দেশে দেশে অভ্যুত্থান পরবর্তী সরকার গঠন ও রাষ্ট্রপ্রধান নির্বাচন
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে প্রায় ৪৫০টি অভ্যুত্থান হয়েছে। এরমধ্যে ২শটির বেশী ছিল গণ অভ্যুত্থান। সামরিক অভ্যুত্থানগুলোতে সামরিক বাহিনীর প্রধান ক্ষমতা হস্তগত করলেও। গণঅভ্যুত্থানে সাধারণত রাষ্ট্রপতিও অপসারিত হয় এবং যারা অভ্যুত্থানে নেতৃত্ব দেয় তাদের মধ্যে থেকে রাষ্ট্র ও সরকারপ্রধান কখনো স্থায়ী কখনো অস্থায়ীভাবে নির্বাচন করা হয়।
তারা যদি টিকে যায় তারাই ঠিক করে পরবর্তী অবস্থা কি হবে। কিন্তু বাংলাদেশে ২৪ এর অভ্যুত্থানে মাঝখানে সেনাবাহিনী নিয়ন্ত্রণ পুরো ব্যাপারটা ভিন্নরকম হয়ে যায়। ভবিষ্যতে এই বিষয়ে বিশ্লেষকেরা বলবে।
এই লেখার বিষয় হচ্ছে অভ্যুত্থান পরবর্তী রাষ্ট্রপ্রধান কখনো সংবিধান অযুযায়ী নির্বাচিত হয় না। পৃথিবীর কোনো দেশে কখনো হয়নি। তাই যারা সংবিধানের দোহাই দিয়েছেন। তারা জনগনকে ধোকা দেয়ার চেষ্টা করেছেন।
আমরা জানি বাংলাদেশে একাধিকবার রাষ্ট্রপতি হত্যা করা হয়েছে। হুট করে পদত্যাগ করেছেন। সেখানে একটি সমাধন রয়েছে। এই বিষয়ে আমার আরেকটা লেখা এখানে রয়েছে। কিন্তু পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে শত শতবার এই অভ্যুত্থানের কারণে সরকার ও রাষ্ট্রপতির পতন হয়েছে তারা নিশ্চই সংবিধান সংকটনের কথা বলে যার পতন হয়েছে তাকে এনে রাষ্ট্রপতি করেনি। তাহলে তারা কি করেছে এখন সেটা আলোচনা করি।
এই বিষয়ে আমি চ্যাট জিপিটির কাছে জানতে চাওয়ার পর সে লিখেছে
অসাধারণ একটি প্রশ্ন তুলেছেন।
আমরা দেখেছি— উগান্ডা, ফিলিপাইন, তিউনিসিয়া, হাইতি, সেন্ট্রাল আফ্রিকান রিপাবলিক, মালি ও সুদানের মতো দেশগুলোতে অভ্যুত্থান বা গণ-অভ্যুত্থানের মাধ্যমে প্রেসিডেন্টদের পতন হয়েছে। এখন দেখব সেই সব দেশে কীভাবে রাতারাতি শাসনব্যবস্থা সামলানো হয়, অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গঠিত হয় বা প্রেসিডেন্ট নির্বাচন হয়। আমি দেশের ভিত্তিতে সংক্ষিপ্ত থেকে বিস্তারিত ধারাবাহিক বিবরণ দিচ্ছি-
উগান্ডা — ইদি আমিন উৎখাত (১৯৭৯)
-
ঘটনা:
তানজানিয়ার সেনাবাহিনী ও উগান্ডার বিদ্রোহীরা একত্রে ইদি আমিনকে উৎখাত করে কাম্পালা দখল করে। -
কীভাবে সরকার হলো?
-
একটি সামরিক ও রাজনৈতিক জোট গঠন হয় (Uganda National Liberation Front – UNLF)।
-
তাদের একটি সর্বদলীয় জাতীয় কমিশন থেকে ইউসুফ লুলে কে অন্তর্বর্তী রাষ্ট্রপ্রধান হিসেবে ঘোষণা করা হয়।
-
পরে সামরিক কমান্ড বারবার পরিবর্তিত হয়ে রাষ্ট্রপতি বদল হয়, স্থিতিশীলতা আনতে বহু বছর লেগে যায়।
-
-
নির্বাচনের মাধ্যমে?
-
প্রথমে সামরিক ও বিদ্রোহী নেতাদের সমঝোতা থেকে প্রেসিডেন্ট নির্বাচন হয়।
-
কোনো সরাসরি জনগণের ভোট নয়।
-
পরে ১৯৮৬ তে মুসেভেনির নেতৃত্বে স্থিতিশীল সরকার আসে।
-
ফিলিপাইন — মার্কোস উৎখাত (১৯৮৬)
-
ঘটনা:
“People Power Revolution” এ লাখো মানুষ ম্যানিলার রাস্তায় নামলে সেনাবাহিনীর বড় অংশ মার্কোসের পক্ষে থাকতে অস্বীকার করে। -
কীভাবে সরকার হলো?
-
মার্কোস হাওয়াই পালিয়ে গেলে বিদ্রোহী নেতা ও নির্বাচনে বিজয়ী দাবি করা কোরি একুইনোকে সেনাপ্রধানেরা প্রেসিডেন্ট হিসেবে সমর্থন করে।
-
রাতারাতি প্রেসিডেন্টের শপথ হয় একটি সামরিক ঘাঁটিতে।
-
-
নির্বাচনের মাধ্যমে?
-
পরবর্তী সময়ে গণতান্ত্রিক সংবিধান তৈরি করে নতুন নির্বাচন হয়।
-
তিউনিসিয়া — বেন আলী উৎখাত (২০১১)
-
ঘটনা:
আরব বসন্তের গণ-আন্দোলনে পুলিশ ও সেনা বেন আলীর প্রতি আনুগত্য ত্যাগ করে। তিনি সৌদি আরবে পালান। -
কীভাবে সরকার হলো?
-
তিউনিসিয়ার সংবিধান অনুযায়ী, রাষ্ট্রপতি চলে গেলে স্পিকার অন্তর্বর্তী প্রেসিডেন্ট হয়।
-
সংসদের স্পিকার ফুয়াদ মেবাজা অস্থায়ী প্রেসিডেন্ট হিসেবে শপথ নেন।
-
-
নির্বাচনের মাধ্যমে?
-
কয়েক মাসের মধ্যে অন্তর্বর্তীকালীন নির্বাচন হয়।
-
একটি Constituent Assembly নির্বাচন করে নতুন সংবিধান প্রণয়ন করে।
-
হাইতি — দুভালিয়ে উৎখাত (১৯৮৬)
-
ঘটনা:
গণঅভ্যুত্থান ও সেনাবাহিনীর চাপের মুখে দুভালিয়ে ফ্রান্সে পালিয়ে যান। -
কীভাবে সরকার হলো?
-
হাইতিতে একটি মিলিটারী কাউন্সিল (CNRE) রাতারাতি ক্ষমতা নেয়।
-
সেনাপ্রধানরা মিলে রাষ্ট্র পরিচালনা শুরু করে।
-
-
নির্বাচনের মাধ্যমে?
-
কয়েক দফা সামরিক-অন্তর্বর্তী সরকারের পর বহু বিক্ষোভের মাধ্যমে গণতান্ত্রিক নির্বাচন হয়।
-
সেন্ট্রাল আফ্রিকান রিপাবলিক — বোজিজে উৎখাত (২০১৩)
-
ঘটনা:
সেলেকা বিদ্রোহীরা রাজধানী দখল করে প্রেসিডেন্ট বোজিজেকে উৎখাত করে। -
কীভাবে সরকার হলো?
-
সেলেকা বিদ্রোহীরা নেতা মিশেল জোটোদিয়া কে নিজে রাষ্ট্রপতি ঘোষণা করে।
-
এতে বিশৃঙ্খলা আরও বেড়ে যায়, পরে আফ্রিকান ইউনিয়ন মধ্যস্থতায় অন্তর্বর্তীকালীন রাষ্ট্রপতি বসানো হয়।
-
-
নির্বাচনের মাধ্যমে?
-
অনেক সংঘাতের পর ২০১৬-তে গণভোটে নতুন সংবিধান ও নির্বাচন হয়।
-
মালি — ইব্রাহিম কিতা উৎখাত (২০২০)
-
ঘটনা:
গণবিক্ষোভের পরে সেনাবাহিনী প্রেসিডেন্ট প্রাসাদ ঘিরে ফেলে, প্রেসিডেন্ট কিতাকে পদত্যাগে বাধ্য করে। -
কীভাবে সরকার হলো?
-
সেনাবাহিনীর “জাতীয় কমিটি ফর দ্য স্যালভেশন অফ দ্য পিপল” (CNSP) রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা নেয়।
-
পরে আন্তর্জাতিক চাপের মুখে একটি বেসামরিক অন্তর্বর্তী প্রেসিডেন্ট বসানো হয় (বাহ এনডাউ), সেনা প্রভাবিত অবস্থাতেই।
-
-
নির্বাচনের মাধ্যমে?
-
পরিকল্পনা করা হয় অন্তর্বর্তী সরকারের অধীনে নির্বাচন।
-
সুদান — ওমর আল বাশির উৎখাত (২০১৯)
-
ঘটনা:
মাসব্যাপী গণবিক্ষোভের পর সেনাবাহিনী আল বাশিরকে গ্রেফতার করে ক্ষমতাচ্যুত করে। -
কীভাবে সরকার হলো?
-
ট্রানজিশনাল মিলিটারি কাউন্সিল (TMC) প্রথমে রাষ্ট্রের শাসন নেয়।
-
পরে বেসামরিক গ্রুপের সাথে সমঝোতা করে সেনা+সিভিল মিলে একটি Sovereign Council গঠন করে।
-
-
নির্বাচনের মাধ্যমে?
-
পরিকল্পনা হয় ধাপে ধাপে অন্তর্বর্তী সরকার শেষ করে গণতান্ত্রিক নির্বাচন।
-
ইরান — শাহের পতন (১৯৭৯)
কীভাবে সরকার সামলানো হলো:
-
১৯৭৯ সালের ইসলামিক বিপ্লবে (Iranian Revolution) শাহ মোহাম্মদ রেজা পাহলভি দেশ ছাড়েন।
-
কিছুদিন একটি প্রভিশনাল গভর্নমেন্ট (মেহদি বাজারগান) চলে, পরে আয়াতুল্লাহ খোমেনির নেতৃত্বে ইসলামিক রিপাবলিক ঘোষণা হয়।
পরবর্তী নির্বাচন:
-
বিপ্লবের পর শতাধিক রাজনৈতিক দল ও গোষ্ঠীকে নিষিদ্ধ করা হয়।
-
একটি নতুন ইসলামিক সংবিধান গণভোটে অনুমোদিত হয়।
কত বছর পর স্থিতিশীলতা আসে:
-
আনুমানিক ২-৩ বছরের মধ্যে ধর্মীয় শাসন দৃঢ়ভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়, কিন্তু রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা বলার মতো নয় কারণ পরে ইরাক যুদ্ধ শুরু হয়।
-
দীর্ঘমেয়াদে একদলীয় ধর্মীয় শাসন স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করে, কিন্তু গণতান্ত্রিক মানদণ্ডে নয়।
আর্জেন্টিনা — সামরিক জান্তা পতন (১৯৮৩)
কীভাবে সরকার সামলানো হলো:
-
১৯৭৬ থেকে ১৯৮৩ পর্যন্ত আর্জেন্টিনায় সামরিক শাসন চলতে থাকে (প্রায় ৩০,০০০ মানুষ গুম বা হত্যা)।
-
ফকল্যান্ড যুদ্ধের ব্যর্থতার পর সামরিক জান্তা পদত্যাগ করে।
-
নতুন বেসামরিক অন্তর্বর্তী প্রশাসন গঠন হয়।
পরবর্তী নির্বাচন:
-
১৯৮৩ সালের শেষেই জাতীয় নির্বাচন হয়।
-
রাউল আলফনসিন প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন।
কত বছর পর স্থিতিশীলতা আসে:
-
আনুমানিক ৩-৫ বছরে গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলো স্থিরভাবে দাঁড়ায়।
শ্রীলংকা — রাজাপাকসের সরকার পতন (২০২২)
কীভাবে সরকার সামলানো হলো:
-
অর্থনৈতিক সংকট ও গণ-অভ্যুত্থানমুখী আন্দোলনের মুখে গোটাবায়া রাজাপাকসে দেশ ছাড়েন।
-
স্পিকার অন্তর্বর্তী প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব নেন, পরে পার্লামেন্টে ভোটে রনিল বিক্রমাসিংহে প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন।
পরবর্তী নির্বাচন:
-
এটি পূর্ণ প্রথাগত নির্বাচনের মাধ্যমে নয়, পার্লামেন্টের ভোটের মাধ্যমে রাষ্ট্রপতি ঠিক করা হয়।
-
পরবর্তী সাধারণ নির্বাচন এখনও বাকি।
কত বছর পর স্থিতিশীলতা আসে:
-
এখনো অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিকভাবে অনেকটাই নড়বড়ে।
-
আনুমানিক ২-৩ বছরের মধ্যে কিছুটা স্থির হয়েছে, কিন্তু গণরোষ ও পুনর্গঠন অব্যাহত।
অভ্যুত্থানের পর রাতারাতি শাসন ব্যবস্থা ও স্থিতিশীলতা
| দেশ | কিভাবে সরকার সামলানো হলো | পরবর্তী নির্বাচন | কত বছর পর মোটামুটি স্থিতিশীলতা আসে |
|---|---|---|---|
| উগান্ডা | সামরিক ও বিদ্রোহী জোট (UNLF) | ১-২ বছর পর নির্বাচন পরিকল্পন |
