা বুঝিয়ে দেবে।
তাই রাজনৈতিক দলগুলোর উচিৎ সঠিক পথে থাকা। যারা পরিবর্তনের নেতৃত্ব দিয়েছেন তাদের উচিৎ ন্যায় ভিত্তিক সমাজ প্রতিষ্ঠার জন্য কাজ করা এবং সুযোগসন্ধানীদের পথ না দেখানো।
তা না হলে আবারো বেহাত হবে জনতার বিপ্লব। আবারো ঝরবে রক্ত।
আর কবির মতো করে বলবো- এই রক্তস্নাত কসোভো আমার দেশ না। নতুন স্লোগান নিয়ে আসবো- মবতন্ত্র নিপাত যাক। সাধারণ মানুষ মুক্তি পাক, ফ্যাসবাদের প্রেতাত্মা ভর করেছে আরেকবার, সাইকো লীগের যত রোগ ভর করেছে করলে লোপ।
লেখা: জাহাঙ্গীর আলম শোভন
ছবি : ইন্টারনেট
