Copyright

কপিরাইট আইন ২০২৩ ঘাটতি ও দূর্বলতা

বাংলাদেশের কপিরাইট আইন ২০২৩  বার বার সংশোধন করার পরও এটি কাংখিত মান অর্জন করতে পারছেনা। এবং যেজন্য আইনটি তৈরী করা হয়েছে সেসব সমস্যারও সমাধান হচ্ছে না। এটি পূর্ববর্তী ২০০০ সালের আইনের বহু দুর্বলতা কাটিয়ে উঠতে চেষ্টা করেছে এবং কপিরাইট ব্যবস্থাপনায় কিছু কাঠামোগত উন্নয়ন এনেছে। কিন্তু বাংলাদেশের সকল আইন কাঠামোগতভাবে প্রায় ২শ বছরের পুরনো আর একই কারণে আইনগুলোর দূর্বলতায় এর কোনো কাংখিত লক্ষ্য অর্জিত হয়না।

লাভের মধ্যে শুধু যা হয়। তাহলে আইনগুলো সংশোধনের নামে এগুলোর বিচারিক পরিধি বৃদ্ধি করা হয় এবং নতুন নতুন অনেক বিষয়কে আইনের আওতায় এনে মামলার সংখ্যা বাড়িয়ে। পুলিশ ও কোর্টের লোকদের মামলার ব্যবসা করার সুযোগ দেয়া হয়। আর সেসব মামলাকে ঝুলিয়ে রেখে দেশে মামলার জট তৈরী করা হয়।

আইনটির বিস্তার বাড়লেও বাস্তবতার নিরিখে বহু পুরোনো ও জটিল সমস্যার কার্যকর সমাধান এতে অনুপস্থিত রয়ে গেছে। আন্তর্জাতিক মানদণ্ড, প্রযুক্তিগত রূপান্তর এবং সৃজনশীল অর্থনীতির বাস্তবতা বিবেচনায় এই আইনে একাধিক মৌলিক ঘাটতি স্পষ্ট হয়ে ওঠে।

১. প্রতিকার আছে, কিন্তু প্রতিরোধ নেই

বিশ্বের আধুনিক কপিরাইট আইনগুলোতে কেবল লঙ্ঘনের পর শাস্তি বা প্রতিকার নয়, বরং ex-ante prevention mechanism বা আগাম প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থাকে সর্বাধিক গুরুত্ব দেওয়া হয়। যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপীয় ইউনিয়ন, জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়ার কপিরাইট ব্যবস্থায় ডিজিটাল রাইটস ম্যানেজমেন্ট (DRM), নোটিস অ্যান্ড টেকডাউন ব্যবস্থা, প্ল্যাটফর্মের উপর proactive monitoring obligation, repeat infringer policy ইত্যাদি কাঠামো আইনের অংশ থাকে যাকে এখানে সঠিকভাবে রাখা হয়নি।

বাংলাদেশের কপিরাইট আইন ২০২৩ মূলত ex-post অর্থাৎ লঙ্ঘনের পর প্রতিকারকেন্দ্রিক। এখানে জরিমানা, নিষেধাজ্ঞা, মোবাইল কোর্ট বা মামলা রয়েছে, কিন্তু লঙ্ঘন ঘটার আগেই তা প্রতিরোধের জন্য কার্যকর কোনো বাধ্যতামূলক কাঠামো নেই। ফলে এই আইন প্রয়োগে “আগে ক্ষতি, পরে প্রতিকার”—এই পুরোনো দর্শনই বহাল থাকে।

২. আদালত-কেন্দ্রিকতা এবং বিকল্প বিরোধ নিষ্পত্তির অভাব

আন্তর্জাতিকভাবে কপিরাইট বিরোধ নিষ্পত্তিতে এখন আদালতের পাশাপাশি Alternative Dispute Resolution (ADR) পদ্ধতির ব্যবহার ব্যাপক। অনেক দেশে— কপিরাইট ট্রাইব্যুনাল, কপিরাইট কাউন্সিল বা বোর্ড অব মেডিয়েশন, সেক্টরভিত্তিক সালিশি প্যানেল, কার্যকরভাবে চালু রয়েছে। কিন্তু এখানে এসব অনুপস্থিত।

বাংলাদেশের কপিরাইট আইন ২০২৩-এ কপিরাইট বোর্ড ও রেজিস্ট্রারের ক্ষমতা বাড়ানো হলেও আদালতের বাইরে বাধ্যতামূলক বা কার্যকর বিকল্প বিরোধ নিষ্পত্তি কাঠামো নেই। বিশেষ করে দ্রুত নিষ্পত্তিযোগ্য বিষয়—যেমন রয়্যালটি বণ্টন, লাইসেন্সিং বিরোধ, ডিজিটাল কনটেন্ট টেকডাউন—এসব ক্ষেত্রে আদালতই প্রধান ভরসা। এতে সময়, খরচ ও জটিলতা বাড়ে, যা স্রষ্টাদের জন্য বাস্তবসম্মত নয়।

একটি স্বতন্ত্র কপিরাইট কাউন্সিল বা মাল্টি-স্টেকহোল্ডার প্ল্যাটফর্ম (স্রষ্টা, ব্যবহারকারী, প্ল্যাটফর্ম, রাষ্ট্র)—এই আইনে অন্তর্ভুক্ত না হওয়াটা একটি বড় কাঠামোগত দুর্বলতা।

৩. খাতভিত্তিক কপিরাইট বিধির অনুপস্থিতি

বিশ্বের উন্নত দেশগুলো কপিরাইটকে একক ও অভিন্ন বিষয় হিসেবে দেখে না। বরং তারা বুঝে নিয়েছে— “One size does not fit all in copyright.” ফলে সেখানে— চলচ্চিত্র শিল্প, সংগীত ও পারফর্মিং আর্টস, সফটওয়্যার ও গেমিং,

সংবাদ ও সাংবাদিকতা, একাডেমিক ও গবেষণা কর্ম, ফটোগ্রাফি ও ভিজ্যুয়াল আর্ট প্রতিটি খাতের জন্য আলাদা বিধি, গাইডলাইন বা কোড অব প্র্যাকটিস বিদ্যমান।

বাংলাদেশের কপিরাইট আইন ২০২৩ একটি সাধারণ কাঠামো দিয়েছে, কিন্তু খাতভিত্তিক বাস্তবতা ও অর্থনৈতিক মডেলকে আলাদা করে বিবেচনা করেনি। উদাহরণস্বরূপ— সিনেমা ও ওটিটি প্ল্যাটফর্মের লাইসেন্সিং সমস্যা, সংগীত শিল্পে রয়্যালটি সংগ্রহ ও বণ্টন, সফটওয়্যার ও ওপেন সোর্স লাইসেন্স, সংবাদমাধ্যমে ফেয়ার ইউজ ও উদ্ধৃতি সীমা, গবেষণায় ডেটা ও জার্নাল ব্যবহারের ন্যায্যতা এসব বিষয়ের জন্য পৃথক বিধিমালা না থাকায় আইন প্রয়োগে বিভ্রান্তি তৈরি হবে।

৪. ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম দায়বদ্ধতায় সীমাবদ্ধতা

ইইউ ও যুক্তরাষ্ট্রে ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মগুলো কেবল “হোস্ট” নয়, বরং নির্দিষ্ট শর্তে দায়বদ্ধ সত্তা। বাংলাদেশের আইনে ডিজিটাল কর্মের স্বীকৃতি থাকলেও অ্যালগরিদমিক প্রচার, এআই-জেনারেটেড কনটেন্ট, রি-ইউজ ও রিমিক্স সংস্কৃতি, প্ল্যাটফর্মের রাজস্ব ভাগাভাগি এসব বিষয়ে আইন এখনও নীরব বা অস্পষ্ট।

৫. এআই ও চতুর্থ শিল্পবিপ্লবের বাস্তবতা অনুপস্থিত

বিশ্বের বহু দেশ ইতোমধ্যে কপিরাইট আইনে এআই প্রশিক্ষণ ডেটা, মেশিন লার্নিং আউটপুট, অটোমেটেড কপিরাইট লঙ্ঘন শনাক্তকরণ ইত্যাদি বিষয় অন্তর্ভুক্ত করেছে। বাংলাদেশের কপিরাইট আইন ২০২৩ এই ক্ষেত্রে প্রায় নীরব, যা ভবিষ্যতে বড় আইনি শূন্যতা তৈরি করবে।

৬. নৈতিক ও সামাজিক প্রয়োগ কাঠামোর দুর্বলতা

উন্নত কপিরাইট ব্যবস্থায় আইন কেবল শাস্তির যন্ত্র নয়; এটি একটি ethical ecosystem। সেখানে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, মিডিয়া, প্ল্যাটফর্ম ও পেশাজীবীদের জন্য আচরণবিধি থাকে। বাংলাদেশের আইনে সচেতনতার কথা বলা হলেও বাধ্যতামূলক নৈতিক কাঠামো বা কোড অব কন্ডাক্ট অনুপস্থিত।

৭. কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI) বিষয়ে নীরবতা

বর্তমান বিশ্বের সবচেয়ে বড় কপিরাইট চ্যালেঞ্জ হলো কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা। এআই দ্বারা— লেখা, গান, ছবি, ভিডিও, এমনকি সফটওয়্যার কোড তৈরি হচ্ছে। প্রশ্ন উঠছে—এই সৃষ্টির মালিক কে? প্রশিক্ষণ ডেটায় ব্যবহৃত কনটেন্টের কপিরাইট কীভাবে সুরক্ষিত হবে? এআই যদি হাজারো শিল্পীর কাজ থেকে শিখে নতুন কিছু তৈরি করে, তবে মূল স্রষ্টাদের অধিকার কোথায়?

বাংলাদেশের কপিরাইট আইন ২০২৩ এই বিষয়ে প্রায় সম্পূর্ণ নীরব। অথচ বিশ্বের বহু দেশে ইতোমধ্যে এআই-ট্রেনিং ডেটা, অ্যালগরিদমিক ব্যবহার, এআই আউটপুটের স্বত্ব এবং দায়বদ্ধতা নিয়ে স্পষ্ট নীতিমালা প্রণীত হচ্ছে। এই শূন্যতা ভবিষ্যতে কপিরাইট আইনের সবচেয়ে বড় দুর্বলতায় পরিণত হতে পারে।

৮. বুদ্ধিভিত্তিক সম্পদ সুরক্ষায় সমন্বিত নির্দেশনার অভাব

কপিরাইট কেবল একটি আইনি বিষয় নয়; এটি একটি ইকোসিস্টেম। সৃজনশীল ব্যক্তি, প্রযোজক, পরিবেশক, প্ল্যাটফর্ম, প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান এবং ভোক্তা—সবাই এই ব্যবস্থার অংশ। কিন্তু কপিরাইট আইন ২০২৩-এ বুদ্ধিভিত্তিক সম্পদ সুরক্ষার জন্য কোনো সমন্বিত জাতীয় নির্দেশনা (National IP Governance Framework) নেই।

বিশেষ করে— কপিরাইট, পেটেন্ট, ট্রেডমার্ক, ডিজাইন এই চারটি ক্ষেত্রের মধ্যে নীতিগত সমন্বয়ের অভাব রয়ে গেছে। বুদ্ধিভিত্তিক সম্পদ সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের সমন্বয়ে একটি কাউন্সিল, অথবা একাধিক কাউন্সিলের সমন্বয়ে একটি ফেডারেশন গঠনের মৌলিক প্রয়োজনীয়তা উপেক্ষিত হয়েছে। ফলে আইনের আওতা বাড়লেও দীর্ঘদিনের কাঠামোগত সমস্যাগুলো রয়ে গেছে।

৯. বহু-স্বত্বাধিকারী কনটেন্টে অনুমতি ও রয়্যালটি জটিলতা

একটি গান সাধারণত একাধিক স্বত্বাধিকারীর সমন্বয়ে তৈরি— গীতিকার, সুরকার, সংগীতশিল্পী, প্রযোজক।

কিন্তু সেই গান কেউ ব্যবহার করতে চাইলে— কার কাছ থেকে অনুমতি নেবে? কাকে কত শতাংশ রয়্যালটি দেবে?

এই প্রশ্নের বাস্তবসম্মত ও দ্রুত সমাধান নেই। অতীতে মোবাইল কনটেন্ট, রিংটোন ও ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে এই সুযোগে ব্যাপক অনিয়ম হয়েছে। কনটেন্ট প্রোভাইডাররা অনেক সময় প্রোডাকশন হাউজ থেকে কনটেন্ট নিয়েছে, অথচ প্রকৃত কপিরাইট শিল্পী বা গীতিকারের নামে। ফলাফল—সৃজনশীল মানুষ ঠকেছে, আর মধ্যস্বত্বভোগীরা লাভবান হয়েছে।

একটি কার্যকর কপিরাইট কাউন্সিল থাকলে আদালতে না গিয়েই এসব বিরোধ নিষ্পত্তি সম্ভব হতো। কিন্তু আদালতের দীর্ঘসূত্রতা ও খরচের ভয়ে অনেক স্রষ্টা ন্যায্য অধিকার দাবি না করেই চুপ থাকেন। মাঝখানে অন্য কেউ সুবিধাভোগী হয়, আর সৃজনশীল মানুষ বঞ্চিত থেকে যায়।

১০. কাউন্সিল বা ফেডারেশনের অধীনে আর্থিক ব্যবস্থাপনার অনুপস্থিতি

আন্তর্জাতিকভাবে কপিরাইট ব্যবস্থাপনায় সবচেয়ে কার্যকর মডেল হলো Collective Rights Management System। এই ব্যবস্থায়— স্রষ্টারা তাদের কাজ একটি কর্তৃপক্ষের কাছে জমা দেন, ব্যবহারকারীরা সেই কর্তৃপক্ষের কাছ থেকেই লাইসেন্স নেয়, রয়্যালটি সংগ্রহ ও বণ্টন স্বচ্ছভাবে সম্পন্ন হয়।

বাংলাদেশের কপিরাইট আইন ২০২৩-এ এমন একটি কাউন্সিল বা ফেডারেশনের অধীনে স্বতন্ত্র আর্থিক বিভাগ গঠনের সুযোগ রাখা হয়নি। যদি এমন একটি প্রতিষ্ঠান থাকত, যা মিডিয়া হিসেবে কাজ করে নির্দিষ্ট কমিশনের বিনিময়ে লাইসেন্স ও রয়্যালটি ব্যবস্থাপনা করত, তাহলে কপিরাইট সংক্রান্ত অর্ধেক সমস্যার সমাধান আপনা-আপনিই হয়ে যেত।

১১. ই-কমার্স ও বিপুল কনটেন্ট বাস্তবতার অনুপস্থিত স্বীকৃতি

ই-কমার্সে একজনের ছবি, বিবরণ বা কনটেন্ট আরেকজন অবাধে ব্যবহার করছে—এটি একটি বাস্তব ও জটিল সমস্যা। একটি বড় ই-কমার্স প্ল্যাটফর্মে— কোটি কোটি পণ্য বিবরণ, প্রতিদিন হাজার হাজার নতুন আপলোড

এই বিপুল কনটেন্টকে পৃথকভাবে কপিরাইট রেজিস্ট্রেশন করা বাস্তবসম্মত নয়। আন্তর্জাতিকভাবে এসব ক্ষেত্রে safe harbour, notice-based system, platform liability guideline অনুসরণ করা হয়। বাংলাদেশের আইনে এই বাস্তবতার কোনো স্পষ্ট দিকনির্দেশনা নেই, যা ভবিষ্যতে বড় ধরনের আইনি জটিলতা তৈরি করবে।

১২. নিউজ ও কনটেন্ট কপির সাধারণ নীতির অভাব

সবচেয়ে বেশি কপি হয় সংবাদ ও কনটেন্ট। এক সংবাদমাধ্যমের লেখা অন্য মাধ্যম হুবহু প্রকাশ করছে—এটি নিত্যদিনের ঘটনা। অথচ এ বিষয়ে— কতটুকু উদ্ধৃতি বৈধ, কোথায় ফেয়ার ইউজ শেষ, কোথায় কপিরাইট লঙ্ঘন শুরু এসব বিষয়ে কোনো স্পষ্ট জাতীয় গাইডলাইন নেই। আদালতে গিয়ে এসব সমস্যা সমাধান করা বাস্তবসম্মত নয়। বরং এসব ক্ষেত্রে প্রেস কাউন্সিল বা মিডিয়া কাউন্সিলের মাধ্যমে নিষ্পত্তির নির্দেশনা থাকা জরুরি ছিল। কপিরাইট আইনের অধীনে এ বিষয়ে পৃথক গাইডলাইন না থাকায় সংবাদমাধ্যম ও কনটেন্ট নির্মাতারা অনিশ্চয়তার মধ্যে রয়ে গেছে।

মোট কথা, কপিরাইট আইন ২০২৩ আইন হিসেবে বিস্তৃত হলেও এটি এখনো প্রতিরোধহীন, কাউন্সিলবিহীন এবং খাতভিত্তিক বাস্তবতা-বিচ্ছিন্ন একটি কাঠামো। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম, ই-কমার্স, সংবাদমাধ্যম এবং বহু-স্বত্বাধিকারী সৃজনশীল কাজের বাস্তব সমস্যাগুলো এই আইনে পূর্ণাঙ্গভাবে প্রতিফলিত হয়নি।

এই আইন সত্যিকার অর্থে কার্যকর করতে হলে প্রয়োজন— কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও নতুন প্রযুক্তি বিষয়ে স্পষ্ট নীতি, বুদ্ধিভিত্তিক সম্পদের জন্য সমন্বিত কাউন্সিল বা ফেডারেশন, আদালতের বাইরে দ্রুত বিরোধ নিষ্পত্তি কাঠামো, খাতভিত্তিক কপিরাইট গাইডলাইন, এবং একটি শক্তিশালী নৈতিক ও আর্থিক ব্যবস্থাপনা মডেল।