July

জুলাই জাতীয় সনদ ও সংবিধান সংষ্কার প্রসঙ্গ

জুলাই জাতীয় সনদ ও সংবিধান সংষ্কার প্রসঙ্গ

যারা সংসদে বা সংসদের বাইরে বলছেন: গণভোটের ও জুলাই আদেশের ভিত্তি কি? তাহলে প্রশ্ন: সংস্কার কমিশনের ভিত্তি কি? বাংলাদেশের রাষ্ট্র সংস্কারের লক্ষ্যে প্রধান ছয়টি কমিশন ৩/১০/২৪ ইং তারিখ গঠিত হয়। সংবিধান সংস্কার কমিশন ৮/১০/২৪ এ পূর্ণাঙ্গ রূপ পায়। পরবর্তীতে আরও ৫টি সহ মোট ১১টি সংস্কার কমিশন গঠিত হয়। প্রত্যেকটি গেজেটে বলা আছে “ডক্টর মুহাম্মদ ইউনূসের” অনুমোদনক্রমে। মানে জনগণের ইচ্ছায় গঠিত সরকারের প্রধানের নিরঙ্কুশ এক্তিয়ার জনগণ মেনে নিয়েছে। জনগণের সার্বভৌম ক্ষমতার প্রয়োগে সরকার প্রতিষ্ঠিত হয়েছে এবং এসব আইনি দলিল জনগণের আকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন। জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে ঐ সরকার স্বীকৃতি পেয়েছে।

ঐক্যমত্য কমিশনের ভিত্তি: অন্তর্বর্তীকালীন সরকার কর্তৃক গঠিত ৭ সদস্যের জাতীয় ঐক্যমত্য কমিশন আনুষ্ঠানিকভাবে ১৩/২/২৫ ইং তারিখে গঠিত হয়। এটি ছয়টি সংস্কার কমিশনের সুপারিশ পর্যালোচনা করেন। এর সভাপতি ছিলেন ড. মুহাম্মদ ইউনূস।

প্রথম পর্যায়ে ২০ মার্চ – ১৯ মে ২০২৫ কমিশন ৩২টি রাজনৈতিক দল ও জোটের সাথে ৪৪টি সভা করে। দ্বিতীয় পর্যায়ে ৩ জুন – ৩ জুলাই ২০২৫ পর্যন্ত সংবিধান সংস্কারের ২০টি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ের উপর ৩০টি রাজনৈতিক দল ও জোটের সাথে আরও ২৩টি সভা অনুষ্ঠিত হয়। এই ব্যাপক আলোচনার মাধ্যমেই জুলাই জাতীয় সনদ (সংবিধান সংস্কার) বাস্তবায়ন আদেশ, ২০২৫ চূড়ান্ত করা হয়। সুতরাং এটির বাধ্যকর শক্তি রয়েছে।

 বিকল্প কি হতে পারে:

জাতীয় ঐক্যমত্য কমিশন রাজনৈতিক দলগুলোর সাথে দীর্ঘ সংলাপের পর ৪৮টি প্রস্তাব সম্বলিত একটি চূড়ান্ত ভাষ্যের সনদ তৈরি করেছে। দীর্ঘপথ পরিক্রমায় যে সনদ তৈরি হল তা মূলত একটি রাজনৈতিক মীমাংসার ঐতিহাসিক দলিল। জনগণের ইচ্ছার একটি সমন্বিত প্রতিফলন এ সনদ। গণঅভ্যুত্থানের যে সরকার রাষ্ট্র শাসন করছে সে সরকারের আয়োজনে এ সনদ তৈরি হয়েছে। এর রাজনৈতিক ও নৈতিক ভিত্তি হল জনগণের অভিপ্রায় (General Will of the People)। তথাপি এ সনদ যেহেতু ইতিপূর্বে ঘটে যাওয়া অনেকগুলো সাংবিধানিক ও অসাংবিধানিক (Extra-Constitutional) কর্মকাণ্ডের স্বীকৃতির কথা বলছে, রাষ্ট্র সংস্কারের নানাবিধ প্রতিশ্রুতির কথা বলছে এবং সর্বোপরি সংবিধানের বেশ কিছু মৌলিক জায়গায় সংস্কারের বিষয়ে আলোকপাত করেছে সেহেতু এর অধিকতর গ্রহণযোগ্যতার জন্য একটি আইনি ভিত্তির কথা বলা হয়েছিল রাজনৈতিক দলসমূহ থেকে।

 কোন প্রেক্ষাপটে জুলাই জাতীয় সনদ (সংবিধান সংস্কার) বাস্তবায়ন আদেশ, ২০২৫ প্রণীত হয়:

জুলাই সনদ রাজনৈতিক ও নৈতিক ভিত্তি পেয়েই আছে। ভিন্নমত আছে এর আইনি ভিত্তি রচনার ব্যাপারে। যেহেতু ৫ আগস্ট কোন বিপ্লবী সরকার গঠিত হয়নি, ৮ আগস্টেও কোন proclamation বা declaration গ্রহণ করা হয়নি, তাই দীর্ঘ পথ পরিক্রমায় সরকার যে সমস্ত কার্যক্রম পরিচালনা করেছে, আইন-কানুন রচনা করেছে, কিছু সংস্কার করেছে ও আরো সংস্কারের লক্ষ্যে কর্মসূচি গ্রহণ করেছে সেহেতু সবগুলো বিষয় একটি আইনি দলিলে বিধৃত করে ভবিষ্যতের পথরেখা বুননের পরামর্শ এসেছিল। রাজনৈতিকবোদ্ধা, সংবিধান ও আইন বিশেষজ্ঞদের কাছ থেকে। বলা হয়েছে, রাষ্ট্রপতির অধ্যাদেশের মাধ্যমে একটি বিশেষ সাংবিধানিক আদেশ (Special Constitutional Order) জারি করে জুলাই সনদকে আইনি কাঠামোয় আনার। তবে যেহেতু অধ্যাদেশের মাধ্যমে সাংবিধানিক বিষয়ে পরিবর্তন আনা যায় না (অনুচ্ছেদ ৯৩ এর বিধান), সেহেতু রাষ্ট্রপতির একটি সাধারণ আদেশ (Order) বলে প্রজ্ঞাপন জারি করে পুরো জুলাই সনদকে আপাতত আইনি কাঠামোয় নিয়ে আসা হয়েছে। সংবিধানের ১৫২ অনুচ্ছেদে আইনের যে সংজ্ঞা দেওয়া হয়েছে তাতে “আদেশ”ও একটি আইন। তাছাড়া সনদ ও আদেশ যখন গণভোটে পাশ হয়েছে তা সর্বোচ্চ আইন (বিচারপতি আব্দুল মতিন)।

জুলাই সনদের আইনি ভিত্তি দেওয়ার জন্য গণভোটের (Referendum) আয়োজন এর প্রস্তাব এসেছিল। এটি গ্রহণযোগ্য বলে বিশেষজ্ঞগণ মতামত দিয়েছিলেন। আমরা মতামত দিয়েছিলাম, ভিন্নমত (dissent) সংযুক্তকরণ ছাড়াই গণভোটের প্রস্তাবনা তৈরি করার। ‘রাষ্ট্রপতির আদেশ’ মূলে এ সনদকে আইনি শক্তি প্রদানের যে কথা বলা হয়েছে সে আদেশেই গণভোটের বিধান যুক্ত করা হয়। একই দিনে গণভোট ও সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠানের যে প্রস্তাবনা এসেছিল এবং বিএনপিসহ কয়েকটি দল তাতে যে অনড় ছিল, এখন মনে হচ্ছে, তাতে সরকারের সম্মতি প্রদান একেবারেই ভুল ছিল। বিএনপি যেহেতু একটি বৃহৎ রাজনৈতিক দল, তাদের মতামতকে প্রাধান্য দেওয়া সরকার সেসময় সমীচীন মনে করেছিল। তবে বর্তমানে দৃশ্যমান রাজনৈতিক অসততা ও নৈতিক পদস্খলন দেখে মনে হচ্ছে, নির্বাচনের আগে গণভোট অনুষ্ঠান করাই ভালো ছিল। তাতে বর্তমানে গণভোটে উত্তীর্ণ প্রতিপাদ্য বিষয়ে সরকার গঠনকারী রাজনৈতিক দলের অনীহা এবং অনাগ্রহ প্রকাশ করার হয়তোবা তেমন সুযোগ থাকতো না। রাজনৈতিক প্ল্যাটফর্মের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশের U-Turn করা হয়তো কঠিন হতো।

জুলাই আদেশ বর্তমান সরকার/সংসদের উপর বাধ্যতামূলক কিনা:

(ক) যেহেতু জুলাই জাতীয় সনদে এমন অনেক বিষয় আছে যা সংবিধানের মৌলিক কাঠামোর সাথে সম্পৃক্ত তাই তার বাস্তবায়নের জন্য সর্বোৎকৃষ্ট পথ হল গণপরিষদ গঠন (Constituent Assembly)। উল্লেখ্য, এটা সাংবিধানিক আইনের প্রতিষ্ঠিত নীতি যে, ব্রিটেনের মতো যুক্তরাজ্য, ভারত, বাংলাদেশে সংসদের সার্বভৌম ক্ষমতা নেই (যেহেতু এসব দেশে সংসদের কর্তৃত্বের উপর সাংবিধানিক ও আদালতের কর্তৃত্বের প্রাধান্য রয়েছে) সেহেতু আমাদের সংসদ সকল ক্ষেত্রে নিরঙ্কুশ ক্ষমতা বা এক্তিয়ার ভোগ করতে পারে না। আইন প্রণয়ন ক্ষমতাও চূড়ান্ত নয়। আইন প্রণয়ন, সংবিধান সংশোধন, পরিবর্তন, পরিবর্ধনের ক্ষমতা সংবিধান এবং সুপ্রিম কোর্টের অধীন। (Ours is a limited government, a government whose powers, functions and jurisdictions are limited by the authority of the Constitution and the Apex Court.) সুতরাং চলমান সংসদে যে বিতর্কে জুলাই আদেশের আইনি ভিত্তি নেই কিংবা একটি সংসদীয় কমিটি গঠন করে সংবিধান সংশোধনের যে প্রস্তাব এসেছে তার কোন সারবত্তা নেই। এসব চর্চা ১৭ মাস ধরে রাজনৈতিক দলসমূহ করেছে। কমিশনের সদস্যগণ ও বিশেষজ্ঞগণ করেছেন। দীর্ঘ পথ পাড়িয়ে আবার শূন্য থেকে শুরু করা বোকামি। বরং জুলাই আদেশ হল জনগণের সার্বভৌম ক্ষমতার বলে প্রতিষ্ঠিত একটি সরকার ও রাজনৈতিক দলসমূহের ঐক্যমত্যের ভিত্তিতে বা সম্মতির ভিত্তিতে রচিত বোঝাপড়ার শক্ত একটি আইনী দলিল। ন্যায়বিচার, সুশাসন নিশ্চিত করার জন্য এবং শক্তিশালী সাংবিধানিকতাবাদ (constitutionalism) প্রতিষ্ঠিত করার জন্য সংবিধানের মৌলিক কিছু সংস্কারের ব্যাপারে জুলাই সনদে ঐক্যমত্য প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। সেগুলো বাস্তবায়নের পথরেখা চিহ্নিতকরণে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে কোথাও কোথাও মতানৈক্যের সৃষ্টি হয়েছিল। অতঃপর রাজনৈতিক দলগুলোর ঐক্যমত্যের ভিত্তিতে ঐক্যমত্য কমিশন এর প্রচেষ্টায় এবং সংবিধান, আইন ও রাষ্ট্রনীতি বিজ্ঞানে অভিজ্ঞ রাষ্ট্রের অভিভাবকদের মতামতের আলোকে জুলাই আদেশে সরকার জুলাই সনদ, রাষ্ট্র বা সংবিধান সংস্কার এর একটি বিস্তারিত পথরেখা অঙ্কিত হয়েছে। এ পথরেখা নিজেই একটি মজবুত আইন।

(খ) অনুচ্ছেদ ১৫২ এর সংজ্ঞায় lawful authority এর “যে কোন আদেশ” (any order) আইনের মর্যাদা পাবে। জুলাই সনদ বাস্তবায়ন আদেশটি আইনের মর্যাদা পেয়েছে সংবিধানের ১৫২ অনুচ্ছেদের সংজ্ঞা অনুযায়ী এবং জনগণের সার্বভৌম ক্ষমতায় গঠিত সরকারের বৈধ কর্তৃত্বের কারণে। ট্রেজারি থেকে বলা হয়েছে, ৪র্থ তফসিলের আদেশ শুধু আইন, এটি misconceived idea, মূলত সাংবিধানিক বা আইনের দ্বারা সৃষ্ট কর্তৃপক্ষের আদেশ, সার্কুলার, বিধি ইত্যাদিও আইনের ন্যায় মর্যাদা পায়; আইনের একটা প্রতিষ্ঠিত ধারণা।

(গ) জুলাই আদেশ – আইন না হলে rightly/wrongly রিট পিটিশন দায়ের করে এ আইনের সাংবিধানিক বৈধতা চ্যালেঞ্জ করা হয়েছে কেন? একটা আইনের সাংবিধানিক বৈধতা চ্যালেঞ্জ করতে হলে আইনটিকে impugn করতে হয়, জুলাই সনদ আদেশের আইনগত কর্তৃত্ব আছে বলেই এর সাংবিধানিক বৈধতা আছে কিনা পরীক্ষা করবার জন্য হাইকোর্ট রুল ইস্যু করেছেন। রুল নেওয়ার জন্য prima facie satisfaction লাগে ‘এটা আইন কিনা’ তার উপর, এরপর কোর্টকে সন্তুষ্ট হতে হয় whether this is a good law or bad law, এরপর দেখতে হয় সংবিধানের ৩য় অনুচ্ছেদের মৌলিক অধিকার পরিপন্থী কিনা, তারপর দেখতে হয় সংবিধানের অন্য কোন মৌলিক বিধানের সাথে বা কোন নধধরমপ ওংংঁব এর সাথে সাংঘর্ষিক কিনা। রুল ইস্যু করা হয়েছে মানে এ আইনের / আদেশটির কার্যকারিতা স্থগিত হয়নি, রহিত হয়নি, বরং রুলটি এবসলিউট না হওয়া পর্যন্ত ধরে নিতে হয় এর সাংবিধানিক বৈধতা আছে [presumption of Constitutional validity of a law is very much there; thus this Parliament, the Government and the Opposition all are bound to follow this Order/i.e. the Law in question;]

[যদিও আমরা মনে করি হাইকোর্ট বিভাগে একটা একান্ত পলিটিক্যাল কোয়েশ্চন নিয়ে যাওয়া ঠিক হয়নি এবং রাজনৈতিক ভাবে যা মীমাংসিত হয়েছে তা সাংবিধানিক আদালতে মীমাংসার উদ্যোগটাই misconceived]

(ঘ) সংসদকে দ্বৈত ক্ষমতা প্রদানের কথা আমরা বলে আসছি। প্রথমে সেটি গণপরিষদ (সংবিধান সংস্কার পরিষদ) হিসেবে সাংবিধানিক মৌলিক সংস্কারের বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেবে। তবে সে বিশাল কর্মযজ্ঞ শুরুর আগে এ সরকারের সময়ে প্রণীত আইনগুলোকে অনুমোদন করে নেবে। অতঃপর গণপরিষদের ক্ষমতা প্রয়োগ করে সাংবিধানিক বিষয়ে বিতর্ক সভা চলবে। সাংবিধানিক পরিবর্তন, পরিবর্ধন, সংস্কারের কাজ শেষ করবে। সংবিধানে সংস্কার আনার প্রতিশ্রুতি বি.এন.পি’র ৩১ দফার ১ম দফা ছিল। যেহেতু দীর্ঘ সময় ধরে সংলাপ হয়েছে, সনদ ও সাংবিধানিক সংস্কার কমিশনের প্রতিবেদন ইত্যাদি সংবিধান সংস্কার পরিষদ সদস্যদের সামনেই থাকবে সেহেতু সাংবিধানিক পরিবর্তনের বিষয়াদিতে এত বেশি সময়ের দরকার হবে না-এটাই আমরা মনে করি। অতএব সেভাবে জুলাই আদেশ হল। গণভোট অধ্যাদেশ হল। অতঃপর তাতে সকল রাজনৈতিক দল প্রত্যক্ষ/পরোক্ষ/সসুস্পষ্ট/মৌন সম্মতি দিয়ে সেসব দলিলের মৌলিক, আইনী ও নৈতিক ভিত্তি সুদৃঢ় করল। এখন নতুন সংকট সৃষ্টির কোন যৌক্তিক কারণ নেই। এটি জাতির জন্য দুর্ভাগ্য বটে।

 নতুন চ্যালেঞ্জ, নতুন শঙ্কা:

(অ) অন্তর্বর্তী সরকারের ১৮ মাসে জারি করা ১৩০টি অধ্যাদেশ পর্যালোচনা করেছে জাতীয় সংসদের বিশেষ কমিটি। ১৮টি বিল আকারে উত্থাপনের সুপারিশ করে, ১৫টির ক্ষেত্রে সংশোধিত আকারে বিল উত্থাপিত হয়, বাকি ২০টির মধ্যে ৪টি বাতিল ও ১৬টি এখনই বিল আকারে না তোলার সুপারিশ করা হয়েছে এবং সংসদ তা-ই করেছে। ঐ ২০টি অধ্যাদেশ কার্যকারিতা হারিয়েছে। রাজস্ব খাত এর সংস্কার অধ্যাদেশটিও বাতিল করা হয়েছে। কারণ একেবারেই ঠুনকো। গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার অধ্যাদেশ [“গুম অধ্যাদেশ”] বাতিলের কোন গ্রহণযোগ্য কারণ নেই। সংসদে গুম অধ্যাদেশটি গৃহীত না হবার পেছনে যে কারণ দাঁড় করানো হয়েছে তা সচেতন মহলে গ্রহণযোগ্য হয়নি। এ নিয়ে তুমুল বিতর্ক ও সমালোচনা চলমান রয়েছে।

মাসের পর মাস চিন্তা গবেষণা আলোচনা পর্যালোচনা করে যে মৌলিক আইন বা অধ্যাদেশ গুলো প্রণীত হয়েছিল গত ১৮ মাসে তাতে রাষ্ট্রে মৌলিক সংস্কারের কিছু আশার সঞ্চার হয়েছিল। সেখানে একটি সংসদীয় কমিটি দুই সপ্তাহেরও কম সময়ে কোন গণশুনানি না করে রাষ্ট্রের অভিভাবক, সিভিল সোসাইটি, বিশেষজ্ঞ, স্টেকহোল্ডারদের না শুনে সংসদে পর্যাপ্ত সময় না দিয়ে জনমত যাচাই বাছাই না করে কণ্ঠভোটে যান্ত্রিকভাবে মৌলিক সংস্কারের অধ্যাদেশগুলো রদ করে জাতির দীর্ঘ দিনের প্রত্যাশা, আকাঙ্ক্ষা ও স্বপ্নের সাথে অবিচার করেছে বলে আমরা মনে করি।

 নাগরিক সমাজের দায়:

যে সমস্ত প্রতিশ্রুতি জুলাই সনদে লিপিবদ্ধ করা হয়েছে এবং তা বাস্তবায়নের যে পথরেখা জুলাই আদেশ ২০২৫ এ অঙ্কিত হয়েছে এবং যে গণভোটে ৭০% জনগোষ্ঠী সম্মতি দিয়েছে তার সবটাই পরিপালনের দিকে সংসদ ও সরকারকে আসতে হবে, এটি আজকের সচেতন নাগরিক সমাজ (civil society) এর দাবী। এ লক্ষ্যে ইতোমধ্যে রাষ্ট্রের বুদ্ধিজীবী, পেশাজীবী, ছাত্রসমাজ ও নাগরিক সমাজের নেতৃবৃন্দ বেশ সোচ্চার হয়েছেন। এ ধারা অব্যাহত রাখতে হবে। একটি পরিচ্ছন্ন রাষ্ট্রকল্পের আকাঙ্ক্ষায় যে ঐক্যমত্য প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল নির্বাচনের আগে তাতে ইচ্ছায় অনিচ্ছায় যে ক্ষত সৃষ্টি করা হয়েছে তা দ্রুত না শুকালে জাতি পথ হারাবে। জুলাই আদেশের আলোকে শপথ না নেওয়া বেআইনী, ১৮০ দিনের জন্য ‘সংবিধান সংস্কার পরিষদ’ গঠন না করা আইনের লঙ্ঘন। চলমান সংসদের পুরো কার্যধারা (proceedings) সাংবিধানিক, রাজনৈতিক ও নৈতিক চ্যালেঞ্জ এর মুখোমুখি হবে, ইতিমধ্যেই সংসদ নৈতিকতার মানদণ্ডে পিছিয়ে পড়েছে। অন্তর্বর্তী সরকারের গঠন, যাত্রা, সংস্কার কমিশনের কাজ ইতিমধ্যেই বাস্তবায়িত রাষ্ট্রের বিভিন্ন পর্যায়ে সংস্কার, নির্বাচন, সংসদ গঠন, ‘সংবিধান সংস্কার পরিষদ’ গঠন, গণভোট, জুলাই আদেশ, উচ্চ কক্ষ গঠন করে পূর্ণ ৫ বছর সংসদের উভয় কক্ষ কার্যকর থাকা; এসবই অবিচ্ছেদ্য, inextricably connected with each other, একটাকে বাদ দিয়ে আরেকটা হবে না- তার চেষ্টা করাও রাজনৈতিক বন্ধ্যাত্ব ছাড়া আর কিছু নয়।

বাতিল করা অধ্যাদেশের মধ্যে রয়েছে ‘সুপ্রিম কোর্টের বিচারক নিয়োগ অধ্যাদেশ-২০২৫’ এবং ‘সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় অধ্যাদেশ, ২০২৫’, দুর্নীতি দমন কমিশন অধ্যাদেশ, গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার অধ্যাদেশ ইত্যাদি।

বিচার বিভাগ সংক্রান্ত অধ্যাদেশ দুটি পাশ হলে জাতির দীর্ঘদিনের প্রত্যাশা বিচার বিভাগ পৃথকীকরণের ৫৪ বছরের আকাঙ্ক্ষা (সংবিধানের ২২ অনুচ্ছেদ, মাজদার হোসেন মামলার রায়ের নির্দেশনা ইত্যাদি) পুরোপুরি বাস্তবায়ন করা যেত। এ দুটি অধ্যাদেশ আইনে রূপান্তরিত হলে সারাদেশের অধস্তন আদালতের নিয়ন্ত্রণ সুপ্রিম কোর্টের হাতে ন্যস্ত হতো যেভাবে ৭২ এর সংবিধানে ছিল এবং সুপ্রিম কোর্ট এর বিচারক নিয়োগেও সরকারের প্রভাব থাকত না। অন্তর্বর্তী সরকার জাতির সেই আকাঙ্ক্ষা থেকেই উক্