খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ ও গ্রামীণ কর্মসংস্থানে বাংলাদেশ ব্যাংকের ঐতিহাসিক উদ্যোগ: গঠিত হলো ১০,০০০ কোটি টাকার আবর্তনযোগ্য পুনঃ অর্থায়ন স্কিম
নিজস্ব প্রতিবেদক
ঢাকা | তারিখ: ২৫ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ / ০৮ জুন ২০২৬ খ্রিষ্টাব্দ
সূত্র: এসিডি সার্কুলার নং-০১, কৃষি ঋণ বিভাগ-১, বাংলাদেশ ব্যাংক।
দেশের খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ, সামগ্রিক কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধি এবং পল্লী অঞ্চলে ব্যাপক অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে কর্মসংস্থান সৃষ্টির লক্ষ্যে ১০,০০০ কোটি টাকার একটি বিশাল ‘পুনঃ অর্থায়ন স্কিম’ গঠন করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। সম্পূর্ণ নিজস্ব তহবিল থেকে গঠিত ৫ বছর মেয়াদি এই স্কিমটি একটি আবর্তনযোগ্য (Revolving) তহবিল হিসেবে পরিচালিত হবে। দেশের ব্যাংক কোম্পানি আইন, ১৯৯১ এর ৪৫ ধারায় প্রদত্ত ক্ষমতাবলে বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ের কৃষি ঋণ বিভাগ-১ থেকে আজ ০৮ জুন ২০২৬ তারিখে এই সংক্রান্ত একটি বিস্তারিত পরিচালন নীতিমালা ও সার্কুলার জারি করে বাংলাদেশে কার্যরত সকল তফসিলি ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তাদের নিকট পাঠানো হয়েছে।
পটভূমি ও মূল উদ্দেশ্য
বাংলাদেশ ব্যাংকের সার্কুলার অনুযায়ী, দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি অর্জন, দারিদ্র্য বিমোচন এবং গ্রাম বাংলার মানুষের জীবনমানের টেকসই উন্নয়নে কৃষি খাত প্রধান চালিকাশক্তি হিসেবে কাজ করছে। বিশেষ করে বৈশ্বিক পরিবেশ বিপর্যয় এবং জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাব মোকাবেলাতেও কৃষির ভূমিকা অপরিসীম। দেশের ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যার খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে একদিকে যেমন কৃষির উৎপাদন বৃদ্ধি করা প্রয়োজন, অন্যদিকে পল্লী অঞ্চলে আয়-উৎসারী কর্মকাণ্ড সম্প্রসারণের মাধ্যমে কর্মসংস্থান সৃষ্টি করা জরুরি। এই প্রেক্ষাপট বিবেচনা করেই বাংলাদেশ ব্যাংক এই ঐতিহাসিক তহবিলটি গঠনের সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
তহবিলের মূল কাঠামো ও প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থাপনা
এই পুনঃ অর্থায়ন স্কিমটি সুনির্দিষ্ট কিছু প্রাতিষ্ঠানিক নীতিমালার অধীনে পরিচালিত হবে:
১. স্কিমের অফিশিয়াল নাম: ‘দেশের খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণে কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধি এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টির লক্ষ্যে কৃষি ও পল্লী খাতের জন্য পুনঃ অর্থায়ন স্কিম’।
২. মোট তহবিল ও উৎস: বাংলাদেশ ব্যাংকের নিজস্ব তহবিল হতে মোট ১০,০০০ (দশ হাজার) কোটি টাকা যোগান দেওয়া হবে।
৩. মেয়াদ ও প্রকৃতি: স্কিমটির মেয়াদ হবে মোট ০৫ (পাঁচ) বছর। এটি একটি আবর্তনযোগ্য (Revolving) তহবিল, যার অর্থ আদায়কৃত টাকা পুনরায় এই খাতেই বিনিয়োগ করা যাবে এবং স্কিমের মেয়াদ শেষ না হওয়া পর্যন্ত এই অর্থ সম্পূর্ণ আলাদা একটি হিসাবে সংরক্ষিত থাকবে।
৪. পরিচালনা কর্তৃপক্ষ: বাংলাদেশ ব্যাংক প্রধান কার্যালয়ের ‘কৃষি ঋণ বিভাগ-২’ এই স্কিমটি পরিচালনা ও তদারকি করবে এবং প্রয়োজনীয় শর্ত/বিধি জারির অধিকার রাখবে। তবে অংশগ্রহণকারী তফসিলি ব্যাংকসমূহ তাদের প্রধান কার্যালয় বা প্রিন্সিপাল অফিসের মাধ্যমে তহবিল গ্রহণ এবং পরিশোধের কার্যক্রম সম্পাদন করবে।
৫. লক্ষ্যমাত্রা প্রদর্শন: ব্যাংকসমূহ এই স্কিমের আওতায় বিতরণকৃত কৃষি ও পল্লী ঋণকে তাদের বার্ষিক কৃষি ও পল্লী ঋণ বিতরণের নিয়মিত লক্ষ্যমাত্রার অংশ হিসেবে প্রদর্শন করতে পারবে।
ঋণ চুক্তি ও ব্যাংকগুলোর জন্য তহবিল বরাদ্দ প্রক্রিয়া
কৃষি ও পল্লী ঋণ নীতিমালার আওতাভুক্ত সকল তফসিলি ব্যাংক বাংলাদেশ ব্যাংকের কৃষি ঋণ বিভাগ-২ এর সাথে একটি ‘অংশগ্রহণ চুক্তি’ (Participation Agreement) সম্পাদন করে এই সুবিধা নিতে পারবে। সার্কুলার জারির ১ (এক) মাসের মধ্যে এই চুক্তি সম্পন্ন করার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। ব্যাংকগুলোর বার্ষিক কৃষি ঋণ বিতরণের লক্ষ্যমাত্রা অর্জন (Performance), চাহিদা এবং ঋণ বিতরণের সক্ষমতার ওপর ভিত্তি করে কৃষি ঋণ বিভাগ-২ তহবিল বরাদ্দ করবে এবং প্রয়োজনে তা পুনঃনির্ধারণ করতে পারবে। গ্রাহক পর্যায়ে ঋণ বিতরণের পর ব্যাংকগুলো প্রতি মাসের ১৫ তারিখের মধ্যে নির্ধারিত ছকে (সংযুক্ত ছক-১) পুনঃ অর্থায়নের আবেদনপত্র দাখিল করবে। বিশেষ কারণে উল্লিখিত সময়ে ব্যর্থ হলে বিলম্বের কারণ উল্লেখপূর্বক সর্বোচ্চ পরবর্তী ২ মাসের মধ্যে আবেদন করতে হবে, অন্যথায় উক্ত ঋণ পুনঃ অর্থায়নের জন্য বিবেচিত হবে না।
কৃষক পর্যায়ে ঋণ বিতরণ ও নমনীয় জামানত নীতিমালা
প্রকৃত প্রান্তিক চাষিরা যাতে সহজে এই ঋণের সুবিধা পান, সে জন্য বিতরণ ও জামানত ব্যবস্থা অত্যন্ত সহজ ও গ্রাহক-বান্ধব করা হয়েছে:
বিতরণ নেটওয়ার্ক: ব্যাংকসমূহকে তাদের নিজস্ব শাখা, উপশাখা, এজেন্ট ব্যাংকিং, কন্ট্রাক্ট ফার্মিং, দলবদ্ধ ঋণ (Group Lending) কিংবা কোনো কোম্পানি/প্রতিষ্ঠানকে এজেন্ট/ইন্টারমিডিয়ারি নিয়োগ করে সরাসরি কৃষক পর্যায়ে ঋণ পৌঁছানো নিশ্চিত করতে হবে।
জামানতবিহীন ঋণ (সর্বোচ্চ ৫ লক্ষ টাকা): ক্ষুদ্র, প্রান্তিক ও বর্গাচাষিদের জন্য শস্য ও ফসল চাষের ক্ষেত্রে কোনো স্থাবর জামানত লাগবে না। শুধুমাত্র শস্য-ফসল দায়বদ্ধকরণের (Crops Hypothecation) বিপরীতে এককভাবে সর্বোচ্চ ৫.০০ লক্ষ টাকা পর্যন্ত জামানতবিহীন ঋণ দেওয়া যাবে।
বৃহদায়তন চাষাবাদ: কৃষি ও পল্লী ঋণ নীতিমালা অনুযায়ী সর্বোচ্চ ৫ একর জমিতে চাষের জন্য ফসল দায়বদ্ধকরণের সুবিধা মিলবে। এর চেয়ে বড় জমিতে চাষের ক্ষেত্রে ব্যাংকগুলো নিজেদের ঋণ নিয়মাচার অনুযায়ী জামানত গ্রহণ করা বা না করার বিষয়টি ব্যাংক-গ্রাহক সম্পর্কের ভিত্তিতে নির্ধারণ করবে।
বিকল্প জামানত (নারী ও প্রান্তিক চাষিদের জন্য): নারী ও প্রান্তিক কৃষকদের অর্থায়ন সহজ করতে প্রচলিত জমি বা স্থাবর সম্পত্তির পরিবর্তে ব্যক্তিগত, সামাজিক বা দলগত জামানত (যা সিএসএমই ঋণের অনুরূপ) ব্যবহার করা যাবে।
ঋণ ব্যবহারের কঠোর শর্ত: এই স্কিমের টাকা কোনোভাবেই গ্রাহকের পুরাতন বা খেলাপি ঋণ সমন্বয়ের (Adjust) জন্য ব্যবহার করা যাবে না। কোনো ঋণ খেলাপি ব্যক্তি এই স্কিমের আওতায় ঋণ পাবেন না এবং একজন গ্রাহক সর্বোচ্চ ৩ বার এই স্কিমের সুবিধা ভোগ করতে পারবেন। ঋণ বিতরণের সময় অঞ্চলভেদে স্বাভাবিক নিয়মাচারের ২০% হ্রাস/বৃদ্ধি প্রযোজ্য হতে পারে।
খাতভিত্তিক ঋণের সর্বোচ্চ সীমা
যাতে ক্ষুদ্র ও মাঝারি স্তরের অধিক সংখ্যক প্রকৃত চাষি উপকৃত হতে পারেন, সে লক্ষ্যে একজন গ্রাহকের একক ঋণের সর্বোচ্চ সীমা সুনির্দিষ্ট করে দেওয়া হয়েছে:
-
শস্য ও ফসল খাত: সর্বোচ্চ ৩০,০০,০০০ টাকা (ত্রিশ লক্ষ টাকা)।
-
আয় উৎসারী কর্মকাণ্ড ও অন্যান্য পল্লী ঋণ খাত: সর্বোচ্চ ১৫,০০,০০০ টাকা (পনেরো লক্ষ টাকা)।
-
কৃষি যন্ত্রপাতি খাত: সর্বোচ্চ ২০,০০,০০০ টাকা (বিশ লক্ষ টাকা)।
-
মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ খাত: সর্বোচ্চ ১,০০,০০,০০০ টাকা (এক কোটি টাকা)।
সুদ বা মুনাফার হার এবং পরিশোধের মেয়াদ
কৃষকদের উৎপাদন খরচ কমিয়ে আনতে এই স্কিমের সুদের হার অত্যন্ত আকর্ষণীয় ও সহনীয় পর্যায়ে রাখা হয়েছে:
-
তহবিল প্রাপ্তির হার (ব্যাংক পর্যায়): অংশগ্রহণকারী তফসিলি ব্যাংকসমূহ বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে মাত্র ৪% সুদ/মুনাফা হারে এই পুনঃ অর্থায়ন সুবিধা পাবে।
-
গ্রাহক/কৃষক পর্যায়: কৃষক পর্যায়ে সরল সুদের হার হবে সর্বোচ্চ ৮%। শরীয়াহ্ ভিত্তিক ব্যাংকগুলোর ক্ষেত্রেও মুনাফার হার কোনোভাবেই ৮% এর বেশি হতে পারবে না। এই হার সবার জন্য সমান এবং ক্রমহ্রাসমান স্থিতির (Diminishing Balance) উপর আরোপ করতে হবে।
-
ঋণের মেয়াদ ও গ্রেস পিরিয়ড: খাত বিবেচনায় কৃষক পর্যায়ে সর্বোচ্চ ০৩ (তিন) মাস গ্রেস পিরিয়ডসহ ঋণের মোট মেয়াদ হবে সর্বোচ্চ ১৮ (আঠারো) মাস। ব্যাংকগুলোকেও পুনঃ অর্থায়ন গ্রহণের ১৮ মাসের মধ্যে আসল ও সুদ (৪% হারে) বাংলাদেশ ব্যাংককে বুঝিয়ে দিতে হবে।
কঠোর মনিটরিং, জবাবদিহিতা ও শাস্তিমূলক ব্যবস্থা
তহবিলের অপব্যবহার রোধে বাংলাদেশ ব্যাংক একটি শক্তিশালী মনিটরিং ব্যবস্থা চালু করেছে:
পৃথক হিসাব বই: ব্যাংকগুলোকে এই স্কিমের আওতায় বিতরণকৃত প্রতিটি ঋণের জন্য পৃথক হিসাব বই বা অ্যাকাউন্ট সংরক্ষণ করতে হবে।
মাসিক রিপোর্টিং: প্রতি মাসের সমাপ্তির ৭ কর্মদিবসের মধ্যে ঋণের পুঞ্জীভূত বিবরণী (সংযুক্ত ছক-২) বাংলাদেশ ব্যাংকের কৃষি ঋণ বিভাগ-২ এ দাখিল করতে হবে।
সরেজমিন পরিদর্শন: ব্যাংকগুলোর নিজস্ব তদারকি ব্যবস্থার পাশাপাশি বাংলাদেশ ব্যাংক নিজে সরেজমিন পরিদর্শন ও তথ্য যাচাইয়ের মাধ্যমে ঋণের সদ্ব্যবহার মনিটরিং করবে। ঋণের আদায়ের সকল দায়-দায়িত্ব সংশ্লিষ্ট ব্যাংকের উপর থাকবে।
শাস্তিমূলক ব্যবস্থা: যদি কোনো ব্যাংকের ক্ষেত্রে প্রমাণিত হয় যে তহবিলের সঠিক সদ্ব্যবহার হয়নি অথবা কৃষকদের কাছ থেকে ৮% এর বেশি সুদ আদায় করা হয়েছে, তবে বাংলাদেশ ব্যাংক ওই অর্থের ওপর নির্ধারিত হারের অতিরিক্ত আরও ২% শাস্তিমূলক সুদ (সর্বমোট ১০%) ধার্য করে এককালীন কেটে নেবে। এছাড়া নির্ধারিত সময়ে ব্যাংক টাকা পরিশোধ না করলে বাংলাদেশ ব্যাংকে রক্ষিত ওই ব্যাংকের চলতি হিসাব বিকলন (Debit) করে টাকা আদায় করা হবে।
প্রচার ও প্রকৃত কৃষক নির্বাচন পদ্ধতি
ঋণ কার্যক্রম পুরোপুরি স্বচ্ছ রাখতে প্রতিটি ব্যাংক শাখাকে তাদের কার্যালয়ের ভেতরে ও বাইরে সহজে চোখে পড়ে এমন স্থানে ৮% সুদের ঋণের ব্যানার প্রদর্শন করতে হবে। চাষের মৌসুম শুরু হওয়ার আগেই বিশেষ ক্যাম্পেইন পরিচালনা করতে হবে। প্রকৃত প্রান্তিক কৃষক ও বর্গাচাষি চিহ্নিত করতে স্থানীয় কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর, মৎস্য অধিদপ্তর, প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তর কিংবা সরকারের অফিসিয়াল ‘কৃষক কার্ড’ (Farmer’s Card) ডেটাবেজের সহায়তা নেওয়া যাবে।
প্রতিবেদনটি বাংলাদেশ ব্যাংকের কৃষি ঋণ বিভাগের পরিচালক (এসিডি-১) দেবাশীষ সরকার কর্তৃক স্বাক্ষরিত অফিশিয়াল নির্দেশনার আলোকেই প্রস্তুত করা হয়েছে, যেখানে সার্কুলারের সংযুক্ত ছক-১ (মাসিক পুনঃ অর্থায়ন দাবী) এবং ছক-২ (মাসিক পুঞ্জীভূত বিবরণী) এর ছকসমূহ ব্যাংকগুলোর জন্য বাধ্যতামূলক করা হয়েছে।
